somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সামাজিক দায়বদ্ধতা ও ছিচকে মাস্তানদের দৌরাত্ম

২৩ শে অক্টোবর, ২০১৫ বিকাল ৪:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


একটা সময় ছিল যখন এ দেশে ছিচকে চোরের বর উৎপাত ছিল। মূলত তার কারণ ছিল তখনকার সময়ে দেশের অর্থনীতি। যা তখন সমাজের একটি অংশের মানুষকে বেচে থাকার তাগিদেই এমন সব অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকতে বাধ্য করেছিল।
চাইলেই কাজ পাওয়া যেত না। গ্রামে গঞ্জে কারো ঘরেই উদ্বৃত্ত খাবার ছিল না। সাধারন মানুষের জীবন ধারণ সত্যিই তখন খুব কঠিন ছিল।
দেশের সার্বিক অর্থনীতির উল্লম্ফন। নিম্ন বিত্তের কর্ম সংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়া। রেমিটেন্সের প্রবাহ বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে এখন আর সেইসব ছিচকে চোরের কথা শোনা যায় না। তবে তার জায়গাটাই দখল করেছে ছিচকে মাস্তান বা ছিচকে সন্ত্রাসীরা।

এই ছিচকে মাস্তান বা ছিচকে সন্ত্রাসী অন্য কোন দেশ থেকে আমদানি করা কোন বস্তু তো নয়; এরা আমাদের সমাজেরই অংশ। এরা মূলত বাবার অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদের কুফল আর আমাদের দেউলিয়া রাজনীতির ফসল।
এই সব সন্ত্রাসীরা তৈরি হয় মুলত দুই ভাবে- পারিবারিক সুশাসনের অভাব আর রাজনীতিবিদদের সন্ত্রাসী লালনের মানসিকতা থেকে। মূলত দুর্নীতিবাজরা নৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলে বলে তারা তাদের সন্তানদের শাসন করতে পারে না। সন্তানের প্রতি তারা দায়িত্বও পালন করে এক গাদা টাকা দিয়ে। যা তাদের সন্তানদের মানুষ হওয়ার পরিবর্তে দিন দিন অমানুষ হিসেবেই গড়ে তোলে।
আর এ দেশের রাজনীতিবিদগণের আধিপত্য বিস্তারের জন্য সন্ত্রাসী তো পুষতেই হয়। কারণ তারা ভাল কাজের দ্বারা এবং ভাল মানুষের চেহারা প্রদর্শনের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন। বিশেষত মধ্যম শ্রেণীর রাজনীতিবিদগন অনেকটাই এমন। তারা আধিপত্য বাদে বিশ্বাসী। তারা ভালবাসা দিয়ে জয় করতে নয় ভয় দেখিয়ে আদায় করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন ।
আর তা করতে হলে সন্ত্রাসী পুষতেই হবে। এত সন্ত্রাসী তারা কোথায় পাবেন? কাজেই সন্ত্রাসী তৈরির সুমহান দায়িত্বটিও অনেকটা তারাই পালন করেন।

যদিও এর দায় থেকে আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাও একেবারে মুক্ত নয়। নিতি নৈতিকতা বিবর্জিত জাগতিক লাভা লাভের হিসাব সংশ্লিষ্ট এই শিক্ষা ব্যবস্থা জীবিকার প্রয়োজনানুযায়ী যত বড় সনদ দিতেই সক্ষম হোক না কেন। তা যেন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে যে ন্যুনতম ভুমিকা রাখতে সক্ষম নয় তা বলাই বাহুল্য।
এর বাইরেও সামাজিক নানা অসঙ্গতি তো রয়েছেই।

এই ছিচকে মাস্তান বা ছিচকে সন্ত্রাসীদের মুল স্বীকার সাধারণ মানুষ। যারা কেবল মাত্র বেঁচে থাকার জন্যই নিত্য সংগ্রামে লিপ্ত। এই সাধারণ মানুষদের মধ্যে আবার নেই কোন সামাজিক বন্ধন। এরা একই দেয়ালের এপাশে ওপাশে এমন ভাবে থাকে যেন সেটা বার্লিনের দেয়াল যা অতিক্রমের সুযোগ নেই। আর এই বিচ্ছিন্ন জীবন যাপনের সুযোগটিই সন্ত্রাসীরা নিয়ে থাকে। কারণ তারে জানে এর প্রতিবাদ হবে না। কেউ তাদের সমাজচ্যুত করবে না। কেউ ধরে দুই গালে কষে দুটি চর বসিয়ে দেবে না। অতএব ভয়ের তো কোন কারন নেই। এখানে জোড়টাই আসল কথা।
একটা সময় ছিল; যখন সমাজ ছিল। সমাজের মান্যবর মানুষরা সামাজিক বিচারের মাধ্যমে মানুষের নিরাপত্তায় অনেক খানি ভূমিকা রাখতেন। এখন
সে ব্যবস্থা নেই। আর এই না থাকার সুযোগেও একদল মানুষ এর নামেও করছে যথেচ্ছাচার!
ফলে সামাজিক বিচারের নামে হচ্ছে প্রহসন। ধর্ষণের বিচার হল; ধর্ষকের সাথে ধর্ষিতার বিয়ে অথবা টাকা দিয়ে সকলের মুখবন্ধ। কাজেই সন্ত্রাসীরা জানে এ অবস্থায় কিচ্ছুটি হবার নয়। যদিও বা খুব বেশি হয় তাও ঐ থানা - পুলিশ পর্যন্ত। সেক্ষেত্রে বড় ভাই(?) নেতাদের(?) আশীর্বাদ তো তাদের পাওনাই রয়েছে।
এই যখন সার্বিক চিত্র তখন সাধারণ মানুষ এদের দমনের জন্য রাষ্ট্রের দিকেই যে তাকিয়ে থাকবে তাতে আর সন্দেহ কি? কিন্তু রাষ্ট্র যন্ত্রের পক্ষে একা যে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় সেটা যেন আজ আর আমরা কেউ বুঝতেই চাই না। ফলে দিনকে দিন এই ছিচকে সন্ত্রাসীরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে।

এই সব ছিচকে মাস্তান বা ছিচকে সন্ত্রাসীদের ঠেকাতে হলে শুধুমাত্র রাষ্ট্রের ঘাড়ে সব ভার না চাপিয়ে সকলকেই উদ্যোগী হতে হবে। এদের রুখতে হলে এগিয়ে আসতে হবে সমাজকেই। সর্বতোভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমাদের এটা মনে রাখা উচিৎ-
এরাই রাজনৈতিক সন্ত্রাসে ভাড়ায় খাটে।
এরাই সমাজে ক্রমাগত বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে।
এরাই ধর্ষক।
এরাই ছিনতাইকারী।

অথচ এরা আর কেউ নয় আপনার আমার ঘরেরই পালিত বেয়াড়া সন্তান। দয়া করে এদেরকে প্রশ্রয় দিবেন না, কোনভাবেই না। আজ এই সন্ত্রাসের জন্য স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে গৃহবধূ পর্যন্ত নিরাপত্তাহিনতায় ভুগছে। তারা নানাভাবে উত্ত্যক্ত হচ্ছে। হচ্ছে শ্লীলতাহানির স্বীকার। এমনকি ধর্ষণ পর্যন্ত এদের নিত্যদিনের কারবার।
একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখা যায় তা হল আমরা একজন অপরাধীকে ঠিক অপরাধ করার মুহূর্তে দুর্বৃত্ত বলে চালিয়ে দিচ্ছি। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার অব্যবহিত পরেই যাতে সে ধোপ দুরস্ত ভাল মানুষটি সাজার সুযোগ পায়। এটা কি সচেতনভাবেই করছি নাকি অসচেতন ভাবে সেটাও এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

আজও আমরা ভাবতে পারছি না যে, কোন ব্যক্তি মাত্রই আক্রান্ত হচ্ছে না। কিংবা কোন এক নারী ধর্ষণের স্বীকার হচ্ছে না। মূলত আক্রান্ত হচ্ছে সমাজ। আজ আপনি বা আপনার সন্তান বেঁচে গেছে কাল তারাও একইভাবে আক্রান্ত হবে। কেন যেন আমাদের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গাটিই তৈরি হচ্ছে না। জাগ্রত হচ্ছে না মানবতা বোধ। আমরা প্রত্যেকেই যে যার স্থান থেকে নিজেকে বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি।
কি অদ্ভুত ব্যাপার, সন্ত্রাসীরা একতাবদ্ধ হচ্ছে আর আক্রান্তরা দিন দিন আলাদা ভুবনের বাসিন্দা হচ্ছে! ফলে আজ আমরা প্রত্যেকেই নিরাপত্তা হীন হয়ে পড়ছি।

একজন মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, প্রতিবেশী ফিরেও তাকাচ্ছে না! আধুনিকতা আর ক্ষেত্র বিশেষে প্রয়োজন এই দু'য়ের চাপে এমনিতেই আমরা আজ একক পরিবারের নামে বিচ্ছিন্ন জগতের বাসিন্দা। তার উপরে চরম স্বার্থপরতা আমাদের দিন দিন অমানুষ করে তুলছে। ফলে পাশাপাশি দুই ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের মধ্যে কোন যোগাযোগ নেই। এক ফ্ল্যাটের কান্নার রোলও পাশের ফ্ল্যাটের বিবাহ বার্ষিকীর অনুষ্ঠানের লাউড স্পিকারের উন্মাতাল গানের শব্দটা পর্যন্ত কমাতে পারছে না।

কে বাঁচল কে মরল কারো যেন কোন দায় নেই। এটা কি মানব সমাজ? আমরা দিন দিন যতটা না উন্নত জীবনের সাধ নিচ্ছি ততোধিক অমানবিকতার পরিচয় দিচ্ছি। যে উন্নত জীবন অমানুষ তৈরি করে সে উন্নত জীবনের থেকে তো সাদা কালো সেই আটপৌরে জীবনই অনেক ভাল ছিল।
যেখানে মানবতা বোধ ছিল। যেখান মানুষ মানুষকে সম্মান করত, ভালবাসত, স্নেহ করত। যেখানে অনাত্মীয় পর্যন্ত প্রতিবেশীর দাবিতে শাসন করতে পারত। সামাজিক শৃঙ্খলা আজ যেন একেবারেই ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
এটা রক্ষা করা বা একে পুনর্নির্মাণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নয়। আর তা রাষ্ট্রের পক্ষে করা সম্ভবও নয়। এ জন্যে সমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে। দায়িত্ব নিতে হবে তাদেরই, আজো সমাজে যারা কিছুটা হলেও নিজেদের দায়িত্ববান বলে মনে করেন। যাদের মধ্যে থেকে মানবতা বোধ বা মানবিকতা এখনো একেবারে ফুরিয়ে যায় নি।

যদি এ সমাজ এখনো ঘুরে না দাঁড়ায় তাহলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে সন্দেহ নেই। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সে জন্যে এই প্রজন্মকেই দায়ী করবে। যে দায় আমরা কেউই এড়াতে পারব না। আজকের এই প্রজন্মের দায় পূর্ববর্তী প্রজন্মকে সাথে নিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ সমাজ বিনির্মাণ করে যাওয়া।


[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে অক্টোবর, ২০১৫ বিকাল ৫:২১
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জিন্নাহ কি বাঙালি মুসলমানের শত্রু?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৪


মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা বা পাকিস্তানের জাতির জনক। একজন বাংলাদেশী হয়ে পাকিস্তানের জাতির জনককে নিয়ে আলোচনা করলে কি গুনাহ হতে পারে কিংবা বড় ক্ষতি হতে পারে? বাংলাদেশে জিন্নাহর... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্রেফ 'জিন্নাহকে স্মরণ আর বঙ্গবন্ধুকে গালি' রাজাকারি মানসিকতারই উদাহরণ

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪



ভারতীয় উপমহাদেশের জাতিসত্তাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন নেতা হিসেবে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রতি কেউ 'যৌক্তিক' বা তাঁর 'প্রাপ্য' সম্মানটুকু জানাতেই পারেন; তাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু, যখন সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহর ছবি প্রশ্ন জাগে, আমরা কোন দেশে বাস করি?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৯

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহর ছবি প্রশ্ন জাগে, আমরা কোন দেশে বাস করি?
যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, যে বাংলাদেশ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয়েছে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু... ...বাকিটুকু পড়ুন

এগারটি বছর পার হয়ে গেল…. কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে একাদশতম বর্ষপূর্তি পোস্ট

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৪১



পূর্বের বর্ষপূর্তি পোস্টের লিঙ্কঃ দশম বর্ষপূর্তি পোস্ট

সামহোয়্যরইনব্লগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখ রাত ১১টা ২৬ মিনিটে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম কবিতা, বক্ষমাঝে থাকবে তুমি। বলা যায় খুব দ্রুতই, মাত্র তৃতীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুঃখ খচিত পতাকা আমার

লিখেছেন এম ডি মুসা, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র প্রাঙ্গণে
আজ হঠাৎ কার ছায়া নামে?
কার দুঃসাহসী কালো হাত
ইতিহাসের বুকের ওপর আঁকে পরাধীনতার নাম?

যে নাম একদিন ভাষার কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল,
যে শাসন একাত্তরে ছড়িয়েছিল মৃত্যুর অন্ধকার
আজ কেন তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×