somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জুনায়েদ, ফান, ফেসবুক ও তারুণ্যের বিকার { একটি বিশাল ঘটনা, যা বাংলাদেশকে নারিয়ে দিয়েছে }

১৭ ই মার্চ, ২০১৬ দুপুর ১২:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একটি ছেলে তার বন্ধুকে পেটাচ্ছে।
আরেকজন সেটা ভিডিও করছে। দেখনদার পাবলিক
দেখছে। সেই ভিডিও ফেসবুক থেকে ভাইরাল
হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। দেখনদার পাবলিক সেখান
থেকেও দেখছে। এই পাবলিকের বেশির ভাগই
আবার কৈশোরিক বা তরুণ-তরুণী। আর তাদের
আছে ফেসবুক। সেখানে তারা মেতে উঠছে
আলোচনায়। মারকুটে জুনায়েদ আর মার-খাওয়া
নুরুল্লাহর এই গল্পে একটি মেয়েও আছে, যাকে
অপমানের অভিযোগ নিয়ে জুনায়েদ চড়াও
হয়েছে নুরুল্লাহর ওপর। আপাদমস্তক পেটানো
হয়েছে ছেলেটিকে। ৯ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড
ধরে দৃশ্যটা ভিডিও করা হয়েছে। পর্নোগ্রাফির
মতো নির্মমতাও উপভোগ্য অনেকের কাছে।
ফেসবুকে দেখা যায়, অনেকেই জুনায়েদকে
সমর্থন করছে। তার সমর্থনেও ভিডিও ছাড়া
হয়েছে এবং সেগুলোও হিট! বড়দের দুনিয়া যখন
বাংলাদেশ ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা নিয়ে আলোড়িত, তখন
কৈশোর-তারুণ্যের মনোযোগ কেড়ে
নিয়েছে জুনায়েদ নামের এক মারকুটে তরুণ।
এসব ফেসবুক পোস্টের উদ্দেশ্য মনে হয়
লাইক ও শেয়ার বাড়ানো। যত লাইক, যত শেয়ার, তত
বিখ্যাত হওয়ার হাতছানি। ঢাকাই সিনেমার মারদাঙ্গা নায়কেরা
কেন জনপ্রিয় হন, তার বাস্তব নমুনা পাওয়া গেল।
জগতে জো জিতা ওহি সিকান্দার। যে মেরে
জিতে থাকবে, সে-ই রাজা, সে-ই জনপ্রিয়। যে
মারছে বন্ধুকে, সেই জুনায়েদ যেন প্রাগৈতিহাসিক
কাল থেকে চলে আসা এই নিয়ম জেনে গেছে।
তারও বিশ্বাস, জোর যার মুল্লুক তার। তাই একচেটিয়া
মেরেই যাচ্ছে। দুদিন আগে এই নাটক মঞ্চ ছাড়াই
পরিবেশিত হয় ধানমন্ডি লেকের পাড়ে। সবার
সামনে পেটানো চলেছে, ভিডিও করা হয়েছে
এবং আশপাশে মানুষ স্বচক্ষে এবং বাকিরা
ভিডিওযোগে এই ‘অ্যাকশন’ দেখছে।
জুনায়েদের অভিযোগ, নুরুল্লাহ তার (জুনায়েদ)
বান্ধবীকে অপমান করেছে। ভিডিওর মধ্যে
মারতে মারতে এই অভিযোগের কথা বলতে
দেখা গেছে জুনায়েদকে। আর নুরুল্লাহ মার
খেতে খেতেও অভিযোগ অস্বীকার করে
গেছে। এরই মধ্যে বেরিয়ে পড়ল আরেকটা
ভিডিও। তাতে দেখা যাচ্ছে, জুনায়েদ তার বন্ধুর
কাছে ইনিয়ে-বিনিয়ে মাফ চাইছে। সেটাও বেশ
বীরোচিত ভঙ্গিতে, ‘মাফ কইরা দে দোস্ত’!
অথচ তার চোখে-মুখে অনুতাপের ভঙ্গি নেই,
আছে কাটা ঘায়ে নুন লাগানোর অভিলাষ। এই ভিডিওটাও
ফেসবুকে ব্যাপক হিট।
জুনায়েদের জন্য হয়তো পুরোটাই ‘ফান’-মজা। তাই
ফৌজদারি অপরাধ করার দৃশ্যটা সে ভিডিও করিয়েছে এবং
ছড়িয়ে দিয়েছে ফেসবুকে। কী উদ্দেশ্যে?
ফেসবুকে এ নিয়ে বাদ-বিতর্কে জড়িত
ব্যক্তিদের অনেকেরই মত হচ্ছে, নিজেকে
বিখ্যাত করার জন্যই জুনায়েদ ভিডিওটি ছেড়েছে।
এবং ঘটনা সত্য। জুনায়েদ এখন মহাবিখ্যাত।
ফেসবুকেই তার ভিডিওটি দেখেছে প্রায় তিন লক্ষ
ভিউয়ার। এই বয়সে এ রকম খ্যাতিলিপ্সা অস্বস্তিকর।
খ্যাতি চাই কেন? খ্যাতি বন্ধুদের সমাদর বাড়ায়,
মেয়েরা বেশি পাত্তা দেয় ইত্যাদি। খ্যাতির এই বাসনা
কি কেবলই ওদের? এই সমাজে মিডিয়ায় কাজ করা
মানুষ, নাটক-টক শো-বিজ্ঞাপনের মানুষ, কে না চায়
খ্যাতি? খ্যাতি অনেক ক্ষেত্রে অর্থ ও ক্ষমতার
সহায়ক। কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও সেলিব্রিটি
হতে চায় না কে? খ্যাতি অর্জনের অনেক উপায়।
তার মধ্যে কেলেঙ্কারি সৃষ্টি করা একটা।
অভিনেত্রী-মডেলদের কাউকে কাউকে দেখা
গেছে বিতর্কিত বিষয়ে মন্তব্য করে, কিংবা অন্য
কোনো সেলিব্রিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে
বিখ্যাত হওয়ার চেষ্টা করতে। যৌন উত্তেজক ছবি বা
ভিডিও প্রচারের তরিকাও অনেকে নিচ্ছেন।
আমাদের এক মন্ত্রী তো খলিফা হারুন অর
রশিদের কায়দায় সড়কে ‘ওয়ান ম্যান হিরোর’ ভূমিকায়
অবতীর্ণ হয়ে কোথাও মারধর, কোথাও দয়া,
কোথাও বিবেকের বাণী দিয়ে বেড়ান।
বাগদাদের খলিফার যুগে সাংবাদিক ছিল না, কিন্তু
মন্ত্রীর জন্য সাংবাদিকেরা সর্বদাই প্রস্তুত।
যা হোক, ‘বিখ্যাত’ হওয়ার মাধ্যমে জুনায়েদের মজা
নিশ্চয়ই আরও বেড়েছে। ‘মজা’ খুবই নিরীহ শব্দ।
একে বলা হয় নির্দোষ আনন্দ। এই নির্দোষ
আনন্দের তোড়েই ঢাকার জনাকীর্ণ রাস্তায়
রেসিং কার ছোটায় ধনীর দুলালেরা। মাস কয়েক
আগে গুলশানে তাদেরই একজনের গাড়ির ধাক্কায়
রিকশারোহী মায়ের কোলে থাকা শিশু নিহত হয়।
মজার টানেই ইয়াবাসহ বিভিন্ন রকম নিকৃষ্ট নেশা
তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। মজার খোরাক
জোগাতে গিয়েই তাদের কেউ কেউ দামি গাড়ি
নিয়ে মধ্যরাতের ঢাকায় ছিনতাই অভিযানে নেমে
পড়ে। এবং এ রকম করে কেউ কেউ জড়িয়ে
পড়ে আরও মারাত্মক সব অপরাধে। গত মাসে
রাজধানীর পূর্ব রামপুরায় প্রকাশ্য রাস্তায় ১৭-১৮
বছরের দুই কিশোর এক তরুণকে ধারালো অস্ত্র
দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। হরহামেশাই এ রকম
ঘটছে। পেশাদার খুনি হিসেবে কিশোরদের
ব্যবহার বাড়ছে। কারণ, তাদের বেপরোয়া সাহস।
যে সাহস আবার আসে নেশার রসায়নে এবং এদের
ভাড়া করা যায় খুবই সস্তায়।
সব দেশেই সব সময়ে তরুণদের একটা নিজস্ব
জগৎ থাকে। একে বলা যায় সাব-কালচার। তারা চায়
পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের প্রভাবের বাইরে নিজস্ব
পরিচয় ও জগৎ বানিয়ে তার মধ্যে বাস করতে। প্রায়ই
তাদের এই জগতে আলোর চেয়ে অন্ধকারই
থাকে বেশি। তাদের নিজস্ব স্টাইল থাকে, আচরণ
থাকে, থাকে বড়দের কাছে ‘অদ্ভুত লাগা’ সব
আগ্রহ ও আদর্শ। কখনো কখনো তারা প্রতিষ্ঠিত
সমাজ-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। কিন্তু
আমাদের দেশে যেটা দেখা যাচ্ছে, সেটা
বিদ্রোহ নয়, বিকৃতি।
এই বিকৃতির প্ররোচনার অনেক উৎস। রাজনীতি
তাদের ব্যবহার করে, ব্যবসা তাদের খোরাক
করে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি তাদের টানে দৃশ্য-
সংস্কৃতি। টেলিভিশন, ইউটিউব, সিনেমায় মারদাঙ্গা ব্যাটাগিরি
নায়কের জয়জয়কার। সিরিয়ালগুলোতে গুটিবাজির
সমাহার। ওই ভিডিওতে জুনায়েদ নুরুল্লাহকে গুটিবাজ
বলে গালি দিচ্ছিল। গুটিবাজ মানে যে কূটকচালি করে।
গুটিবাজি, নেশাবাজি আর মাস্তানি হয়ে উঠছে অনেক
তরুণের সাব-কালচার। মোবাইল, ভিডিও, ইন্টারনেট
থেকে তারা সংগ্রহ করছে এসবের রসদ। ভালো
থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষা তাদের বেহুঁশ করছে।
প্রেম ও খ্যাতির তৃষ্ণা, অর্থ ও ক্ষমতার লোভ এবং
আদর্শহীন এই সমাজের প্রতি বিতৃষ্ণা যে তাদের
বেপথু করছে না, তা কে নিশ্চিত করে বলতে
পারে?
সন্তানেরা জন্মগতভাবে মা-বাবার, কিন্তু কৈশোর
থেকেই তারা হয়ে যায় সমাজের। সমাজ যেমন, তারা
তেমন দিকেই ধাবিত হয়। আর আজ যখন সমাজ বলে
কিছু নেই, যখন আছে কেবল যার যার নিজস্ব
অ্যাসোসিয়েশন আর গ্রুপ (বাস্তবে বা
ফেসবুকে), তখন তারা মিডিয়ার সরবরাহ করা বাসনার
জাতক ছাড়া আর কী? আপনাদের সন্তানেরা আর
কতটা আপনাদের, আর কতটা প্রযুক্তিনির্ভর
বিনোদনশক্তির, সেই কথাটা ভাবতে বসুন। রাষ্ট্র,
রাজনীতি, অর্থ নিয়ে ভাবতে ভাবতে সমাজ-সংস্কৃতির
নোঙর যাঁরা ছেড়ে দিয়েছেন, এ রকম একেকটি
ঘটনা তাঁদের আরও হতবাক করার জন্য অপেক্ষা
করে আছে!
video here: https://m.youtube.com/watch?v=cGrL1-zEgfs
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

টাই চাই

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩১

সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে: অদ্য হইতে কোনো সরকারি বা বেসরকারি কার্যালয়ে ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানে টাই ও বেল্ট পরিধান দণ্ডনীয় অপরাধ। কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে একবাক্যে: "কর্মক্ষেত্র ও যত্রতত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রাইভেট জব

লিখেছেন রোদ্র রশিদ, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:১০



গত পনেরো দিন ধরে নতুন ম্যাডাম ইংরেজি ক্লাস নিচ্ছেন। ট্রায়াল ক্লাস। ম্যাডামকে এখনো কলেজে পারমানেন্ট করা হয়নি। উনি খুব একটা খারাপ পড়ান না।

আজকের ক্লাস শেষে ম্যাডামের মন খুব খারাপ।
খুব... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের জন্য ৭-গ্রেডভিত্তিক ন্যায়সংগত সরকারি বেতন ও প্রশাসনিক সংস্কার একটি প্রস্তাবিত নীতিপত্র

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২০


ন্যায়সংগত পারিশ্রমিক, বেতন বৈষম্য হ্রাস, মেধার মূল্যায়ন এবং দক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রশাসন প্রতিষ্ঠার একটি সমন্বিত প্রস্তাব

বাংলাদেশের সরকারি বেতন কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে ২০টি গ্রেডের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে আসছে। ভেবেছিলাম দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুlie ২৪ আন্দোলন পরবর্তী বৈষম্যহীন বাংলায় (যেহেতু বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই), বেসরকারী ও সরকারী কর্মজীবীর জীবন...

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২১

/বাংলাদেশের মোট কর্মজীবীদের মধ্যে সরকারী আর বেসরকারী কত শতাংশ?

/গত ২ বছরে যত শিল্প কারখানা ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে এবং তাতে যত সংখ্যক বেসরকারী কর্মজীবী (কর্মকর্তা, কর্মচারী, শ্রমিক….) চাকরী... ...বাকিটুকু পড়ুন

দশ বছরের ব্লগিং—মিষ্টি মুখ হোক সবার

লিখেছেন কাওসার_সিদ্দিকী, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৯

আজ আমার ব্লগিং যাত্রার দশ বছর দুই মাস পূর্ণ হলো। এই দীর্ঘ সময়ে পাঠকদের ভালোবাসা, মন্তব্য আর সমর্থন আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

এই আনন্দ ভাগাভাগি করতে চাই আপনাদের সবার সাথে—তাই আজকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×