somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইউনুসের টাকার খতি

১১ ই মার্চ, ২০১৬ সন্ধ্যা ৭:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইউনুসের খতি
(শামীম জাহাঙ্গীর)
ইউনুস আলী দশ গ্রামের মাঝে একমাত্র ডাক্তার । হোমিওপ্যাথ । লক্ষীপুর গ্রামের একেবারে শেষদিকে ইউনুসের ছোট দোচালা বাড়ি । সে শুধু ডাক্তারই নয় সাধারণ গৃহস্থও বটে । পৈতৃক আমলের জমি হইতে বর্গাদারের দেওয়া ধান ও পাট হইতেও কম বেশী আয় হয় তার । সংসার ও বেশ বড় । চার ছেলের দুইজনই চাকরিতে ঢুকেছে এই মাসে । সরকারি চাকরী । ইউনুস আলী কোমর থেকে খতিটা খুলে টাকা গুনে ।

এলোপ্যাথি চিকিত্‍সার তখনো প্রসার হয়নি এই এলাকায় । কোন সাইনবোর্ড টানানো হয়নি তবুও এটা "ডাক্তার বাড়ি" । রুগী বলতে ভাই বেরাদর আত্মীয় স্বজন । দূর দূরান্ত থেকেও যে কালে ভদ্রে রুগী আসে না তা নয় । বাড়ির বাইরে বৈঠকখানা । রুগী আসলে বৈঠকখানার সামনে রিক্সা থামে । রিক্সার টুংটাং বেল বাজিয়ে রিক্সাওয়ালা হাক দেয় । "ডাক্তার সাব বাড়িত আছুইন্" ?

ডাক্তার ইউনুস বাড়িতেই থাকে । সাধ্যমত বই ঘেটে ঘোটে চিকিত্‍সা করে । ডাক্তারের ফি হিসাবে চাল ডাল তরি তরকারি এমনকি হাস মুরগিও দেয় রুগিরা ।

এ গাঁয়ের লোকদের নগদ টাকার বড় অভাব । তবে কখনো সখনো কোন কোন রুগী নগদ টাকা দেয় । সেই টাকা ইউনুস খুব যত্নে তার টাকার থলিতে ঢুকিয়ে রাখে । টাকার এই বিশেষ থলিকে এই এলাকায় টাকার খতি বলে । এটা কোমরে বেঁধে রাখা যায় ।

গত বিশ বছর এই খতি ট্রাংকে থাকে। প্রতিদিনই তো আর টাকা আয় হতো না । যখন টাকা পয়সা আসতো হাতে তখন ট্রাংক থেকে খতি বের করতো । টাকা খতির ভিতর রেখে খতিটা আবার আগের জায়গায় রেখে দেয় । কতো ঝড় তুফান বয়ে গেছে তার উপর দিয়ে । তবুও খতির ভিতর থেকে একটা কানা পয়সাও বের হয়নি ।

আজকেও বের করার ইচ্ছা ছিল না । বিশেষ কারণেই করেছে । আজ রাতে তার দুই ছেলেই বেতনের টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরছে । পিঠাপিঠি দুই ছেলে একদিনেই চাকরীতে ঢুকেছে । ছেলেদের বলে দিয়েছে যেন নতুন টাকা আনে । এই পুরাতন ছেঁড়া ফাড়া টাকা গুলো বদলিয়ে নতুন টাকা আনিয়ে নিতে হবে । সর্বমোট বাইশ টাকা চার আনা । চার আনাটা অবশ্য চকচকে ।

খতিটা নিজ হাতে সাবান দিয়ে পরিস্কার করে ধুঁয়ে বৈঠকখানার সামনের রোদে শুকাতে দিল । খুব খেয়াল রাখছে চারদিকে । দূর থেকে কাউকে আসতে দেখলেই খতিটা লুকিয়ে ফেলে । সে ভাবে তার এই খতির কথা কেউ জানে না । সে ভুল জানে ।

ইউনুস আলীর খতির খবর সবাই কম বেশী জানে । এলাকায় এই খতি রীতিমত আলোচনার বিষয় এটা ইউনুস আলী মোটেও বুঝতে পারে না । সে নিজে কারো খবর রাখে না । মানুষ নিজেকে দিয়েই চারপাশের মানুষকে বিচার করে । এটা আসলেই সত্য । অন্তত ইউনুসের কাছে ।

ইউনুস দিনের বেলায় দরজা বন্ধ করে খতি হতে মুঠ ভরে টাকা বের করে । তবে সব টাকা বের করে না । কচকচে টাকা গুনার মজাই আলাদা । ইউনুস সেই মজাটা নেয় । মোট কতো জমল তার হিসাব সে করে না ।

এতদিনে দুই ছেলেকে বিয়ে করিয়েছে ইউনুস আলী । তিনটা মেয়ের মাঝে দুইটারও বিয়ে দেয়া শেষ । বড় ছেলে শমসেরের দুইটা ছেলে । আজহারের এক ছেলে । দুই ছেলের জন্যে আলাদা আলাদা ঘর । বড় ছেলের ঘর লাগোয়া ঘরে ইউনুস থাকে ছোট দুই ছেলে নিয়ে । ইউনুস বিপত্নীক ।

দেশে দূর্ভিক্ষ চলছে তখন । চারিদিকে আকালের মাঝে আশে পাশের কেউই যখন ঠিকমত একবেলা ভাত খেতে পায় না সেখানে ইউনুস আলীর ঘরে তিন বেলা গরম ভাত । তার দুই দুইটা ছেলে সরকারি চাকরিওয়ালা বলে কথা । এতদিন শুধু গল্পই হতো ইউনুসের খতি নিয়ে । কিন্তু অভাবে স্বভাব নষ্ট হয় বলে কথা আছে না ?

এখানেও কেউ কেউ ইউনুসের খতির লোভে পড়ে । সাইদুল তাদের মাঝে একজন । দূরের কেউ নয় সে । ইউনুসকে চাচা বলে ডাকে । পাশাপাশি বাড়ি । সাইদুল দেখতেও যেমন সুন্দর তার আদব লেহাজ ও ভাল । এমনিতে চাচা বলে ডাকলেও আজ ডাকল ডাক্তার চাচা হিসাবে ।

ইউনুস দুপুরের খাবার খেয়ে এই সময়টা শুয়েই থাকে । কখনো ঘুম আসে । ঘুম আসলে সে ঘুমায়ও। ঘুম হল আল্লাহর শ্রেষ্ট নিয়ামত । আজও চোখটা লেগে আসছিল এমন সময় দরজার বাইরে টোকা পড়ল ।

ডাক্তার চাচা বাড়িতে আছেন ? কার কণ্ঠ বুঝতে পারল না ইউনুস । তবে কাছের কেউ হবে । দূরের কেউ হলে বৈঠকখানার সামনে থেকেই ডাক দেয়ার কথা ।

কে ? শুয়া অবস্থায়ই প্রশ্ন করল ইউনুস ।

আমি সাইদুল সরকার । নামের শেষে সরকারটা একটু গম্ভীর স্বরে বলে । ছেলেটার গা টা গরম সকাল থেকে ।

আচ্ছা । তুমি বৈঠকখানায় বস গিয়ে । আমি আসতেছি ।

সাইদুল কথা বাড়ায় না । কথা বাড়ানো যেত । কিন্তু চাচাকে সশরীরে দেখতে পারবে না বলে আপাতত সবুর করে সে । জ্বী চাচা আমি বৈঠকখানায় বসতেছি । আপনি আস্তে ধীরে আসেন ।

আস্তে ধীরেই দরজা খুলল ইউনুস । এলোমেলো টাকা গুলো গুছিয়ে খতিটা কোমরে বেঁধে তারপর দরজা খুলে সে ।

দরজা খুলতেই বড় উঠোন । উঠোনের পশ্চিমে দ্বিতীয় ছেলের ঘর । সেই ঘরের পাশে রান্না ঘর । রান্নাঘরের পিছনে নিজস্ব টিউবওয়েল । টিউবওয়েলেরও পিছনে জঙ্গল । সেই জঙ্গল তাদের বাড়ির সীমানা । নিজের ঘরের ডানদিকে বড় ছেলের ঘর । তার পিছনে অনেকটা খালি জায়গা ধান মাড়ানোর জন্যে । বৈঠকখানা হলো আরেক সীমানা ।

বৈঠকখানায় ইউনুসকে ঢুকতে দেখে সাইদুল উঠে দাড়ায় । বুড়োর চেহারা দিন দিন সুন্দর হচ্ছে । সাইদুল চিন্তিত হবার ভান করে । ছেলের জ্বর তো বাহানা মাত্র ।
বাচ্চাদের ব্যাপারে বেশ সতর্ক থাকে ইউনুস । ভাল করে নাড়ি পরীক্ষা করে । থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর মাপে । সব তো ঠিকই আছে সাইদুল । জ্বর মনে হয় কমে গেছে ।

ডাক্তার চাচার শরীর ঠিক আছে তো ? সাইদুল যেন ইউনুসের কথা শুনেনি । আপনার পেটটা কেমন ফোলা ফোলা লাগে । সাইদুল আসলে খাতির অবস্থান রেকি করার দায়িত্ব পালন করতে এসেছে এবং তাই করছেও ।

ইউনুস আলী সাইদুলের কথায় চমকে উঠলেও বুঝতে দেয় না । অবশ্য সাইদুল যেভাবে এক দৃষ্টিতে ইউনুসের পেটের দিকে তাকিয়ে আছে, সে চমকালেও টের পেত না সে ।

তুমি কি ছেলের চিকিত্‍সার জন্যে আসছ ? সাইদুলের গতিবিধি ভাল না লাগলেও প্রকাশ করে না ইউনুস ।

জ্বী চাচা । ইউনুস আলী বিরক্ত হচ্ছে সাইদুল বুঝতে পারে । বিরক্ত হলেই তার কী এমন ভাবে কথাটা বলল সে । অবশ্যই ছেলের চিকিত্‍সার জন্যে আসছি ।

কিন্তু তোমার কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে তুমি আমার চিকিত্‍সা করতে আসছ ! ইউনুসের হাহাহা করে হাসিতে সাইদুল থতমত খেয়ে যায় এইবার ।

শুন সাইদুল সরকার । ইউনুস কথা ঘুরিয়ে ফেলে । তোমার ছেলে ভাল আছে । ছেলেকে মাছ শাক সব্জি মাছ মাংস ডিম ও দুধ খাওয়াইবা । আর ছেলের হাতটা মাঝে মাঝে কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুঁয়ে দিবা । হাত দিয়েই বাচ্চাদের রোগ-জীবানু মুখ হয়ে শরীরে প্রবেশ করে । শুধু হাত পরিস্কার থাকলে বাচ্চাদের অসুখ বিসুখ অনেক কম হয় । আর আমিতো আছিই ।

জ্বি চাচা । আপনি আছেন বলেই তো নিশ্চিন্তে আছি । সাইদুলের কণ্ঠের কুটিলতাটা ইউনুস টের পেল কি না বুঝা যায় না ।

প্রতিদিন এশার নামাজ শেষে মুসুল্লিরা যাওয়ার পর মসজিদে তালা দিয়ে তবেই মোয়াজ্জিন এমদাদ বাড়ী যায় । এমদাদ কোরানে হাফেজ । খুব বিনয়ি ও কর্মঠ ছেলে এমদাদ ইউনুসের আপন চাচাত ভাইয়ের ছেলে । ইউনুসের ঘরের বাম দিকে এমদাদ দের ঘর । এশার নামাজের পর এমদাদ ঘরে ফিরে কোরান তেলাওয়াত করে । ইউনুসের ভাল লাগে বিষয়টা । তারও ইচ্ছা ছিল তার একটা ছেলেকেও আরবি লাইনে পড়াবেন । আল্লাহ হয়তো চায়নি । এ নিয়ে তার একটা হালকা আফসোসও আছে ।

আজকে মসজিদে তালা মেরে বেরুতে একটু দেরী হয়ে গেছে এমদাদের । এরই মাঝে এই অভাবী মানুষদের পুরো গ্রামের সব ঘরের বাতি নিভে গেছে । যারা জেগে আছে এবং যে কারনে জেগে আছে তাদেরও আলোর প্রয়োজন নাই । সাথে অমাবস্যার তিথি চলছে বলে চারিদিকে ঘন অন্ধকার । পরিচিত জায়গাটাও তাই খুবই অচেনা লাগছে এমদাদের কাছে । অনেকক্ষন হেটেও যখন বাড়ি খুঁজে পেল না তখন মাকে ডাক দিল ।

মায়া । মাকে মায়া বলে ডাকে এমদাদ । বাতিডা লইয়া বাইর অও মায়া গো । আমারে মনে অয় কানাওয়ালা ধরছে । গ্রামের মানুষের কাছে কানাওয়ালা হল অন্ধকারের এক তীব্র আতংকের নাম । এরা মানুষকে ভুল ঠিকানায় নিয়ে যায় বলে মানুষ বিশ্বাস করে ।

খুব কাছেই দরজা খোলার শব্দ হয় । এমদাদ আলো দেখে বুঝতে পারে ঘরের খুব কাছেই ছিল । হয়ত একই জায়গায় চক্কর দিছে এতক্ষন । কানাওয়ালার পাল্লায় পড়ে কত মানুষ মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে ফেলে তার হিসাব নেই । ভাবতে ভাবতে এমদাদ ঘরে ঢুকে । দরজা খোলা থাকায় ঘরের আলো রাস্তায় পড়ে। সেই আলোতে কয়েকটা কালো আবছায়া মতো কিছু সরে যেতে দেখল যেন এমদাদ । এমদাদ ভাবছে এরাই হয়ত কানাওয়ালা । হয়ত তাকে ঘরে ঢুকে পড়তে দেখে হতাশ হয়ে অন্য দিকে শিকার খুঁজতে গেল । বড় বাঁচা বেঁচে গেছে ভাবতে ভাবতে ঘরের দরজায় খিল দিল এমদাদ ।

শমসেরের ঘরে টিমটিম করে হারিকেন জ্বলছে । আলোতে তার ঘুম আসে না । আবার ছোট ছেলেটা ঘর অন্ধকার করলেই ট্যা ট্যা করে বাড়ি মাথায় তুলে । অগত্যা এই দূর্মূল্যের বাজারে শমসেরের ঘরে হারিকেন জ্বলে । টিমটিম করে জ্বলা হারিকেনের আলোতে ঘুমিয়ে থাকা বউকে আরো রূপবতী লাগে । আগুনের মত সুন্দর বউটাকে হারিকেনের আলোতে আরও সুন্দর লাগে। সেই বউ আর তার মাঝে দুই ছেলে শুয়া । ছোট ছেলেটা মনে হয় আজ আর ঘুমাবে না । এইটা কিভাবে জানি টের পেয়ে যায় । মায়ের দিকে হাত বাড়ালেই কান্না করে জেগে উঠে । জহুরা মুচকি হেসে উপাশ ফিরে শুয় । ছেলেও যেন নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুম দেয় । শমসেরেরও চোখে ঘুম আসি আসি করছে এখন । সারাদিনের কর্ম ক্লান্ত শমসেরকে শান্ত করতে জহুরা ওই হাসিটুকুই বরাদ্ধ করতে পারে মাত্র ।

বারেকের মা বারো মাস অসুখে ভুগে । প্রতি রাতে তার কাশি উঠে । ভয়াবহ কাশি । রাত যত বাড়ে কাশিও তত বাড়ে । শেষ রাতে বমি টমি করে টরে অতঃপর ঘুমায় সে । তার ক্রমাগত কাশির শব্দে বাচ্চাদের ঘুম ভেঙ্গে যায় । আশেপাশের কুকুর গুলি ঘেউ ঘেউ করতে থাকে ।

বারেকের মা যখন ক্লান্ত হয়ে ঘুমায় তখন সকাল হতে তেমন বাকী থাকে না । বারেকের মায়ের সাথে সাথে কুকুর গুলিও শান্ত হয়ে ঘুমায় । আজ এখন পর্যন্ত বারেকের মায়ের টানা কাশি শুরু হয়নি । বিরতি দিয়ে দিয়ে কাশছে । তার মানে রাত এখনো গভীর হয়নি । বারেকের মা রাতের বেলায় একটা জ্যান্ত ঘড়ি যেন ।

বারেকের মা কাঁশছে না অথচ কুকুরগুলি খুব ঘেউ ঘেউ করছে । ঘেউ ঘেউ করতে করতে কুকুরগুলি ইউনুসের উঠোনের দিকে আসছে । প্রতিদিন রাতের মতো আজও কুকুরের চিত্‍কারে ঘুম ভেঙ্গে যায় ইউনুসের । আর প্রতি রাতের মতো আজকেও বারেকের মার গুষ্টি উদ্ধার করছে সে । করবেই না কেন ? বারেকের মা ইউনুসের চাচাত ভাবী, বিধবা । তার বিশ্বাস হোমিওপ্যাথ ঔষধ মদ দিয়ে বানানো । তাই সে কবিরাজ ডেকে ঝাড় ফুঁকের চিকিৎসা নেয় । ডাক্তার বাড়িতে কবিরাজ আসাটা তার জন্য বড়ই অপমানের যে !

অতীব রক্ষণশীল এই মহিলা ইছা(চিংড়ি) মাছকে বিয়ের পর থেকেই হুংগা উলা মাছ বলে ডাকে কারণ তার স্বামীর নাম ইছব আলী । ইছা মাছকে ইছা মাছ বললে নাকি তার স্বামীর নাম মুখে আনা হয়ে যায় ।

রাতে যদি কখনও হারিকেনের আলো বাড়াতে হয় তবে ঘুমন্ত শমসেরের চোখের উপরে পাতলা কাঁথা মেলে দেয় তার বউ । যেদিন দিতে মনে থাকে সেদিনতো সব ঠিকই থাকে । আর তাড়াহুড়ার মাঝে যেদিন আলো বাড়ানোর আগে শমসেরের চোখের উপর কিছু দিতে ভুলে যায়, টিমটিম করে জ্বলা হারিকেনের সলতা বাড়াতেই ঘুম ভেঙ্গে যায় শমসেরের । ঘুমের মাঝে বিরক্ত করলে খুবই রাগ করে সে ।

ইস্ ! আলোর তীব্রতায় চোখ কুঁচকে গেল শমসেরের । বউয়ের উপর চরম একটা তপ্ত মেজাজ নিয়ে চোখ খুলল সে । চোখে চোখ ঝলসানো আলো ! তার চোখ অটোমেটিক বন্ধ হয়ে গেল আবার । ভয়ার্ত একটা চিৎকারের শব্দ বের হবার আগেই তার মুখে গামছা গুঁজে দিল কেউ । শমসেরের বুকে বল্লম ঠেকিয়ে একজন মোটা গলায় হুকুম করল "একদম চুপ" । শমসের বুঝতে পারল তার বাড়িতে ডাকাত পড়েছে ।

ডাকাতদের সাথে মৃদু দস্তদস্তিতে তার পাশে ঘুমানো চার বছর বয়সী বড় ছেলে ফরহাদের ঘুম ভেঙ্গে যায় । চোখ মেলে ঘরে এত গুলো মামা দেখে আনন্দে চোখ গোল গোল করে তাদের দেখে । এই বাড়িতে এমন প্যান্ট শার্ট পড়ে কেবল তার মামারাই আসে । মামারা নিশ্চয়ই অনেক কিছু নিয়ে এসেছে ভেবে "মামা" বলে বিছানা থেকে নামতে গেলে ডাকাতদের একজন ফরহাদের কচি গালে একটা থাপ্পর বসায় এবং বুকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয় । ফরহাদ ভ্যা ভ্যা করে কাঁদা শুরু করে । কান্না থামানোর জন্য ধমক দিলে আরো কান্না বাড়ে তার ।

"মা" এমনই এক চরিত্র যা চিরায়ত নারীর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা । জহুরার কথাই ধরা যাক । বিয়ের পর এমনও হয়েছে যে খুব বৃষ্টি হচ্ছে••• । জহুরা ঘুমুচ্ছে••• । হঠাত্‍ টিনের চালের ছিদ্র দিয়ে জহুরার উপর পানি পড়া শুরু••• । শমসের টের পেলেও জহুরাকে ডাকে না । ততোদিনে তার জানা হ্য়ে গেছে বউকে ডেকে লাভ হবে না । তাই সে বউকে টেনে খাটের একপাশ থেকে অন্য পাশে নিয়ে যায় । তবুও ঘুম ভাঙ্গত না জহুরার । এমনই কুম্ভকর্ণের ঘুম ছিল তখন । •••আর এখন ? রাত দুপুরে তার বড় ছেলের একটা আচমকা চিত্‍কারে সাথে সাথে ঘুম ভেঙ্গে যায় জহুরার ।

চিত্‍কার দিতে চেয়েও থেমে যায় জহুরা । তার স্বামীর বুকে ধরে রাখা বল্লম তাকে চুপ করিয়ে দেয় । ফরহাদ মায়ের বুকে লোকায় । কান্না থামিয়ে মাকে প্রশ্ন করে । মা এরা কারা ? মা'ও তাকে বলে এরা তার মামা । ফরহাদ অবাক । এরা ভাল না মা । এরা পঁচা মামা ।

ডাকাতদের মধ্যে কেউ একজন হো হো করে অট্টহাসি দেয় । তারপর এক কান ফাটানো ধমক । একদম চুপ । তাড়াতাড়ি আলমারির চাবি বের কর । আমরা ভাল মানুষ । ভয়ংকর হবার আগে ভদ্রভাবে সব দিয়ে দে । কথা বলতে বলতে বল্লম দিয়ে আস্তে করে শমসেরের বুকে খুঁচা দেয় ।

বল্লমের ধারালো চিকন অগ্রভাগ শমসেরের বুকে ঢুকে যেতে চাইলে শমসের পিছনে কাত হয়ে যায় । সাদা গেঞ্জিতে ভিজা দাগ দেখে চমকে উঠে জহুরা। রক্ত••• ? জহুরা চিত্‍কার করে উঠে । আপনারা সব নিয়া যান । তবুও এই মাসুম বাচ্চাদের এতিম কইরা দিয়েন না । জহুরা আর সময় নষ্ট করে না । কথা বলতে বলতে আঁচল হতে চাবি খুলে ছুঁড়ে দেয় । সব নিয়া যান । জহুরার কাছে তার স্বামীর চাইতে দামী আর কিছুই নাই যে ।

আলমারির জিনিসে মন ভরে না ডাকাত দলের । একজন হুংকার দেয় । অলংকার কই ?

শমসের শুধু এটুকুই বলে যে, যা আছে সব ওই আলমারিতেই আছে । আর এটুকু বলতেই শমসেরকে পিছ মোড়া করে বেঁধে ফেলে এক ডাকাত । এক ডাকাত টান মেরে শমসেরকে বিছানা থেকে টান মেরে মাটিতে ফেলে দেয় । শমসেরের গলায় ছুরি দিয়ে পোছ দিবে এমন সময় জহুরা ডাকাতের পা জড়িয়ে ধরে । সিলিংয়ে আরেকটা ট্রাংক আছে দেখেন । আপনে আমার ধর্মের বাপ লাগেন । এত বড় সর্বনাশ কইরেন না আমার ।

জহুরা যৌবনবতী কন্যা । ভারী বুক থেকে আঁচল সরে যায় । সেদিকে তার খেয়াল করার সময় না এখন । স্বামীর জীবন আশংকায় পড়লে মেয়েদের মাথা ঠিক থাকে না । মাথার সাথে কাপড়ের একটা সম্পর্ক আছে আদিকাল থেকেই । মাথা ঠিক তো কাপড় ঠিক । মাথা ঠিক নাই তো কাপড়ও ঠিক নাই ।

এবার ট্রাংক খুলে সন্তুষ্টই মনে হলো ডাকাত দলকে । একজন শমসেরকে টেনে তুলে তার পিঠে ডেগার চেপে ধরে বলে, চল্•••। যেন হালের গরু ঠেলছে । তোর বাপের ঘরে নিয়ে চল্ । শমসের বাধ্য ছেলের মতো তার পিছনের নির্দেশে সামনে হাটে । শমসেরের ঘর থেকে তার বাবার ঘরে যাওয়ার একটা করিডোর আছে । বাজান এতোক্ষনে নিশ্চয়ই পালিয়ে গেছে ভাবতে ভাবতে বাবার ঘরে ঢুকে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো।

ইউনুসের নাকে মুখে রক্ত, চিৎ হয়ে পড়ে আছে মাটিতে । ছোট দুই ভাইকে পিছমোরা করে বেঁধে রাখা হয়েছে । এবার তাকেও পিছমোরা করে বাঁধা হলো । এবার মনে হয় তাকে জবাই করেই ফেলবে । চিৎকার করে শমসের । তোমরা কেউ আইলানা ? ডাকাইতে আমরারে জবাই কইরা ফেললো ! জহুরা গগণ বিধারী চিত্‍কার করে তার শ্বশুরের ঘরের দিকে দৌড় দিল । তার দুই কোলে দুই ছেলে । ফরহাদ ও মজনু ।

তোর বাপকে বল্ ভালয় ভালয় টাকার খতিটা দিয়ে দিতে, না হলে সত্যই সবগুলারে জবাই করব ••• হুংকার দেয় এক ডাকাত । এই ডাকাতটা বেশ বড়সড় ও মোটাসুটা । এটা বোধ হয় ভয়ংকর ডাকাত । না হলে এই বয়স্ক মানুষটাকে এভাবে মারে কেউ ? এদের নিষ্ঠুরতা দেখে তার মনে বিশ্বাস জন্মায় যে, খতি না পেলে এরা হয়ত সত্যি সত্যি আজ তাদের জবাই করে ফেলবে । এই কয়টা টাকার জন্যে শমসেরের এভাবে জীবন দিতে ইচ্ছা করে না । বাপকে জোরে জোরে ডেকে বলে, বাজান গো । ওরা যা চায় দিয়া দেও । বাঁইচা থাকলে টাকা পয়সা আবার হইব ।

ইউনুস আলী চোখ বুঝে পড়ে আছে । কোন সাড়া শব্দ নাই । পেট নড়ছে দেখে বুঝা যাচ্ছে বেঁচে আছে । এক ডাকাত এসে ইউনুসের পেটে, লুঙ্গীর নীচে কিছু খুঁজল । তারপর তার পেটে জোরে জোরে আঙুলুঁ দিয়ে খোঁচা দেয় আর বলে, ওই বুইড়া উঠ, আমরা তর চিকিৎসা করতে আসছি । নাইলে কিন্ত তোর চার পোলারেই খতম করবাম কইলাম । এবার একটা রাম খোঁচা দিল ইউনুসের পেটে ।

যে জোরে খুঁচাটা দিল তাতে অজ্ঞান হলে জ্ঞান ফিরে আসতো । ইউনুস আলী অজ্ঞান হবার ভঙ্গি করছে । সে দাতে দাত কামড়ে পড়ে আছে । যা হবার হোক আমি চোখ খুলব না এমন সিদ্ধান্তে অটল পাহাড় হয়ে পড়ে রয়েছে । জীবন গেলেও খতির খবর সে দিবে না । এরই মাঝে মনে মনে সাইদুলকে একটা ধন্যবাদও দেয় সে । সাইদুলের দূপুরের আচরনই যে সাবধান করে দিয়েছিল ইউনুসকে ।

এবার ইউনুসের পেটে বিশাল এক ঘুসি দেয় । তাতেও জ্ঞান ফিরানো যায়নি দেখে সব রাগ গিয়ে পড়ে শমসেরের উপর । উপুড় হয়ে পড়ে থাকা শমসের পিঠে তার হাতের ডেগার চেপে ধরে । আগাটা একটু ঢুকতেই মরণ চিত্‍কার দেয় শমসের । এটা দেখে জহুরা পাগলের মতো একবার শ্বশুরকে ডাকছে আবার ডাকাতের পায়ে পড়ছে । বাজানরা, আর একটু সময় দেন, আমি খুঁইজা দেখি••• । আব্বারতো দাতি লাগছে । বেহুশ হওয়াকে এই এলাকায় দাতি লাগা বলে । দুই পাটি দাত খুব শক্ত হয়ে একে অন্যের সাথে লেগে থাকে বলে এই নাম ।

এমদাদ অনেকক্ষন আগেই টের পেয়েছে । রাতে কানাওয়ালার ভয়ে একটু তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ায় ঘুমটা বেশ গভীর হলেও পাশের ঘর থেকে এত জোরে চিত্‍কার চেঁচামেচি শুনে ঘুম না ভাঙ্গার কোন কারণ নাই । দরজা খুলতে গিয়ে বুঝতে পারল ডাকাতেরা বাইরে থেকে আটকে দিয়েছে । দরজা আটকে কি আর সবাইকে আটকানো যায় ?

এমদাদের কাছে গরু জবাই করার ছুড়ি আছে । সেটা দিয়ে ঘরের খাম থেকে বেড়া কেটে ছুড়ি হাতেই বেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়ে । জঙ্গল পেরুলেই ফয়জুদ্দি মোড়লের বাড়ি । মোড়ল বাড়ির সবাইকে ডেকে তুলল এমদাদ । ডাকাত পড়ছে গো ইউনুস চাচার বাড়ি••• । চলো সবাই•••। ফয়জুদ্দির ছোট ভাই বিরাট পালোয়ান । সেই লোকমান সবার আগে ।

ইউনুসের তবু জ্ঞান ফিরে না । এদিকে ডাকাতের ডেগার শমসের পিঠে আধা ইষ্ণির মতো ঢুকে গেছে । শমসেরের রক্ত দেখে জহুরা বাক শক্তি হারিয়ে ফেলল । শমসেরের মুখ থেকে ঘুঙ্গানির মত শব্দ বেরুচ্ছে এখন ।

এমন সময় বাইরে লোকজনের ডাকাত ডাকাত বলে চিত্‍কার শুনা গেল । চিৎকার শুনে ডাকাতেরা পিঠ টান দেয় । মানুষজন আসতাছে রে, চল্ আজ আর না ! কোনমতে প্রাণে বেঁচে যাওয়া রক্তাক্ত শমসের ওভাবেই পড়ে আছে ।

জঙ্গলের দিক থেকে হৈচৈ শুনতে পেল জহুরা । ডাকাতরা অন্ধকারে মিলিয়ে যায় নিমিষেই । নিশ্চিত অন্ধকারে ছেঁয়ে যেতে থাকা তার ও তার দুই সন্তানের ভবিষ্যতের উঠোনে আবার আলো জ্বলে উঠলো যেন । ছেলে দুটোকে বুকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছে এতক্ষন দম ফাটানো পরিস্থিতি মোকাবেলায় ক্লান্ত জহুরা ।

সমাপ্ত•••
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশ কি অন্যের যুদ্ধ লড়বে, নাকি নিজের দেশকে আগে রক্ষা করবে?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:২৯

বাংলাদেশ কি অন্যের যুদ্ধ লড়বে, নাকি নিজের দেশকে আগে রক্ষা করবে?
============================================
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে যে নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশকে যুক্ত করার আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের পক্ষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

দৃশ্যমানতা এখন একধরনের পুঁজি

লিখেছেন মুনতাসির, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:০০

মানুষ শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য কনটেন্ট নির্মাতা হতে চাইছে না। দৃশ্যমানতা নিজেই এখন একটি মূল্যবান সামাজিক সম্পদে পরিণত হয়েছে।

অনুসারীর সংখ্যা একজন মানুষকে পরিচিতি, আমন্ত্রণ, প্রভাব, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছে প্রবেশাধিকার, বাণিজ্যিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

।। রাশিয়ার মতো বাংলাদেশে হামলা করুক ভারত।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:১২


আমি আজ পর্যন্ত আম্লিগে কোন ভালোমানুষ খুঁজে পাইনি। আম্লিগ মানেই ইয়ের বাচ্চা। আম্লিগ মননে মগজে ধর্ষক, লুন্ঠনকারী, দেশদ্রোহী ও পাচারকারী। এদের মাঝে কোন কালেই কোন ভালোমানুষ ছিলোনা বর্তমানেও নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়ামানাকা ফ্যাক্টরস

লিখেছেন কলাবাগান১, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৫৭


ছবিতে যাকে দেখছেন উনার নাম প্রফেসর ইমানাকা। উনাকে সারা বিশ্ব মনে রাখবে উনার যুগান্তরী আবিস্কার এর জন্য। তার আবিস্কার যেভাবে সবার জীবনকে বদলে দিবে এবং দিচ্ছে সেটা জানানোর জন্যই... ...বাকিটুকু পড়ুন

Movie-Obsession(2026)

লিখেছেন ডি এইচ তুহিন, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বিশিদবার রাতে খুব বাজে আর একটা ছিনেমা দেখলাম। ভাই-রে ভাই কি বলবো, ঐ রাতে আর ঘুমাতে পারি নাই। মানে দেখার পর থেকে এখনো গা শিরশির করছে। চোখ বন্ধ করলেও চোখের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×