somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

শাওন আহমাদ
স্বপ্নপূরণই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়।তাই বলে স্বপ্নকে ত্যাগ করে নয়,তাকে সঙ্গে নিয়ে চলি।ভালো লাগে ভাবতে, আকাশ দেখে মেঘেদের সাথে গল্প পাততে, বৃষ্টি ছুঁয়ে হৃদয় ভেজাতে, কলমের খোঁচায় মনের অব্যক্ত কথাগুলোকে প্রকাশ করতে...

আমার শরৎ-বিলাস

০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৩ বিকাল ৩:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমার পছন্দের ঋতু শরৎ তবে বর্ষা আর শীতের আগমনী বার্তাও খারাপ লাগেনা। ছেলেবেলা থেকেই আমার কাছে অপার এক বিষ্ময় আর মুগ্ধতার নাম ছিল শরৎ। শরতের আকাশের মতো এতো সুন্দর ঘোর লাগানো আকাশ অন্য কোনো ঋতুতে খুব একটা দেখা যায় না। এ সময় আকাশ এতোটাই স্বচ্ছ আর গাঢ় নীল থাকে যে অনেক দূরের আকাশে ডানামেলা সোনালী চিলও খুব সহজে দৃষ্টিগোচর হয়; ক্ষণে ক্ষণে সোনালী ডানার চিলের সাথে পাল্লা দিয়ে স্বচ্ছ গাঢ় নীল আকাশে আল্পনার বেশে থোকায় থোকায় ভেসে বেড়ায় শুভ্র মেঘ। ছেলেবেলায় এই মেঘ গুলোকে আমার কাছে তুলোর টিলা মনে হত। আমার দাদী যখন উঠানে শিমুল তুলো শুকাতেন, আমরা ভাই-বোনেরা তখন রোদের তাপে ফুলে ফেপে উঠা সেই শিমুল তুলোর উপর গাড়াগড়ি খেতাম। শরতের আকশে শুভ্র মেঘ দেখলেই তাই আমার দাদীর রোদে শুকাতে দেওয়া তুলোর মতো মনে হত, ইচ্ছে করত মেঘের ভেলায় চড়ে গড়াগরি দিতে। আবার কখনো বা এই শুভ্র মেঘের দলা গুলোকে পাড়ায় বিক্রি করতে আনা হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো লাগত, ভাবতাম মেঘ গুলোকে ধরে মুখে পুড়ে দিলেই হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো মিলিয়ে যাবে।

আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথে লাগোয়া সাপের মতো এঁকেবেঁকে বয়ে গিয়েছিল ছোট একটি নদী, ঠিক যেন রবীন্দ্রনাথের ‘আমাদের ছোট নদী’ কবিতার মতো। শরৎকালে নদীর পানি নেমে গিয়ে তলার দিকে চলে যেত, কমে আসত স্রোতের গতিবেগও। গলা কিংবা বুক পানি ভেঙ্গে মানুষ সোনারঙা ধানের বোঝা মাথায় করে নদী পাড় হতেন, সাঁতরে পাড় হতো গরুও— খানিক বাদে-বাদে দূরের মাঠ থেকে বয়ে আনা আখ ভর্তি ডিঙি নৌকা গুলো ঘাটে এসে ভীড়ত। ঘাটের পাশেই ছিল গুরের খোলা, সেখানে দিনমান আখের গুড় বানানোর কাজ চলত। প্রথমে আখ গুলোকে মেশিনের মাধ্যমে পিষে রস বের করা হত; তারপর সেই রস বিশাল দৈত্যাকার চুলা ও লোহার কড়াইয়ে জ্বালিয়ে গুড় বানানো হত।

আমরা ছেলেপুলেদের দল বিকেলে রোদ পড়ে এলে, গুড়ের খোলা থেকে গুড় কিংবা আখ খেতে-খেতে নানা রঙ-বেরঙের ফড়িং ধরায় নিযুক্ত হয়ে যেতাম। ফড়িং ধরার জন্য আমাদের বিশেষ ধরণের হাতিয়ার ছিল, পাটকাঠির মাথায় কাঁঠাল কিংবা জিগা গাছের আঠা লাগিয়ে বসে থাকা ফড়িংয়ের উপর ছোঁয়া লাগাতেই তারা আঠার মধ্যে আটকে যেত— কেউ কেউ আবার পাটকাঠির মাথায় মাকড়োসার জাল পেঁচিয়েও ফড়িং ধরত, এতো এতো রঙের ফড়িংয়ের মধ্যে আমার পছন্দের ছিল, গাঢ় লাল আর গাঢ় হলুদ রঙের ফড়িং।সবুজ রঙের হেলিকপ্টারের মতো দেখতে বড় এক ধরণের ফড়িং ছিল, যাকে আমরা রাজা ফড়িং বলে ডাকতাম; কিন্তু রাজা বলে তাকে ডাকা হলেও সে ছিল ভীষণ বোকা কিসিমের ফড়িং, খুব সহজেই তাকে ধরে ফেলা যেত। আমরা দস্যি ছেলে-মেয়েদের দল, নদীর পাড় আর কশবনের ভেতর ঘুরে-ঘুরে ফড়িংদের পাকড়াও করতাম।



কমে আসা নদীর পানিতে পাট গাঁজন দিয়ে, পাটকাঠি এবং পাটের আঁশগুলোকে আলাদা করা হত— তারপর সেই পাটকাঠি গুলোকে ছোট-ছোট আঁটি বেঁধে গোলাকৃতি ঘরের মতো করে ছড়িয়ে রোদে শুকাতে দেওয়া হত। আমরা মাঠভর্তি করে রোদে শুকাতে দেওয়া পাটকাঠির ঘরগুলোর ভিতরে লুকোচুরি খেলতাম, পাঠকাঠির গা থকে অদ্ভুত এক গন্ধ আসত— আমি চোখবন্ধ করে গভীর শ্বাস নিয়ে পাটকাঠির গায়ে লেগে থাকা গন্ধ শুকতাম, এই গন্ধ আমার পছন্দের ছিল এবং এখনো এই গন্ধ পেলে আমি শৈশবে ফিরে যাই, মাটির গন্ধ পাই।



শরতে রোদ্র-ছায়ার লুকোচুরি আমাদের খেলায় ভিন্নমাত্রা যুক্ত করত, আমরা ছেলে-মেয়েদের দল ছায়া থেকে দৌড়ে রোদের সাথে-সাথে যাবার প্রতিযোগিতা করতাম; কিন্তু কখনোই রোদের সাথে পেরে উঠতাম না। রোদ সবসময় আমাদেরকে হারিয়ে জয়ী হয়ে যেত। শরতে আমাদের আরেক বিষ্ময় ছিল, বুড়ির সুতো নামে পরিচিত সাদা মাকড়োসার জালের মতো দেখতে এক বস্তু যা বাতাসে ভেসে বেড়াত— বড়দের জিজ্ঞেস করলে বলত এগুলো চাঁদের বুড়ির চরকার সুতো, বুড়ি চরকা ঘোরাবার সময় এগুলো উড়ে-উড়ে পৃথিবীতে চলে আসে। এই সুতো মাথায় পেঁচিয়ে রাখলে নাকি চুল সুন্দর হয়। আমরাও সেই কথা বিশ্বাস করে বাতাসে উড়তে থাকা সেই সুতো গুলোকে ধরে-ধরে মাথায় পেঁচাতাম। (এই সুতো নামক বস্তু এখনো আমার কাছে এক বিষ্ময়, এগুলো ঝাঁকে-ঝাঁকে আসলে কোথায় থেকে উড়ে আসতো? যদি কারো কাছে এই তথ্য থাকে তাহলে জানাবেন প্লিজ)

এখন ঢের বড় হয়েছি, আশেপাশে সবকিছু দুর্বার গতিতে পরিবর্তন হয়েগছে; তবুও শরৎ এলেই কেমন বাচ্চা হয়ে যাই! খুঁজতে থাকি কাশেরবন। আজ অফিসে আসার সময় দেখলাম বিভিন্ন ফাঁকা প্লটে কাশফুল ফুটে সাদা হয়ে আছে, বাতাসে দোল খেয়ে তারা শরতের জানান দিচ্ছে। অফিসে এসে এক প্রকৃতিপ্রেমী সহকর্মীর সাথে কথা বললাম, একদিন অফিস থেকে আর্লি বের হয়ে দুজন কাশের বন থেকে ঘুরে আসব, কথা পাকা হয়েছে এখন যাওয়ার অপেক্ষায়…

ছবিঃ গুগল
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৩ রাত ৮:৫৩
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাসূলের (সা.) একমাত্র অনুসরনীয় আহলে বাইত তাঁর চাচা হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মোত্তালিব (রা.)

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩




সূরাঃ ৩৩ আহযাব, ৩২ নং ও ৩৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
৩২। হে নবী পত্নিগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও। যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তবে পর পুরুষের সহিত কোমল... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোরগের ডাক , বিজ্ঞানের পাঠ এবং গাধার প্রতি আমাদের অবিচার

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:৫৫


গ্রামে বেড়ে ওঠা মানেই একটা অসাধারন শৈশব। আমাদের সেই শৈশবের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল মক্তবের মৌলভি সাহেবদের গল্প। তারা বলতেন, ভোররাতে মোরগ ডাকে কারণ সে ফেরেশতা দেখতে পায়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বঙ্গ ও বেঙ্গলীর শিকড় কী মুছে গেছে? নাকি পুণ্ড্রনগর সভ্যতার মত হারিয়ে গেছে ??

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৯:০৮


বঙ্গ ও বেঙ্গলীর শিকড় কী মুছে গেছে নাকি পুণ্ড্রনগর সভ্যতার মত হারিয়ে গেছে ?? সামু ব্লগের এই ক্রান্তিকালে বিষয়টি নিয়ে একটু আলোচনা/পর্যালোচনা করে কিছু সময় কাঠানো যাক... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংকটে আওয়ামী লীগের কর্মীরা কোথায় দাঁড়িয়ে?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:০০

সংকটে আওয়ামী লীগের কর্মীরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বহুবার প্রমাণ হয়েছে যে, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি থাকে তার তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে। তাদের শ্রম, ত্যাগ, জেল-জুলুম সহ্য করার মানসিকতা এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

খাজনা

লিখেছেন রাজীব নুর, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:২৯



মন! মানুষের মন! মানুষকে তছনছ করে দেয়!
কখনো সে বাঘ, কখনো সে অজগর, কখনো সে শত্রু, কখনো সে বন্ধু!
কখনো সে ঈশ্বর, কখনো সে শয়তান, কখনো সে নিয়তি!
বিদিকিচ্ছিরি কান্ড!

লম্বা টানা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×