ক্ষমতার শেষ সময়ে এসে দেড় লাখ সন্ত্রাসী খুঁজে পেয়েছে জোট সরকার
ক্ষমতা মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে জোট সরকার সন্ত্রাসী ধরার নামে বিরোধী দলের নেতাকমর্ীদের দমন-পীড়নের লক্ষ্যে শিগগিরই মাঠে নামাচ্ছে র্যাব ও পুলিশকে। ইতিমধ্যে এ লক্ষ্যে সারা দেশে দেড় লাখেরও বেশি 'সন্ত্রাসী'র কথিত একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার অভিযানের পরিকল্পনা এমনভাবে করা হয়েছে যাতে জোট সরকারের আমলে শুর" হয়ে এই প্রক্রিয়া আগামী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গিয়েও চলতে থাকে। পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়ে তৈরি করা ওই তালিকা ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে। সূত্রমতে, বিভিন্ন পেন্ডিং মামলায় আসামি দেখিয়ে সারা দেশে বিরোধী দলের সক্রিয় নেতাকমর্ীদের নাম ঐ তালিকায় রাখা হয়েছে। আগামী সংসদ নির্বাচনে ঐসব নেতাকমর্ী যাতে দলের পক্ষে কাজ করতে না পারে সে উদ্দেশ্যেই তাদের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী বানিয়ে র্যাব-পুলিশকে দিয়ে গ্রেপ্তার মিশনের এই পরিকল্পনা করা হয়েছে। সন্ত্রাস দমনে সফলতার দাবিদার জোট সরকার ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে এসে সারা দেশে দেড় লাখেরও বেশি সন্ত্রাসী খুঁজে পাওয়ায় খোদ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর মধ্যেই ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে।
নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রাক্কালে বিদায়ী জোট সরকার তাদের ফায়দা হাসিলের জন্য এই দেড় লাখ সন্ত্রাসীর 'মনগড়া' তালিকা তৈরি করে অচিরেই গ্রেপ্তার অভিযান চালাতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছে। এই তালিকায় কুখ্যাত, দুর্ধর্ষ ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি বিরোধী দলের নেতাকমর্ীদের মধ্যে সমপ্রতি যাদের বির"দ্ধে ছোটখাটো ঘটনায় থানায় জিডি হয়েছে তাদের নামও ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতার শেষ মুহূর্তে এসে জোট সরকার সন্ত্রাস দমনের নামে ফের 'অপারেশন ক্লিন হার্ট' স্টাইলে আরো একটি সাঁড়াশি অভিযান শুর"র পরিকল্পনা করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ইতিমধ্যেই সন্ত্রাস দমনে সরকারের পরিকল্পনার কথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর থেকে র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দাদের জানিয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দৃশ্যতঃ দেশের ক্রমাবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে সন্ত্রাসের লাগাম টেনে ধরতে এসব বিষয় নিয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর র্যাব ও পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালানোর সময় র্যাব ও পুলিশকে কঠোর হতে বলা হয়েছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বৈঠক করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র আরো জানায়, সারা দেশে যেসব সন্ত্রাসীর কারণে আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোটের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ধসে পড়ে জনগণের রায়ে প্রভাব ফেলতে সেইসব চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে খুঁজে বের করে প্রয়োজনে 'ক্রসফায়ারে' ফেলারও ইঙ্গিত র্যাব ও পুলিশকে দেওয়া হয়েছে।
দেশের কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপাররা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অতি অল্প সময়ের মধ্যে দ্র"ত তৈরি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এই তালিকায় পুলিশের সঙ্গে এসবি, ডিবি, এনএসআই, ডিজিএফআই ও সিআইডির পৃথকভাবে তৈরি করা তালিকার ব্যাপক গরমিল রয়েছে। প্রত্যেক সংস্থার সদস্যরা প্রতিদিনের র"টিনওয়ার্কের বাইরে তালিকা তৈরির কাজ করেছে। মন্ত্রণালয়ের বারবার তাগাদার কারণে থানা পুলিশ তড়িঘড়ি করে শুধুমাত্র থানার নথি ঘেঁটে, আবার অনেক পুলিশ কর্মকর্তা 'রাইটার বা থানার মুনশিকে' দিয়ে তালিকা তৈরির দায় সেরেছেন !
এছাড়া যেসব মামলা ডিবি ও সিআইডি তদনত্দ করেছে সেসব মামলার আসামিদের প্রায় নির্বিচারভাবেই তালিকাভুক্ত করেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা। আর এসব অধিকাংশ মামলাতেই বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের নাম জড়ানো হয়েছে বলে সূত্র জানায়। আবার বহু মামলায় আসামিদের নাম-পরিচয় সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকায় এবং এযাবৎ তদনত্দে আসামিরা চিহ্নিত না হওয়ায় অনেক ভয়ংকর সন্ত্রাসীর নামই তালিকার বাইরে রয়ে গেছে।
রাজশাহী বিভাগের একজন পুলিশ সুপার জানান, গত সাড়ে 4 বছরে বিরোধী দলের হাজার হাজার নেতাকমর্ীর নাম উল্লেখ করে হত্যা, পুলিশ এসল্ট, বিস্ফোরক আইন, দ্র"ত বিচার আইনসহ নানান স্পর্শকাতর ধারায় থানায় মামলা হয়েছে। দেশের অনেক স্থানে বিরোধী দলের অনেক নেতাকমর্ীর বির"দ্ধে একাধিক থেকে শতাধিক মামলাও রয়েছে। অনেক নেতাকমর্ীকে গ্রেপ্তার করে একাধিক পেন্ডিং মামলায় আদালতে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি শুধুমাত্র সরকারী দলের নেতাকমর্ী হওয়ায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরও বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদল ক্যাডারদের বির"দ্ধে থানায় মামলা রেকর্ড হয়নি। আদালতে দায়ের হওয়া মামলার তদনত্দ ফাইল আটকে রেখেছে পুলিশ। এ অবস্থায় পুলিশের তৈরি করা তালিকায় বিরোধী দলের নেতাকমর্ীদের নাম প্রাধান্য না পাওয়ার কোনো যুক্তি নেই !
সূত্র জানায়, 2002 সালের 15 অক্টোবর থেকে 2003 সালের 9 জানুয়ারি পর্যনত্দ চলা টানা 85 দিনের 'অপারেশন ক্লিনহার্ট'-কে জোট সরকার সন্ত্রাস দমনে তাদের বড়ো ধরনের সাফল্য বলে প্রচার করে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পুলিশ-বিডিআরের সমন্বয়ে শুর" হয় 'অপারেশন স্পাইডার ওয়েভ'। এসব অভিযানের সাফল্যকে সামনে এনে সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে জনগণের স্বসত্দি আনতে নতুন নামে অপারেশন ক্লিনহার্ট স্টাইলে খুব শিগগিরই র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দাদের দিয়ে আরো একটি সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাস দমনের পরিকল্পনা করেছে। যদিও সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিডিআর ও আনসারের সমন্বয়ে চালানো অপারেশন ক্লিনহার্টে 45 জনের 'হৃদরোগে' মৃতু্যর ঘটনা যৌথ বাহিনীর পুরো অভিযানকে বিতর্কিত করেছিল, তবুও 85 দিনের ঐ অভিযানে 11 হাজার সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার এবং 2 সহস্রাধিক অস্ত্র উদ্ধারকে সরকার সাফল্য হিসেবে সবের্াচ্চ গুর"ত্ব দিচ্ছে।
এদিকে উত্তরাঞ্চলে চরমপন্থীরা আবারো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠায়, এমনকি পুলিশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মাঠে নামায় এই মুহূর্তে আরো একটি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালানো জর"রি মনে করছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকতর্ারা। গত শুক্রবার প্রকাশ্য দিবালোকে নওগাঁয় গর"র হাটে হাজার হাজার মানুষের সামনে 4 জন পুলিশ ও একজন ছাত্রদল নেতাকে চরমপন্থীরা জবাই করে হত্যা এবং একই এলাকায় চরমপন্থীরা 6 পুলিশকে গণপিটুনি দেওয়ায় এখন আরো একটি অভিযান সরকারের জন্য জর"রি মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর এই সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার আসামি হয়ে 'সন্ত্রাসী' তালিকাভুক্ত হওয়া হাজার হাজার বিরোধী দলীয় নেতাকমর্ী বলির পাঁঠা হতে যাচ্ছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান নতুন করে শুর" হলে যাদের বির"দ্ধে মামলা নেই অথচ নানা কারণে তালিকাভুক্ত হয়েছে, তাদেরকে 54 ধারায় গ্রেপ্তার করে আটকাদেশ দেওয়া হবে। অপারেশন ক্লিনহার্ট অভিযানেও তাই করা হয়েছিল।
এদিকে, কারাবন্দী অনেক সন্ত্রাসীর নাম তালিকাভুক্ত হয়নি। এরা অনেকেই আগামী তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে আগাম জামিনে মুক্তিলাভ করে আবারো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বিঘ্ন ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এদের মধ্যে চিফ হুইফ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পুত্র কারাবন্দী আখতার হামিদ পবনকে নিয়ে মানিকগঞ্জে আতঙ্ক রয়েছে। বহু মামলার আসামি পবনের নাম সন্ত্রাসী তালিকায় নেই বলে মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার এবং লালবাগ, কোতোয়ালি ও সূত্রাপুর থানা পুলিশ জানিয়েছে।
:::ভোরের কাগজ ::::
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






