somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্পঃ নিয়তি

৩০ শে নভেম্বর, ২০১৫ বিকাল ৫:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



একটা সুন্দরী মেয়ে দাঁত বের করে হাসছে। তার ডান হাতে একটা ক্রিম। সৌন্দর্যবর্ধক ক্রিম। মেয়েটার পাশে একটা সুদর্শন ছেলেকেও দেখা যাচ্ছে। ছেলেটা মেয়েটার বাম হাতের অনামিকায় একটা আংটি পরিয়ে দিচ্ছে। ছেলেটার দৃষ্টি ঝুকে আছে মেয়েটার হাতে, কিন্তু মেয়েটার দৃষ্টি ছেলেটার দিকে নিবদ্ধ নেই। সে ছেলেটার দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে উল্টো দিকে তাকিয়ে ডান হাতের সৌন্দর্যবর্ধক ক্রিম প্রসারিত করে ধরেছে। বিয়েটা যে তার ক্রিমের বদৌলতে হচ্ছে এটা সে সবাইকে জানান দিচ্ছে হেসে হেসে সংগোপনে।

এটা একটা বিজ্ঞাপন। পত্রিকার শেষের পাতায় ঢুকতেই বিজ্ঞাপনটা চোখে পড়ে হাফিজের। অদ্ভুত বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে শুধু সৌন্দর্যবর্ধক ক্রিমের যাদুকরী চরিত্রই ফুটে উঠেনি, একইসাথে উপমহাদেশীয় চরিত্রটাও ফুটে উঠেছে। হাফিজ পত্রিকাটা দোকানের এক কোণে রেখে চায়ের কেটলি নামায়। দোকানে ভিড় লেগেই আছে। পত্রিকা পড়ার ফুরসৎ নেই। এমনসময় একজন বৃদ্ধ পত্রিকাটা চেয়ে নেন ওর কাছ থেকে। বৃদ্ধ হাফিজের বেশ পরিচিত। বৃদ্ধের হাত থেকে পত্রিকা ঘুরতে থাকে চায়ের কাপে কাপে। পত্রিকা থেকে লাফ দিয়ে সমাজ, দেশ, রাজনীতি ঢুকে পড়ে চায়ের কাপের ভেতর। চায়ের কাপে কথার ঝড় উঠে। হাফিজের ছোট চায়ের দোকান সরগরম হয়ে যায় ধীরে ধীরে।

হাফিজের চায়ের দোকানে প্রতি সকালেই এমন দৃশ্য দেখা যায়। হাফিজ নিজে অবশ্য কখনো চায়ের কাপের কথার ঝড়ে যোগ দেয় না। তবে যোগ না দিলেও কথাগুলো সে উপভোগ করে নীরবে। কিন্তু আজ তাকে বেশ অন্যমনস্ক লাগছে। চায়ের কাপের কথায় তার কোন মন নেই আজ। মনের ভেতর দুর্ভাবনার ভার। হারুনের দুর্ভাবনা। হারুনকে কি সে কোনভাবেই ফেরাতে পারবে না?

হাফিজের চায়ের দোকানটা ধানমণ্ডি মাঠের দক্ষিণ দিকের রাস্তা ঘেঁষে এক কোণে অবস্থিত। এই ছোট চায়ের দোকানেই হাফিজের পরিবার চলে। হাফিজের বাবা নেই। মা আর ছোট ভাই--হারুন। ধানমণ্ডির এক বন্ধুর সহযোগিতায় সে এই চায়ের দোকানটা দিয়েছে। হাফিজের চায়ের দোকানটা ধানমণ্ডিতে হলেও সে তার মা আর ভাইকে নিয়ে মিরপুরে থাকে। আজ থেকে সাত বছর আগে হাফিজের বাবা তাদেরকে নিয়ে মিরপুরের এই বাড়িটাতে এসে ভাড়া উঠেছিলেন। দু’ বছর আগে তিনি হঠাৎ মারা যান। হাফিজ বাড়িটা ছাড়েনি। বাড়িটাতে তার বাবার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তাছাড়া মিরপুরে বাড়িভাড়া ধানমণ্ডির তুলনায় একটু কম। কিন্তু এবার সে ঠিক করেছে ধানমণ্ডিতে চলে আসবে। মিরপুর থেকে ধানমণ্ডিতে এসে দোকান চালানো বেশ কষ্টকর হয়ে যায়।

পরিচিত বৃদ্ধ মানুষটি হাফিজের অন্যমনস্কতাটা মনে হয় বুঝতে পারেন। বলেন, কি হাফিজ তোর মন খারাপ ক্যান?

হাফিজ কথা বলে এবার, হারুনকে বাবা মারা যাওয়ার পর আমি কোনদিন মারিনি চাচা। গতকাল রাতে তারে একটু মারধর করছি। হারুন রাতেই বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছে। বাড়িতে ফেরেনি সারারাত।

বৃদ্ধ তার হাতের চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলেন, ও এই ব্যাপার। হারুন তাহলে এখনো বদভ্যাসটা ছাড়ে নি?

বদভ্যাসের গন্ধ পেয়ে দোকানের অন্যান্য কানগুলো একটু সচেতন হয়ে ওঠে। হাফিজ চুপ হয়ে যায়। বৃদ্ধও সবাইকে হতাশ করে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দোকান ছেড়ে উঠতে উঠতে বলেন, হাফিজ চায়ের দামটা লিখে রাখিস বাপ।

হাফিজ বেশিদূর পড়ালেখা করার সুযোগ পায় নি। কিন্তু তারপরও তার ভেতর একটা গুণ আছে। সে সৎ। তার এই সততা সহজাত। তার বাবার মধ্যেও এই গুনটা ছিলো। অথচ হারুন যে পকেট কাটার বিদ্যাটা কিভাবে শিখলো হাফিজের এটা মাথায় আসে না। বিভিন্ন লোকাল এমনকি সিটিং বাসে ঘুরে ঘুরে সে মানুষের পকেট কাটে। পকেট সে টাকার জন্য কাটে না। পকেট কাটে মোবাইলের জন্য। হাফিজ তাকে কতো শত ভাবে বুঝানোর চেষ্টা করে কিন্তু হারুন পকেট-কাটা শিল্প ত্যাগ করে না। সে যে পেটের দায়ে এই কাজটা করছে এমন কিন্তু না। পকেট কাটা ওর একপ্রকার নেশা হয়ে গেছে। এটা সে ছাড়তে পারে না। দু’ একবার ধরা পড়ে গণপিটুনিও খেয়েছে কিন্তু তারপরও সে অদম্য। হারুন যে কেনো এই কাজ করে হাফিজ সেটা ভেবে পায় না। সেতো যথাসম্ভব ওর চাওয়া পাওয়া সব পূরণ করে। দামী মোবাইল কিনে দিয়েছে। হারুন রঙ বেরঙের টিশার্ট পরতে পছন্দ করে। হাফিজ প্রায় তাকে সেটা কিনে দেয়। গতকালও সে ফেরার সময় তার জন্য সবুজ রঙের একটা টি-শার্ট নিয়েছিলো। বাড়িতে ফিরেই সে হারুনের রুমে ঢুকে আগে। হারুনের টেবিলে একটা দামী মোবাইল দেখতে পায়। মোবাইল দেখেই মাথা বিগড়ে যায় ওর। হারুন যখন মার খেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলো তখন হাফিজ চেঁচিয়ে বলে, ছোটু তুই এরপর যদি কারো মোবাইল নেস তাহলে দেখিস আমি কিন্তু একটা অঘটন ঘটাবো।

হাফিজের ভেতরটা উপলব্ধি করে হারুনও বেশ মর্মযাতনায় পুড়ে। হাফিজ যে তাকে কি পরিমাণ ভালোবাসে এটা সে জানে। মনে মনে ঠিক করে আর কখনো পকেট কাটবে না, কিন্তু নিজের মনের ওপরই খুব একটা ভরসা পায় না সে। ভরসা পাক আর না পাক হাফিজকে কিছু একটা ভরসার কথা শুনাতে হবে। তার এই কর্মকাণ্ডে হাফিজ কতোই না কষ্ট পাচ্ছে। সে যে এই কাজ আর করবে না এই কথাটা অন্তত তার সামনে গিয়ে বলতে হবে। হারুন সারারাত নিদ্রাহীন কেটে সকাল বেলা বাড়িতে ফেরে। ঠিক করে বাড়িতে ফিরেই হাফিজকে কথাটা বলবে। কিন্তু বাড়িতে ফিরে সে হাফিজকে আর পায় না। হাফিজ ঘুম থেকে উঠেই দোকানে চলে এসছিলো। সে আজ সকালে মুখেও কিছু দেয়নি।

সারাদিন আজ বিষণ্ণতায় কেটে যায় হাফিজের। মনে মনে ঠিক করে হারুনকে পাশে বসিয়ে আজকে আরও সুন্দরভাবে বুঝাবে। হারুনকে একটা স্কুলেও ভর্তি করে দিয়েছিলো সে। কোন কাজ হয় নি। হারুন স্কুলে যায় না। আজ ঠিক করে হারুনকেও এমন একটা ছোট দোকান ধরিয়ে দেবে। দোকানে বসলে পকেট কাটার আর ফুরসৎ পাবে না। বুদ্ধিটা বেশ ভালোই। হাফিজের মনে হঠাৎ যেনো একটু আনন্দের বিদ্যুৎ ঝিলিক খেলে যায়। দোকান একটু দ্রুতই বন্ধ করে ফেলে সে। প্রথম সন্ধ্যা প্রহরে।

আশীর্বাদ--- মিরপুর টু আজিমপুর। গাড়িটা সিটিং না লোকাল ঠিক বুঝা যায় না। হাফিজ নতুন আশা নিয়ে আশীর্বাদে উঠে বসে পেছনের সিটের কর্নারে জানালার কাছে। হারুনকে একটা ফোন দেয় কিন্তু নাম্বার ব্যস্ত দেখায়। মোবাইল কান থেকে সরিয়ে সে জানালায় হাত রাখে। হঠাৎ তার হাত থেকে মোবাইলটা কে জানি ছোঁ মেরে নিয়ে যায়। হাফিজ কোনকিছু না ভেবেই খোলা জানালা দিয়ে লাফ দেয় রাস্তায়। পেছন থেকে চলন্ত একটা গাড়ি এসে তাকে মুহূর্তেই লাশ বানিয়ে দেয়। হাফিজের রক্তাক্ত বিকৃত লাশ দেখে চলন্ত রাস্তা থমকে দাঁড়ায় নির্বাক। লাশ ঘিরে ভিড় জমে। কোলাহল গুঞ্জন শুরু হয়। কোলাহল ঠেলে হঠাৎ একটা ছেলে দৌড়ে হাফিজের বিচূর্ণ বিকৃত শরীরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তীব্র আর্তনাদে। ছেলেটার গায়ে হাফিজের গতকালের কেনা সবুজ রঙের নতুন টি-শার্টটি আর তার হাতে দেখা যায় হাফিজের কমদামী চায়না মোবাইলটা। মোবাইলটা থেকে যেনো বারবার একটা কথা বেজে ওঠে ছেলেটার কানে-- ছোটু তুই এরপর যদি কারো মোবাইল নেস তাহলে দেখিস আমি কিন্তু একটা অঘটন ঘটাবো।





সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে নভেম্বর, ২০১৫ বিকাল ৫:৫৫
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মৃত্যুর আগে কি মানুষ টের পায়, সে মারা যাচ্ছে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



মৃত্যুর কয়েক মুহুর্ত আগে, টের পাওয়া যায়- মরে যাচ্ছি।
সময় শেষ। তবে সবাই বুঝতে পারে না। কেউ কেউ বুঝতে পারে। আমার বাবা একদিন মাকে বলল, আমার দোষ ত্রুটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

গোল্ডেন সেপিয়া দিগন্ত এবং ভ্যাঞ্জেলিসের অমর সুর: এক কালজয়ী সমুদ্রযাত্রার মহাকাব্য

লিখেছেন চারাগাছ, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:০০




গোল্ডেন সেপিয়া দিগন্ত এবং ভ্যাঞ্জেলিসের অমর সুর: এক কালজয়ী সমুদ্রযাত্রার মহাকাব্য


সময়টা যেন হুট করেই থমকে যায়, যখন ইথারে ভেসে আসে সেই অতিপ্রাকৃত সুরের মূর্ছনা। চোখ বন্ধ করলেই মনের ক্যানভাসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সে আমার এআইনোক্কিও

লিখেছেন শায়মা, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪৪


এক জীবনে কত কিছু দেখা হয় কত কিছু জানা হয় মানুষের! আসলেই কত অজানারে! লেখক শংকরের এই নামে একটি বই আছে। কবিগুরুর আছে কবিতা কত অজানারে জানাইলে তুমি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ সাইটের জন্য ডোমেইন নাম সাজেস্ট করুন

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৪:৫৫


বাংলায় ব্লগিং করার জন্য একটি ওয়েব সাইট তৈরী করতে চাচ্ছি। আপাতত মূল উদ্দেশ্য হলো সামুতে লিখা আমার সবগুলো পোস্ট ধীরে ধীরে সাইটটিতে আর্কাইভ করে রাখা। সামুতে অনেকে নিবেদিত প্রাণ ব্লগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড্যাম কেয়ার সেই মেয়েটি AI দিয়ে সাজে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:২২



ড্যাম কেয়ার সেই মেয়েটি AI দিয়ে সাজে
==================================
পিঠ ছুঁয়ে নামা মেঘবরণ তার লম্বা কালো চুল,
তারই মাঝে লুকিয়ে হাসে একটি সাদা ফুল।
চোখ দুটো তার ডাগর ডাগর, অবাক করা আলো,
দুষ্টুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×