somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কবিতার পাঠক

২৮ শে নভেম্বর, ২০১৭ রাত ৯:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




সেদিন বরষা ঝরঝর ঝরে,
কহিল কবির স্ত্রী-
‘রাশি রাশি মিল করিয়াছো জড়ো,
রচিতেছো বসি পূঁথি বড়ো বড়ো,
মাথার উপরে বাড়ি পড়ো পড়ো
তার খোঁজ রাখ কি!

কাব্যচর্চার সাথে মাথার উপর বাড়ি পড়ো পড়ো’র এই সম্পর্ক বাংলার সমাজ সংস্কৃতির ইতিহাসে এক শাশ্বত সত্য। সেকথা বাঙালি মাত্রেই আমরা জানি। কোন বিখ্যাত কবিই শুধুমাত্র বিশুদ্ধ কাব্যচর্চা করে দুবেলা গ্রাসচ্ছাদনের সুরাহা করতে পারেন নি। তাকে হয় সাহিত্যের অন্যান্য শাখাতেও কলম চালাতে হয়েছে, কিংবা অন্য কোন পেশার সাথে সংযুক্ত থেকেই কাব্যচর্চার পরিসরটিকে সজীব রাখতে হয়েছে। এটাই বাংলার কাব্যচর্চার মাহাত্য। আর এইখানেই সমান্য একটি প্রশ্ন জাগে। সাধারণ ভাবেই সবাই বলে থাকেন বাঙালি কবিতা প্রিয় জাতি। তবে তো বলতেই হয় তাহলে সেই কবিতা প্রিয় জাতির কবিদের মাথার ওপর বাড়ি পড়ো পড়ো হয় কি করে?

সত্যই কি বাঙালি কবিতাপ্রিয় জাতি? আচ্ছা বেশ না হয় ধরেই নেওয়া গেল, আমরা সত্যিই কবিতা প্রিয় জাতি। তাহলে আসুন, একটি সামান্য প্রশ্নই বরং করা যাক পরস্পরকে। গত এক বছরে কয়টি কবিতার বই কিনেছেন আপনি? কিংবা প্রশ্নটি যদি করি আমরা নিজেদেরকেই? প্রত্যেকে। কয়টি কবিতার বই কিনেছি আমি গত এক বছরে? গত এক বছরে আমাদের মোট বিনোনদন ব্যায়ের অনুপাতে কবিতার বইয়ের পেছনে করা খরচের পরিমাণটি ঠিক কতো? অনেকই হয়তো হাসবেন। এ কিরকম যুক্তি। অনেকেই হয়তো তর্ক করবেন কবিতার সাথে বিনোদনের তুলনা? না কবিতার সাথে বিনোদনের তুলনা নয় আদৌ। আমাদের বাৎসরিক বিনোদন ব্যায়ের পরিমাণ দিয়েই আমাদের আর্থিক সামর্থ্যের একটি ধারণা করা সম্ভব। সেই সামর্থ্যের প্রেক্ষিতেই কবিতার বইয়ের পেছনে কতটা ব্যয় করি আমরা সারা বছর? আসল হিসেবটা ঠিক এইখানেই। সেটা অর্থ ব্যায়ের বা আর্থিক সামর্থ্যের হিসাব নয়। সেটাই আমাদের প্রকৃত কাব্যপ্রেমের হিসাব।

না হিসাবের কোন গোলমাল নেই এখানে। এই হিসাবের উপরেই বাংলার কবিদের আর্থিক অবস্থা নির্ভরশীল। অর্থাৎ যিনি শুধু কাব্যচর্চা করেই গ্রাসাচ্ছাদনের প্রচেষ্টায় সাধনারত। কিংবা যিনি সেই গ্রাসাচ্ছাদনের কারণেই কাব্যচর্চার পাশাপাশি অন্য পেশায় নিযুক্ত হতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন কবিতা লেখা ও কাব্যচর্চার সাথে অন্যান্য পেশায় সংয়ুক্ত থাকার মধ্যে তো কোন বিরোধ নেই। আর থাকবেই বা কেন? না বন্ধু বিষয়টি বিরোধ থাকা কিংবা না থাকা নিয়ে নয়। একজন পেশাদের মানুষ ডাক্তার উকিল কারিগর অধ্যাপক আধিকারিক, ব্যবসায়ী কাউকেই কিন্তু গ্রাসাচ্ছাদনের উদ্দেশ্যে তার নিজস্ব পারদর্শীতার কাজটির বাইরেও অন্য পেশায় সংযুক্ত থাকতে হয় না। কিন্তু একজন কবিকে হয়। যিনি সত্যই কবি। তাকে একটু সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকতে গেলে কাব্যচর্চার পাশাপাশি অন্য কোন না কোন পেশায় নিযুক্ত থাকতে হয়। বিশ্বকবিকেও থাকতে হয়েছিল। পারিবারিক জমিদারীতে। নজরুলকে গ্রামোফোন কোম্পানীতে। জীবনানন্দকে অধ্যাপনায়।

কারণ সেই আমাদের কাব্যপ্রেম। সারাবছর যে কয়টি কবিতার বই কিনি আমরা, সেই পরিমাণটির উপরেই বাংলার কবিদের ভাগ্য দুলতে থাকে। কেউ কেউ বলতেই পারেন কবিতার বই কেনার উপরেই কি শুধু কাব্যপ্রেম নির্ভর করে? বুদ্ধদেব বসুর সেই অমোঘ গল্পের মামীমার মতো অনেকেই কি নাই, যিনি দেওয়ালের রঙের সাথে মিলিয়ে কাব্যসম্ভার কিনে থাকেন গৃহসজ্জার নিমিত্তে। থাকলেও সেটাই তো সব নয়। আছেন নিশ্চয়ই। কিন্তু সেই সংখ্যাটিও এতই কম যে তাতেও কবিদের ভাগ্য খোলে না। তাহলে কবিতার বই কেনা আর না কেনার উপরেও তো নির্ভরশীল নয় আমাদের কাব্যপ্রেম। বলতে পারেন অনেকেই। একটু ভেবে দেখলেই আমরা দেখতে পাবো, আমরা নিত্যদিনের প্রয়োজনের বাইরেও সেই সব বিষয়েই বেশি খরচ করে থাকি, যে বিষয়ে আমাদের ভালোবাসা ও টান যত বেশি ও তীব্র। আর দুঃখের বিষয় সেইখানেই কবি ও কবিতা আমাদের জীবনে আজো ব্রাত্যই মূলত। তাই এই বছর কয়টি কবিতার বই কিনলেন আপনি জানতে চাইলে আমরা প্রত্যকেই বিব্রত বোধ করি। আমাদের কাব্যপ্রেমের বিষয়ে অধিক ব্যাখ্যা তাই নিষ্প্রয়জন।

তাহলে এই যে বিশাল লিটলম্যাগাজিনের সম্ভার এপার ওপার দুপার বাংলায়, আর রাশি রাশি কাব্যসংকলন? হ্যাঁ সেও সত্য। শুধু তাই নয়, অন্তর্জাল দুনিয়া জুড়ে বাংলা কবিতার আছড়ে পড়া সুনামির কথাও সমান সত্য। এই বিপুল কাব্যচর্চাই মূলত কবিদের পারস্পরিক পিঠচাপড়ানি শুধু। বৃহত্তর জনসাধারণের প্রতিদিনের জীবনের সাথে যার সংযোগ খুবই ক্ষীণ। বা আরও স্পষ্ট করে বললে বলা চলে কোন সংযোগই নেইই প্রায়। জীবনানন্দ সাবধান করে দিয়েছিলেন বহু আগেই। সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি। আর আজকে অন্তর্জালকে কেন্দ্র করে সকলেই কবি। কেউ কেউ নয়। একদিক দিয়ে মনে হতেই পারে, এই তো আমাদের কাব্যপ্রেমের অকাট্য প্রামাণ। কে বলে আমরা কবিতা ভালোবাসি না? বাসি তো। সে যখন নিজে দুপাতা কবিতা লিখে ফেলি তখনই। কিন্তু তখনো কি আমরা অন্যের কবিতা পাঠেও সমান আগ্রহী? যতটা আগ্রহী নিজের দুলাইন কবিতা জনেজনে অন্যদেরকে ডেকে শুনাতে? অন্তর্জালকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিপুল পরিমানে ওয়েবপত্রের সম্পাদক মাত্রেই জানেন, কবি মাত্রেই তাঁর ওয়ালে তাঁর প্রকাশিত কবিতার লিংকই কেবল পছন্দ করেন। অন্য কবির কবিতার লিংক কেউই বিশেষ সুনজরে দেখেন না। আর যার যত বেশি বন্ধুবৃত্ত, তার কবিতাতেই তত বেশি লাইক ও কমেন্ট। এবং সেই কমেন্টের বহরেই বাংলা কবিতার পাঠকের কাব্যবোধের দৌড় বোঝা যায় সুস্পষ্ট ভাবেই। আরও একটু লক্ষ্য করলে এটাও দেখা যায়, আমরা নিজ বন্ধুবৃত্তের বাইরের কারুর কবিতা পড়তে আদৌ আগ্রহী নই মোটেই। অর্থাৎ অন্তর্জালকেন্দ্রিক কাব্যচর্চার পরিসরে য়েখানে কবিতা পড়তে অর্থ ব্যায়ের বাধ্যবাধকতাও বিশেষ নাই, সেখানেও আমাদের কবিতা পড়ার আগ্রহ মূলত কোন বন্ধুর সাথে কতটা নিবিড় সম্পর্ক, ঠিক তার উপরেই।

বাংলা কবিতার পাঠক কারা? যারা নিজে কবিতা লেখেন বা লেখার চেষ্টা করেন তারাই তো! তাদের বাইরে নিখাদ কাব্যপ্রেমিক কবিতার পাঠক যৎসামান্যই। আর সেটাই বাংলা কবিতার কবিদের দুর্ভাগ্যের মূল কারণ। আজকের এই অন্তর্জাল বিপ্লবকে কেন্দ্র করে যেখানে আমরা সবাই কবি আমাদের এই নেটের রাজত্বে- সেখানেও কবির তুলনায় পাঠক যৎসামান্য। আর সেটাও বোঝা যায়, অন্তর্জালে প্রকাশিত কবিতার মন্তব্যগুলির সঠিক পর্যালোচনায়। বেশিরভাগ মন্তব্যই কবির সাথে ব্যক্তিগত বন্ধুত্যের কৃতজ্ঞতার প্রকাশ মাত্র। তার সাথে কবিতা বা কাব্যচর্চার কোন সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ফলে আমাদের কবিতা লেখা ও পড়ার থেকে সাহিত্য রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। যে কোন ভাষার সাহিত্যের পক্ষেই সেটা আশার কথা নয়। আশংকার বিষয়। আর সেই সময়েই একটি জাতির সাহিত্য কেবলই ঘুরপাক খেতে থাকে তার নিজ আত্মশ্লাঘার বৃত্তেই। কবিযশপ্রার্থীর বাসনাকে কেন্দ্র করেই মূলত। বিশেষ করে আজকের অন্তর্জাল কেন্দ্রিক কাব্যচর্চার এইটাই মূল বাস্তবতা তবু সেটাই কিন্তু শেষ কথা নয়।

আমাদের কাব্যপ্রেমের এই দিগন্তে তবু কিছু মানুষ তাঁদের নিরলস সাধনায় প্রকৃত কবিতার পাঠক গড়ে তোলার প্রয়াসে যুদ্ধ করে চলেছেন নিরন্তর। কেউ পকেটের অর্থ ব্যায় করে লিটলম্যাগাজিনের পরিসরে। কেউ বা ইনটারনেটের মাশুল গুনে অন্তর্জালকে কেন্দ্র করে। বস্তুত তাঁদের সাধনার দিপশিখাতেই যেটুকু আলো দেখা যায় সুদূর আগামীতে, ততটুকুই আশার কথা বলা যেতে পারে মাত্র।

শ্রীশুভ্র

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জানুয়ারি, ২০১৮ রাত ৯:৪১
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ফাইজারের ভ্যাকসিন ব্যাবহারে যুক্তরাজ্য অনুমোদন দিলো

লিখেছেন শাহ আজিজ, ০২ রা ডিসেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:৫১


ভ্যাক্সিনের ফ্রিজার যাতে থারমাল বক্স আছে এবং তা নরমাল ফ্রিজে পাঁচদিন ভাল থাকবে । ভ্যাক্সিনের সেকেন্ড ডোজের ৮দিন বাদে একজন মানুষ নিরাপদ।



... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের দিনটা মানব সভ্যতার একটি ঐতিহাসিক দিন।

লিখেছেন চাঁদগাজী, ০২ রা ডিসেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:৩৯



আজকের দিনটি মানুষের জ্ঞান, বিজ্ঞান, টেকনোলোজীর আরেকটি মাইলষ্টোন।

আজকের দিনটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক দিন; মানব জাতি এই ১ম'বার এতো কম সময়ে ভয়ংকর কোন ভাইরাসের ভ্যাকসিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

হারামকে হারাম জানাই এখন চ্যালেঞ্জ।

লিখেছেন অধীতি, ০২ রা ডিসেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:২৬

রাজনৈতিক স্বার্থে ইসলামকে ব্যবহার করার ফলে একজন ইমানদার মুসলিমের যে পরিমান ক্ষতিসাধন এবং জাতি যে পরিমান ইসলামি আকিদা,বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত হয় তা এখন চাক্ষুষ বিষয়।

এতদিন সবাই জানতো, সেটা ভাস্কর্য অথবা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কালচার করা মাংসের অনুমোদন দিল সিংগাপুর

লিখেছেন মুজিব রহমান, ০২ রা ডিসেম্বর, ২০২০ রাত ১০:২২


সিংগাপুরের মানুষ এখন কালচার করা মুরগির নাগেট খেতে পারবে সাধারণ মুরগির নাগেটের মতো দামেই। প্রাণি হত্যা করার কারণে যারা মাংস খাওয়া বাদ দিয়েছিলেন তারাও খেতে পারবেন- কারচার করা মাছ,... ...বাকিটুকু পড়ুন

চেয়ে চেয়ে দেখি ঘুমন্ত প্রিয়ার মুখ

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৩ রা ডিসেম্বর, ২০২০ সকাল ৯:৫৭


রাত গভীরে দর্মার বেড়ার ফাঁক চুইয়ে,
উড়ে এসে জুড়ে বসলো
এক টুকরো পূর্ণ চাঁদের আলো,
আমার প্রিয়তমার মুখে।

কি অপরূপ! কি অপরূপ!!
আহা!!মরি মরি।

আমি একবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×