somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

শামছুল ইসলাম
নিঃসীম নীল আকাশে পাখী যেমন মনের আনন্দে উড়ে বেড়ায়, কল্পনার ডানায় চড়ে আমিও ভেসে চলেছি মনের আনন্দে--রূঢ় পৃথিবীটাকে পিছনে ফেলে।

জোছনা ও জননীর গল্প: মুক্তিযুদ্ধের শুরুর কথা (পর্ব-৯)

১০ ই জানুয়ারি, ২০১৮ বিকাল ৪:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



১। ভূমিকা:
দেশের স্বাধীনতার জন্য ১৯৭১ সালে অনেক মেধাবী ছাত্র তাঁদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতকে অগ্রাহ্য করে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল । তাঁদেরই একজন নাইমুল । ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের দিনটিকে সে বেছে নেয় নিজের বিয়ের দিন হিসাবে । কারণ তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবে । তখন এই দিনটাকে জাতীয় ছুটির দিন হিসাবে ঘোষণা করা হবে । সেই ছুটির দিনে সে ও মরিয়ম মনের সুখে ঘুরে বেড়াবে ।

২। ঘটনাপ্রবাহ
ঘটনাপ্রবাহ-১
শাহেদ বন্ধু নাইমুলের সাথে ওর পুরনো ঢাকার অপরিসর বাসায় দেখা করতে যায় । নাইমুল শাহেদকে জানায় ও আজই বিয়ে করতে যাচ্ছে । শাহেদ বন্ধুর এই ব্যবহারে ব্যথিত হয় । কিন্তু নাইমুল বরাবর একটু অন্যরকম – নিজের বিয়ের ব্যাপারে সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পছন্দ করে । নাইমুল দুপুরে হোটেল থেকে ইলিশ মাছের ডিম খাওয়াতে চায় শাহেদকে । কিন্তু শাহেদ ওর উপর অভিমান করে না খেয়েই বেরিয়ে পড়ে ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা শোনার জন্য – রেসকোর্সের দিকে । নাইমুল ওকে অনুরোধ করে সন্ধ্যায় বিয়েতে থাকার জন্য ।
ঘটনাপ্রবাহ-২
নাইমুলের মা-বাবা মারা গেছে ওর শৈশবে । তেমন কোন আত্মীয়-স্বজনও নেই । তাই বিয়ের বর যাত্রী এবং অভিভাবক হিসাবে শ্রদ্ধেয় প্রিয় শিক্ষক ধীরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরিকে নাইমুল ঠিক করে । আত্মভোলা এই শিক্ষকের গাড়িতে করে সোবহনবাগের দিকে রওনা হয় । রাস্তায় মানুষের মিছিলের ঢল । কিন্তু সেদিকে স্যারের কোন খেয়াল নেই । উনি Kaluza- এর পঞ্চম ডাইমেনশন নিয়ে মেতে আছেন প্রিয় ছাত্র নাইমুলের সাথে । হঠাত রাস্তার পাশের নর্দমায় গাড়ি পড়ে যায় । সুতরাং নাইমুল বাধ্য হয়ে রিকশা করেই মেয়ের বাড়ির দিকে রওনা হয় । ধীরেন স্যার ১৮নং সোবহানবাগের ঠিকানা খুঁজতে চলে যান ১৮নং চামেলীবাগে – কী সহজ,আত্মভোলা একজন প্রফেসর ।
ঘটনাপ্রবাহ-৩
মরিয়মের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে । কিন্তু তাঁর বিশ্বাস হতে চাচ্ছে না । লম্বা রোগা বরকে সে আগে কখনো দেখেও নি । তবে তাঁর ছোট বোন মাফরুহা খবর দিয়েছে, বর খুব সুন্দর । আবার সে শুনতে পেয়েছে, বিয়ের পর তাঁর বর নাকি আজ তাঁদের বাসায় থাকবেও না । নাইমুলের এক চাচা ও ফুফা এসেছে ওর সাথে । মোবারকের মামা মুসলেহ উদ্দিন ওনাদের আপ্যায়ন করছেন । কিন্তু মেয়ের বাবা নতুন কুটুম্বদের কিছু না বলে চলে যাওয়ায় উনারা অপমানিত বোধ করেছেন । বিয়ে পড়ানো শেষে একে একে সবাই চলে যায় । নাইমুল একা বসে থাকে । এদিকে মোবারক সাহবের প্রচন্ড মাথা ব্যথা, তাঁর আদরের পুত্রে ইয়াহিয়ার খুব জ্বর, মরিয়মের ছোট মাসুমা ব্যস্ত রান্নাঘরে দুলাভাইয়ের রান্না নিয়ে । রাত দশটার দিকে রান্না শেষে মরিয়ম বরকে খাবার দেবার জন্য ঘরে ঢুকে ।
নাইমুল প্রথমেই নববধুর কাছে ব্যাখ্যা করে কেন সে এগারো হাজার টাকা শ্বশুরের কাছ থেকে নিয়ে ছিল । তা না হলে যে সে মরিয়মের কাছে যৌতুক লোভী বর হিসাবে পরিচিত হয়ে যাবে । নর্থ ডেকোটায় একটি টিচিং এসিস্ট্যান্স পেয়েছে নাইমুল । মাসে চারশ’ ডলার করে দেবে ওরা । কিন্তু প্লেনের ভাড়া – আট হাজার টাকা ওকেই দিতে হবে । আর বাকী তিন হাজার টাকা দিয়ে ঋণ শোধ করবে ।
দু’জনের মধ্যে অনেক কথা হয় । মরিয়ম নাইমুলকে এই অল্প সময়েই প্রচন্ড ভালো বেসে ফেলে । সে তাঁকে তাঁদের বাসায় রাখতে চায় – মাকে অনুরোধ করে । কিন্তু বাবার কাছে তাঁর সেই আবেদন নতুন মা পৌঁছাতে পারে না । নাইমুল সেই রাতেই চলে যায় – চোখের জলে ভাসতে থাকে মায়াবতী মরিয়ম ।

ঘটনাপ্রবাহ-৪
মাওলানা ভাসানীর বক্তৃতার দিন মোবারক বাসায় ফিরে তাঁর দুই মেয়েকে পায় । ওদের নিয়ে রিকশার করে তিনি বক্তৃতা শুনতে যান । বড় মেয়েকে আরো কড়া শাসনের আওতায় আনার পরিকল্পনা করেন মনে মনে । ছোট দুই মেয়েকে বেবি আইসক্রিম কিনে দেন । কিছুক্ষণ পর পল্টনের মাঠে মাওলানা সাহেব বলেন-
‘তের বছর আগে কাগমারী সম্মেলনে আমি আসসালামুআলাইকুম বলেছিলাম । মরহুম শহীদ সোহরাওয়ার্দী তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন হয়েও সেদিন আমার কথা অনুধাবন করতে পারেন নাই ।...... তাই বলে ছিলাম যে তোমরা তোমাদের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করো এবং আমরা আমাদের জন্য শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করি । ‘লাকুম দীনুকুম ওয়ালিয়া দীন’ । শেখ মুজিবর রহমান আজ ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে । আমি সাত কোটি বাঙালিকে আজ মোবারকবাদ জানাই এ জন্য যে তারা এই বৃদ্ধের তের বছর আগের কথা এতদিন পর অনুধাবন করতে পেরেছে ।‘

এদিকে মরিয়ম খুঁজতে খুঁজতে নাইমুলের পুরনো ঢাকার বাসায় পৌঁছে দরজায় কড়া নাড়ে । ভিতর থেকে নাইমুলের ভরাট গলা ভেসে আসে, মরিয়ম চলে এসো, দরজা খোলা ।
শুধু কড়া নাড়ার শব্দে যে বুঝতে পারে কে এসেছে, তাঁকে কেমন করে উপেক্ষা করে মরিয়ম?

৩। একান্তে দেখা – নাইমুল-মরিয়ম
ঘটনাপ্রবাহ-১ থেকে ঘটনাপ্রবাহ-৪ পর্যন্ত নাইমুল আর মরিয়মের যে পরিচয় আমরা পাই, তাতে একটা কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, ওরা দু’জন যেন একান্তভাবে দু’জনের ।


৪। যে কথাগুলো বারবার পড়লেও পুরনো হয় না - এপিগ্রাম
১। আপনি দেশ বা রাজনীতির বাইরের কেউ না । আপনি সিস্টেমের ভিতরে আছেন । - শ্রদ্ধেয় ধীরেন স্যারের প্রতি নাইমুলের উক্তি ।

৫। দু’টি কথা
নিজের বিয়ের দিনটাকে স্মরণীয় করে রাখতে একজন অসম্ভব মেধাবী আবেগী যুবক ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে বিয়ে করে ছিল । এমনি আরো কতো মানুষ তাঁদের আবেগের সবটুকু দিয়ে এদেশটাকে ভালো বেসে ছিল । তাঁদের ভালোবাসার কতটুকু দাম আমরা দিতে পেরেছি/পারছি?
ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আরো কিছু চরিত্র আছে । সবগুলো চরিত্রের সন্নিবেশে আসছে আগামী পর্ব । দশম পর্বেই মুক্তিযুদ্ধের শুরুর কথার ইতি টানতে যাচ্ছি ।

মোঃ শামছুল ইসলাম

(নোট: একজন পাঠকের অনুরোধে মাওলানা ভাসানীর বক্তৃতার কিছু অংশ যোগ করলাম । পাঠকের মতামত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে থাকি ।)

(চলবে.....)
ঢাকা
তাং: ১০ জানুয়ারী, ২০১৮

সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জানুয়ারি, ২০১৮ দুপুর ১২:৫৫
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ছাত্রদলকে সামলাতে না পারলে ক্যাম্পাসগুলো সহিংসতায় পূর্ণ হবে।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮


রাতে রংপুর, সকালে জগন্নাথ। আজকে জগন্নাথে ছাত্রদলের হামলার শিকার একযোগে সব বিরোধী দল। এসব কি ছাত্রদলের কাজ? নাকি ছাত্রদলের ভেতর ছাত্রলীগ প্রবেশ করেছে? জকসু জিএসের জীবন আশংকাজনক। দেশে যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার প্রিয় ২৬টি পোস্ট; যেগুলো আপনারও ভালো লাগতে পারে

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:১৭

গ্যাস নিয়ে গ্যাসলাইটিং: কোনটা আসল সংকট, কোনটা কৃত্রিম?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:২১


বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা কী, এই প্রশ্ন করলে সবাই একবাক্যে বলবেন গ্যাস সংকটের কথা। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে, ফলে লোডশেডিং বেড়েছে বহুগুণ। কলকারখানা হোক বা বাসাবাড়ি, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Humans are (not) from Earth- তবে কি আমরা মহাবিশ্বের ভৃত্য?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৫৫

Humans are not from Earth: A Scientific Evaluation of the Evidence বইটির লেখক ডক্টর এলিস সিলভার (Dr. Ellis Silver)-এর ব্যক্তিগত ও একাডেমিক জীবন নিয়ে মূলধারার তথ্যমাধ্যমে এক ধরনের রহস্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা ইতিহাসের ছিন্নপত্র...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:০৩



আমরা ইতিহাসের ছিন্নপত্র...

২০১০, এক-এগারোর পর থেকে ৩৬ জুলাই পর্যন্ত- যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল, যারা গুম, নির্যাতন, কারাবাস, মামলা, চাকরি হারানো, পরিবার ভেঙে যাওয়া- সবকিছুর মূল্য দিয়েছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×