
জামাত ক্ষমতায় এলে আমাদের সমাজে যে বড় ক্ষতি ও ক্ষত তৈরি হবে, তার কিছু নমুনা ইতিমধ্যেই দেখা গেছে। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো তারা ক্ষমতায় এলে প্রথম দিনেই সংবিধান ছিঁড়ে ফেলবে না বা জাতীয় পতাকা পোড়াবে না। কিন্তু নিচের খবরটি পড়ে মনে হল, আমার প্রত্যাশা আরেকটু কমিয়ে নিতে হবে।
ইবনে সিনা ফার্মা, যা জামাতের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত, সেখানে লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স পদের এক চাকরির বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে যে শুধুমাত্র "পুরুষ" এবং "প্র্যাকটিসিং মুসলিম" প্রার্থীরাই আবেদন করতে পারবেন। এমন বৈষম্যমূলক চাকরির আবেদনের নিয়ম বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের সাথে সাংঘর্ষিক। সংবিধান অনুসারে সকল নাগরিক আইনের সামনে সমান এবং লিঙ্গ ও ধর্মভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধ।
জামাত ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ভেঙে পড়বে। জামাতের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে আছে দেশকে ইসলামী শাসনতন্ত্র বা শরিয়া আদর্শে পরিচালনার নীতি। নাগরিকত্ব আর সমান অধিকারের ভিত্তিতে থাকবে না। তা নৈতিক ও ধর্মীয় যোগ্যতার প্রশ্নে রূপ নেবে। আইন, নীতি ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নাগরিক বা জনসম্মতির বদলে ধর্মীয় ব্যাখ্যার অধীনে চলে যাবে।
দ্বিতীয় পরিবর্তন আসবে নারীর অধিকার ও তাদের জীবিকায়। নারী অধিকারের প্রশ্নে জামাতের অবস্থান হলো, নারীর প্রধান জায়গা পরিবার ও ঘর। কর্মজীবি নারীদের গণিকা ইত্যাদি বলা এবং পরে চাপের মুখে অস্বীকার করার পরেও বার্তাটি স্পষ্ট। ক্ষমতায় গেলে এই বার্তাই রাষ্ট্রীয় নীতি হয়ে উঠবে। নারীর জীবনের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, পোশাক, চলাফেরা, কর্মক্ষেত্র - সবই তাদের নজরদারির অংশ হবে।
জামাত ক্ষমতায় গেলে সংখ্যালঘু, আদিবাসী থেকে শুরু করে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠের বাইরের ধর্ম-গোত্র-বর্ণের মানুষ, তারা সবাই প্রান্তিক হয়ে পড়বে। সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুভূতি, ইসলামী মূল্যবোধ - এই ধরনের ভাষা ব্যবহার করে এমন একটি আবহ তৈরি করা হবে, যেখানে রাষ্ট্র হবে একটি নির্দিষ্ট ধর্মবিশ্বাসী বা মতবাদের মানুষের। সংখ্যালঘু, আদিবাসী এবং অন্য বিশ্বাস বা মতবাদের মানুষের নিরাপত্তা শুধু কাগজেই থাকবে, বাস্তবে নয়।
জামাত বহুত্ববাদ, বৈচিত্র্য এবং বহু মতের সহাবস্থানকে স্বীকৃতি দেয় না। রাজনীতিকে তারা দেখে বিশেষ ধর্মীয় মতবাদ এবং বিভাজনের চোখে। যুক্তি, আলোচনা, সমালোচনা - এগুলো তাদের বিষয় নয়। তাদের মতে জনসম্মতি বা পাবলিক ওপিনিয়নের বিষয়গুলো সর্বজনগ্রাহ্য যুক্তি দিয়ে নয়, বিশ্বাস দিয়ে বিচার করতে হবে। অতএব, আপনি হয় বিশ্বাসী নয় বিভ্রান্ত। হয় মোমিন নাহলে নাস্তিক। ধর্ষকের সংজ্ঞা নিয়ে আপনার প্রশ্ন করার অধিকার নেই। প্রশ্ন হলো আপনি কি সেই সংজ্ঞায় বিশ্বাস করেন, কি করেন না। বিশ্বাস না করলে আপনি নাস্তিক। এখন আপনাকে হত্যা করা হবে নাকি দোররা মারা হবে, এটা তাদের বিবেচনা। লেখক, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, সবার জীবন ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। সমালোচনা ইসলামবিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত হবে। বই, নাটক, সিনেমা, গান, সবকিছুর ওপর সেন্সরশিপ বসবে।
গভীর ক্ষতিটা হবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে। জামাত কখনোই মুক্তিযুদ্ধে তাদের দায় স্বীকার করেনি। তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ভারতীয় ষড়যন্ত্র হিসেবে চালিয়ে দেয় বা পুনর্ব্যাখ্যা করে। ক্ষমতায় গেলে এটি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাবে। মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক ভিত্তি ঝাপসা হবে এবং ইতিহাস নতুনভাবে লেখা হবে।
জামাত ক্ষমতায় এলে রাজনীতির ভাষা বদলে যাবে। রাজনীতি হবে নৈতিকতার যুদ্ধ - সৎ বনাম অসৎ, মিত্র বনাম শত্রুর যুদ্ধ। ভিন্নমতকে শত্রুতে রূপ দেওয়া হবে, আর সমালোচনাকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হবে। ন্যায়সঙ্গত রাষ্ট্র মানুষকে এক ছাঁচে ফেলতে চায় না। বরং এমন নিয়ম তৈরি করে, যেখানে ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সবাই রাষ্ট্রকে নিজের বলে মানতে পারে। রাষ্ট্রের আইন এমন যুক্তির ওপর দাঁড়াতে হয়, যা সব নাগরিক, তাদের ধর্ম বা বিশ্বাস যাই হোক, গ্রহণ করতে পারে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হবে - আমরা তখন আর মানুষ থাকব না। আমাদেরকে নামিয়ে আনা হবে "কম মানুষ", "অল্প মানুষ", "ক্ষীণ মানুষ", "হীন মানুষ", "ক্ষুদ্র মানুষ", "নীচু মানুষ" ইত্যাদির পর্যায়ে। এমন অবস্থায় ভিন্ন মত, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, চিন্তা, বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক, সুষ্ঠু ও সুসংগত সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। মানবতা, উন্নত চিন্তা এবং মনুষ্যত্বের সঙ্গে আমাদের সংযোগ তখন ছিন্ন হয়ে যাবে।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১০:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

