সংকটে আওয়ামী লীগের কর্মীরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বহুবার প্রমাণ হয়েছে যে, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি থাকে তার তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে। তাদের শ্রম, ত্যাগ, জেল-জুলুম সহ্য করার মানসিকতা এবং রাজপথের সংগ্রামই বড় নেতাদের ক্ষমতার আসনে পৌঁছে দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো সুযোগের সময়ে যারা তৃণমূলের ঘাম ও রক্তের উপর দাঁড়িয়ে মন্ত্রী, এমপি এবং প্রভাবশালী নেতা হয়েছেন, সংকটের সময়ে তাদের অনেককেই আজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ভেতরে একটি অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায় দলের ভেতরে সুবিধাভোগী ও আত্মীয়কেন্দ্রিক রাজনীতি অনেক সময় প্রকৃত ত্যাগীদের মূল্যায়নকে আড়াল করে দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, কিছু সুবিধাবাদী ব্যক্তি ক্ষমতার সময় নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও, আজ দলের দুঃসময়ে তারা অনেকেই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক তৃণমূল নেতা-কর্মীর জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। কেউ বছরের পর বছর মামলা নিয়ে আদালতে ঘুরছেন, কেউ ব্যবসা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন, আবার কেউ পারিবারিক সম্পত্তি বিক্রি করেও আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তবুও মামলা থেকে মুক্তি মিলছে না। অনেকের অভিযোগ সংগঠনের পক্ষ থেকে তাদের জন্য কোনো কার্যকর আইনি বা আর্থিক সহায়তা কাঠামো দৃশ্যমান নয়। আরও করুণ বাস্তবতা হলো, জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরও অনেক নেতা-কর্মী নিজ বাড়িতে নিরাপদে থাকতে পারছেন না বলে দাবি করছেন। পরিচিত রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ বাসা ভাড়া দিতে চায় না মব হামলার আশঙ্কা বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভয়ে অনেকেই দূরে থাকছেন। নারী নেত্রীরাও একই সংকটের মধ্যে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যা রাজনৈতিক মানবিকতার জন্য একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। রাজনীতিতে ত্যাগের ইতিহাস নতুন নয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে ত্যাগের বিনিময়ে কি শুধু অবহেলাই প্রাপ্য? যারা রাজপথে আন্দোলন করেছে, মামলা খেয়েছে, কারাবরণ করেছে তাদের দুর্দিনে যদি নেতৃত্ব পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে সংগঠনের ভবিষ্যৎ ভিত্তি কতটা শক্ত থাকবে? দলের ভেতরের অনেকেই মনে করেন, এখন সময় এসেছে আত্মসমালোচনার। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বাস্তব সহায়তার একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন যেখানে আইনি সহায়তা, পুনর্বাসন এবং সংকটে থাকা কর্মীদের তালিকা তৈরি করে তাদের পাশে দাঁড়ানো হবে। নইলে তৃণমূলের আস্থা হারানো যে কোনো দলের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ইতিহাস বলে, রাজনীতিতে নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা হয় দুঃসময়ে। সুসময়ের বক্তৃতা নয়, বরং সংকটের সময়ে কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর সাহসই একজন নেতার প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে। আজ প্রশ্ন একটাই যারা তৃণমূলের ত্যাগে নেতৃত্বের আসনে উঠেছেন, তারা কি সেই ত্যাগের ঋণ স্বীকার করে বাস্তবে কোনো দায়িত্ব নেবেন, নাকি ইতিহাসই একদিন এই নীরবতার বিচার করবে?
রাজনীতি যদি মানবিকতা হারায়, তাহলে তা শুধু ক্ষমতার খেলায় পরিণত হয়। আর সেই খেলায় সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয় তৃণমূলের নিঃস্ব কর্মীদেরই। এখন দেখার বিষয় এই বাস্তবতা পরিবর্তনে নেতৃত্ব কতটা আন্তরিক পদক্ষেপ নেয়।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



