
হঠাৎ করে ফারহানের ঘুম ভেঙ্গে গেলো ইনকামিং কলের শব্দে। সচরাচর সে অত তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে না।ঘুম ঘুম চোখে কল দাতার উপর রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে কল রিসিভ করতে দেখে তারানার কল। সে ভুলেই গেলো যে, গত রাত্রে তারানাকে বলেছিলে সকাল সকাল তাকে নক দিতে। অন্যান্য দিন ফারহানের অফিসে যাওয়ার আধাঘন্টা অাগে ফারহানের আম্মু ঘুম থেকে জাগাতে গেলে সে বকাবকি করে আর আজ কোন নক ছাড়াই সকাল সকাল উঠে গেলো তাও আবার অফ ডে-তে।
ফারহানা ঘুম থেকে উঠেই ব্রাশ করার আগে আগে নেইল কাটার খোঁজে, ফারহানের আম্মু আকষ্মিক তাকে সকাল সকাল উঠতে ও নেইল কাটার খুঁজতে দেখে জিজ্ঞাসা করলো.....
ঘড়িতে ৭.15 মিনিট, কোথাও যাবি নাকি??
আজতো অামি নামাযের আগে ও অফিসের আধাঘন্টা আগে উঠতে বকাবকি করিনি, আজ উঠালে কে শুনি?? ফারহান হতভম্ভ হয়ে বলে কিছু না, এমনিতে ঘুম ভেঙ্গে গেলো তাই গোসলের আগে নখ কাটার জন্য নেইল কাটার খুঁজি। ফারহানের আম্মু নেইল কাটার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে আজ না জানি কাকে বকা দিলি, এমনিতে কয়েকবার তোর ফোনে কল আসল।নখ না কাটলে যে তার আজ কুমিল্লা ট্যুর বিফলে যাবে তাতো আম্মুকে বলতে পারছে না। এমনিতে তারানা ফারহানকে এই ব্যাপারে কয়েকবার বলেছে কেননা তারানা নখ রাখা পছন্দ করে না, তারানা ফারহানকে প্রায় বলে নখ রাখলে এবাদাত কবুল হয় না। তাই তারানাও চায় যে যাতে নখগুলো কাটে যদিও ফারহান নখগুলো শখ করে রেখেছে।
তারানার সাথে ফারহানের সম্পর্ক আজ চার মাস গড়ালো। চার মাসের মাথায় এই প্রথম তারানা ফারহানকে অফার করলো কোথাও বেড়িয়ে আসতে। কোথায় যাবে তার কোন সিদ্ধান্ত না দিয়েই সকাল সকাল উঠতে বলেছে ফারহানকে তার প্রিয়তমা। ফারহানের ইচ্ছে দূরে কোথাও যাবে কিন্তু তারানা তাতে রাজি নন।পরবর্তীতে ফারহান কুমিল্লার প্রস্তাব করেন। তাও ঠিক করে বলেনি তারানা শুধু বলল সকাল সকাল উঠতে।
নখ কেটে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা না করেই দ্রুত বেরিয়ে গেলো। তারনাকে ফোন দিয়ে বলে আমি কোথায় দাঁড়াবো? উত্তরে তারানা বলে মানে?? আমি সকাল সকাল উঠে আম্মুর চোখে সন্দেহের পাত্র হয়ে নাস্তা না করেই বেরিয়ে আসছি তুমি কী বলছ? তারানা বলে আমি নামায পড়ার জন্য তোমায় ফোন দিলাম। আমি ফযরের আযানের পর থেকে ফোন দিয়ে যাচ্ছি নামায পড়ার জন্য কোথাও বেরুতে নয়, তুমি ফোন ধরতে সাড়ে ছয়টা বাঁজল তাতে আমার কী আছে?? আমি তো তোমায় সকাল সকাল উঠানোর জন্য এমনটি করেছি। ফারহান ক্ষোভে বলল আমি তোমার জন্য সন্দেহের পাত্র হয়েছি, আজ না আসলে আর কোনদিনই যাবো না। তারানা বলে মাত্র গোসল শেষ করেছি রেডি হয়ে আসছি। তুমি ওয়েট কর। ফারহান শস্তির নিশ্বাস ছেড়ে বলে থ্যাংকু পাগলি আসো তাড়াতাড়ি। নির্ধারিত স্থানে বসেই আছে ফারহান একসাথে নাস্তা করবে মনে করে নাস্তাও করেনি। রেডি হতে আর কতক্ষনই বা লাগবে একসাথেই নাস্তা করি। কিন্তু কে জানতো তারানার রেডি হতে হতে যে এগারোটা গড়াবে। পরে একাই নাস্তা সেরে অনবরত তারানার নাম্বারে ফোন দিতেই আছে, কখনো ফোন রিসিভ করে বলছে ৫ মিনিট, 5 মিনিট পরে বলে আসতেছি, 5 মিনিট মনে হয় তারানার ঘড়ির কাটায় 30 মিনিটের সমতুল্য ফারহান মনে মনে ভাবে। পরবর্তীতে ১১ টায় আসলো তারানা, ফারহান শুধু এইটুকু বলল মেয়েদের রেডি হয়ে অাসছি বলে কোন মেয়ে যদি বলে তা হলে সে তিন ঘন্টা পরেই নির্ধারিত স্থানে যাবে। আমার জানা ছিলো না তারানা তোমার ঘড়ির কাটা এত স্লো!! শেষ পর্যন্ত তর্কে না গিয়ে চল বাস স্ট্যান্ড-এর দিকে যাওয়া যাক, তারানা বলে বাস স্টান্ড কেন? আমরাতো মেঘনার তীরে যাচ্ছি। ফারহান বলে সেখানেতো প্রায়ই যাওয়া হয়, এখান থেকে মাত্র 35 কিঃমিঃ, এই তোমার দূরে কোথাও বেড়ানোর জায়গা?? শেষে রাজি হল ফারহান, জোর করলে তারানা সোজা বাসায় চলে যাবে তাই জোর না করে তার কথায় রাজি হয়ে সিএনজিতে উঠে সোজা ফারহানের বন্ধু জামসেদের নিকট যায়, তারানা জানেনা জামসেদ কে, কি করে আর ফারহানের সাথে কী সম্পর্ক, তারানার ইচ্ছে ছিল নদীর পাড়ে সে আর ফারহান একাই ঘুরবে, কিন্তু ফারহানের মনে ছিল অন্যটা সে তার বন্ধু জামসেদের নিকট শুনেছে নদীর পাড়ের লোকেরা নাকি ভালো না থুব ক্ষেত টাইপের হয় এবং সুযোগ বুঝে হিংস্রও বটে। কয়েকদিন আগে ফারহানের বন্ধু জামসেদের নিকট গল্প শুনছে..........
নদীর পাড়ে বেড়াতে যাওয়া দুইজন (প্রেমিক প্রেমিকা) নৌকা নিয়ে নদীতে বেড়াতে গেলে মাঝি যাওয়ার সময় দ্রুত চালিয়েছে। নৌকায় বসে দুজনের মাঝে তৃতীয় এক ব্যক্তিকে নিয়ে কথা কাটাকাটি করতে করতে সন্ধ্যা গড়িয়েছে, দুজনের মধ্যে কারো খেয়াল ছিল না যে, সন্ধ্যা হচ্ছে কিংবা তারা আবার আসতে হবে ঝগড়ায় ব্যস্ত। তারা মাঝিকে বলতে লাগলো নৌ্কা ফেরাতে কিন্তু মাঝি ধীরে ধীরে নৌকা ফেরায় এবং খুব ধীর গতিতে চলতে থাকে। যতই মাঝিকে বলে দ্রুত যাওয়ার জন্য মাঝি ধীরেই চলছে আর ফোনে কাকে জানি ফোন দিয়ে ইশরায় কী বলছে। কিছুক্ষণ পর মাঝ নদীতে বিপরীত দিক থেকে আরও একটি নৌকা এসে ৪-৫ জন বখাটে লোক এসে তাদেরকে আটক করে ছেলেটিকে বেদম মারধর করে মেয়েটিকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে । মেয়েটি তখনো ছেলেটিকে ভুল বুঝলো এবং বলে তুমি আর বাদ থাকবে কেন আসো। ছেলেটি বাঁধা অবস্থায় মাথা নত করেই বসে আছে। মেয়েটি ভাবল ছেলেটি নাটক করে এসব করেছে। পরবর্তীতে মাঝিদের মধ্যে মেয়েটির বাবার সমতুল্য লোকটিকে বলল প্লিজ আংকেল আমাকে ছেড়ে দেন, আমার বাবাও আপনার সমবয়সী। লোকটি বলে আচ্ছা চল তোকে ছেড়ে দিব বলে লোকটির বাড়ীতে নিয়ে যায় এবং বাড়ীতে মাঝির বৌ-স্ত্রী থাকা শর্তেও লোকটি মেয়েকে পুণরায় নির্যাতন করে। আর ছেলেটিকে ভোর অবদি পর্যন্ত বাহিরে বেঁধে রাখে।
শুনে খুব ভীত হয়েছে ফারহান এবং সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় যদিও কাউকে নিয়ে যায় একা যাবে না তাই তার সাথে জামসেদকেও নিল। তারানার সাথে জামসেদের পরিচয় করে দিল ফারহান এবং বলে ও অামাদের সাথে যাচ্ছে। তারানা কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারেনি কারন জামসেদ তাদের সাথে মিশেই জুকার টাইপের কয়েকটি কথা বলে নিজেকে জুকার সাজিয়েছে এবং তারানাও সামনা সামনি কিছু বলতে পারছে না। পুণরায় তারা লেগুনাতে ছড়ে সোজা মেঘনার পাড়ে যায়। উক্ত সময়ে মেঘনার পাড়ে বসার কোন উপায় নেই মাথার উপর সুর্যটা। এই দুপুরে নদীর পাড়ে ঘুরার কারো ইচ্ছে নেই।প্রশান্তির চেয়ে খারাপই বেশি লাগবে। পরে তারা পাশেই একটি হোটেলে দুপুরে খাওয়া সেরেছিল যদিও তারানা এই প্রথম এই রকম পরিবেশে খাচ্ছে। নিজেকে যেকোন জায়গায় মানিয়ে নিতে পারে তারানা তাইতো জামসেদের উপস্থিত তার কাম্য ছিল না তাও তার সাথে হেসে কথা বলা, এই রকম পরিবেশে কখনো খায়নি তবুও খাচ্ছে যদিও পরে ফারহানকে ফোনে বকা দিল যে, তার পেট ব্যথা করছে।
খাওয়া শেষে তারা নদীর পাড়ে যায়। ফারহানের ইচ্ছে ছিল তারানার সাথে ছবি তুলবে এবং জামসেদকে ছবি উঠানের জন্য বললে তারানা ছবি উঠাতে রাজি নন। শুধু বলে তোমরাই উঠাও আমি নিজের ছবি উঠাই না তবে অন্যকে ছবি তুলতে সাহায্য করি পরে জামসেদ বলে ঠিক আছে তাহলে আমাদের ছবি উঠাও। জামসেদের ছবি তুলতে গিয়ে জামসেদ এঙ্গেল হতে দাঁড়াতে সে পড়ে গিয়ে কোমরে মারাত্মক ব্যথা পায়। লজ্যায় জামসেদ কাঁদতে পারছে না, তারানা ও ফারহান ভাবছে ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু সে নীচ থেকে উঠতেই পারতেছে না এ অবস্থা দেখে ফারহান দৌড়ে গিয়ে তাকে উঠাতে গেলে তাও সে উঠতে পারে না। তার কোমরে পূর্বে একবার এমন ব্যথা পাইছে ডাঃ বলেছে কিডনির সমস্যা ডাইয়ালায়সিস করা লাগবে। পেইন কিলার খেয়েই দমন করেছে সে। পাক্কা দশ মিনিটেরও বেশি শুয়ে ছিলো আশ পাশের লোকজন তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছে আর বলছে....
“উচিত কাম অইছে, এতক্ষণ আসের আর ওন আসা বারি গেছে”। তারা কোন সাহয্য না করে বরং উস্কানি মুলক ভাব দেখায় এবং উত্যক্তমুলক কথা শুনে ফারহান বুঝেছে যে সত্যি নদীর পাড়ের মানুষজন আসলে ক্ষেত টাইফের। তারা সমবেদনা বুঝে না, কারো কান্না দেখলে তাদের হাসি পায়, তারা হয়ত বুঝেনি জামসেদ কতটা ব্যথা পেয়েছে কিন্তু পাক্কা দশ মিনিট শুয়েও তাদের মনে ধারণা যোগায়নি যে, ছেলেটা সত্যি ব্যথা পাইছে তারা কেউ এগিয়ে আসে নাই। ফারহান বুঝতে পারছে যে, তাদের মাঝে এখনও কুসংস্কার ভাব রয়েই গেলো, কয়েকটা মেয়ে ছেলে একত্রে দেখলে তাদের মনে বিরূপ ধারণা আসে, তারা ফ্রেন্ডশীফ বুঝে না, ভালোবাসা বুঝে না, ঐ পরিবেশে থাকতে থাকতে তারা শুহুরের লোকদের অন্য চোখে দেখে।
ফারহান জামসেদের নিকট শোনা জীবন থেকে নেওয়া গল্পটিকে ভুল মনে করতো যদি সেদিন এই রকম পরিস্থিতিতে সেখানকার লোকদের এরূপ আচরন না দেখতে পেতো।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে অক্টোবর, ২০১৭ দুপুর ১২:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


