somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মোরগের ডাক , বিজ্ঞানের পাঠ এবং গাধার প্রতি আমাদের অবিচার

০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


গ্রামে বেড়ে ওঠা মানেই একটা অসাধারন শৈশব। আমাদের সেই শৈশবের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল মক্তবের মৌলভি সাহেবদের গল্প। তারা বলতেন, ভোররাতে মোরগ ডাকে কারণ সে ফেরেশতা দেখতে পায়। নিস্তব্ধ রজনীর শেষ প্রহরে চারপাশ যখন ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন মোরগের ডাক মুমিনের হৃদয়ে এক অদৃশ্য আহ্বান জাগায়। আমরা তো ছোট ছিলাম, কথাগুলো সরল মনে বিশ্বাস করে নিতাম।

সেই বিশ্বাসের পেছনে যে হাদিসের কথা বলা হতো, সেটা সত্যিই আছে। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা মোরগকে গালি দিয়ো না; কারণ সে নামাজের জন্য জাগিয়ে তোলে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫১০১)। আরেক জায়গায় এসেছে, ‘যখন তোমরা মোরগের ডাক শুনবে তখন আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করো। কেননা এই মোরগ ফেরেশতাদের দেখে।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৩০৩)।

আরেকটি জায়গায় এসেছে, ‘যখন তোমরা মোরগের ডাক শুনবে তখন তোমরা আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করে দোয়া করো। কেননা এই মোরগ ফেরেশতাদের দেখে আর যখন গাধার আওয়াজ শুনবে তখন শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবে, কেননা এই গাধা শয়তান দেখেছে।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৩০৩)।

হাদিসের এই কথাগুলো যেমন আছে, ঠিক তেমনিই থাকবে । কোনোদিন পরিবর্তন হবে না । কিন্তু বড় হয়ে যখন আমরা বিজ্ঞানের পাঠ নিতে শুরু করলাম, তখন প্রথমেই মনে একটা প্রশ্ন জাগল। মোরগ আসলে কেন ভোরে ডাকে? ফেরেশতা দেখার পাশাপাশি এর পেছনে কি প্রকৃতিতে কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ লুকিয়ে আছে? তখনই চোখের সামনে ভেসে উঠলো এক অন্য রহস্যের গল্প। মোরগের ভোরবেলা ডাকার পেছনে মূল বৈজ্ঞানিক কারণ হলো তাদের 'সার্কেডিয়ান রিদম' (Circadian Rhythm) বা অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি। এটি তাদের শরীরের একটি ২৪ ঘণ্টার চক্র, যা মূলত তাদের কখন জেগে উঠতে হবে বা ডাকতে হবে তা নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষের শরীরেও এই ঘড়ি আছে।

জাপানের নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক তাকাশি শিমমুরা এবং তাকাশি ইয়োশিমুরা একটি চমৎকার পরীক্ষা করেন। তারা মোরগকে সম্পূর্ণ অন্ধকার একটি বন্ধ ঘরে রাখেন। বাইরে কোনো আলো নেই। কোনো শব্দ নেই। কোনো সংকেত নেই। তবুও মোরগ নিজের মতো করে ডাকে। প্রতি ২৩.৮ ঘণ্টা পরপর সে নিয়মিত ডাকতে থাকে। এর থেকে বোঝা যায়, মোরগ কেবল সূর্যের আলো দেখে ডাকে না। এর পেছনে কাজ করে তার শরীরের ভেতরের জিনগত প্রোগ্রাম। রাতের বেলা মোরগের মস্তিষ্কে মেলাটোনিন নামক একটি হরমোন বাড়ে। এই হরমোনের প্রভাবে মোরগ ঘুমায়। ভোরের দিকে এই হরমোনের মাত্রা কমতে থাকে। মোরগের শরীর তখন সক্রিয় হয় এবং সে ডাকতে শুরু করে।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে মোরগের চোখের অসাধারণ ক্ষমতা। মানুষের চোখের তুলনায় মোরগের চোখের আলো গ্রহণ করার ক্ষমতা অনেক বেশি। সূর্য ওঠার অনেক আগে আকাশে যে অতি ক্ষীণ আলো আসে, মানুষের চোখে তা ধরা পড়ে না। কিন্তু মোরগের চোখ সেই আলো দেখতে পায় এবং তার সাথেই তার মস্তিষ্কে ডাকার সংকেত চলে যায়। বিজ্ঞানীদের আরেকটি মজার তথ্য হলো মোরগের ডাকার পেছনে একটি কড়া সামাজিক শৃঙ্খলা কাজ করে। একটা দলে সবার আগে ডাকে আলফা , দলের সবচেয়ে প্রভাবশালী মোরগটি। তার ডাক শেষ হলে তারপর ডাকে দ্বিতীয় মোরগ। ছোট মোরগটি আলফার অনুমতি ছাড়া ডাকতে পারে না।

মোরগ কেবল ভোরেই ডাকে এমন নয় , সারাদিনেও মাঝে মাঝে ডাকতে পারে । ডাকার পেছনে পুরুষ হরমোন 'টেস্টোস্টেরন'-এর বড় ভূমিকা রয়েছে। ভোরে ডাকার একটা বড় কারণ হলো: নিজের এলাকা বা টেরিটোরি দাবি করা এবং অন্য মোরগদের সতর্ক করা। এর মাধ্যমে সে বোঝায়, "আমি এখানকার প্রধান, এই এলাকা আমার এবং এখানকার মুরগিগুলো আমার।" একইসাথে এটি মুরগিদের ডাক শুনে নিজেদের নিরাপদ বোধ করতে সাহায্য করে।

আমরা মনে করি, মোরগ আমাদের চারপাশেরই একটি স্থানীয় পাখি। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে অন্য কথা। গৃহপালিত মোরগ বা মুরগি আসলে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার পাখি। এদের বৈজ্ঞানিক উৎস হলো বুনো পাখি রেড জাঙ্গলফাউল। আজও এই পাখি ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ডের জঙ্গলে দেখা যায়। গবেষকদের ধারণা, প্রায় সাত থেকে আট হাজার বছর আগে মানুষ এই বুনো পাখিকে পোষ মানিয়ে গৃহপালিত করে।

মোরগ তার জৈবিক ঘড়ি অনুযায়ী ডাকবে আর আমরা সেই ডাকে সজাগ হয়ে পরম করুণাময়ের ইবাদতে মগ্ন হওয়া কি খারাপ ? না, একদমই না। তাহাজ্জুদ পড়া কি খারাপ? না। ফজরের নামাজ পড়া কি খারাপ? না, বরং এগুলো অসাধারণ অভ্যাস। ভোরে ওঠা মানুষের শরীর ও মনের জন্য উপকারী। বিজ্ঞানও এটা বলে। ইংরেজিতে প্রবাদ রয়েছে, "Early to bed and early to rise, makes a man healthy, wealthy, and wise."

ইসলামও এটা বলে। দুটোই এখানে একমত। ভোরের নিস্তব্ধতায় যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে থাকে, তখন নামাজে দাঁড়ানোর একটা আলাদা অনুভূতি আছে। সেই মুহূর্তে মন পরিষ্কার থাকে। চিন্তা স্থির থাকে। একটা গভীর প্রশান্তি আসে। ধর্ম ও বিজ্ঞান এখানে একে অপরের পরিপূরক হিসেবেই কাজ করছে।

তবে আমার মাঝে মাঝে মনে হয় , গাধার সাথে আমরা কিছুটা অবিচার করেছি। মোরগের পাশাপাশি আমাদের গাধাও লালন-পালন করা উচিত ছিলো । মোরগের ডাক নিয়ে যে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে, সেখানেই বলা হয়েছে গাধার ডাক শুনলে শয়তান থেকে আশ্রয় চাইতে, কারণ সে শয়তান দেখেছে। কিন্তু আমরা সমাজে মোরগ পালন নিয়ে যতটুকু উৎসাহ বা ধর্মীয় আবেগ দেখি, গাধা পালনের ক্ষেত্রে তেমনটা দেখি না।

আমরা কি ফেরেশতা দেখতে পাওয়ার সুসংবাদটুকু নিতে যতটা আগ্রহী, শয়তানকে চিনে রাখার সতর্কবার্তা নিতে ততটাই উদাসীন ? গাধার ডাকটা আমাদের জীবনের অপ্রিয় সত্যের মতো শোনায় বলেই আমরা তাকে এড়িয়ে যাই? মোরগ যদি আধ্যাত্মিক অ্যালার্ম হয়, তবে গাধার ডাকও তো এক ধরণের 'আধ্যাত্মিক অ্যান্টিভাইরাস'। অথচ আমরা মোরগের গুণগান গাইছি, আর গাধাকে করেছি অবহেলা ।

মোরগের ভোরে ডাকার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নিয়ে উল্লেখিত গবেষণাগুলো নিম্নরূপ:

https://www.nationalgeographic.com/animals/article/130318-rooster-crow-circadian-clock-science

1-Shimmura, T., & Yoshimura, T. (2013). Circadian clock determines the timing of rooster crowing. Current Biology, 23(6), R231–R233.

2-Shimmura, T., Ohashi, S., & Yoshimura, T. (2015). The highest-ranking rooster has priority to announce the break of dawn. Scientific Reports, 5, 11683.

3- Eda, M. (2021). Origin of the domestic chicken from modern biological and archaeological evidence. Animal Science Journal.
(এছাড়া Red Junglefowl-এর domestication নিয়ে বহুল স্বীকৃত গবেষণা অনুসারে, প্রায় ৭–১০ হাজার বছর আগে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এদের পোষ মানানো হয়।)

মোরগের ডাক শুনে আল্লাহকে স্মরণ- মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা



সর্বশেষ এডিট : ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০৫
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনব প্রতারনা - ডিজিটাল প্রতারক

লিখেছেন শোভন শামস, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:১৮



একটি সাম্প্রতিক সত্য ঘটনা।
মোবাইল ফোনে কল আসল, একটা গোয়েন্দা সংস্থার ছবি এবং পদবী সহ। এই নাম্বার সেভ করা না, আননোন নাম্বার। ফোন ধরলাম। বলল আপনার এই নাম্বার ব্যবহার করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আগে নিজেকে বদলে দিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪১



"আমার স্বামী সংসারের কুটোটাও নাড়ান না। যেখানকার জিনিস সেখানে রাখেন না। মুজা খুলে ছুঁড়ে যেখানে সেখানে ফেলে দেন। নিজেকে পরিষ্কার রাখতে বারবার ভুল করেন! এতো বছর বিবাহিত জীবন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×