somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দুই প্রজন্ম

০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৬ রাত ১২:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

[গাঢ়]প্রজন্ম-এক[/গাঢ়]

আমার মা এখনও বেঁচে আছেন। বয়স সত্তর-এর কাছাকাছি। বাবা মারা গেছেন বছর সাত হলো। আমরা নয় ভাইবোন। মারা গেছে আরও তিন ভাইবোন। সে হিসেবে আমার মা গর্ভে ধারণ করেছেন সর্বমোট বারোজন সন্তান। আগের দিনের ব্যাপার। কী পরিমাণ ধৈর্য্য এবং সদিচ্ছা থাকলে এতোগুলো সন্তান লালন-পালন সম্ভব- এ যুগে তা কল্পনার অতীত! কিন্তু আমার মা-বাবা পেরেছেন। এবং তা ভালোভাবেই পেরেছেন। সন্তান মানুষ করার ক্ষেত্রে তাঁদের এতোটুকুও অবহেলা ছিলো না। মা-বাবার বেঁচে থাকা সন্তানদের মধ্যে আমি সপ্তম। এখন ঢাকায় থাকি।

মা অধিকাংশ সময় গ্রামেই থাকেন। মানে গ্রামই পছন্দ মা'র। সেখানে আমার তিন ভাই থাকে। বাদবাকিরা শহরে থাকে। জোড়াজুড়ি করে মাকে কাছে এনে রাখলেও বেশিদিন রাখতে পারি না। আবার চলে যান গ্রামে। একটু খোলামেলা জায়গা, কথাবলার মানুষ না হলে তাঁর চলে না। শহরে এসবের দারুণ অভাব। তাই অবসর পেলে আমিই মা'র সাথে গল্প করি। মাঝে মাঝে একটু নষ্টালজিক হয়ে যাই। আমার শৈশবের কথা শুনি। কী করতাম, কতোটুকু দুষ্টু ছিলাম- এইসব আর কী! মা-ও গুছিয়ে সুন্দর করে বলেন গল্প। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি।

একটু দুষ্টু ছিলাম বটে। তবে শৈশবের যে জিনিসটা আমাকে মুগ্ধ করে, তাহলো- আমি নাকি একটি বিশেষ গান গাইতাম সুন্দর করে। লোকেরা আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে সেই গান শুনতো- যদিও সব 'র' অর 'ল' উচ্চারণ করতাম আমি। মাকে জিজ্ঞেস করি- কী গান গাইতাম আমি? মা'র স্মৃতিশক্তি এখনও প্রখর। সে গানিটির ক'টি লাইন এরকম- ধান থুইয়া পাট বুনলাম/ বাইষ্যা আইলে তিল বুনলাম/ এবার বড়ো কুষ্টার আমদানি/ বাড়িত যাইয়া কমু আমি/ ভাত রাঁনছোনি সুন্দরী / তোমার জন্য খাইটা মরি../ ............................/ ভাত-ভুত রাঁনধুম কি/ খড়ি-জাবা ভিজলি/ এতো রাইতে ছাওয়ালের ঘ্যানঘেনি...। কী ছিলো গানটার সারমর্ম বাণী? তখন না বুঝলেও এখন কিছুটা বুঝে হাসি পায় মনে।

গানটির সবটুকু মা পারেন না। সুরে নয়, কবিতার মতো করে বলেন মা। তবু শুনতে মজা লাগে শুনতে। কারণ মনে পড়ে আমার শৈশব। মা আমাকে সাথে করে বাড়ির পাশের নদীতেই গোসল করতে যেতেন। তখনকার দিনে টিউবওয়েল বা পাতকুয়ার চল ছিলো না প্রতি বাড়িতে। খুব কাছের নদীতে গোসল করতো সবাই। আমি মা'র সাথে যেতাম। আমার বয়স পাঁচের মতো হবে। স্কুলে যাওয়া শুরু হয়নি তখনও। আমি পথের আশপাশ দেখতাম চোখ ভরে। মাঝে সোনাফলা ধানতে দেখে বলতাম- মা, লোয়া ধানে লং ধরছে, অহন পাকবো। ছোটো মুখে এরকম পাকা কথা শুনে মা হাসতো। মনে মনে তৃপ্ত হতো ছেলের বুদ্ধিদীপ্ততায়।

[গাঢ়]প্রজন্ম-দুই[/গাঢ়]

আমার ছেলের বয়সও পাঁচ। ছেলেকে দাদার বাড়ি দেখাতে নিয়ে যাই গ্রামে। খুব খুশি হয় সে তখন। শহরের বদ্ধ আবহাওয়া ছেড়ে গ্রামে গিয়ে মুক্ত বিহঙ্গের মতো ছটফট করে। সবকিছুই চষে বেড়ায় সে। সাথে খেলার সাথী আমার ছোটো ভাইয়ের মেয়ে জেমি। ওর চেয়ে চার-পাঁচ মাসের ছোটো। পুতুল পুতুল খেলা, ঘর-বাড়ি বানানো কতো কী খেলে! আমার ছেলে গাছ লাগায় তার খেলনা বাড়ির পাশে। গাছপালা লাগায়; আমের ডাল মাটিতে পুঁতে রাখে। সেটাই ওর ভষ্যিতের মহীরুহ। জেমি অভিযোগ করে বলে- চাচ্চু, জারিফ ভাইয়ার একটুও বুদ্ধি নাই; আমের ডালে কোনোদিন গাছ হয়? আমার ছেলে মুখ কালা করে আমার কাছে চলে আসে। আমি ছেলেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলি- না বাবা, আম গাছের ডালেও গাছ হয়। ছেলে খুব খুশি হয় তখন। আমি অবাক বিস্ময়ে দ্বিতীয় প্রজন্ম দেখি।

[গাঢ়]উপসংহার[/গাঢ়]

আমার ছেলে এখন স্কুলে যায়। পড়াশুনায় ছেলে বেশ মেধাবী। আমি স্কুলে দিয়ে আসি, নিয়ে আসি। আসা-যাওয়ার পথে ওর সাথে বন্ধু হয়ে যাই। ও আশপাশ দেখে। সারি সারি অট্টালিকা, রিক্সা, ঢেলাগাড়ি, কার, বাস এসব কিছু। রিক্সায় চলাফেরা করি। মাঝে মাঝে যানজট দেখে আমাকে সতর্ক করে- বাবা, পা শক্ত করে রাখো, ব্রেক কসবে। আমার বলা কথা আমাকেই ফিরিয়ে দেয় ছেলে। আমি হাসি। সাধারণত ফেরার পথেই ওর সাথে আলাপ জমে বেশি। যেদিন ওর গানের কাস থাকে আমি জিজ্ঞেস করি- আজকে কী গান শেখালো ওর টিচার? ও বলে- মামুনিয়া, মামুনিয়া...ওরে ও বিড়ালের ছানা...। আবার কোনোদিন বলে...আমরা করবো জয়...এধরনের গানের কথা। দুই প্রজন্মের মিলন হয় প্রতিদিন। ছেলে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে মাঝে মাঝে আমিও মনে মনে গাই...আমরা করবো জয় একদিন...

07.09.2006
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাতানো নির্বাচনে বিএনপিকে কিভাবে ক্ষমতায় বসানো হল-(১) অথচ দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনের পর চাওয়া ছিল একটি সুষ্ঠ নির্বাচন।

লিখেছেন তানভির জুমার, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:২১

১/ ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের ভিতরে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ। অর্থাৎ মানুষকে ফোন বাসায় রেখে আসতে হবে। কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার পক্ষপাতিত্ব করলে কেউ রেকর্ডও করতে পারবে না। কেন্দ্রে কোন অনিয়ম, জালভোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

শের

লিখেছেন এ.টি.এম.মোস্তফা কামাল, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:২৯


তিন শ' তিন
মুমিন তো নই, তবু খোদা টিকিয়ে রেখেছে!
প্রেমিক তো নই, তবু প্রেম বিকিয়ে রেখেছে!

তিন শ' চার

ভীষণ একাকী আমি, অপেক্ষায় কেটে যায় বেলা।
হতাশার মাঝে শুধু, পাশে আছে তার অবহেলা ! ...বাকিটুকু পড়ুন

কলেজ ও ভার্সিটির তরুণরা কেন ধর্মের দিকে ঝুঁকছে? করনীয় পথ নকশাটাই বা কী?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৩৬


ধর্মের দিকে ঝোঁকার মানচিত্র

অচেনা পথে হাঁটে আজ তরুণের দল
পরিচয়ের কুয়াশায় ঢেকে গেছে কাল
শিক্ষা, কর্ম, সম্পর্ক সবই আজ প্রশ্নবিদ্ধ
কোথায় জীবনের মানে মন দ্বিধাবদ্ধ।

এই দোলাচলে ধর্ম দেয় দৃঢ় পরিচয়
উদ্দেশ্য, শৃঙ্খলা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলাম কি নারী নেতৃত্ব বিরোধী?

লিখেছেন রাশিদুল ইসলাম লাবলু, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৩২



ইসলামে নারী নেতৃত্ব জায়েজ কিনা এ বিষয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠেছে। নারী নেতৃত্ব নিয়ে সংশয় মূলক বেশ কিছু পোষ্টও আমার চোখে পড়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামাত ক্ষমতায় এলে আমাদের যে বড় ক্ষতি হবে

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:৩২


জামাত ক্ষমতায় এলে আমাদের সমাজে যে বড় ক্ষতি ও ক্ষত তৈরি হবে, তার কিছু নমুনা ইতিমধ্যেই দেখা গেছে। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো তারা ক্ষমতায় এলে প্রথম দিনেই সংবিধান ছিঁড়ে ফেলবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×