somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মা’কে নিয়ে লেখা মিসবাহ উদ্দীন আহমদ

২৩ শে নভেম্বর, ২০১৩ রাত ১০:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


মা; শব্দটির বিশালতা বলার কোন প্রয়োজন নেই। মা মানে আমার কাছে কেন, যে কোনো সন্তানের কাছেই পুরো পৃথিবী। আমার মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন নতুন ঠিকানায়। যেখানে যাওয়ার জন্যই পৃথিবীর বুকে আসা। মহান আল্লাহপাক ডাক দিয়েছেন, সেই ডাক ফেরানোর সাধ্য কারোরই নেই। ছিলো না আমার মায়েরও। তাইতো অনেকটা হাসিমুখেই মা চলে গেলেন। রেখে গেলেন আকাশ ছোঁয়া স্মৃতি। যদি কম্পিউটারের কি-বোর্ডে কিংবা কাগজের পাতায় ওসব লিখতে বসি তবে অনায়াসে সেটা হবে সুবিশাল এক স্মৃতি জাগানিয়া। তিল তিল করে, আদরে আদরে জমা স্মৃতিসব, মায়াভরা মুখচ্ছবি আজো চোখের সামনে এসে প্রেরণা আর সাহস জোগায়। আগামীর পথে চলার পাথেয় হয় আর দোয়া দিয়ে যায়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে করজোড়ে মিনতি মা-কে তিনি যেনো জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন। তার অপার করুণাধারায় সিক্ত করেন মানুষটিকে; যিনি সারাজীবন শুধু আমাদের জন্যই কষ্ট আর ত্যাগ করে গেছেন। আমাদের ভবিষ্যৎ সাজাতে নিজের কতো-শতো সাধ-আহ্লাদ বাক্সবন্দি করে রেখেছেন। আমরা কষ্টে থাকবো বলে প্রবাসে থাকা বাবা-মা, ভাই-বোন ও স্বজনদের ডাকে ত্রিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে মাত্র সাড়ে পাঁচ মাস থেকে কেঁদে পাগলপ্রায় হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন স্বামী-সন্তানের কাছে। যে মানুষটি বিয়ের আগে ও পরে ইংল্যান্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করার সুযোগ বারবার পেয়েও যাননি। শুধু স্বামীর সেবা করার জন্য সে সুযোগ ফিরিয়ে দিয়েছেন। যে মানুষটি শুধুই ভালোবেসে পরপারে চলে গেলেন, নাড়িছেড়া ধনরা তার জন্য কিছুই করতে পারিনি। তোমার জন্য মা শুধু চোখের পানি আর প্রার্থনা। নিজ হাতে সাজিয়ে শুধুই দিলে; প্রতিদানে কিছুই নিলেনা।
২.
চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুর কথা। মায়ের অসুস্থতার খবর শুনে দিন দিন আমার এবং পরিবারের অন্যান্যদের মানসিক অস্থিরতা বাড়ছেই। যে কোনো উপায়ে মাকে বাঁচাতে হবে। শতো চেষ্টা, শত আকুতি। চলছেই। তিল তিল করে দুরারোগ্য ব্যাধি বাসা বেঁধেছে আম্মার শরীরে। বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর রিপোর্টগুলো নিয়ে ছুটে গেলাম আমার অসামান্য ভরসার স্থল ‘দৈনিক মানবজমিন’ পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি মম ভাই’র (চৌধুরী মুমতাজ আহমদ) বাসায়। ওখানে বসে অনেক আলোচনা এবং ফোনে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত হলো দেশেই চিকিৎসা করানো ভালো।
তারপরও ভাবলাম অন্য কোথাও নিলে যদি আরেকটু বেশি উপকার হয়। আমার আরেক ভরসার স্থল ‘দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পত্রিকার সিলেট ব্যুরো চীফ ও সিলেট ভিউ সম্পাদক শাহ্ দিদার আলম নবেল ভাই’র সাথেও দেখা করলাম। তিনি বললেন যা করো বুঝে-শুনে করো। মমভাই, মঈন উদ্দিন ভাই, মুকিত রহমানী ভাই, নবেল ভাই তারা আম্মার অসুস্থকালীন সময়ে অনেক প্রেরণা আর সাহস দিয়েছেন।
বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছেন আর আন্তরিকতা দেখিয়েছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. ইহতেশামূল হক চৌধুরী দুলাল। সবসময় যেনো তারা ছায়ার মতোই পাশে ছিলেন।
কলকাতার সাংবাদিক বন্ধু সব্যসাচী শর্মার সাথে যোগাযোগ করলাম; তাকে সব অবগত করে চিকিৎসার ব্যাপারে খোঁজ নিতে বললাম। আমার সকল ডাক্তার বন্ধুদের কাছ থেকেও ফোনে-সরাসরি অনেক পরামর্শ পেলাম। বিশেষ করে অনেক কাছের বন্ধু রাগিব রাবেয়া মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের ল্যাকচারার ডা. আব্দুল হাফিজ শাফী, ডা. আবু সালেহ খান, ডা. আবুল হাসনাত লায়েক তারা অনেক পরামর্শ দিয়েছেন।
আম্মার শারীরিক অবস্থার কারণে দেশেই চিকিৎসা করাতে হলো। বিদেশে নেওয়ার ইচ্ছা ও পুরো প্রস্তুতি থাকা স্বত্ত্বেও তা আর হলো না। আম্মা মারা যাওয়ার কয়েক দিন আগে আমি বিদেশে নেওয়ার ব্যাপারে আব্বাকে ভীষণ চাপ দিই। আব্বা পাসপোর্টসহ ভিসা সংক্রান্ত অন্যান্য কাগজ পত্র প্রায় ঘুচিয়ে আনছিলেন। কিন্তু আবারও বাঁধ সাধলেন বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা। এ্যাপোলো হসপিটালস্ এর ডা. হাফিজুর রহমান আনসারী বললেন রোগীর শারীরিক কন্ডিশন দিন দিন অবনতির দিকেই যাচ্ছে। বিদেশে নিয়ে গেলেও কোনো ভালো ফল আসবে না। সত্য বড় কঠিন; আর এই কঠিনকেই মেনে নিতে হলো।
চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এক নম্বর ইউনিট এর অধীনে ভর্তি করানো হয় আম্মাকে। ডাক্তাররা বললেন আম্মার শরীরে যে রোগ বসত গড়েছে তা যাতে পুরো শরীরে ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য ক্যামোথেরাপি দিতে হবে। একজন ডাক্তার আমাকে এবং আব্বাকে কিছুটা আড়ালে ডেকে নিয়ে অকপটে বলেই দিলেন এসব পেসেন্ট বেশিদিন বাঁচেন না। শুনে মনটা ভীষণ ভেঙ্গে পড়লো; মাথায় যেনো পুরো আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। ভার সইতে পারছিলাম না। আম্মার পাশে আব্বাকে রেখে চলে এলাম পাঁচ তলার ব্যালকনিতে। নিজের অজান্তেই চোখের পানি ফেলেছি অনেকক্ষণ। কান্নার পর মানুষ মানসিকভাবে শান্তনা বা শক্তি পায়। আমিও যেনো শক্তি পেলাম কিছুটা। মানসিকভাবে কঠোর হলাম। আমি ভেঙ্গে পড়লে আব্বাও ভেঙ্গে পড়বেন। ছোট ভাই-বোনও সাথে। আমি আর আব্বা ছিলাম ওই দিন। আব্বা আর আমিই শুধু বিষয়টি জানতাম। বাড়ির কেউ, এমনকি কোনো আতœীয় স্বজনের সাথে বিষয়টি শেয়ার করিনি। মা যেনো কোনো ফাঁক ফোকরে জানতে না পারেন তার অসুস্থতার কথা এই ইচ্ছাতেই কারো সাথে বিষয়টি শেয়ার না করা। ডাক্তারদেরও অনুরোধ করা হয় রোগীর সাথে যেনো রোগের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা না হয়। তারা অবশ্য এটি করেন না।
ইউনিট ওয়ান এবং ইউনিট টু এর ফিমেইল সার্জারি বিভাগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের ব্যাপারে আমি অকপটে একটি কথা বলতে চাই। আপনাদের সেবার কথা আমরা ভুলব না। আপনারা রোগীদের যেভাবে সেবা দেন এই খবর যদি সাধারণের কানে ঠিক ভাবে পৌঁছুতে তবে সাধারণ-অসাধারণ সবাই ওই সেবা পেতেই ছুটতো। আর বেসরকারি ক্লিনিক- হাসপাতালগুলো শুধু লোকসানই গুনতো। আমি বিশ্বাসই করতে পারিনা এবং এই জীবনে আমার দেখা অন্যান্য ডাক্তারদের সাথে আপনাদের তুলনাও করতে পারিনা। শুধু আপনাদের মুখগুলো যখন দেখতাম; আর নিজে নিজে নিজেকে প্রশ্ন করতাম আপনারা এত্তো ভালো কেনো? সারাদিনের অমানুষিক খাঁটুনির পর আপনাদের মন এত্তো ভালো থাকে কেমনে?
আপনারাই পারবেন গানওয়ালা নচিকেতার গানের যুঁথসই উত্তর দিতে। আপনাদের মতো ডাক্তাররা আছেন বলেই সরকারি হাসপাতালগুলো স্বগৌরবে সেবা দিয়ে যায় কিংবা চেষ্টা করে। যেখানেই থাকুন যেভাবেই থাকুন না কেনো; কথা দিন আপনারা বদলে যাবেন না। আপনাদের এই গুণ আরো কয়েকগুন বাড়বেই শুধ্-ুকমবে না। এমন প্রতিশ্র“তি রোগীরা আপনাদের কাছে থেকেই আসা করতে পারেন।
৩.
পরীক্ষা নিরীক্ষার পর রিপোর্টগুলো হাতে আসলে ডাক্তাররা বললেন অপারেশেনের আগেই তার শরীরে তিনটি ক্যামোথেরাপি দিতে হবে। দিতেই হবে, বিকল্প নেই। থেরাপি দেওয়ার আগে শরীরের ভারসাম্য বা থেরাপির সাপোর্টিং হিসেবে এই রক্ত দিতে হয়। অনেক রক্ত প্রয়োজন পড়বে। আপাতত: তিন ব্যাগ রক্ত ম্যানেজ করতে হবে। প্রথম ব্যাগ দিলো আমার ছোট ভাই মিফতাহ উদ্দিন মিয়াদ। বাকি রক্ত জোগাড় করতে শুরু হলো নানান স্থানে যোগাযোগ। পরিচিত সবাইকে সেলফোন থেকে ম্যাসেজ পাঠানো আর ফোনকল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের আশ্রয় নিলাম। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলাম ‘ও’ পজিটিভ রক্তের প্রয়োজন। দেখেই ফোন দিলো নগরীর উপশহরের বাসিন্দা আমার হাইস্কুলের বন্ধু মিজান। জানলাম তার রক্তের গ্র“প ‘ও’ পজিটিভ। আরেক স্কুল ফ্রেন্ড পূবালী ব্যাংকের কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান হিপু সেও একইভাবে ফোন করলো। আমার এলাকার বড়ো ভাই আসাদ আহমদ স্বপন এর কানেও পৌঁছুলো এই খবর অন্তরঙ্গ ক্রীড়া চক্রের সহ-সভাপতি সাদ উদ্দিন জাবেদ ভাই’র মারফতে। তিনি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে এসে আম্মুর জন্য রক্ত দিয়ে গেছেন। আরেক ভাই কলবাখানির বাসিন্দা সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা রুহেল আহমদকে রক্তের জন্য বলেন আমার এক বড়ো ভাই রাসেল আহমদ। রুহেল ভাই তার অনেক ব্যস্ততার মাঝেও নিজে এসে আম্মাকে রক্ত দিয়ে গেছেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই ব্লাড ব্যাংকে চার ব্যাগ রক্ত জমা হলো। এভাবে প্রতিটি ক্যামোথেরাপির আগে শরীর পুরো প্রস্তুত করতে রক্ত প্রয়োজন পড়তো। অনেকের সাথেই যোগাযোগ করা হয় রক্তের জন্য। কেউই হতাশ করেননি যে যার মতো যোগাযোগ করেছেন।
আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন আমার আম্মা সুফিয়া খাতুন ও আব্বা নুর উদ্দীন আহমদ দু’জনই বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি সিলেট ইউনিটের আজীবন সদস্য। এই সুবাদে রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির সেক্রেটারি আবদুর রহমান জামিল ভাইও আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছেন। বারবার আব্বার সাথে যোগাযোগ করেছেন, রক্তের প্রয়োজন যখনই হয় তাকে যেনো ফোনে জানানো হয়।
আমার কাছের বন্ধু, স্বজন আর সাংবাদিক সহযোদ্ধারা, আব্বার রাজনৈতিক সহযোদ্ধা-শুভাকাঙ্খিরা আম্মার চিকিৎসাকালীন রক্ত ম্যানেজের জন্য কি চেষ্টাই না করেছেন। যোগাযোগ করেছেন অনেকের সাথে। তারা যেনো আমাদের কষ্টগুলো অল্প অল্প করে ভাগ করে নিয়েছিলেন। নবেল ভাইও চরম ব্যস্ততার মাঝেও দুই ব্যাগ রক্ত ম্যানেজ করেছেন। বন্ধু নাহিদ, তার এক পরিচিত মানুষ কুচাই এলাকার আবদুল রউফ ভাইকে পাঠালো রক্ত দেওয়ার জন্য। ওই মানুষটি জীবনের প্রথমবার আমার মায়ের জন্য রক্ত দিলেন। একটুও ভীত হননি। তার ওপর সারাদিন ফুটবল খেলাতে ব্যস্ত ছিলেন তিনি।
আমার বন্ধু আফজালের ছোট ভাই আজমল ভোর বেলা নিয়ে আসলো তার এক সহপাঠিকে। ওই ভাইটির নাম আমার মনে নেই। ওইদিন নাকি ওনার পরীক্ষা ছিলো। এদিন আমার সাথে করে একই সময় মেডিক্যালে যায় আমার আরেক বন্ধু ইংল্যান্ড প্রবাসী সাহাব উদ্দিন আহমদের ছোটভাই সালাহ্ উদ্দিন আহমদ। সালাহ্ তোমাদের জন্য অনেক শুভাশীষ। কাজীটুলা দীঘির পাড়ের মুজিবুর রহমান রাশেদকে পাঠালেন কাজীটুলা মক্তবগল্লির বাসিন্দা মো. জাকারিয়া হোসেন। জাকারিয়া আরেক রোগী নিয়ে তখন ঢাকায় দৌড়াদৌড়ি করছিলেন। এই বিপদে থেকেও শুধুমাত্র ম্যাসেজ পেয়েই এই মানুষটি দু’ব্যাগ রক্ত ম্যানেজ করে দিয়েছে। বন্ধু সহকর্মী সৈয়দ সুজন, তুহিন চৌধুরী, রাশেদ আহমদ রাসু, রাশেদীন ফয়সাল, ছাত্রনেতা জুয়েল, সেলিম আহমদ আম্মার মায়ের জন্য যে আন্তরিকতা দেখিয়েছেন তা আমি, আমরা ভুলতে পারিনা। জাকারিয়ার ছোট ভাই ইসলামিক রিলিফ এর ফিল্ড ফ্যাসিলেটর জুম্মান হোসেন নিয়ে আসলেন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী তার বন্ধু সহপাঠি নজরুল ইসলামকে। আরোও যদি রক্তের প্রয়োজন হয় শুধু তাকে জানাতে বললো সে। এই মানুষগুলোর ভালোবাসার দাম কেমনে দিই?
শিবগঞ্জ মজুমদার পাড়ার বন্ধু নেপুর ইসলাম চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে হরতালের দিনে আসলো আমার মাকে রক্তের ঋণে বাঁধতে। ফেসবুকে এই বন্ধুটির নাম পরাজিত সৈনিক। তাকে বলি দোস্ত নামটা পরিবর্তন করে ‘বিজয়ী বীর’ কর না প্লিজ!
রক্ত দিয়েছেন আমাদের অন্তরঙ্গ ক্রীড়া চক্রের আরেক ভাই শামীম আহমদ। তিনি তার অনেক জরুরি কাজ ফেলে রেখে রক্ত দিয়েছেন। এই এত্তোটা মানুষ আমাদের রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। যে অদৃশ্য মায়ার বাঁধনে তারা বেঁধেছেন তা অনেক শক্তিশালী। ঠুনকো কোনো আঘাত- এই বাঁধন ছিড়তে পারবেনা; বুকের বা পাশে হাত রেখে কথা দিলাম।
আমার ছোট ভাই মিফতাহ উদ্দিন মিয়াদ ও ছোটবোন সাদিয়া সুলতানা তান্নীও ম্যানেজ করলো তার পরিচিত আরো অনেককে। তারা তাদের পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের সাথে যোগাযোগ রাখতো সবসময়। আমরা যখন হসপিটালে আর বাড়িতে দৌড়াদৌড়িতে ব্যস্ত। দিনকে রাত করছি। তখন আমার এই বোনটি আগলে রেখেছে পুরো পরিবার। বোনটিও মুহুর্তে মুহুর্তে ফোনে জানতো আম্মার শারীরিক অবস্থা। একদিন তো ওর ক্লাস শেষ করে একাই ছুটে গিয়েছিলো হসপিটালে। যে হসপিটালে গিয়ে অনেক জানা শুনা মানুষই পথ হারিয়ে বসে; সেখানে গিয়ে ও ঠিকই খুঁজে নিয়েছিলো মা কে।
রক্তের কোনো ঘাটতি আমরা রাখিনি। ডাক্তার রক্ত চাওয়ার আগেই রক্তের ব্যাগ তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। যতবারই রক্তের প্রয়োজন পড়েছে ততবারই ৩/৪ ব্যাগ রক্ত বেশি দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট রক্তগুলো পরে সন্ধানীতে দান করা হতো। ৪, ৫ এবং ৭ এপ্রিল টানা এই তিনদিন সিলেট রেডক্রিসেন্ট-মুজিব জাহান রক্ত কেন্দ্রে আম্মাকে নিয়ে রক্ত দেওয়া হয়েছিলো। ওইদিনগুলো দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেসামাল ছিলো। বেসামাল পরিস্থিতিতেও রক্তদান করতে আমার আতœার আতœীয়রা পিছপা হননি। ঠিক সময়ের আগেই এসেছেন সবাই। আম্মাকে রক্ত দেওয়ার জন্য আরোও প্রস্তুত ছিলেন আলপনা ফ্যাশন ম্যাগাজিনের চীফ ডিজাইনার আরিফুজ্জামান খাঁনসহ আরো অনেকে। রক্ত সংগ্রহের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়েছেন অনেকে; তাদের নাম মনে আসছে না। এদিকে আম্মার চিকিৎসা চলছিলো যথা নিয়মেই। কিন্তু তিনটা ক্যামোথেরাপি আর টানা দু’টো অপারেশন আম্মাকে এতোটাই দুর্বল করে ফেলে যে আম্মা আর বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে পারলেন না। দিনে দিনে আম্মা অনিবার্য সত্যের দিকেই ধাবিত হচ্ছিলেন। বারবার মনে হচ্ছিলো আড়ালে ডেকে নেওয়া ওই ডাক্তারের কথা। আর আমরা উপরওয়ালার সিদ্ধান্তের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তাকে সুস্থ করার ব্যর্থ চেষ্টাই শুধু করছিলাম। কোনো চেষ্টা, কোনো মেডিসিন, কোনো অজুহাতই উপরওয়ালার দরবারে প্রশ্রয় পায়নি। গেলো ২৭ জুলাই পবিত্র ১৭ রমজান সুবহে সাদিকের কিছু আগে আল্লাহপাক তার সৃষ্টিকে তার কাছেই ফিরিয়ে নিলেন। আমাদের ঘরে আজ সুনসান নিরবতা। আমাদের আজ অনেক অবসর। যা আমরা ঘুর্ণাক্ষরেও চাইনি।

৪.
যারা রক্তের মায়ায় আমাদের চিরঋণে আবদ্ধ করেছেন; আপনাদের ভালোবাসার প্রতিদান দেওয়ার দু:সাহস আমি বা আমার পরিবার দেখাই না। ধন্যবাদ দিয়েও ছোট করতে চাই না। শুধু বুক উজাড় করা ভালোবাসা আর আজন্ম শুভকামনা আপনাদের জন্য। আপনারা হয়তো জানেন না কিংবা অনুভব করতে পারেন না ওইদিন আপনারা রক্ত দিতে গিয়েছিলেন বলেই আমি এবং আমার পরিবার কতোটা সাহস পেয়েছিলাম। ওই সাহসের খুঁটিতে ভর করেই হয়তো আরো ক’টা দিন বেশি আমার মা কে পৃথিবীর বুকে ধরে রাখতে পেরেছি। আরো ক’টা দিন বেশি মা ডাকতে পেরেছি।

৫.
শেষে আরো একটা কথা সবিনয়ে বলতে চাই; এই লেখাটি যে কারণে তৈরি করা। এই লেখা পড়ে আরো হাজারো মানুষ যেনো রক্তদানে এগিয়ে আসেন এই প্রত্যাশা। রক্তদানের মাধ্যমে আরো হাজারো পরিবারের হাজারো স্বজন যেনো তাদের রোগের সাথে সংগ্রাম করে নতুন জীবন ফিরে পান এই কামনা। রোগীর যখনই রক্তের প্রয়োজন; তখনই যেনো এরকম হাজারো যোদ্ধা হাজির হন রক্তদানে। দিকহারা ওইসব স্বজনদের মাঝে তাদের দান করা প্রতিটি রক্তবিন্দু আনন্দবন্যা বইয়ে দিক; এই প্রত্যাশায় এই লিখা। আমার মা’র যখন রক্তের প্রয়োজন পড়তো তখন ব্লাড ব্যাংকগুলোতে দেখেছি রক্তের জন্য শতো শতো মানুষের আহাজারি। চেষ্টা; তদবির। প্রয়োজনের সময় রক্তের জন্য অনেক রোগী মারাও গেলেন কি না কে জানে? হয়তো কোনো কোনো রোগী মারাও গেছেন! আমি আমার আম্মাকে নিয়ে দৌড়ে থাকায় সে খবর আর জানা হয়নি। সবকিছুই আল্লাহ’র হুকুমে ঘটে ঠিক। কিন্তু রক্তদানের মাধ্যমে তো আমরা অপ্রত্যাশিত মৃত্যু রোধ করতে পারি। আমি মেডিক্যালে দেখেছি থ্যালাসেমিয়া রোগীদের আর্তনাদ। যাদের জন্য রক্তই যেনো আরেক হৃদযন্ত্র। এসব রোগীদের প্রতিমাসে শরীরের পুরো রক্ত বদল করতে হয়। তারা কতোটা অসহায় চিন্তা করে দেখেছেন কি? অথচ আপনার মাত্র এক ব্যাগ রক্ত এসব জটিল রোগীদের মুখে হাসি ফোঁটাতে পারে। আসুন আমরা সবাই মিলে রক্তদানে উদ্যোগী হই। পাড়ায়- মহল্লায় রক্ত সংগ্রহ অভিযান পরিচালনা করি। কেউ রক্তের জন্য ফোন দিলে নিজে অন্তত একজনের সাথে যোগাযোগ করি। রক্ত ব্যবস্থা করতে পারি আর না পারি চেষ্টা অন্তত করি। সেলফোনে প্রতিটি নামের পাশে ব্লাড গ্র“পটা লিখে রাখি। কারো রক্তের গ্র“প জানা না থাকলে সেটা পরীক্ষা করিয়ে নিতে উৎসাহিত করি। প্রত্যেকে প্রত্যেকের রক্তের গ্র“পটি জেনে নিই; এটি খুব জরুরি একটি বিষয়।
#
অক্টোবর’২০১৩
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে নভেম্বর, ২০১৩ রাত ১০:২৬
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিএনপি’কে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল বলার কোনো কারণ নাই!!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৩



জাতীয় সন্মাননা কি কোনো গোপন বিষয় । একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা’কে গার্ড অফ অনার দিতে এত অনীহা কেনো বর্তমান সরকারের ‼️

আজ বারবার আমার গোআ’র কুপুত্রের একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

মঞ্চনাটক: "এনিমেল ফার্ম"

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৭


আজ সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় দেখে এলাম জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নাটক "এনিমেল ফার্ম"। পরিবেশনায় ছিল রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ। নির্দেশনা দিয়েছেন ড.... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাড়ে হাজার বিজ্ঞানী এবং একটি স্ক্যামের গল্প

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২৮


জুলাইয়ের কোটা আন্দোলনের পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। সেই সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের অংশ হিসেবে পাকিস্তান বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘নলেজ করিডোর’-এর আওতায় আল্লামা ইকবাল বৃত্তি চালু করে। ২০২৫... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাসিনা-বিভ্রাট: এটা ট্রল নয়, কূটনৈতিক সতর্কসংকেত

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৮


হাসিনা-বিভ্রাট: এটা ট্রল নয়, কূটনৈতিক সতর্কসংকেত

জাপানের এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের একটি পোস্ট নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে হাসাহাসি চলছে। আমার মনে হয়, হাসির আড়ালে আসল প্রশ্নটা চাপা পড়ে যাচ্ছে।

ঘটনাটা কী
প্রধানমন্ত্রী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচন।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:২৯


এখন পর্যন্ত প্রকাশিত এক্সিট পোল অনুযায়ী, কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন ৬১টি নিশ্চিত করতে পারেনি।
নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট, প্রায় ৫১–৫২ আসন।
গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট: প্রায় ৪৯–৫১ আসন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×