সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে: অদ্য হইতে কোনো সরকারি বা বেসরকারি কার্যালয়ে ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানে টাই ও বেল্ট পরিধান দণ্ডনীয় অপরাধ। কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে একবাক্যে: "কর্মক্ষেত্র ও যত্রতত্র আত্মহত্যাপ্রবণতা রোধকল্পে।" ব্যাস, এইটুকুই। কোনো বর্ণণা নেই, আগেপরে কোনো গবেষণা নেই, শুধু একটা সত্য প্রকাশ্যে স্বীকৃত হলো যা সবাই জানত অথচ কেউ বলত না, বা বললেও অন্যরা শুনতো না, এমনকি যে এইকথা আগে বলেছে এবং পরেও বলবে, সেও না, তাকে বললেও সে শুনতো না।
এদিকে করিম সাহেব গুলশানের অফিসে ঢোকার মুখে গেটে দাঁড়ানো নিরাপত্তারক্ষী তার কোমর থেকে বেল্টটা কেড়ে নিল, যেমন বিমানবন্দরে জুতা খোলানো হয়। "স্যার, প্যান্ট সামলাইয়া ভিতরে যান।" করিম সাহেব হাত দিয়ে কোমর চেপে ধরে লিফটের দিকে হাঁটলেন। করিম সাহেবের সহকর্মী রহিম সাহেবের গলায় টাই নেই বলে শার্টের কলার এমনভাবে উড়ছে যেন, যা এতদিন এই কলারের আড়ালেই লুকিয়ে থাকত, কারণ টাই যে জিনিসটা আসলে লুকাত, সেটা লজ্জা না, সেই প্রায়দিনই অফিসের শেষে নারী সহযোগীর সাথে মালদ্বীপ যাওয়ার প্রস্তুতিপর্ব বা প্রতিশ্রুতিপর্বের বেহায়াপনাগুলো আজকে সবাই দেখতে পাচ্ছে ।
সেদিকে কোর্টকাচারিতে বিচারক সাহেব এজলাসে বসলে একদা যে কালো গাউনের নিচে টাই শোভা পেত, সেখানে এখন একটা ঢিলা রুমাল অথবা ফিলিস্তিনী গামছা কী একটা যেন ঝুলছে, তা সংহতি প্রকাশের অভিপ্রায়ে, নাকি নেহাত ফ্যাশনের খাতিরে, তা বিচারক সাহেব নিজেও ভালো বলতে পারবেন না, কারণ ন্যায়বিচার আর নিজের ভাবমূর্তির মধ্যে পার্থক্যটা তিনি অনেকদিন ধরেই ভুলে বসে আছেন; তাকে দেখতে অনেকটা জাঁদরেল জল্লাদের বদলে যেন কুইচ্চা মুরগীর কসাইয়ের মতো। কষে গামছা বেঁধে আসা আসামীপক্ষের উকিল যুক্তি দিলেন, "মাননীয় আদালত, আমার মক্কেল নির্দোষ, কারণ তার কোমরে বেল্ট থাকলে তিনি নিজেকেই ফাঁসি দিতেন, অন্যকে খুন করার সময় কোথায়।" বিচারক মাথা নাড়লেন, যুক্তিটা মন্দ না।
ওদিকে সচিবালয় পাড়ায় করিডোরে একজন সিনিয়র সচিব হেঁটে যাচ্ছিলেন, যার প্যান্ট প্রতি পাঁচ কদমে ছয় ইঞ্চি নেমে যাচ্ছিল। উনার পেছনে হাঁটতে থাকা সহকারী একহাতে ফাইল আর অন্যহাতে স্যারের কোমর সামলাচ্ছিলেন নিজেরটার তোয়াক্কা না করেই। তাকে দেখে মনে হতে পারে যে, এদেশে রাষ্ট্রযন্ত্র ও জনজীবন আসলে এভাবেই চলে—এক হাতে দলিলনথি সামলানো, আরেক হাতে খসে পড়া থেকে রক্ষার প্রয়াস।
সন্ধ্যায় টিভিতে এক টকশো বিশেষজ্ঞ বললেন, "টাই-বেল্ট নিষিদ্ধ করে আমরা আসলে উপসর্গ সারাচ্ছি, রোগ না।" উপস্থাপক জিজ্ঞেস করলেন, "তাহলে রোগটা কী?" বিশেষজ্ঞ চুপ করে রইলেন অনেকক্ষণ, তারপর বললেন, "চাকরি।"
পরদিন থেকে চাকরি নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলো, কিন্তু সেনাপতিকে লাথি মারতে চাওয়া আন্দোলনকারী গণপতিরা টাই-বেল্ট ছাড়া মিছিলে দাঁড়িয়ে বুঝলো যে, হাতে প্ল্যাকার্ড ধরলে প্যান্ট সামলাবে কে! আন্দোলনও তাই আর বেশিদূর গড়াল না। রাষ্ট্র নিশ্চিন্ত, ভাগাড় যথারীতি অক্ষত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


