আমার মা এখনও বেঁচে আছেন। বয়স সত্তর-এর কাছাকাছি। বাবা মারা গেছেন বছর সাত হলো। আমরা নয় ভাইবোন। মারা গেছে আরও তিন ভাইবোন। সে হিসেবে আমার মা গর্ভে ধারণ করেছেন সর্বমোট বারোজন সন্তান। আগের দিনের ব্যাপার। কী পরিমাণ ধৈর্য্য এবং সদিচ্ছা থাকলে এতোগুলো সন্তান লালন-পালন সম্ভব- এ যুগে তা কল্পনার অতীত! কিন্তু আমার মা-বাবা পেরেছেন। এবং তা ভালোভাবেই পেরেছেন। সন্তান মানুষ করার ক্ষেত্রে তাঁদের এতোটুকুও অবহেলা ছিলো না। মা-বাবার বেঁচে থাকা সন্তানদের মধ্যে আমি সপ্তম। এখন ঢাকায় থাকি।
মা অধিকাংশ সময় গ্রামেই থাকেন। মানে গ্রামই পছন্দ মা'র। সেখানে আমার তিন ভাই থাকে। বাদবাকিরা শহরে থাকে। জোড়াজুড়ি করে মাকে কাছে এনে রাখলেও বেশিদিন রাখতে পারি না। আবার চলে যান গ্রামে। একটু খোলামেলা জায়গা, কথাবলার মানুষ না হলে তাঁর চলে না। শহরে এসবের দারুণ অভাব। তাই অবসর পেলে আমিই মা'র সাথে গল্প করি। মাঝে মাঝে একটু নষ্টালজিক হয়ে যাই। আমার শৈশবের কথা শুনি। কী করতাম, কতোটুকু দুষ্টু ছিলাম- এইসব আর কী! মা-ও গুছিয়ে সুন্দর করে বলেন গল্প। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি।
একটু দুষ্টু ছিলাম বটে। তবে শৈশবের যে জিনিসটা আমাকে মুগ্ধ করে, তাহলো- আমি নাকি একটি বিশেষ গান গাইতাম সুন্দর করে। লোকেরা আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে সেই গান শুনতো- যদিও সব 'র' অর 'ল' উচ্চারণ করতাম আমি। মাকে জিজ্ঞেস করি- কী গান গাইতাম আমি? মা'র স্মৃতিশক্তি এখনও প্রখর। সে গানিটির ক'টি লাইন এরকম- ধান থুইয়া পাট বুনলাম/ বাইষ্যা আইলে তিল বুনলাম/ এবার বড়ো কুষ্টার আমদানি/ বাড়িত যাইয়া কমু আমি/ ভাত রাঁনছোনি সুন্দরী / তোমার জন্য খাইটা মরি../ ............................/ ভাত-ভুত রাঁনধুম কি/ খড়ি-জাবা ভিজলি/ এতো রাইতে ছাওয়ালের ঘ্যানঘেনি...। কী ছিলো গানটার সারমর্ম বাণী? তখন না বুঝলেও এখন কিছুটা বুঝে হাসি পায় মনে।
গানটির সবটুকু মা পারেন না। সুরে নয়, কবিতার মতো করে বলেন মা। তবু শুনতে মজা লাগে শুনতে। কারণ মনে পড়ে আমার শৈশব। মা আমাকে সাথে করে বাড়ির পাশের নদীতেই গোসল করতে যেতেন। তখনকার দিনে টিউবওয়েল বা পাতকুয়ার চল ছিলো না প্রতি বাড়িতে। খুব কাছের নদীতে গোসল করতো সবাই। আমি মা'র সাথে যেতাম। আমার বয়স পাঁচের মতো হবে। স্কুলে যাওয়া শুরু হয়নি তখনও। আমি পথের আশপাশ দেখতাম চোখ ভরে। মাঝে সোনাফলা ধানতে দেখে বলতাম- মা, লোয়া ধানে লং ধরছে, অহন পাকবো। ছোটো মুখে এরকম পাকা কথা শুনে মা হাসতো। মনে মনে তৃপ্ত হতো ছেলের বুদ্ধিদীপ্ততায়।
[গাঢ়]প্রজন্ম-দুই[/গাঢ়]
আমার ছেলের বয়সও পাঁচ। ছেলেকে দাদার বাড়ি দেখাতে নিয়ে যাই গ্রামে। খুব খুশি হয় সে তখন। শহরের বদ্ধ আবহাওয়া ছেড়ে গ্রামে গিয়ে মুক্ত বিহঙ্গের মতো ছটফট করে। সবকিছুই চষে বেড়ায় সে। সাথে খেলার সাথী আমার ছোটো ভাইয়ের মেয়ে জেমি। ওর চেয়ে চার-পাঁচ মাসের ছোটো। পুতুল পুতুল খেলা, ঘর-বাড়ি বানানো কতো কী খেলে! আমার ছেলে গাছ লাগায় তার খেলনা বাড়ির পাশে। গাছপালা লাগায়; আমের ডাল মাটিতে পুঁতে রাখে। সেটাই ওর ভষ্যিতের মহীরুহ। জেমি অভিযোগ করে বলে- চাচ্চু, জারিফ ভাইয়ার একটুও বুদ্ধি নাই; আমের ডালে কোনোদিন গাছ হয়? আমার ছেলে মুখ কালা করে আমার কাছে চলে আসে। আমি ছেলেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলি- না বাবা, আম গাছের ডালেও গাছ হয়। ছেলে খুব খুশি হয় তখন। আমি অবাক বিস্ময়ে দ্বিতীয় প্রজন্ম দেখি।
[গাঢ়]উপসংহার[/গাঢ়]
আমার ছেলে এখন স্কুলে যায়। পড়াশুনায় ছেলে বেশ মেধাবী। আমি স্কুলে দিয়ে আসি, নিয়ে আসি। আসা-যাওয়ার পথে ওর সাথে বন্ধু হয়ে যাই। ও আশপাশ দেখে। সারি সারি অট্টালিকা, রিক্সা, ঢেলাগাড়ি, কার, বাস এসব কিছু। রিক্সায় চলাফেরা করি। মাঝে মাঝে যানজট দেখে আমাকে সতর্ক করে- বাবা, পা শক্ত করে রাখো, ব্রেক কসবে। আমার বলা কথা আমাকেই ফিরিয়ে দেয় ছেলে। আমি হাসি। সাধারণত ফেরার পথেই ওর সাথে আলাপ জমে বেশি। যেদিন ওর গানের কাস থাকে আমি জিজ্ঞেস করি- আজকে কী গান শেখালো ওর টিচার? ও বলে- মামুনিয়া, মামুনিয়া...ওরে ও বিড়ালের ছানা...। আবার কোনোদিন বলে...আমরা করবো জয়...এধরনের গানের কথা। দুই প্রজন্মের মিলন হয় প্রতিদিন। ছেলে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে মাঝে মাঝে আমিও মনে মনে গাই...আমরা করবো জয় একদিন...
07.09.2006
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


