রাজধানীর লালবাগ-কামরাঙ্গীরচর-হাজারীবাগের সাবেক এমপি নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে কতো টাকার মালিক বনেছেন তা বোধহয় তিনি নিজেও জানেন না। জানেন না কতোভাবে টাকা এসেছে তার কাছে। স্থানীয়রা তার অর্থবিত্তের পরিধি অনুমান করতে গিয়ে প্রায়শই একটি উদাহরণ টানেন। এবার কতোগুলো গর" কুরবানি দিয়েছেন তা জানতে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রশ্নের উত্তরে নাসিরউদ্দিন পিন্টু বলেছিলেন, 'এবারের হিসাব জানতে চাইবেন না। তবে গত বছর 64টি গর" কুরবানি দিয়েছিলাম।' এ উদাহরণ থেকেই তার সম্পদের ধারণা পেতে চেষ্টা করেন সাধারণ মানুষ। পণ্ড হয়ে যাওয়া 22 জানুয়ারির নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়ে নাসিরউদ্দিন পিন্টু নিজেই নির্বাচন কমিশনে তার সম্পদের হিসাব দিয়েছিলেন এ রকম : মোট জমির পরিমাণ 2 দশমিক 93 একর, যার মূল্য 1 কোটি 52 লাখ টাকা। আর গত বছর ব্যবসা ও অন্যান্য খাত থেকে তার আয় হয়েছে 3 কোটি 13 লাখ 98 হাজার টাকা। অবশ্য সাধারণ মানুষ এই হিসাব সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করেন বলেই জানা গেছে।সূত্র মতে, নামে-বেনামে ঢাকায় পিন্টুর কয়েকশ কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে। পুরান ঢাকার বাবুবাজারে শাবিসত্দান সিনেমা হল এবং আশপাশের জমি বিএনপি-জামাত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই দখল করে পিন্টু 4টি বহুতল দালান গড়ে তোলেন। যাত্রাবাড়ীতে কয়েক একর জমি সিএনজি ফিলিং স্টেশন স্থাপনের নামে দখল করেন। কেরানীগঞ্জ ও কামরাঙ্গীরচরে বিঘার পর বিঘা সম্পত্তি রয়েছে তার। লালবাগের কিল্লারমোড় এলাকায় 13 একর নিচু জমি পিন্টুর দখলে রয়েছে। সোয়ারীঘাটের ড্রামপট্টি ও সিম্পসন রোডের বিক্রমপুর গার্ডেন নামে একটি বহুতল ভবনের ভাড়াটিয়ারা প্রতি মাসে ভাড়া দেন পিন্টুকে। হাজারীবাগে ভেড়িবাঁধ সংলগ্ন কয়েক একর জায়গা পিন্টুর দখলে। আরো কতো সম্পদ এখন পিন্টুর দখলে তার ইয়ত্তা নেই। এসব সম্পত্তির প্রকৃত দখল পিন্টু বাহিনীর হাতে থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাগজপত্রে পিন্টুর দখলে নেই দেখানো হয়েছে। দখল প্রক্রিয়াকে ঝামেলামুক্ত রাখতে এটি পিন্টুরই একটি কৌশল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। জানা গেছে, সাভারে দুটি পোশাক শিল্প ও একটি চামড়া কারখানায় প্রায় শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন তিনি। এ ছাড়া একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল চালু করার উদ্যোগও রয়েছে তার।
বুড়িগঙ্গার উত্তর তীরে যতোগুলো ঘাট রয়েছে, সাংসদ হওয়ার পর ক্যডার লেলিয়ে দিয়ে সবগুলো ঘাটেরই দখল নিয়ে নেন পিন্টু। ফলে ঘাটের প্রকৃত ইজারাদাররা বাধ্য হয়ে পিন্টুকে তাদের ব্যবসায় অংশীদার করে নিতে বাধ্য হন। জানা গেছে সোয়ারীঘাট, ফেরিঘাট, ছোট কাটারা ঘাট, পানঘাট, বাবুবাজার ঘাট, নলগোলাঘাটসহ 9/10টি ঘাট পয়েন্ট থেকে পিন্টুর আয় মাসে কয়েক কোটি টাকা।
ক্ষমতায় আসার পর এলাকার পরিবহন ব্যবসাও দখলে চলে আসে তার। চকবাজার ও হাজারীবাগ থেকে গুলিসত্দান, চকবাজার থেকে নিউমার্কেট, বাবুবাজার থেকে হাজারীবাগসহ বিভিন্ন র"টে পিন্টুর লোকজন 'লেগুনা সার্ভিস' চালু করে। প্রতিদিন এ রকম কয়েকশ লেগুনা থেকে 'লাইন খরচ' এর নামে 200/250 টাকা করে তুলে মাসে কয়েক লাখ টাকা পেঁৗছে দেওয়া হতো তৎকালীন ওই সাংসদের বাড়িতে। সূত্র জানিয়েছে, বাবুবাজার থেকে গাবতলী পর্যনত্দ ভেড়িবাঁধ রোডে কয়েকটি বাস সার্ভিস চালু হয় প্রায় 4 বছর আগে। কিন' এতে বাদ সাধেন পিন্টু। ফলে ওই র"টে চলাচলকারী বাসের ওপর প্রায়শঃই হামলা হতে থাকে। শেষ পর্যনত্দ প্রতি মাসে আড়াই লাখ টাকা করে পিন্টুকে দিতে রাজি হয়ে ওই র"টে টিকে থাকে ব্রাদার্স নামে একটিমাত্র পরিবহন সার্ভিস। বুড়িগঙ্গা নদীতে অবৈধ ড্রেজিং ও মাটি ভরাটের ব্যবসা থেকেও পিন্টু মাসে কয়েক লাখ টাকা আদায় করেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ঠিকাদারি ব্যবসায় তার দখলদারিত্বের কথা স্থানীয় সবারই জানা। গত 5 বছরে সরকারি রাসত্দা বা ভবন নির্মাণের কাজ পিন্টুকে কমিশন না দিয়ে সম্পন্ন হতে পারেনি বলে সূত্র জানিয়েছে। আবার পিন্টু, তার স্ত্রী ও ভাইয়ের মালিকানাধীন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো জবরদসত্দিমূলকভাবে গত 5 বছরে অধিকাংশ সরকারি কাজ হাতিয়ে নিয়েছে। তবে জবরদসত্দি বেসরকারি টেন্ডার হাতাতে গিয়ে বিপদেও পড়তে হয়েছে পিন্টুকে কয়েকবার। নির্বাচিত হওয়ার তিন মাস যেতে না যেতেই পিন্টু টেন্ডারবাজির অভিযোগে একমাস জেল খেটেছিলেন। গত বছর আজিমপুর কবরস্থানের সাড়ে চার হাজার কবর ভেঙে রাসত্দা বানাতে গিয়েও জনরোষে পড়েন তিনি।
মূলত সন্ত্রাসকে পুঁজি করেই উত্থান ঘটেছে নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর। তার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, কেরানীগঞ্জের দরিদ্র পরিবারের ছেলে পিন্টু হাজারীবাগে নানা-নানীর কাছে বড়ো হয়েছেন। ছোটবেলায় তিনি রিকশা-সাইকেল মেরামতের কাজ করেছেন । '83 সালে মাধ্যমিক পাস করেন তিনি। এর পর থেকে ক্রমেই সন্ত্রাসী কাজে পারদর্শী হয়ে ওঠেন তিনি। রাজনীতি আর বন্ধুবান্ধব নিয়ে মেতে থাকতেন দিনরাত। গড়ে তোলেন সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী। '91 থেকে 96 সাল পর্যনত্দ তার বির"দ্ধে লালবাগ, কোতোয়ালি ও হাজারীবাগ থানায় ডজন খানেক মামলার খোঁজ পাওয়া যায়। কৌশলী পদক্ষেপ এবং অনুগত ক্যাডার শক্তির বদৌলতে ওয়ার্ড ছাত্রদল নেতা থেকে পিন্টু কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের পদ দখলে সক্ষম হন। 2000 সালের 2 জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের তৎকালীন সাধারন সম্পাদক পিন্টুর ক্যাডার বাহিনী ও একই সংগঠনের সভাপতি লাল্টুর ক্যাডার বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে নিজেদের কাছে থাকা বোমা বিস্ফোরণে পিন্টু বাহিনীর 2 সদস্য নিহত হয়। তখন আলোচনায় চলে আসেন পিন্টু। নিজ সংগঠনের সভাপতির নেতৃত্বের বির"দ্ধে তার ক্যাডার বাহিনীর সেদিনের প্রতিহিংসামূলক শোডাউন দেখে বিএনপির শীর্ষ নেত্রী তাকে কাছে টেনে নেন। পোষ্যপুত্রের মর্যাদা দেন তাকে। এরপর পিন্ট ুপ্রথমে ছাত্রদলের সভাপতি ও পরে 2001 এর নির্বাচনে সাংসদ বনে যান।
অভিযোগ রয়েছে, পিন্টু নিজে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তবে এখন নিজে খুন খারাবিতে না গেলেও তার নির্দেশে হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে। এজন্য তার কিলিং স্কোয়াড রয়েছে। মিটফোর্ডের কামাল পিন্টুর নির্দেশে গত বছর কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটায় বলে অভিযোগ রয়েছে। 2004 সালের মার্চ মাসে কামাল বাহিনী নলগোলা বিসিক মার্কেট দখল করে নিলে এলাকাবাসী কামালের গ্রেপ্তারের দাবিতে আন্দোলনে নামে। 23 মার্চ পিন্টু নিজে গুলি করতে করতে এলাকাবাসীর তৈরি মঞ্চ দখল করে নেন। এ বছর চম্পাতলী এলাকার মাছ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলীকে প্রকাশ্যে খুন করে দিলু নামে এক সন্ত্রাসী। সেই সন্ত্রাসীও এখন পিন্টুর আশ্রয়ে রয়েছে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়া 2004 সালের 2 মার্চ কামরাঙ্গীরচরে মনির চেয়ারম্যান ও মিজানুর রহমানকে গুলি করার ঘটনার নির্দেশদাতা পিন্টু বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় মিজানুর রহমান নিহত হন। 2004 সালের 16 ফেব্রচ্ছারি মীর নেওয়াজ আলীকে গুলি করার ঘটনারও নির্দেশদাতা পিন্টু। অভিযোগ রয়েছে সাবেক সাংসদ হাজী সেলিমের ওপর কয়েক দফা হামলা চালানোর। পিন্টুর ষড়যন্ত্রের কারণেই হাজী সেলিমের ব্যবসায়িক পার্টনার দুধ মিয়াকে র্যাব ক্রসফায়ারে হত্যা করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। এ কারণে পিন্টুর ক্ষমতার বলয় আর ভয়ঙ্কর চরিত্রের কাছে অসহায় সাধারণ মানুষ এসব অভিযোগ করার সময় প্রথমেই নাম প্রকাশ না করার শর্ত আরোপ করে তারপর কথা বলতে রাজি হন।
:::ভোরের কাগজ ::::
18/01/07
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জানুয়ারি, ২০০৭ রাত ১০:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






