somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কানসাট ডায়েরি 2

১৯ শে এপ্রিল, ২০০৬ ভোর ৬:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পেটের ভেতর যে সন্তানটিকে আগলে রেখেছে, কবিরণ জানে না সে সুস্থ্য আছে কি না। চিকিৎসকের কাছে যাওয়া হয় না টাকার অভাবে। 'কী আর হবে ওখানে গিয়ে', ছনের বেড়ায় ঘেরা ঘরে মাথা গুঁজে থাকা কবিরণের আঞ্চলিক ভাষায় এই প্রশ্ন যেনো তীরের মতো বেঁধে। তারপরেই তার তীক্ষ্ম কণ্ঠ নেমে যায়। যেনো কৈফিয়ত দিচ্ছে এমনভাবে ধরা গলায় কবিরণের আপে, 'অভাগাটা তো বাপকে কোনো জীবনেও দেখতে পাবে না।'
কী হয়েছে ওর বাবার? অন্য কোথাও হলে হয়তোবা প্রশ্নটা করেই জেনে নিতে হতো বিস্তারিত। কিন্তু তার আর প্রয়োজন হয় না কানসাটে। এখানে জনতা যেভাবে একাট্টা হয়ে আন্দোলন করেছে, তেমনি পুলিশের বুলেট বুকে নিয়ে জীবন উৎসর্গও করেছে দলবেঁধে। সবার মৃতু্যর ঘটনা অভিন্ন। শুধু ভিন্নতা দিন-তারিখ-সময়ে। শিবনগর কাইঠাপাড়ার কবিরণের স্বামী দিনমজুর আবদুল মান্নান মারা গেছেন 23 জানুয়ারি। 4 ছেলে তো ছিলোই। কবিরণের পেটে আরো এক সন্তানের অস্তিত্ব। কবিরণ জানে না, তার দিন চলবে কী করে। প্রতিবেশীরাই এখন তাকে নানাভাবে সাহায্য করছেন। কিন্তু এভাবে কতোদিন? কবিরণ মাথা উঁচু করেই রাখলেন প্রশ্নটা।
23 জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে কলাবাড়ীর দিনমজুর গরীবুল্লাহ, শিবনগরের আবু দাউদ ও গোপালনগরের রিকশাচালক আনারুলের পরিবারেরও দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়। গরীবুল্লার এক ছেলে এক মেয়ে। সপ্তম শ্রেণীর স্কুল ছাত্র ছেলে তরিকুলের মাথায় এখন ঘুরছে চিন্তা, কী করে পড়াশোনা চলবে দু'ভাইবোনের? দিনই বা কাটবে কেমন করে? এক বছরের পুত্র সন্তান নিয়ে শিবনগরের আবু দাউদের স্ত্রী বিউটির চোখেও হতাশা। গোপালনগরের আনারুলের স্ত্রী মৌসুমী 6 বছরের শিশুকন্যাটির দিকে তাকিয়ে আঞ্চলিক ভাষায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 'আমাদের নিয়ে কেউ কি ভাবছে?'
জায়গীরগ্রামের 11 বছরের শিশু আনোয়ার লাল-কালো শার্ট পরে 12 এপ্রিল বাইরে রাস্তায় খেলছিলো। পুলিশের ঘাতক বুলেট তাকেও ছাড়েনি। মা মনোয়ারা বেগম কথা বলেন না। বাবা মাইনুলের নিজের জমি নেই। অন্যের জমিতে ফসল ফলান। বাড়িতে বসে সেই লাল-কালো শার্ট বুকে ধরে কাঁদেন তিনি সারাদিন। যে যায় তাকেই দেখিয়ে বলেন, 'ওরা ক্যান মারলো?' দাদী আকলিমা খাতুন ঘটনার বর্ণনা দেয়া শেষে জানতে চাইলেন, 'মানুষের জীবনের দাম কি পাখির চেয়েও কম হয়ে গেছে?'
মানুষের জীবনের দাম এবং পাখি সংক্রান্ত এই প্রশ্নটি করতে করতেই 12 এপ্রিল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন শিবনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক আবদুর রহমান। স্কুল থেকে খনিতলা বিশ্বনাথপুর এলাকায় বাড়ি ফিরে বিকেলে পুলিশের সেই পাখির মতো গুলি করে মানুষ মারার দৃশ্য তিনি সহ্য করতে পারেননি। জানালা বন্ধ করার পর গুলির শব্দে হৃদরোগী আবদুর রহমান খাটে শুয়েই মারা যান। এক ছেলে এক মেয়ে তার। দু'জনই রাজশাহী পড়াশোনা করেন। স্ত্রী শামসুন্নাহার স্বামীর এ মৃতু্য কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। ঘুরে ফিরে বারবারই বলছেন, 'যদি 12 এপ্রিল পুলিশ তাণ্ডব না চালাতো তাহলে হয়তো মানুষটা আরো কিছুদিন বাঁচতো।' শামসুন্নাহার জানালেন, তার স্বামী আবদুর রহমান মারা যাবার আগে বারবার প্রশ্ন করছিলেন, ওরা এভাবে মানুষ মারছে কেনো। পুলিশের তাণ্ডবে অসুস্থ তিনি শুয়ে পড়েন বিছানায়। এরপর মৃতু্যর আগে তিনি থুথু ফেলতে চেয়েছিলেন। তার ছেলে আখতারুজ্জামান তার মাথাটা একটু উঁচু করে ধরলে তিনি পর পর দু'বার থুথু ফেলেন। এরপরেই নিথর হয়ে আসে তার দেহ। মৃতু্যর আগে তিনি কেনো, কাদের উদ্দেশ্যে থুথু ফেলেছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর আর জানা যাবে না। তবে তার স্ত্রী শাসুন্নাহার জানেন, যে রাষ্ট্রে পাখির মতো গুলি করে আইনরী বাহিনী মানুষ মারে সেই রাষ্ট্রে জন্ম নিয়ে নিজেকে দুর্ভাগা বলে আপে করতে করতেই মৃতু্য হয় স্কুল শিক আবদুর রহমানের। শামসুন্নাহার সমকালকে সে কথাটিই জানিয়ে দিলেন।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমি টুপ করে চলে আসবো

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:১৯


আমি হাসিনা। আমি আমার স্বামী ওয়াজেদ মিয়াকে কোনদিন স্বামীর মর্যাদা দেইনি। সে জ্ঞানী হলেও আমি সবসময় তাকে বাসার কাজের লোকের চেয়ে বেশি কিছু মনে করিনি। আমি সবসময় মৃণাল কান্তি... ...বাকিটুকু পড়ুন

রুবা

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮




রুবার সাথে আমার বিয়েটা ওঠ ছেড়ি তোর বিয়ের মতোই হয়েছে । একদম সাধারন কোনরকম অনুষ্ঠান নাই । সেইদিন অফিসে অনেক কাজ ছিলো । চোখে তারা ফারা দেখছিলাম । বসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রথম .........।

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৪


আন্ডারগ্রাউন্ড শোতে এটাই আমার প্রথম ড্রামস বাজানোর একটা মুহূর্ত।

কিছু গল্প আসলে পরিকল্পনা করে শুরু হয় না।কিছু গল্প হঠাৎ করে একটা মুহূর্ত থেকে জন্ম নেয় আর তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সমুদ্রের নীল খাম

লিখেছেন ডি এইচ তুহিন, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪২


এই শহরে থাকি প্রায় সাতাশ-আটাশ বছর ধরে। তিন প্রেমিকার মায়া ছেড়ে যাওয়া যায় না এমন এক অদ্ভুত সুন্দর এই শহর। যার এক হাতে নদী, অন্য হাতে সমুদ্র, আর কপালে জায়গা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী দুঃশাসনের পতন অনিবার্য ছিল, জুলাই তো স্রেফ উছিলা মাত্র!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮



জুলাই নিয়ে অনেক বিতর্ক, সমালোচনা আছে। কিন্তু, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে জুলাই গণঅভ্যূত্থান না হলে আমরা দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পেতাম না। জুলাই ঘিরে যত বিতর্ক, সমালোচনাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×