বন্ধুদের আড্ডা থেকেও নাকি অনেক কিছু শেখা যায়। আচ্ছা স্কুলের পড়াও যদি এভাবে আড্ডার ছলে শেখা যেত ! কমুনিকেটিভ ল্যঙ্গুয়েজ লার্নিং (CLT) কথোপথন ও পারস্পরিক মিথস্কিৃয়ার মাধ্যমে সেকেন্ড ল্যঙ্গুয়েজ শেখার এমনি একটি পদ্ধতি।

সারা বিশ্বে ইংরেজি শেখার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে সিএলটি বা কমিউনিকেটিভ ল্যাঙ্গুয়েজ টিচিং। বাংলাদেশেও এ পদ্ধতি চালু আছে, তবে কাগজে-কলমে
ধরুন, তৃতীয় শ্রেণির ইংরেজি ক্লাস। শিক্ষক ক্লাসে ঢুকেই বললেন, 'আজ আমি তোমাদের প্রিপজিশন বোঝাব।'
বলেই ইংরেজি বই থেকে প্রিপজিশন চ্যাপ্টার বের করে পড়তে শুরু করলেন। প্রিপজিশন কাকে বলে, প্রিপজিশনের উদাহরণ লিখে দিলেন ব্ল্যাকবোর্ডে। পরের দিনের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রিপজিশনের সংজ্ঞা মুখস্থ করে আসতে বললেন।
অন্য একটি স্কুলের একই ক্লাস। এই শিক্ষক তৃতীয় শ্রেণীর ক্লাসে শিক্ষক ক্লাসে ঢুকে প্রথমে শিক্ষার্থীদের সাথে কুশল বিনিময়ের পর শিক্ষক গল্পের ছলে সহজ ইংলিশে এমন আলাপ করবেন যেখনে প্রিপজিশনএর ব্যবহার বেশি। ব্যপারটা যাতে তারা লক্ষ করে তাই যা নিয়ে কথা বলছেন তার ছবি বা সামনে থাকলে সে জিনিসটি আঙ্গুল দিয়ে নির্দেশ করতে হবে এবং সমজাতীয় উদাহরন বারবার দিতে হবে। ধরা যাক উনি ক্লাসরুমের ভেতর ও তার আশেপাশের জিনিস নিয়ে কথা বলছেন- The paper is "on" my desk, You are sitting "on" the bench। এভাবে তারা এমনিতেই বুঝে যাবে যে, on কোথায় বসে, আলাদা করে গ্রামার রুল মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই। এভাবে অন্যন্য প্রিপজিশন গুলোর উদাহরণ দিতে হবে। তারপর প্রতি চারজনকে একটি ছবি দেয়া হল এবং বলা হল এই ছবিতে কোথায় কি আছে নির্দেশ করতে। গ্রুপে কাজ করার ফলে যারা একটু কম বুঝেছে তারা অন্যদেও থেকে শিখতে পারে। বাড়ীর কাজ হিসেবে ঐ দিনের সংবাদপত্র থেকে পছন্দ মত কোন একটা খররের মধ্যে প্রিপজিশন গুলো খুঁজে বার করতে হবে
পড়ানোর কৌশলের কারণে এই ক্লাসের শিক্ষার্থীরা প্রিপজিশন সম্পর্কে খুব দ্রুত জেনে গেল ও শিখে গেল। আর এই পদ্ধতিতে পড়ানোর নামই হচ্ছে কমিউনিকেটিভ ল্যাঙ্গুয়েজ টিচিং।
শুরুর কথা
গত শতাব্দীর সত্তর ও আশির দশকের কথা। বিশ্বের নানা জায়গা থেকে প্রচুর মানুষ গিয়ে ভিড় জমায় ইউরোপ ও আমেরিকায়। বাইরে থেকে আসা এসব মানুষ ভাষাগত সমস্যার মুখোমুখি হয়। ব্যাঘাত ঘটে দৈনন্দিন কাজকর্ম ও চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে। তখন ইংরেজি শেখার পদ্ধতি ছিল খুবই জটিল ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। দিনের বড় একটা অংশ ভাষা শেখার পেছনেই ব্যয় করতে হতো। তার ওপর স্কুলগুলোতে দ্বিতীয় ভাষা শেখানোর বেলায় ইংরেজি শেখাতে শিক্ষকদেরও বেশ হিমশিম খেতে হতো। তখনকার ইংরেজি ভাষা শেখানোর পদ্ধতিতে সন্তুষ্ট ছিলেন না সে সময়কার শিক্ষাবিদরা। কাজেই ভাষা শেখানোর পদ্ধতি পরিবর্তনের দাবি উঠতে থাকে ইউরোপজুড়ে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে কমিউনিকেটিভ ল্যাঙ্গুয়েজ টিচিং পদ্ধতির আর্বিভাব।
প্রতিদিন ব্যবহার করা ভাষা ব্যবহার করে এই পদ্ধতিতে ইংরেজি শেখানো হয়। শিক্ষার্থীরা একে অন্যের সঙ্গে গল্প করতে করতেও ভাষাটি আয়ত্ত করতে পারে। এই পদ্ধতিতে শিক্ষক থাকবেন গাইড ও পরামর্শক হিসেবে। শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে এমন একটি পরিস্থিতি তুলে ধরবেন, যা তারা বাস্তব জীবনে মুখোমুখি হয়। কোনো উদাহরণ দেওয়ার সময় শিক্ষার্থীর সংস্কৃতি ও অতীত অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল রাখতে হবে। পড়ানোর বিষয় এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে তারা নিজে থেকেই শিখতে পারে। কমিউনিকেটিভ টিচিং স্টাইলের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে চোখের সামনে দেখা বস্তু ও অথেনটিক টেক্সট (যেমন-সংবাদপত্র, চিঠি)। আর গবেষণার মাধ্যমে এটা প্রমাণিতও হয়েছে যে শিক্ষার্থীরা তখনই ভালো শিখতে পারে, যখন শেখার উপাদানগুলো তাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়।
বাংলাদেশে সিএলটি
সারা বিশ্বে ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ টিচিং প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে কৌশল হিসেবে পরিণত হয়েছে সিএলটি। অবাক করার মতো বিষয় হলো, বাংলাদেশে কাগজে-কলমে এ পদ্ধতিই চালু আছে! ১৯৯০ সালের আগে এই টিচিং মেথড আনুষ্ঠনিকভাবে বাংলাদেশে এসে পৌঁছেনি। বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীরা ইংরেজিতে খুব দুর্বল এবং তারা বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ করতে পারে না। ২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকার ও ডিএফআইডি (Department for International Development) যৌথ উদ্যোগে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত কমিউনিকেটিভ ইংলিশ পাঠ্য বই প্রণয়ন করে।
এর মূল লক্ষ্য ছিল-
১. মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়ভিত্তিক পাঠ্য বই প্রণয়ন (English For Today)
২. শিক্ষকদের কমিউনিকেটিভ ইংলিশ শেখানোর ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া।
এর ফলে পুরনো বইগুলোকে সিএলটির আদলে ঢেলে সাজানো হয় এবং বেশ কিছু স্কুল শিক্ষককে এর ওপর ১৩ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
তবু পিছিয়ে
দীর্ঘ ১৬ বছর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন শায়লা আহমেদ। বর্তমানে আমেরিকান ইন্টারন্যশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের লেকচারার। তিনি বলেন, 'আগে বইগুলোতে শুধু বিদেশি লেখকদের লেখা গল্প-কবিতা ছিল। তখন পরীক্ষার আগে নোট মুখস্থ করলেই হতো। কমিউনিকেটিভ চালু হওয়ার পর গল্প-কবিতার পাশাপাশি আমাদের দেশের পরিচিত টুকরো ঘটনা দিয়ে সাজানো হয়। আর এখন পরীক্ষার হলেই একটা প্যাসেজ পড়ে বুঝে তা থেকে উত্তর লিখতে হয়।
এত সবের পরও প্রকৃতপক্ষে পরিবর্তন এসেছে খুব সামান্যই। এখনো ক্লাসে শিক্ষক বলতে বলতে আর বোর্ডে লিখতে লিখতে ক্লান্ত আর পেছনে বসে ছাত্ররা ঝিমাতে থাকে। ইংরেজির নাম শুনলেই তাদের মনে ভীতির সঞ্চার হয়।'
কেন পিছিয়ে
বাংলাদেশে সিএলটি চালু হওয়ার কয়েক বছর পর এর অবস্থা নিয়ে রোমানা সিদ্দিক গবেষণা করেন। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশে বাংলা মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলোতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে সিএলটি।'
বাংলাদেশে সিএলটির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে রোমানা সিদ্দিকের গবেষণা থেকে জানা যায়-
১. আমাদের শ্রেণিকক্ষে অধিক শিক্ষার্থী, একটি ক্লাসে ১৫০-এর ওপরে শিক্ষার্থীও দেখা যায়। তারা বোর্ডের লেখা স্পষ্ট দেখতে পায় না। একজন শিক্ষকের পক্ষে এত বড় ক্লাসের প্রত্যেক ছাত্রের প্রতি মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না।
২. আমাদের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান নেই বেশির ভাগ স্কুলে। সীমিত বেতনের কারণে শিক্ষকদের প্রায় সবাই প্রাইভেট পড়ান। ফলে স্কুলের ক্লাসে অতটা আন্তরিক হন না। সিএলটি শিক্ষকদের ক্লাসে কৌশলী হতে হয়। সে জন্য ক্লাসের আগে শিক্ষকদের অনেকটা সময় দিতে হয়। কিন্তু টিউশনির ব্যস্ততার কারণে তাঁরা তা পারেন না।
৩. আমাদের ক্লাসরুমগুলোর আসনবিন্যাস কমিউনিকেটিভ পদ্ধতিতে শেখা আর শেখানোর পথে অন্যতম বাধা। এখানে সারিবদ্ধভাবে লম্বা বেঞ্চ রাখা হয়, যা শুধু লেকচার শোনার জন্য উপযোগী; সিএলটি সহায়ক নয়। সিএলটি ক্লাসরুমে গ্রুপওয়ার্ক ও পেয়ারওয়ার্কের জন্য আলাদা চেয়ার দরকার, যাতে তারা সহজে স্থান পরিবর্তন করতে পারে।
৪. সেই গুটিকয়েক দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি, যেখানে কোনো বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ছাড়াই একজন শিক্ষকতা শুরু করতে পারেন।
৫. কমিউনিকেটিভ লার্নিংয়ের জন্য ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে যে সহজ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রয়োজন, সেটা আমাদের দেশে সহজভাবে দেখা হয় না।
তাহলে উপায়
শায়লা আহমেদ বলেন, 'প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকায় যেতে হয়। বেশির ভাগ শিক্ষকই গ্রামের। যাতায়াত খরচের কারণে এবং শিক্ষকদের প্রায় সবাই প্রাইভেট টিউশনি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বলে যেতে চান না। প্রশিক্ষণ যদি ঢাকামুখী না হয়ে গ্রামে গ্রামে বা থানায় থানায় গিয়ে ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে শিক্ষকরা প্রশিক্ষণে অংশ নিতে পারতেন এবং তুলনামূলক সুফল পাওয়া যেত।
শুধু পাঠ্য বই সিএলটি পদ্ধতিতে করে দিলেই তো আর হলো না; সুফল পাওয়ার জন্য প্রয়োজন এর যথাযথ প্রয়োগ। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে যত দ্রুত সমাধান করা যাবে, ততই ইংরেজি শেখার এই পদ্ধতি আমাদের শিক্ষার্থীদের কাজে লাগবে।'
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ৮:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





