
ভোটের আগে বলা হয়েছিল, ক্ষমতায় এলে প্রথম আঠারো মাসেই এক কোটি মানুষকে চাকরি দেওয়া হবে। কথাটা শুনে দেশের বেকার তরুণেরা তো মহাখুশি, কেউ ভাবল সরকারি চাকরি হবে, কেউ ভাবল ব্যবসা করার একটা সুযোগ পাওয়া যাবে, কেউ ভাবল অন্তত বিদেশে যাওয়ার একটা রাস্তা খুলবে। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই বোঝা গেল, কর্মসংস্থান শব্দটার মানে বোধহয় একটু অন্যরকম করে বুঝতে হবে। কারণ একদিকে সরকার বলছে বেকারদের ঋণ দেব, উদ্যোক্তা বানাব, বিনিয়োগ আনব। আর ঠিক তার পাশেই সরকারি চাকরির পরীক্ষায় নতুন এক নিয়ম আনার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে, যেখানে লিখিত পরীক্ষার চেয়ে ভাইভার গুরুত্ব রাতারাতি বেড়ে গেছে। মানে এক হাতে চাকরির লিফলেট বিলি হচ্ছে, আরেক হাতে সেই চাকরির দরজায় নতুন তালা লাগানো হচ্ছে।
খসড়া বিধিমালা বলছে, এগারো-বারো গ্রেডে আগে ভাইভা ছিল মাত্র দশ নম্বরের, এখন হয়ে যাচ্ছে পঞ্চাশ। লিখিততে পাস করার জন্য আগে লাগত পঞ্চাশ শতাংশ, এখন লাগবে মোটে পঁয়ত্রিশ। তেরো-ষোলো গ্রেডেও একই কাহিনি, ভাইভা দশ থেকে লাফ দিয়ে চল্লিশ। আর সতেরো-বিশ গ্রেডে গিয়ে তো লিখিত আর মৌখিক একেবারে জমজ ভাই, দুটোই পঁচিশ নম্বরের। হিসাবটা সহজ করে বলি। ধরেন আপনি সারারাত পড়াশোনা করে লিখিততে পেলেন পঁয়তাল্লিশ, ভাইভায় আপনাকে দিয়ে দিল দশ, মোট পঞ্চান্ন। আর পাশের সিটে বসা ছেলেটা লিখিততে কোনোমতে ত্রিশ পেয়ে পাস করল, কিন্তু ভাইভায় তাকে দেওয়া হলো চল্লিশ, মোট সত্তর। এখন বলেন তো, চাকরিটা কার হবে? উত্তর সবাই জানে, শুধু প্রজ্ঞাপনে লেখা নেই। নেতাকে আর মুখ ফুটে বলতেও হবে না যে রিটেনটা পাস করলেই বাকিটা তিনি দেখে নেবেন, কারণ নিয়মটাই এখন এমনভাবে বানানো হচ্ছে যাতে নেতার আর কিছু বলার দরকারই না পড়ে।
অবশ্য একটা সুবিধাও আছে এতে। লিখিততে এখন আর গাধার খাটুনি খাটার দরকার নেই, পঁয়ত্রিশ শতাংশ পেলেই তো রাস্তা খুলে যাচ্ছে। বছরের পর বছর বই মুখস্থ করা ছেলেটাকে যেন বলা হচ্ছে, ভাই এত কষ্ট করে কী লাভ, পঁয়ত্রিশ পেলেই তো আমাদের কাছে চলে আসতে পারবে, আসল খেলা তো শুরু হবে তারপর। কারণ ভাইভাও তো একটা পরীক্ষা, এটা তো খোদ উপদেষ্টা মহোদয় নিজেই মনে করিয়ে দিয়েছেন। এই যুক্তি মানলে তো ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাও দুই ভাগ করে ফেলা যায়, আগে পঁয়ত্রিশ শতাংশ পেয়ে পাস, তারপর ভাইভায় গিয়ে বোঝাতে হবে আসলে আপনি কতটা যোগ্য। চাকরির দরখাস্তেও তখন লিখে দিলেই হয়, মেধা ঐচ্ছিক, ভাইভা বাধ্যতামূলক।
মজার ব্যাপার হলো এই একই সরকার কিছুদিন আগে যখন শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে পুরোনো নিয়মে ফেরত যাওয়ার একটা খবর ফাঁস হয়ে গিয়েছিল, তখন সেটাকে চোখের পলকে গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল একটা ফেসবুক পোস্টে। অথচ যে গণমাধ্যম খবরটা ছাপিয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে না গেল কোনো মামলা, না এলো লাইসেন্স বাতিলের কোনো হুমকি। গুজব হলে যা হওয়ার কথা তার কিছুই হলো না। আর কিছুদিন পরই দেখা গেল, সেই একই জিনিস আবার হাজির হলো, শুধু জামা বদলে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব হয়ে।
সরকার যদি সত্যিই মেধার কদর করতে চাইত, তাহলে লিখিত পরীক্ষাকে আরও শক্ত করার কথা, ভাইভাকে আরও স্বচ্ছ করার কথা। চাকরিপ্রার্থীরা তো বহুদিন ধরে এটাই চেয়ে আসছে, ভাইভার নম্বর কমিয়ে লিখিতের গুরুত্ব বাড়ানো হোক। কিন্তু আমরা যেন হাঁটছি একদম উল্টো পথে। এক কোটি লোকের জন্য চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্যদিকে এমন এক ব্যবস্থা করা হচ্ছে যাতে মানুষ প্রশ্ন করতে বাধ্য হয়, চাকরি তো হবে, কিন্তু সেই চাকরির চাবিটা থাকবে কার হাতে। তবে সরকারের জন্য একটা সুখবরও আছে এখানে। দলীয় লোকের চাকরি হলেও সেটা তো কর্মসংস্থানই। ব্যাংক ডাকাতের প্রতিষ্ঠানেও লোক কাজ করে, সেটাও কর্মসংস্থান, চাঁদাবাজের অফিসে হিসাবরক্ষক থাকলেও সেটাও কর্মসংস্থান। তাহলে রাজনৈতিক তদবিরে চাকরি হলে সেটাও নির্দ্বিধায় সেই এক কোটির খাতায় ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে, লক্ষ্য পূরণ করতে তেমন কষ্টই হবে না তখন।
রাজনীতির পুরোনো গল্পও আজকাল আবার ফিরে আসছে। সাবেক এক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুরোনো একটা বক্তব্য নিয়ে বহুবার আলোচনা হয়েছে, ভাইভা পর্যন্ত যেতে পারলে তিনি দেখে নেবেন, এমনটি ছিলো কথার কথা। সেই পুরোনো কথাটাকে আজকের এই খসড়া প্রজ্ঞাপনের পাশে বসিয়ে দিলে আলাদা কিছু বলারই দরকার পড়ে না । অবশ্য একটা কথা মনে রাখা দরকার, এই বিধিমালা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, এখনো প্রস্তাবের পর্যায়ে আছে, আর ঠিক এই জায়গাটাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ। এখনই বলে দেওয়া যায়, না, আমরা এমন কিছু চাই না যেখানে লিখিত পরীক্ষায় মেধার দাম কমে যাবে, আমরা চাই মেধাবী ছেলেমেয়েরা নিজের যোগ্যতায় চাকরি পাক, কারও দরজায় গিয়ে নিজের পরিচয় বেচে নয়। তরুণদের নিয়ে সত্যিই যদি লম্বা সময়ের পরিকল্পনা থাকে, তাহলে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগটা তো হওয়া উচিত তাদের আস্থার ওপর।
ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে মানুষ তেমন কিছু বলেনি, ভেবেছে এত বছর পর ক্ষমতায় এসেছে, নিজেদের একটা রাজনৈতিক কর্মসূচি তো থাকবেই। কিন্তু সংস্কারের নামে যদি এমন সব পরিবর্তন হতে থাকে যাতে চাকরির বাজারটাই আরও অনিশ্চিত হয়ে যায়, প্রশাসনে দক্ষতার বদলে অন্য জিনিসের কদর বাড়ে, তাহলে মানুষ একদিন প্রশ্ন করবেই। মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি সচেতন, তারা চায় দক্ষ প্রশাসন, চায় মেধাবী কর্মকর্তা, কারণ যোগ্য মানুষ মানেই দ্রুত কাজ, কম ঝামেলা, একটা সচল রাষ্ট্র। কিন্তু লিখিততে পঁয়ত্রিশ শতাংশ পেয়ে শেষমেশ পঞ্চাশ নম্বরের ভাইভার সামনে দাঁড়াতে হলে প্রশ্ন উঠবেই, রাষ্ট্র আসলে কাকে খুঁজছে, সবচেয়ে মেধাবী মানুষটাকে নাকি নিজেকে সবচেয়ে ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারা মানুষটাকে। আর ভাইভাই যদি আসল পরীক্ষা হয়ে যায়, তাহলে লিখিত পরীক্ষা রাখার দরকারটাই বা কী, সোজা বলে দিলেই তো হয় যে আগামীকাল থেকে লিখিত বাতিল, সরাসরি ভাইভা, এতে অন্তত পরীক্ষার হল ভাড়া করতে হবে না, প্রশ্নপত্র ছাপাতে হবে না, আর এক কোটির টার্গেট পূরণ করতেও খরচ কম পড়বে।
দেশ নেতার স্লোগান টেক ব্যাক বাংলাদেশ, মানুষ ভেবেছিল এর মানে দেশটাকে আবার ভালো একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া, দুর্নীতি কমবে, প্রশাসন দক্ষ হবে, চাকরিতে মেধার দাম বাড়বে। কিন্তু টেক ব্যাক বাংলাদেশের মানে যদি হয়ে দাঁড়ায় পুরোনো তদবির সংস্কৃতি আর পুরোনো ভয়কে আবার ফিরিয়ে আনা, তাহলে সমস্যাটা একটু অন্য জায়গায়। জুলাইয়ে যে প্রজন্ম রাস্তায় নেমেছিল, যাদের এত প্রাণ গেছে, তারা এই স্বপ্নভঙ্গের হিসাব মনে রাখবে না, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। ক্ষমতায় বসে যদি নতুন সরকার তাদের প্রত্যাশার বিপরীতে হাঁটতে শুরু করে, তাহলে একসময় দূরত্ব তৈরি হবেই, তখন সরকার হয়তো বলবে আমরা তো অনেক কাজ করেছি, শুধু আমাদের সমালোচনাই করা হলো, কিন্তু জনগণ তখন আর সেই পুরোনো সহানুভূতিটা দেখাবে না, কারণ মানুষ সরকারকে শুধু অতীত দিয়ে বিচার করে না, আজ কী করছে সেটা দিয়েই বিচার করে।
প্রথমে মনে হয়েছিল সরকার হয়তো লম্বা রেসের ঘোড়া হয়ে এসেছে, অন্তত দুই মেয়াদ থাকার মতো ভিত গড়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত দেখলে মনে হয় সরকার যেন টেস্ট ম্যাচ খেলতে মাঠে নামেইনি, টি টোয়েন্টির মতো তাড়াতাড়ি কিছু রান তুলে স্কোরবোর্ডে বড় সংখ্যা দেখিয়ে চলে যাওয়ার একটা তাড়া আছে। কর্মসংস্থান লাগবে তো সংখ্যাটা বলে দাও, এক কোটি। সংস্কার লাগবে তো যত দ্রুত সম্ভব করে ফেলো। চাকরি দিতে হবে তো ভাইভার নম্বর বাড়িয়ে দাও। মেধা যাচাই করতে হবে তো লিখিতের নম্বর কমিয়ে দাও। আর মানুষ প্রশ্ন করলে উত্তরও রেডি আছে, ভাইভাও তো একটা পরীক্ষা। এই একটা বাক্য দিয়েই যেন বছরের পর বছরের রাত জাগা, কোচিং, বই কেনা, মডেল টেস্ট আর পরিবারের শেষ সম্বল খরচ করে চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার গোটা গল্পটাকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দেওয়া যায়।
সবার মনে রাখা উচিত, বেকার তরুণেরা শুধু চাকরি চায় না, তারা চায় একটা সমান মাঠ। তারা চায় পরীক্ষার হলে কারও পরিচয়ের সাথে প্রতিযোগিতা না করতে হোক, তাদের মেধার সাথে কারও মামা-খালুর জোর বা টাকার প্রতিযোগিতা না হোক, ভাইভা থাকুক তাতে সমস্যা নেই, কিন্তু ভাইভা যেন লিখিততে অর্জিত মেধাকেই উল্টে দেওয়ার অস্ত্র হয়ে না ওঠে। এক কোটি কর্মসংস্থান সত্যিই যদি করতে হয়, তাহলে আগে নিশ্চিত করতে হবে সেই এক কোটির মধ্যে যোগ্য মানুষগুলো চাকুরির সুযোগ পাচ্ছে কি না, নইলে এক কোটি চাকরি হয়তো সত্যিই হয়ে যাবে, শুধু প্রশ্ন থেকে যাবে সেই তালিকায় মেধাবী আর যোগ্যদের নাম আদৌ আছে কি না। আর সরকার যদি এই প্রশ্নের জবাব দিতে না পারে, তাহলে মানুষের মনে খুব স্বাভাবিকভাবেই আরেকটা প্রশ্ন ফিরে আসবে, এক কোটি কর্মসংস্থানের নামে সরকার আসলে মেধাবীদের জন্য চাকরি তৈরি করছে , নাকি মেধাবীদের প্রবেশ নিষেধের একটা নতুন সাইনবোর্ড বানাচ্ছে ?


ফটোকার্ড ক্রেডিট : ইন্টারনেট
সরকারি চাকরির ভাইভায় নম্বর বৃদ্ধির প্রতিবাদে ডাকসুর বিক্ষোভ : https://www.ittefaq.com.bd/808613

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

