somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রিয়েল এস্টেট শোনে কি কখনো মেঘমল্লার

১৫ ই আগস্ট, ২০২২ রাত ১২:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১.
এই না হলে বৃষ্টি !
চায়ের দোকানে গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ভাবছি। মাঝে মাঝে বাতাসে জলের ঝাপ্টা গায়ে লাগছে। শীতল একটা অনুভূতি খেলে যাচ্ছে শরীরে। ভালো লাগছে। আসে পাশে সবার মধ্যে কেমন যেন তাড়াহুড়ো , সবাই ব্যস্ত। একফোঁটা বৃষ্টি কেউ যেন শরীরে পড়তে দিতে চায় না অথচ একটা সময়ে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ছুটে বেড়িয়েছে প্রান্তরে, লাথি দিয়েছে ফুটবলে। অদ্ভুত, সময় খুব দ্রুতই পাল্টে যায়।বৃষ্টি এড়াতে সবাই খুঁজছে মাথা গোঁজার ঠাঁই। ছাতায় ছাতায় বৃষ্টি বরণ করছে। তবে আমার মধ্যে কোন ব্যস্ততা নেই , নেই কোন তাড়াহুড়ো। পরম আয়েশে তৃপ্ত চুমুক পড়ছে চায়ের কাপে , আবেশে চোখ বুঁজে আসছে যেন। আমি দাঁড়িয়ে আছি ভীড় থেকে একটু ফাঁকে। যেখানে আরাম করে সিগারেট টানতে টানতে একটু ভাবা যায়।দোকানটা বেশ বড়। সবাই আশ্রয় খুঁজছে আসে পাশে। আশা করা যায় , খুব শিগ্রী দোকানে দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়া যাবে না এবং আমার নিবিড়ির ভাবনার সমাপ্তি ঘটবে।
“দেখি একটু সাইড দেন তো !”
চেয়ে দেখি কাক ভেজা এক তরুণী সাইড চাইছে । সাইড দেবো কিনা ভাবতে ভাবতে তাকালাম।
কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখ ফেরাতে পারলাম না। কাক ভেজা তরুণীও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হলো কয়েক যুগ কেটে গেছে । গ্রীষ্ম , বর্ষা , শরৎ শেষে শীতে পাতা ঝরা ডালে দেখা দিলো সবুজের সম্ভার। নাহ , আমি ইদানিং বেশি আশা রাখি না।জানি বৃষ্টি থামলেই এই মায়া কেটে যাবে। আকাশের কালো মেঘ গুলো সরে দেখা দেবে নতুন আলো , ঝলকানি দেবে রোদ। । আমি চায়ের কাপটা দোকানির দিকে বাড়িয়ে দেই। বৃষ্টি থেমে গেছে। ফিরে যাচ্ছে যে যার গন্তব্যে। আবার ব্যস্ততা , আবার তাড়াহুড়ো। কাক ভেজা তরুণী চলে যাচ্ছে। একবারো ফিরে না তাকিয়ে ।আমি তাকিয়ে থাকি। আমার কোন তাড়াহুড়ো নেই , নেই কোন ব্যস্ততা। আরেকটা সিগারেট জ্বালিয়ে আকাশের দিকে তাকায়। আকাশে সাদা মেঘের বিচরণ বেড়ে গেছে। তাদের মধ্যেও যেন অদ্ভুত ব্যস্ততা ।


২.
মামা , হুড টা নামিয়ে দেন !
আমি মুখ কাচুমাচু করে তোমার পাশের সিটে বসে থাকি।আমার শরীরে অসুখ , বৃষ্টির পানি মাথায় পড়লে নিশ্চয় ঠান্ডা লাগবে। তারপর সর্দি আর খক খক কাশি। এই ঠান্ডা , সর্দি , কাশি নিয়ে আমার একটা ছড়া আছে।

“মুখ খিঁচিয়ে নাক উঁচিয়ে
দিচ্ছি হ্যাঁচচ্চো হাঁচি
একটু পরেই আসবে বোধহয়
খকর খকর কাশি!”

-- আরে , ভিজে যাবো তো !
-- ভেজার জন্যই হুড নামাতে বললাম।
-- জানোনা , আমার শরীরে অসুখ।
-- ওই অসুখ সেরে যাবে।
-- যদি না সারে ?
-- আরে , সারবে সারবে। আমি আজ ভিজবোই , দেখছো না আমি আজ নীল শাড়ী পরে এসেছি।

বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটা তুমি ধরার চেষ্টা করছো। ছিটিয়ে দিচ্ছ আমার গায়ে। আমি আলোড়িত হয়। ইচ্ছে হচ্ছে ট্রাফিক সিগন্যালে লাল বাতি জ্বালিয়ে সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে দিই। রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে দুজনে ভিজি। রাস্তার পাশের ফুল বিক্রেতা মেয়ে গুলো বাড়িয়ে দেবে বকুল ফুলের মালা। গন্ধ নিবো আর ভিজব , বকুল ফুলের মালা তুলে দেব তোমার খোঁপায়। আমার শরীরে অসুখ , সে অসুখ আজ সেরে যাবে।
আমি তোমার উচ্ছলতা উপভোগ করছি। উপভোগ করছি পুরো পরিবেশ। আসে পাশের মানুষের কপট কথাবার্তা আমার কানে আসছে না। শুধু আমাদের হৃদয়ের ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ টুকু , সুবাস ছড়ায় হৃদয় থেকে অন্য কারো হৃদয়ে।

৩.
এই যা !
আবার বৃষ্টি চলে এলো।আবহাওয়ার মর্জি বোঝা মুশকিল । এই বৃষ্টি এই রোদ। আমি আসেপাশে তাকায় , চোখ খুঁজে ফেরে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ঠিক করলাম একদৌড়ে রাস্তার পার হব। নিউ মার্কেটের গেটের নিচে দাঁড়ালে আপাতত রক্ষা পাওয়া যাবে। এক দৌড়ে এসে দাঁড়ায় নিউ মার্কেটের গেটের সামনে । চারিদিকে কোলাহল বাড়ছে , বাড়ছে যানবাহনের চঞ্চলতা। ভেপু বাজিয়ে ছুটে চলেছে আজিমপুর টু মিরপুরের সিটিং সার্ভিস। বৃষ্টি ব্যস্ততা বাড়ায় , চঞ্চলতা বাড়ায় বহুগুনে।

হটাৎ আমার শরীরটা কেমন যেন নিথর হয়ে গেল, সব কিছু স্থবির হয়ে গেলো , স্তব্ধ হয়ে গেলো চারিপাশ। যানবাহনের হর্ন নিমেষেই হয়ে গেলো নীরব। নিউমার্কেট গেটটার ছাউনির নিচে তুমি দাঁড়িয়ে আছো। তাকিয়ে আছো আমার দিকে। ভাবলাম চোখ সরিয়ে নেবো । তবে কেন জানি সম্ভব হলো না। বৃষ্টি বাড়ছে। ভিজিয়ে দিচ্ছে পুরো শরীর , চুল , চোখ , আপাদমস্তক, হৃদয়। দূরে দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করি তোমার চোখের গভীরতা।

আচমকা পুরোনো অনুভূতি গুলো তরল হয়ে আমার চোখে জমা হতে থাকে। সেটা বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ার আগেই নিজেকে সংবরণ করি। বহুকাল আগে বলাকা সিনেমা হলের সামনে থেকে যে ভুল বাস ধরে ছিলাম , যে বাস পৌঁছে দিয়েছিলো ভুল কোন গন্তব্য। আজ আর ভুল করতে চাই না। আজিমপুর টু মিরপুরগামী সিটিং সার্ভিস হর্ন দেয় , আমি ফিরে চলি নিজ গন্তব্যে। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে। দুয়েক পা এগিয়ে তুমিও ভিজতে থাকো।ভিজতে থাকে কান্নার এ শহর! ঝাপসা এ শহর।

৪.
পুরোপুরি কর্পোরেট ড্রেসে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে ইতস্ততবোধ করছি । তারপরে লাগামহীন বৃষ্টি। অফিস থেকে আগে হয়েও আটকে গেলাম। ঠাঁই নিয়েছি ফুটওভার ব্রীজের ছাউনিতে। অন্য সময় এই বৃষ্টি উপভোগ্য ছিল। আজ বরং বিরক্ত লাগছে। কখন বৃষ্টি থামবে সে আশায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছি। বৃষ্টি থামার কোন নাম নেই। একটু হেঁটে যে এগুবো, প্যাঁচপ্যাচে কাদা ছিটকে পড়বে প্যান্টে। আগে এই প্যাঁচপ্যাচে কাদায় দাপিয়ে বেড়িয়েছি। তখন ছিটকে গায়ে কাদা লাগার কোন ভয় ছিলো না। বৃষ্টির দিন গুনতাম আর এখন কখন যে বৃষ্টি আসে আর বৃষ্টি যায় টেরই পাইনা। আচ্ছা ঢাকা শহর কি বড় বেশি যান্ত্রিক হয়ে গেছে? এই যে রিয়েল এস্টেট কোম্পানি গুলো বড় বড় দালান তুলছে তাদের কি কখনো হা করে বৃষ্টির ফোঁটা মুখে নেয়ার কথা মনে পড়ে। কিংবা যারা ঐ বড় বড় দালানের বাসিন্দারা, তাদের বুক শেলফে কি গীতবিতান শোভা পায় ? কংক্রিটের দালান কোঠায় বৃষ্টি ঝরে পড়লেও মাটির গন্ধ পাওয়া যায় না। রিয়েল এস্টেট তো কখনো মেঘমল্লার শোনে না।

বৃষ্টির গতি বাড়ছে। সেই সাথে মেঘের গান। অদ্ভুত তো ! হঠাৎ করে মেঘের গর্জনকে মেঘের গান মনে হচ্ছে কেন? আচ্ছা ফুল হাতে রাস্তায় নেমে পড়লে কেমন হয়? প্যান্ট শার্ট কি নষ্ট হয়ে যাবে?

বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ফুল হাতে হেঁটে যাচ্ছি। এই ব্যস্ত শহরে কেউ কারো দিকে তাকায় না। তবুও মনে হচ্ছে অনেকেই তাকিয়ে আছে।
সামনের ছাউনিতে আমার মানবী দাঁড়িয়ে আছে। আমি শুধু তাকে গিয়ে বলবো, ভিজবা?


----
এই লেখাটা এর আগে পোষ্ট করা হয়েছিল। আগের পোষ্টটাকে পরিমার্জিত এবং সংযোজিত করে পূরনায় পোষ্ট করা হলো। ছবি গুলো ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা।

শিরোনামঃ কবীর সুমন





সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই আগস্ট, ২০২২ সকাল ৯:৩১
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্বাসী মানব মনের উপর বিশুদ্ধ ও স্পষ্ট উচ্চারণে ক্বোরান পাঠের ঐশ্বরিক প্রভাব

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:০৯

আমি গত প্রায় ১৮ বছর যাবত আমার বর্তমান এলাকায় বসবাস করছি। স্থানীয় মাসজিদটি আমার বাসা থেকে প্রায় চার মিনিটের মত হাঁটা পথে অবস্থিত বিধায় চেষ্টা থাকে দিনে যতবার সম্ভব, মাসজিদে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেঁচে আছি, বেঁচে আছি!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩



নতুন জেনারেশনের জ্ঞানগরিমায় যুগপৎ মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়ে নিজেকে মনে হয় নিতান্তই জেনারেল!
তাহারা কতকিছু যে জানে, জানে না তাহারা যে জানে! তাবৎ দুনিয়ার খবর তাহাদের তালুর চিপায় নিদ্রামগ্ন!... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিসাব চোকানো - হরমুজ এবং মার্কিন আধিপত্যের অবসান

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:৪১


ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ইতিহাসে বিরল ও প্রভাবশালী ঘটনাগুলোর একটি। দীর্ঘদিন আমেরিকা ও তার মিত্ররা ইরানের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়ে রেখেছে। হরমুজ প্রণালীকে অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ ২০২৪: অস্থিরতার অন্তরালে কী ছিল? লেখকীয় বিশ্লেষণ | সমসাময়িক রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:৩৫

ছবি

বাংলাদেশে ২০২৪: ক্ষমতার পালাবদল নাকি গোপন সমন্বিত পরিকল্পনা?

২০২৪ সালের আগস্ট- বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অস্থির ও বিতর্কিত অধ্যায়। ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে অনেকের কাছে এটি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি র‍্যাপ সং কীভাবে সপ্তম শ্রেণীর বইয়ের কবিতা হলো ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:২৭


আজকে জুলাই আন্দোলনের একটা কবিতা পাঠ করলাম যেটা পড়ে মাথা হ্যাং হয়ে গেছে। এই কবিতা নাকি সপ্তম শ্রেণীর ‘সপ্তবর্ণা’ বইতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কবিতার নাম ‘সিঁথি’, লেখক হাসান... ...বাকিটুকু পড়ুন

×