এম,এল,এম সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই , আমি ব্যক্তিগত ভাবে এই ব্যবসার পন্থাকে ঘৃণা করি , কেনো করি তার কিছু গল্পোই আজকের লেখার বিষয়ঃ
ঘটনা ১; সময়টা ২০০৬ সাল , আমাদের বাসায় কিছু সুদর্শন মানুষের আগমণ ঘটতে লাগলো , তাদের চেহারা দেখে বোঝার উপায় নাই তারা কি পাশ বা কি সমাচার ? আব্বুর সাথে বসে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা খাতা কলম নিয়ে কি সব প্ল্যান বোঝায় ! ছোট বলেই কিছু জিজ্ঞাসা করতাম না , তবুও আম্মুকে খোঁচাতাম , একসময় দেখি আব্বু ৭ হাজার টাকা দিয়ে ২ টা হাত কিনলো , তাঁর কি খুশি !!!ছোট বেলা থেকে খুব একটা খুশি দেখিনি আব্বুকে , অভাব লেগেই আছে পরিবারে , তবুও এইবার আব্বু সাহস করে একটা পদক্ষেপ নিলো বলে ভালো লাগলো , কি সব হাবিজাবি জিনিস কিনে আনলো পয়েন্ট পাওয়ার আশায় । আমরাও আব্বুকে শৌখিন হিসেবে আবিষ্কার করতে থাকায় মনে মনে ডেসটিনিকে ধন্যবাদ দিলাম , কিন্তু যত দিন যায় তত'ই ঐ লোকগুলোর আসা কমে যায় ,
আব্বুও এর মাঝে তাঁর কিছু কলিগদের মাঝে ডেসটিনির সুবাতাস(!!!) পৌছে দিয়েছেন , যার ফলে আমার সহজ সরল আব্বুটাকে অনেক মিথ্যে বলতে হোইছে !
এমন চলতে চলতে একদিন আব্বু থেকেই শুনি ঐ লোক গুলা হাওয়া !
আব্বু নিজেতো কিছুই পেলোনা , সাথে তাঁর কিছু আত্বীয় ও কলিগদেরও ডুবালেন , কিন্তু আত্তসম্মানবোধ থেকে তিনি তার হাতে যারা ছিলেন তাদের টাকাটা নিজেই পরিশোধ করে ডেসটিনির খাতা বন্ধ করলেন !
আমার সহজ সরল আব্বুটা এখনও ডেসটিনি নাম শুনলে লাফ দিয়ে ওঠেন !
ঘটনা ২; মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে বাসায় বসে আছি , পাশের বাসার এক বড় আপুর বিয়ে হোলো ডেসটিনির এক ডায়মন্ড এর সাথে , তাই সেই ভাইয়াকে একটু বেশী শ্রদ্ধা করতাম । একদিন সেই ভাইয়া অফিসে ডাকলেন আমাকে আর আমার কিছু বন্ধুকে , গেলাম খুশি মনেই , এসিরুমে বসে সেই আমলে ভাইয়া ল্যাপটপে আমাদের প্ল্যান বোঝানো শুরু করলেন । আমার বিরক্তি ধরে গেলো , কিন্তু আমার কিছু বন্ধু মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনে গেলো । প্রায় ৩ ঘন্টা প্ল্যান বুঝিয়ে ভাইয়া ফরম পুরন করতে বললেন । আমি বাদে বাকি সবাই করলো । এবং সেই দিন থেকে ঐ ভাইয়া ও আমার কিছু ফ্রেন্ডদের কাছে আমি কালার হোয়ে গেলাম , ফলে আমি কিছু বন্ধু ও ভাইয়া হারালাম । ( কি দরকার ছিলো এই ফালতু পলেসির জন্য সম্পর্ক নষ্ট হবার ? )
ঘটনা ৩; কলেজে উঠে সবার'ই ইচ্ছা চিলো কিছু একটা করার , চারিদিকে এম,এল,এম এর জয়জয়কার । তখন আবার নিউ ওয়ে ভালো মার্কেট পাইছে । দলে দলে আমার কলেজ ফ্রেন্ডরা ভর্তী হোল , এক বন্ধু তার মায়ের জমানো টাকা ডয়ার থেকে চুরি করে নিউ ওয়েতে দিলো !!! সব ফ্রেন্ডরাই আমাকে জোর করতো নিও ওয়েতে যেতে , আমি টাকা নাই অজুহাত দিয়ে পালিয়ে বাঁচতাম । নিউ ওয়ের প্রতারণার শীকার হয়ে আমার এক বন্ধুর অধীনস্থ এক মেম্বার তাকে পিটিয়ে হাসপাতালস্থ করলো , তারপর থেকে নিউ ওয়ের ভুতটা আমাদের মাথা থেকে কিছুটা নামলো!
ঘটনা ৪; ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার, আমার এক কাজিন খুব করে ধরলো আমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাবে , আমিও তার সাথে গেলাম ! গিয়ে দেখি গ্রীহ ই প্রজেক্ট নামে আরেক এম, এল, এম । আমাকে কোটি কোটি টাকার হিসাব আর প্ল্যান বোঝালো , আমার মাথায় বরাবরের মত কিছুই ঢুকলোনা , কাজিন বলেই হ্যা হ্যা করে গেলাম । তার পর থেকে তাঁর সাথেও আমার চোর পুলিশ সম্পর্ক হতে শুরু করলো। সে ফোন করলে আমি হাওয়া , সে বাসায় আসলে আমি বাহিরে । ফলাফল তার সাথেও সম্পর্ক শেষ ।
ঘটনা ৫; শেষ পর্যন্ত আমাকেও ভুত পেলো । আমার খুব প্রিয় ২ বন্ধু পি , সি , আই নামে একটি কম্পানির নাম বললো , যেয়ে দেখি মাত্র ৭০০ টাকায় এনট্রি করাচ্ছে , এইবার বন্ধুদের চাপে পড়ে ঢুকে গেলাম এবং আমার ২ বন্ধুকেও আমার ২ হাতে বসিয়ে নিলাম , এলাকায় আমাদের সাথে ডেসটিনি গ্রুপের প্রায় যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব লেগে গেলো ! কোন কম্পানি সেরা এই দেখতে । আমি যদিও এই সবের মাঝে ছিলাম না , ৭০০ টাকা দিয়ে আইডি কার্ড পেয়ে আমি হাওয়া ! পরে ৬ মাস পর ঐ পি, সি , আই কম্পানিও হাওয়া , বাসায় কিছুই জানাইনি , জানালে আব্বু আবার হার্ট এটাক করতেন , তবে আমার দশাও আব্বুর মত'ই হোল , আমার হাতে থাকা ২ বন্ধুর টাকা দিয়ে আমিও কান ধরলাম , যাক কম টাকায় শিক্ষা নিয়েছি ।
ঘটনা ৬; পি , সি , আই যখন ফুটলো তখন আবার স্পিক এশিয়ার জোয়ার আসলো , দলে দলে ১৫ হাজার করে টাকা দিয়ে এনট্রি হোচ্ছেন , আমার এক বন্ধু ৩২ হাজার টাকা খুব কষ্টে জমিয়েছিলো একটা ল্যাপটপ কিনবে বলে , কিন্তু তার ব্রেন ওয়াশ করে দিলো স্পিক এশিয়ার টাই পড়া দালারেরা । কয়েকদিন খুব হৈ চৈ হোল , তারপর'ই চুপ , স্পিক এশিয়া আমার বন্ধুকে ফতুর করে উড়াল দিলো আকাশে , এখন সে এম,এল,এম এর কথা শুনলে ছূরি নিয়া বাইর হবে , কন্ফ্রাম! সাথে সাথে ইউনিপে টু নামের একটা কম্পানিও মানুষের টাকা এইভাবেই মাইরা ফুরুৎ হোইলো !
ঘটনা ৭; এনালগের দিন শেষ বুঝতে পাইরা এখন এম,এল,এম এর ডিজিটাল ভার্সন আসলো । কম্পিওটার কোর্স , ইন্টারনেট এ ক্লিকে ইনকাম , ডান হাত বাম হাত , ডলার ইনকাম আসলো । আগে পোড় খাওয়া ছেলে গুলাকে আবার দেখলাম বেক্কলের মত সেই এক'ই আগুলে ঝাপ দিতে , পরিচিত অনেক দোস্ত'ই আবার ফেইসবুক ওয়াল , মেসেজ বক্স ভরাই দিচ্ছে এই সব কম্পানির এড দিয়ে , মানুষের উপরে উঠার অদম্য ইচ্ছা দেখে ভালো লাগে তবে খারাপ লাগে তাদের ভালো খারাপ নির্বাচনে এতটা অক্ষমতা দেখে , ন্যাড়া বেল তলায় আর কয় বার যাবে ?
এখন নাকি আমার মত রহিম-কুদ্দুস সবাই ফ্রী ল্যান্সার !!! নেটে উড়াই ধুড়াই টাকা কামাইতেছে !! ফ্রী ল্যান্সার কারে কয় যদি একবার শিখানো যাইতো !
ঘটনা ৮; পুরান মদ নতুন বোতলে আইনা সাজাইছে ডেসটিনি , এখন ট্রী প্ল্যান , নাইজেলা , বিভিন্ন লোভনিও পন্য ক্রয়ের মাঝ্যমে আবার তারা মাঠে নামছে । সব কম্পানি ফুটলেও ডেসটিনি এখনও টিক্কা আছে , এই নিয়া ডেসটিনির দালালদের গর্ব ধরেনা । অবাক হোয়ে যাই ভার্সিটি পড়ুয়া কিছু ছেলেকে দেখে ! যারা পড়ালেখাকে দাম দেয়না , তাদের মুল লক্ষ্য বড় হোয়ে গোল্ডেন-ডাইমন্ড হবে ! আর বেশী দেরি নাই ,ডেসটিনি ফুটারো টাইম হোইছে , সাধু সাবধান !
শেষ কান্ডটা কিছুদিন আগের , এক বড় ভাই হঠাৎ কোট টাই পরে আস্থির অবস্থায় চালতেছেন এলাকায় । নাঁচতে নাঁচতে একদিন বাসায় হাজির , বললো আমার সাথে নাকি কথা আছে ! আমি তারে বসায় রাখলাম ২ ঘন্টা , সে ধৈর্য্য হারিয়ে বলেই ফেললো অন্য একদিন আসবে , আমিও মুখের ওপর বলে দিলাম ''আপনি যা বলতে আসছেন তা আমি জানি , আর আমি এখন একটা এম,এল,এম কম্পানির সদস্য (এই মিথ্যা কথাটা অনেক কাজে দেয় এদেরকে দমাতে ) , দয়া করে আমাকে আর এইসব বলবেননা ''
এইসময় আমার ডেসটিনি ছ্যাকা খাওয়া আব্বু আসলেন আর ভাইরে বললেন কেমন আছেন ? ভাই বললো ''স্যার , এলাকায় বেকারদের কর্মসংস্থান করতেছি '' বলেই আর না দাড়িয়ে দরজায় চলে গেলো । আব্বু দরজা লাগিয়ে আসলেন , ভাই চলে গেসে ভেবে আমি বলে উঠলাম ''এই এম,এল,এম এর দালালদের ধরে ধরে লাথি মারা দরকার '' ঠিক সেই সময় দরজায় জুতার মুখ ক্রেচ করে লাগানোর শব্দ পেলাম । খুব খারাপ লাগলো ভাই গালিটা শুনে ফেলাতে , অথচ উনি কত সম্মানের ছিলেন আমার কাছে !!!
এমন আরো শত শত ঘটনা বলা যাবে , যে এম , এল , এম আমাদের মত নিরীহ মানুষের টাকা আর সম্মান উভয়'ই শেষ করে দিয়েছে। কেউ হয়তো বলবেন এখানে ব্যক্তি ব্যার্থ ,এম,এল,এম এর দোষ নাই ,তাহোলে আমিও তারে বলবো সবার জন্য সব কিছু নারে ভাই , কে জানি বলছিলো এই সব এম,এল,এম দালালদের গলায় শোভা পাওয়া টাই পরতে ঐ মানুষ গুলার লজ্জা লাগেনা , লজ্জাটা পায় ঐ টাই !

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


