কী হয়েছে ওর বাবার? অন্য কোথাও হলে হয়তোবা প্রশ্নটা করেই জেনে নিতে হতো বিস্তারিত। কিন্তু তার আর প্রয়োজন হয় না কানসাটে। এখানে জনতা যেভাবে একাট্টা হয়ে আন্দোলন করেছে, তেমনি পুলিশের বুলেট বুকে নিয়ে জীবন উৎসর্গও করেছে দলবেঁধে। সবার মৃতু্যর ঘটনা অভিন্ন। শুধু ভিন্নতা দিন-তারিখ-সময়ে। শিবনগর কাইঠাপাড়ার কবিরণের স্বামী দিনমজুর আবদুল মান্নান মারা গেছেন 23 জানুয়ারি। 4 ছেলে তো ছিলোই। কবিরণের পেটে আরো এক সন্তানের অস্তিত্ব। কবিরণ জানে না, তার দিন চলবে কী করে। প্রতিবেশীরাই এখন তাকে নানাভাবে সাহায্য করছেন। কিন্তু এভাবে কতোদিন? কবিরণ মাথা উঁচু করেই রাখলেন প্রশ্নটা।
23 জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে কলাবাড়ীর দিনমজুর গরীবুল্লাহ, শিবনগরের আবু দাউদ ও গোপালনগরের রিকশাচালক আনারুলের পরিবারেরও দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়। গরীবুল্লার এক ছেলে এক মেয়ে। সপ্তম শ্রেণীর স্কুল ছাত্র ছেলে তরিকুলের মাথায় এখন ঘুরছে চিন্তা, কী করে পড়াশোনা চলবে দু'ভাইবোনের? দিনই বা কাটবে কেমন করে? এক বছরের পুত্র সন্তান নিয়ে শিবনগরের আবু দাউদের স্ত্রী বিউটির চোখেও হতাশা। গোপালনগরের আনারুলের স্ত্রী মৌসুমী 6 বছরের শিশুকন্যাটির দিকে তাকিয়ে আঞ্চলিক ভাষায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 'আমাদের নিয়ে কেউ কি ভাবছে?'
জায়গীরগ্রামের 11 বছরের শিশু আনোয়ার লাল-কালো শার্ট পরে 12 এপ্রিল বাইরে রাস্তায় খেলছিলো। পুলিশের ঘাতক বুলেট তাকেও ছাড়েনি। মা মনোয়ারা বেগম কথা বলেন না। বাবা মাইনুলের নিজের জমি নেই। অন্যের জমিতে ফসল ফলান। বাড়িতে বসে সেই লাল-কালো শার্ট বুকে ধরে কাঁদেন তিনি সারাদিন। যে যায় তাকেই দেখিয়ে বলেন, 'ওরা ক্যান মারলো?' দাদী আকলিমা খাতুন ঘটনার বর্ণনা দেয়া শেষে জানতে চাইলেন, 'মানুষের জীবনের দাম কি পাখির চেয়েও কম হয়ে গেছে?'
মানুষের জীবনের দাম এবং পাখি সংক্রান্ত এই প্রশ্নটি করতে করতেই 12 এপ্রিল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন শিবনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক আবদুর রহমান। স্কুল থেকে খনিতলা বিশ্বনাথপুর এলাকায় বাড়ি ফিরে বিকেলে পুলিশের সেই পাখির মতো গুলি করে মানুষ মারার দৃশ্য তিনি সহ্য করতে পারেননি। জানালা বন্ধ করার পর গুলির শব্দে হৃদরোগী আবদুর রহমান খাটে শুয়েই মারা যান। এক ছেলে এক মেয়ে তার। দু'জনই রাজশাহী পড়াশোনা করেন। স্ত্রী শামসুন্নাহার স্বামীর এ মৃতু্য কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। ঘুরে ফিরে বারবারই বলছেন, 'যদি 12 এপ্রিল পুলিশ তাণ্ডব না চালাতো তাহলে হয়তো মানুষটা আরো কিছুদিন বাঁচতো।' শামসুন্নাহার জানালেন, তার স্বামী আবদুর রহমান মারা যাবার আগে বারবার প্রশ্ন করছিলেন, ওরা এভাবে মানুষ মারছে কেনো। পুলিশের তাণ্ডবে অসুস্থ তিনি শুয়ে পড়েন বিছানায়। এরপর মৃতু্যর আগে তিনি থুথু ফেলতে চেয়েছিলেন। তার ছেলে আখতারুজ্জামান তার মাথাটা একটু উঁচু করে ধরলে তিনি পর পর দু'বার থুথু ফেলেন। এরপরেই নিথর হয়ে আসে তার দেহ। মৃতু্যর আগে তিনি কেনো, কাদের উদ্দেশ্যে থুথু ফেলেছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর আর জানা যাবে না। তবে তার স্ত্রী শাসুন্নাহার জানেন, যে রাষ্ট্রে পাখির মতো গুলি করে আইনরী বাহিনী মানুষ মারে সেই রাষ্ট্রে জন্ম নিয়ে নিজেকে দুর্ভাগা বলে আপে করতে করতেই মৃতু্য হয় স্কুল শিক আবদুর রহমানের। শামসুন্নাহার সমকালকে সে কথাটিই জানিয়ে দিলেন।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



