somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাদের বড় "মা"

১৫ ই অক্টোবর, ২০২২ বিকাল ৪:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমরা কাজিনরা আমাদের দাদার মা কে বড় মা বলে ডাকতাম। মানুষ টা মায়ের মতোই ভালো আর মমতাময়ী ছিলেন। তার সারল্য, ভালোবাসা আর বাচ্চাদের মতো মুখ টিপে হাসি আমাদের সবমসময় তার পাশাপাশি থাকতে বাধ্য করতো।

বাসার সবার প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা জমা ছিলো তার বুকের গভীরে। এতো বয়স হয়ে যাবার পরেও তার ভালোবাসার দেয়ালের রঙ বিন্দু পরিমাণও বিবর্ণ হয়েছিলো না। সে রাত জেগে ঠুকঠুক করে লাঠিতে ভর দিয়ে সবার রুমে রুমে গিয়ে খবর নিতেন কে বাসায় এসেছে আর কে এখনো আসেনি। সবার চিন্তায় সবসময় ফ্যাঁকাসে হয়ে থাকতেন। সে যেমন সবাইকে স্নেহ আর ভালোবাসার চাদরে জড়িয়ে রাখতেন, সবাই তেমন তাকেও লতার মতন পেঁচিয়ে থাকতেন। যেভাবে বটের ঝুরি গুলো বটবৃক্ষকে পরম মমতায় পেঁচিয়ে থাকে।

আমার ফুপু আর বাবা-কাকারা বড় হয়ে যাবার পরে পরবর্তী প্রজন্ম মানে আমরা কাজিনরা বড় মা'র সাথে রাতে ঘুমানোর জন্য এক প্রকারে যুদ্ধ লাগিয়ে দিতাম। যে জিতে যেতো সেই বড় মা'র সাথে ঘুমানোর সুযোগ পেতো।অধিকাংশ সময় আমিই তার সাথে ঘুমানোর সুযোগ পেতাম। তার সাথে ঘুমানোর রাত মানেই সারারাত রূপকথার রাত।

তার রূমের এক কোনো টিমটিম আলোয় হ্যারিকেন জ্বালানো থাকতো। সেই সময় মফস্বলে প্রচুর বিদ্যুৎ সমস্যা করতো। যখন তখন বিদ্যুৎ চলে যেতো। তাই বারবার অন্ধকারে দিয়াশলাই হাতড়ে হ্যারিকেন জ্বালানোর ঝামেলা এড়াতেই মূলত টিমটিম করে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে রাখা হতো।

হ্যারিকেনের টিমটিম আলো এবং কেরোসিন মেশানো হ্যারিকেনের সলতে পোড়ার অদ্ভুত এক গন্ধ ঘরটিকে সম্মোহনীয় করে তুলতো।সেই সম্মোহনীয় পরিবেশে আমরা বুঁদ হয়ে তার রূপকথার গল্প শুনতাম। উনি গল্প বলার সাথে সাথে এক হাতে আমাদের মাথায় বিলি কেটে দিতেন আর অন্য হাতে ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ করে ঘুরাতে থাকতেন হাতপাখা। আমরা গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে আবার জেগে উঠে দেখতাম উনি নিরলসভাবে এক হাতে আমাদের মাথায় বিলি কেটে যাচ্ছেন আর অন্য হাতে ঘোরাচ্ছেন পাখা। আমরা তখন অবাক হয়ে ভাবতাম আচ্ছা এই মানুষটার হাত ব্যথা করেনা! কিভাবে একাধারে দুই হাতে কাজ করে যান? আবার মনে মনে ভাবতাম বড়দের হয়তো হাত ব্যথা করেনা। কিন্তু এখন বুঝতে পারি মানুষটার ঠিকই হাত ব্যথা করতো কিন্তু আমাদের যাতে গরমে কষ্ট না হয় সে জন্যই তিনি ব্যথা ভুলে পাখা ঘোরাতেন।

শুধু আমরা ছোটরাই না বড়দেরও আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু ছিলো বড় মা'র ঘর। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর সবাই একত্র হয়ে মনোমুগ্ধকর এক আড্ডার পসরা সাজিয়ে বসতো বড় মা'র ঘরে। শীতের সময় এই আড্ডায় এক ভিন্নমাত্রা যুক্ত হতো। বড় মা ভীষণ শীতে কাবু ছিলেন সেই সাথে আগুন তাপানোর তীব্র নেশাও ছিলো তার। মাটির চুলোয় রাতের রান্না শেষে গনগনে কাঠের কয়লা গুলো তিনি একটি মাটির গামলায় তুলে ঘরে নিয়ে যেতেন এবং ঘুমানোর আগ পর্যন্ত সেই কয়লার আগুন তাপাতেন। তার সাথে আমরা সবাই সেই গনগনে কাঠের কয়লা ভর্তি মাটির গামলার চারপাশে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে বিভিন্ন গল্পে মেতে উঠতাম। গল্প করতে করতে যখন আগুনের আঁচ কমে আসতো তখন একটা লম্বা কাঠি দিয়ে সেই কাঠের কয়লা গুলোকে উসকে দিয়ে আবার আমরা গল্পে মেতে উঠতাম। অনেক রাত অবধি চলতো এই গল্প আর আড্ডার খেলা।

বড় মা'র রান্নার হাতে আধ্যাত্মিক এক ক্ষমতা ছিলো। খুব ভালো রান্না করতেন মানুষটি। পুরো বাড়িসুদ্ধ মানুষ তার রান্না করা খাবারের জন্য পাগল ছিলো। উনি শাক, লতাপাতা যাই রান্না করতেন আমরা মাছ-মাংস রেখে সেই খাবারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তাম। তিনি যে খুব গুছিয়ে বনেদি আঙ্গিককে রান্না করতেন তা কিন্তু নয়। খুব সাদামাটা ভাবেই তিনি রান্না করতেন। চুলায় তরকারি বসানোর পর থেকে শুরু করে রান্না শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি তরকারি চেখে চেখে দেখতেন আর মশলা যুক্ত করতেন। কখনো লবন, কখনো হলুদ আবার কখনো বা মরিচ। এতো সাদামাটাভাবে রান্না করার পরেও তার রান্না আমাদের কাছে অমৃতের মতো লাগতো।

মানুষ টা শীত ভয় পেতেন, মানুষ টা মৃত্যুও ভয় পেতেন। এতো ভয়ের পরেও পৌষের কোনো এক কনকনে শীতের বিকেলে তিনি আমাদের এবং এই পৃথিবীর মায়া ছিন্ন করে অজানা এক পৃথিবীতে পাড়ি জমালেন। সেই সাথে ভাঙলো আমাদের আড্ডাখানা, শেষ হলো এক অধ্যায়ের।

ছবিঃ গুগল
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০২২ বিকাল ৪:৫৯
১০টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রবাস ডাইরিঃ ২য় পর্ব

লিখেছেন মুহাম্মদ তমাল, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ রাত ১:০৮



স্বপ্ন সত্যি হবার এক বছর।
আগস্ট ২০২২,
গতবছরের এই অগস্ট মাস ছিলো জীবনের কঠিনতম মাস গুলির একটা।
কতটা বিষণ্ণা, মর্মান্তিক, কঠিন ছিলো এই মাস এটা আমি জানি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেদিনও বৃষ্টি ছিল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ রাত ১:৩৯

ছবিঃ আমার তোলা।

ওরা আসে। হ্যাঁ অবশ্যই আসে।
গভীর রাতে। তখন চারিদিক অন্ধকার। ঝিঁঝিঁ পোকা সমানে ক্লান্তিহীন ভাবে ডাকতেই থাকে। পাতায় পাতায় ঘষা লেগে মিহি একটা শব্দ হয়। বইতে থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিদায় বেলায় - ২৬

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ সকাল ১০:৪৮

ভিন্ন সময় বিভিন্ন যায়গায় বেড়াতে গিয়ে বেশ কিছু সূর্যাস্তের ছবি আমি তুলেছি আদিতে, এখনো তুলছি সুযোগ পেলেই। সেই সমস্ত সূর্যাস্তের ছবি গুলি বিভিন্ন সময় ফেইসবুকে শেয়ার করেছি। সেখান থেকে ৫টি... ...বাকিটুকু পড়ুন

৮ম শ্রেণি পাশ নারী প্রধানমন্ত্রী হতে পারলে হিরো আলম কেন এমপি হতে পারবে না?

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ দুপুর ১:০৫


বগুড়া ৪-৬ আসনে নির্বাচন হলো। সম্ভাবনা জাগিয়েও হিরো আলম স্বল্প ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন। ওনার অভিযোগ ভোট গণনায় কারচুপি হয়েছে। ওনাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ওনি বলছেন, ওনার মতো অশিক্ষিত লোককে স্যার সম্ভোধন... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্ক্সের অবৈধ সন্তান.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ বিকাল ৩:৫১

মার্ক্সের অবৈধ সন্তান.....

শ্রেণি-সংগ্রামের তত্ত্বকথায় যিনি প্রবাদপুরুষ, তিনি বাড়ির পরিচারিকার কাছ থেকে ‘ফায়দা’ নেবেন, চরম শত্তুরেও তা মানতে চাইবে না। কিন্তু ইতিহাসের বড় একটা অংশ বলছে, ঘটনা কতকটা তা-ই। সময়টা ১৮৫০।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×