১৬৭৮ সালে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র ঢাকার সুবেদার মুহাম্মদ আজম শাহ আওরঙ্গবাদ কেল্লা নামে একটি কেল্লার নির্মাণ কাজ শুরু করেন। ১৫ মাস নির্মাণ কাজ পরিচালনার পরে এটির কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই তিনি দিল্লিতে ফিরত যান। শায়েস্তা খান তাঁর পরিবর্তে বাংলার সুবেদার নিয়োগ পান। বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা এই সুবেদারের আমলেই বাংলা ভ্রমন করেন। সুবেদার শায়েস্তা খান কেল্লার নির্মাণ কাজ কিছুদূর আগানোর পরে ১৬৮৪ সালে তাঁর কন্যা দুখত পরী বিবি এখানে মৃত্যু বরণ করেন। পরী বিবি কে এখানে সমহিত করলেও এই কেল্লাটিকে অপয়া ভেবে এর নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখেন। এর পরে ১৭০৪ সালে মুর্শিদ কুলি খান বাংলার রাজধানী ঢাকা হতে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করলে কেল্লাটি পরিত্যাক্ত হয়। ১৮৪৪ সালে ঐ এলাকা আওরঙ্গবাদ থেকে লালবাগ নামে পরিচিত হলে কেল্লাটির নামও লালবাগ কেল্লা হয়ে যায়। অর্থাৎ লালবাগ কেল্লাটি প্রায় ৪৩৭ বছরের পুরনো স্থাপত্যই নয় এটি রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।
সম্প্রতি এই প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী কেল্লার দেয়ালের এক অংশ ভেঙে সেখানে গাড়ি পারকিং এর স্থাপনা করার উদ্যেগ গ্রহন করেই ক্ষান্ত হন নি দেওয়াল ভেঙ্গে পারকিং তৈরির কাজ ও শুরু করে দিয়েছেন। অথচ এমন ঐতিহাসিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনার স্থাপত্যশৈলীতে সামান্য পরিবর্তন করাও অনুচিত। ইউনস্কো এর বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার সংরক্ষণ এর সংজ্ঞা তে বলা আছে-
“Each State Party to this Convention recognizes that the duty of ensuring the identification, protection, conservation, presentation and transmission to future generations of the cultural and natural heritage referred to in Articles 1 and 2 and situated on its territory, belongs primarily to that State. It will do all it can to this end, to the utmost of its own resources and, where appropriate, with any international assistance and co-operation, in particular, financial, artistic, scientific and technical, which it may be able to obtain”.
যদিও লালবাগ কেল্লাটি বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকাতে নেই কিন্তু এটি তো আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য। তাহলে এই কেল্লার দেয়াল ভেঙ্গে এমন পারকিং করার যৌক্তিকতা কতটুকুন? ২৬ অক্টোবর ২০১১ তারিখে হাইকোর্ট থেকে এই কেল্লার ভিতর কিংবা বাইরের অবৈধ সকল স্থাপনা সরাতে সংশ্লিষ্ট করতিপক্ষকে নির্দেশ দেন তা সম্পূর্ণ পালন না করা হলেও এই আদেশ অমান্য করে ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে এখানে পারকিং তৈরি করতে উনাদের কোন অলসতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
আশ্চর্যজনক ভাবে এই ব্যাপারে নাগরিক সমাজের অনেকরই নিরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমাদের চেতনাবোধ কেমন যেন ভি আই পি কেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। গাড়ি পারকিং যেহেতু ভি আই পি দের জন্য সুবিধা বাড়াবে সেহেতু এই ব্যাপারে আমি নিশ্চুপ থাকি। এই রকম চেতনাবোধ যে একটি দেশ ও জাতীর জন্য হুমকি সরুপ। যদিও এই কেল্লা বাংলাতে মুসলিম শাসনের এক ঐতিহ্য যা অনেক চেতনাজিবি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি এর আগ্রাসন এর ফলাফল বলে চালিয়ে দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। যদিও তাদের চোখে অথর্ব অত্যাচারি শাসক লক্ষন সেন একজন অবিসংবাদিত নেতা যিনি তাঁর রাজ্য এবং প্রজাদের এই আগ্রাসন কারীর অনুসারী মাত্র ১৭ জন্য সৈন্যের ভয়ে অরক্ষিত রেখে পিছনের দরজা দিয়ে পালায়ন করেছিলেন। আশ্চর্যের ব্যাপার হল এই আগ্রাসন কারিকে কিন্তু তৎকালীন বাংলার জনগন সেন বংশের সম্রাটদের চেয়ে অনেক স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে মেনে নিয়েছিলেন।
যাই হোক এটি বাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা এবং এর অক্ষুণ্ণতা রক্ষা করা সকল বাঙ্গালিদের দায়িত্ব। এই অপরিনামদর্শী কাজের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলুন। অবিলম্বে বন্ধ করুন এই সকল আগ্রাসন তা না হলে এটি একটি উদাহরণ হিসেবে রয়ে যাবে যার ফলাফল অদূর ভবিষ্যতে আরও খারাপ হতে পারে। এই একটি উদাহরণ কে পুজি করে সকল ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাতে যে এমন অগ্রাসন হবে না এর নিশ্চায়তা কে দিবে? তাই এই হঠকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের শাস্তি প্রদান পূর্বক এই কাজ অবিলম্বে বন্ধ করুন।


অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


