রেললাইনের পাশেই স্কুলটা , ঢাকা চট্টগ্রামের রেলপথ , পাহাড়ী সবুজে চোখ ভরে যায় , এক আজানা স্নীগ্ধতা এমনিতেই মনে ভর করে , রেললাইনের পাশেই পায়ে হাটা পথ , সারি সারি লম্বা আকাশী গাছগুলো হাসিমাখা মুখে যেনো দাড়িয়ে থাকে , সেই পথ ধরেই স্কুল অভিমুখে যাচ্ছে দুইটি ছোট্ট বাবু ,
(বড় ভাইয়ার এক আংগুল নাড়িয়ে নাড়িয়ে ছোট্ট তন্বী)ভাইয়া ? আমাকে আইসক্রিম কিনে দিবে আজকে ? আজ না স্কুলে ক্লাস হবেনা ? এই ভাইয়া ?
সাদা ধবধবে এই পিচ্চিটাকে খুব আদর করে জুলফিকার , তাইতো আজ স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে এমনিতেই , তন্বী বাসায় থাকলে আম্মুকে কথার বন্যায় ভাসায় , তাই আম্মুরও একটু সায় ছিল আসতে দেবার , তবে যাবার সময় বার বার জুলুকে(জুলফিকার) সাবধান করে দিয়েছেন ছোট বোনের খেয়াল রাখতে
তাই বাসা থেকে বের হয়ে আম্মুর চোখের আড়াল হয়েই বোনের প্রতি জুলুর কড়া নির্দেশ '' আমার একটা আংগুল ধরে থাকবে আজ সারাদিন , ছাড়লে কিন্তু বিচার আছে আম্মুর কাছে ''
তন্বী আবার বলে ''এই ভাইয়া ? দিবেনা কিনে আইসক্রিম? ''
হাটতে হাটতেই তন্বীর কথার জবাবে জুলু হ্যা সূচক মাথা নাড়ায় , তন্বী তাতে ক্ষেপে যেয়ে হাটা থামিয়ে বলে ''মুখে বল , না হলে হাটবোনা ''
জুলু আস্তে আস্তে বুঝতে পারছে আজ তার ওপর এই মেয়ে অনেক মাতুব্বরি খাটাবে , তবুও কি করা ? একটাইটো বোন ? তাই একটু ভেবেই বলে ''যা , তোকে ইগলো কিনে দিবো ''
মুখটাকে ভাইয়ার মুখের কাছে এনে জ্বীব কেটে তন্বী বলে '' এইটায় হবেনা , আমি চকবার খাবো ''
তন্বীর সাথে যুদ্ধে যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই নেই এখন , কারণ এমনিতেই ওকে নিয়ে হাটতে সময় বেশী লাগছে , আর তার ওপর আজ স্কুলে পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠান , জুলু ২ টা পুরস্কারও পাবে , কম কথা ? সেই বীরত্য দেখাবে আজ তন্বীকে , তাই ঝটপট বলে ফেল্লো , ''যাও , চকবার'ই পাক্কা ''
খুশী হয়ে আবার হাটায় মন দিলো তন্বী , কিছুদুর এগিয়েই বলে ''ভাইয়া , আস্তে হাটো না ? আমার পা ব্যাথা করছে''
অগ্যতা তন্বীকে কোলে নিতে যেয়ে জুলু ভাবলো ''না এটা করা যাবেনা , তাহোলে ইনের বারোটা বাজবে , কত সুন্দর করে সেঝে আসছে , তবুও বোনকে বললো কাধে চড়বি ? ''
''না ,না , আমার লজ্জা লাগবে ভাইয়া'' তাহোলে আস্তে আস্তেই হাটো।
স্কুল গেইটে এসেই তন্বী জুলুকে বললো '' ভাইয়া ? পেট ব্যাথা করছে , খুব ক্ষুধা লাগছে !!! ''
জুলু বললো ''আচ্ছা দেখি স্কুলে তোমাকে বসিয়ে আমি বাজার থেকে এক দৌড়ে আইসক্রিম আর মিষ্টি নিয়ে আসবো , হ্যা ??? ''
তন্বী হ্যা সুচক মাথা নাড়িয়ে ভাইয়ার হাত ধরেই স্কুলে আসলো , আর কিছু দিন পর ও শিশু শ্রেণীতে ভর্তী হবে , ক খ গ সব পারে , ভাইয়াই শিখিয়ে দিয়েছে
''ভাইয়া ? এইটা কি ? '' বড় স্টেজ করা হয়েছে পুরস্কার বিতরনীর আয়োজনে , তার দিকেই ইঙ্গিত করে তন্বী জিঞ্জাসা করলো
'' এইটাতেই তো আজকে সব অনুষ্ঠান হবে , আমি এইটায় উঠে পুরস্কার নিবো , তোমার তো আংকেল আর আমার সব স্যাররাই উঠবে ঐখানে ''
বলতে বলতেই তন্বীকে নিয়ে জুলু দর্শক গ্যালারীতে এসে পড়ল , সামনে থেকে ২,৩ সারি পেছনে বোনকে নিয়ে বসলো , এখনও তেমন কেউ আসেনি , অতি উৎসাহে অনেক আগেই এসে পড়েছে ওরা
''ভাইয়া ? ক্ষুধা লাগছে তো ? ''
তন্বীর কান্না জড়ানো গলা , জুলু উঠলো সীট থেকে , বোনকে বললো ''আচ্ছা ,ভাইয়া এক দৌড়ে বাজারে জাবো আর আসবো , তমি একটুও জায়গা থেকে নোড়বেনা ! এখানে ওনেক বড় ভাইয়া আপু আছে কিন্তু , তুমি বসে বসে দেখো , আমি ৫ মিনিটেই আসতেছি ''
বলেই খুব জোরে দৌড় দিলো , এক মুহুর্তে স্কুল গেইট , রেললাইন পার হয়ে বড় রাস্তার কাছে এসে পড়লো , সকাল ৮টা , তাই রাস্তার এপাশের দোকান গুলো খোলে নি , জুলু চিন্তায় পড়ে গেলো , কিছু আনতে গেলে রাস্তার ঐ পাশে যেতে হবে ,এই পর্যন্ত ( ৬ ষ্ঠ শ্রেণী ) ও এই রাস্তা পার হবার সাহস পায়নি আম্মুর কড়া শাসনের ভয়ে
তবুও আজ যেতেই হবে , তন্বীর খুব ক্ষুধা লাগছে যে ?
রাস্তার এদিক ওদিক দেখে সে দৌড়ে পার হয়ে গেলো , তাড়াতাড়ি করে ২টা মিস্তি পেটিস আর একটা চকবার আইসক্রিম কিনে আবার ফিরে এল রাস্তার কাছে ,
এবার ওর কছে আর ভয় লাগছেনা বেশী , এদিক ওদিক তাকিয়ে আবার দৌড় দিলো , ওর চোখের কোণে খুব কাছে হঠাৎ হলুদ রং এর কিছু একটা ঝিলিক দিলো , কিছু ভাববার আগেই কোমড়ে অনেক জোরে একটা ধাক্কা খেলো , আইসক্রিম আর পেটিস রাস্তায় ছিটকে পড়লো ,খুব কাছে ওর দেহটাও আছড়ে পড়লো , তবুও শেষ হোলোনা , হলুদ সেই জানোয়ার তীব্র ব্রেক কষেও ওর ওপর তুলে দিলো দুই ভয়াল চাকা , চোখের সামনে সব আলো মুছে যেতে লালগো জুলুর , তন্বীর মুখটাই ভাসছে চোখে , আজ পুরস্কার কে নেবে ? ? ? তন্বী বাসায় যাবে কিভাবে ? খুব গা কাপছে , শরীরের কোনো খোঁজ পাচ্ছেনা , আস্তে আস্তে সব নিভে গেলো ।
১২ বছর পর, , , , , ,
তন্বী আজ কলেজে পড়ে , ওর ভাইয়া থাকলে হয়তো আজ একটা ভাবীও জুটে যেত ,
কেনো তন্বীর ঐ মরন ক্ষুধা লেগেছিলো ? কেনো ভাইয়ার কাছে এত আবদার করত ? আজ ও অনেক ভাবে , অনেক কাঁদে । ভাইয়া তার আর ফিরে আসেনা
(এটি একটি সত্য ঘটনা , ১৯৯৯ সালের ১৭ ই মার্চ এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার এক স্কুল ছাত্র মারা যায় , যার নার ছিলো কিবরিয়া , তবে কিবরিয়া আমার খুব কাছের একজনের নাম বলেই গল্পে জুলু ডেকেছি , আর সেই বোনটির নাম তন্বী এটা ঠিক আছে )
'**আর কোনো তন্বীকে যেনো সড়ক দুর্ঘটনার এই মর্মান্তিক স্মৃতি বয়ে বেড়াতে না হয়**

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


