somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জিন্নাহ কি বাঙালি মুসলমানের শত্রু?

১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা বা পাকিস্তানের জাতির জনক। একজন বাংলাদেশী হয়ে পাকিস্তানের জাতির জনককে নিয়ে আলোচনা করলে কি গুনাহ হতে পারে কিংবা বড় ক্ষতি হতে পারে? বাংলাদেশে জিন্নাহর নাম নিলে নাকি ব্রাশ করতে! স্বাধীন বাংলাদেশে জিন্নাকে আমরা চিনেছি উর্দু এন্ড উর্দু শ্যাল বি দা স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ অফ পাকিস্তান। এই বক্তব্যের মাধ্যমে। জিন্নাহ সম্পর্কে আমরা অনেকেই তাকে অন্যভাবে চিনি। মনে হয় জিন্নাহ এমন একজন লোক যে বাঙালি মুসলমানের শত্রু। যে বাংলাদেশের শত্রু। জিন্নাহ মনে হয় 71 সালে বাংলাদেশে গণহত্যা জড়িত ছিল! এইরকম ধারণা ছিল।

জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শহীদ উসমান হাদির ইনকিলাব মঞ্চ জিন্নার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছিল তাতে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছে একটি মহল। ইনকিলাব মঞ্চের জাবের সহ সবাইকে ধুয়ে দিচ্ছে এবং মনে হচ্ছে জিন্নাহর নাম নেওয়া যেন বাংলাদেশে অপরাধ!

জিন্নাহ এক জীবনে অনেক কিছু করেছেন যার কারণে তিনি ভারতবর্ষের মুসলমানদের একজন লিডার ছিলেন এবং ভারতের মুসলমানদের জন্য একটা স্বাধীন সার্বভৌম পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলতে গেলে তিনি মুসলিমদের ত্রাতা হিসেবে আবির্ভুত হয়েছিলেন। সেই পাকিস্তান থেকেই আমরা ভাগ হয়ে বাংলাদেশ হয়েছি। এখন জিন্নাহ আজকে বিতর্কের বিষয়। নন্দিত নিন্দিত জিন্নাহকে কারা পছন্দ করে? কারা ঘৃণা করে? জিন্নাহকে ঘৃণা করে ভারতের বিজেপি কিংবা কংগ্রেসের লোকজন। কারণ অখন্ড ভারতের স্বপ্নের বুকে সবচেয়ে বড় হাতুড়িটা মেরেছিল বোম্বাই হাইকোর্টের তুখুর মেধাবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যিনি ভারতকে তিন টুকরো করেছিলেন। তার মধ্যে ভারতের পূর্বে এবং ভারতের পশ্চিমে দুটা পাকিস্তান বানিয়েছিলেন । পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান সুতরাং অখন্ড ভারতের যারা স্বপ্ন দেখে তাদের কাছে জিন্নাহ আজীবন শত্রু থাকবে এটা স্বাভাবিক তারা জিন্নাহকে নিয়ে অনেক ধরনের গালিগালাজ করবে এটাও স্বাভাবিক কিন্তু একজন বাঙালি একজন মুসলমান একজন বাংলাদেশী মুসলমান হিসেবে আমাদের কি জিন্নাহকে ভালোবাসা উচিত নাকি ঘৃণা করা উচিত?

জিন্নাহ সম্পর্কে কিছু বলার আগে ভারতের কয়েকটা সংবাদ উল্লেখ করা জরুরী। ভারতের কলকাতায় একটি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল, একজন মুসলিম নারী। তাকে হিন্দুত্ববাদীরা জোর করে পদত্যাগ করাতে বাধ্য করেছে। উনার একটি অপরাধ তিনি মুসলমান। কোন মুসলমানকে ওরা ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দেখতে চান না এবং ওনাকে সরানোর পরে উনার রুমটিকে গঙ্গার জল ঢেলে পবিত্র করা হয়েছে। গেমূত্র দিয়ে শুদ্ধকরণ করা হয়েছে। নির্বাচনের পর বিজেপির একজন এমপি দিল্লিতে একটা মুসলিম কলোনিতে পানি বন্ধ করে রেখেছে এক মাস ধরে কেন তারা বিজেপিকে ভোট দেয়নি? ভারতের উত্তরপ্রদেশে সাহারানপুরে একটা মসজিদ ভেঙে দিয়েছে বুলডোজার দিয়ে। সেই মসজিদটি ১১৯১ সালের তৈরি। যে সময় ভারতরাষ্ট্র ছিল না। যেই সময় এই ধরনের আইন কানুন ছিল না। এখন আইন দেখাচ্ছে বেআইনীভাবে নাকি এই মসজিদ তৈরি করা হয়েছে। আসুন আমাদের প্রতিবেশী আসামে। আসামে গত সপ্তাহে 70 টি মুসলমানদের বাড়িঘর ভাঙ্গা হয়েছে। মুসলমানরা বলছে যে আমাদেরকে ৩০ মিনিটের সময় দেয়নি। আমাদের এই বাড়িঘর সংসার সবকিছু তসনস করে দিচ্ছে। যখন ভারতের মুসলমানরা অসহায় অনুভব করছে যখন বিজেপি বিজেপির নেতারা শুভেন্দুরা আবারো বাংলাদেশ দখল করে পাকিস্তান দখল করে আফগানিস্তান দখল করে অখন্ড ভারত তৈরির স্বপ্ন দেখাচ্ছে যেই ভারতে মুসলমানরা হবে সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন মুসলমানরা হবে নমশূদ্র সেই সময় ভারতবর্ষের মুসলমানরা আবার অনুভব করছে একজন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে এবং স্যালুট জানাচ্ছে সেই জিন্নাহকে যার তীক্ষ্ণ মেধার কারণে ভারতের বুকে জন্ম নিয়েছিল মুসলমানদের একটি আজাদ ভূখণ্ড পাকিস্তান।

১৯৫২ সাল ১৯৭১ সালে জিন্নাহ ছিল না। জিন্নাহ মারা গেছে ১৯৪৮ সালে। ৪৮ এ মারা যাওয়া জিন্নাহকে তো আমরা ৫২ কিংবা ৭১ এর জন্য দোষ দিতে পারি না। আমরা যে কুরবানি করছি গরুর গোশত খাচ্ছি উগ্রবাদী আমাদের চোখের সামনে এসে আমাদেরকে পিটাচ্ছে না হত্যা করছে না এটা বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য জিন্নাহর পক্ষ থেকে একটা উপহার। নামাজে কোন উগ্রবাদী হিন্দু এসে বাধা দিচ্ছে না আমাদের মসজিদের সামনে নাচ গান করছে না এটাও জিন্নাহর অবদান। মুসলিম হয়েও আমাকে কোন উগ্রবাদী জয় শ্রীরাম বলতে বাধ্য করছে না এটাও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর অবদান। মসজিদগুলোতে অবাধে কোরআন তেলাওয়াত হচ্ছে কোন উগ্রবাদী হিন্দু গোষ্ঠী এসে মসজিদের ভেঙে বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিতে আসতে পারছে না এটাও মোহাম্মদ আলী জিন্নার অবদান।

এবার আসি জিন্নাহকে যারা খুব ঘৃণা করে যারা বাঙালি মুসলমান নয় তারা ঘৃণা করলে কোন সমস্যা নেই। বাংলাদেশে যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে দাবিদার জিন্নাহকে ঘৃণা করে। অথচ তাদের বাপ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাজদের বাপ মজিবর আজীবন একজন জিন্নাহ ভক্ত মানুষ ছিল। মজিবর জিন্নাহর একজন কর্মী ছিল। মজিবরের লিডার ছিল সোহরাওয়ারদী। সোহরাওয়ারদী লিডার ছিল জিন্নাহ এবং জিন্নাহর নির্দেশে ভারতের মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রভূমি পাকিস্তান তৈরির জন্য মজিবর ছুটে বেরিয়েছে সিলেট থেকে চট্টগ্রাম বিভিন্ন জায়গায়। মজিবর তার "আমার দেখা নয়াচীন" বইয়ে জিন্নার ভূয়সী প্রশংসা করেছে এবং তিনি বলেছিল জিন্নাহ যদি জীবিত থাকতো পাকিস্তান কোনদিন ভাঙতো না। পাকিস্তানের আর্মিরা কখনো ক্ষমতায় আসতো না। শুধু তাই নয় জিন্নাহর মৃত্যুর পর জিন্নাহর বোন ফাতেমা জিন্নাহ যখন আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে লড়াই করে সেইদিনও শেখ মুজিব এই জিন্নাহর বোন মাদার ই মিল্লাত ফাতেমা জিন্নার পায়ের কাছে বসে আন্দোলনে শরিক হয়েছিল।

জিন্নাহর ছবিকে পিছনে নিয়ে মজিবর বিভিন্ন সমাবেশে বসেছিল।



চেয়ারে বসে আছে ফাতেমা জিন্নাহ আর পায়ের কাছে বসে আছে ভাষানী এবং মজিবরের মত আরো অনেক নেতা।



মজিবর তার জীবদ্দশায় কোনদিনও জিন্নাহ সম্পর্কে একটি কটু কথা বলেনি। মজিবর জানত জিন্নাহ কত বড় মাপের লিডার ছিলেন এবং জিন্নাহ ভারতের মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রভূমি তৈরি করছিলেন। আজকে যারা আম্লিগ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দাবিদার বলে জিন্নাহকে গালিগালাজ করে এরা আসলে মজিবের অনুসারী না এরা হলো নেহরুর অনুসারী প্যাটেলের অনুসারী। এরা জিন্নাকে চিনেছে ভারতের সিনেমা দেখে। এরা জিন্নাকে চিনেছে ভারতের নাটক দেখে। ভারতীয় লেখকদের কথা শুনে। ভারতের বয়ান শুনে। সুতরাং ভারত যেই চোখে জিন্নাকে দেখে এরা সেই চোখে জিন্নাকে দেখে। এজন্য এরা মনে করে বাংলাদেশে জিন্নাহর নাম নেওয়া যাবে না। নাম নিলেই ব্রাশ করতে হবে।

মোহাম্মদ আলী জিন্নার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় যে অভিযোগ করা হয় তিনি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছেন। এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় বাংলাদেশে আসার আগে ভারতের বিষয়ে কিছু বলতে হয়। ভারত একটা বহু ভাষার মানুষের দেশ। ভারতের একেকটা রেল স্টেশনে গেলে অন্তত তিনটা ভাষায় রেল স্টেশনের নাম লেখা থাকে। আপনি দিল্লি এয়ারপোর্টে নামেন বা দিল্লি রেল স্টেশনে নামেন সেখানে ইংরেজি আছে, উর্দু আছে। সেখানে হিন্দি আছে। আরো কয়েকটা লোকাল ল্যাঙ্গুয়েজ থাকে। অর্থাৎ ভারতের মানুষরা তো বিভিন্ন ভাষায় কথা বলে। তাদের একটা কমন ল্যাঙ্গুয়েজ দরকার। যেই ল্যাঙ্গুয়েজটা সবাই জানে। ভারতে এরকম কমন ল্যাঙ্গুয়েজ তিনটা। একটা ইংরেজি, একটা উর্দু আরেকটা হিন্দি। হিন্দি ভাষা সবাই জানে। উর্দু ভাষা ভারতের সকল মুসলমান জানে। উর্দু আর হিন্দি কাছাকাছি একটা ভাষা। এবং ইংরেজি ভাষা ভারতের সব শিক্ষিত মানুষ জানে। এজন্য ভারতের মত একটা বহু ভাষার দেশে প্রত্যেকটা স্টেশনে কমপক্ষে তিনটা ভাষার নাম লেখা আছে। এখন মোহাম্মদ আলী জিন্না দেখলো ভারতের পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বেলুচ, বাঙালি বিভিন্ন জাতির মানুষ আছে। কিন্তু কোন একটা জাতির ভাষাকে যদি রাষ্ট্রভাষা করা হয়, অন্য জাতি বুঝবে না। কোনটা কমন ল্যাঙ্গুয়েজ হতে পারে। সেই কমন ল্যাঙ্গুয়েজ হতে পারে উর্দু। সেজন্যই তিনি বলেছেন উর্দু শ্যাল বি দা স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ অফ পাকিস্তান। এটা পুরো পাকিস্তানের সরকারি ভাষা। কিন্তু বাংলা প্রদেশের ভাষা কি হবে সেটাতে তিনি জোর করে কাউকে উর্দু চাপিয়ে দেননি। তিনি বলেছেন যে বাংলার প্রাদেশিক ভাষা কি হবে? সেটা বাঙালিরাই ঠিক করবে। পাঞ্জাবের প্রাদেশিক ভাষা কি হবে? সেটা পাঞ্জাবের মানুষরাই ঠিক করবে। সুতরাং এখানে যে বিষয়টি আসছে সেটা হলো লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা। মানে কমন ভাষা। অথচ এই উর্দু ভাষার জন্ম কিন্তু পাকিস্তানে না।পাকিস্তানে যত উর্দুভাষী মানুষ আছে তার চেয়ে বেশি উর্দুভাষী মানুষ আছে ভারতে ভারতের মুসলমানদের কমন ভাষা উর্দু। উর্দু শব্দটার অর্থ হলো শূন্য মুঘল সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্টে এই ভাষার জন্ম অর্থাৎ মুঘল আরবিরা বিভিন্ন বিভিন্ন জাতির মানুষ ছিল। কিন্তু তারা একটা কমন ভাষায় কথা বলতো। দিল্লির আশেপাশের ভাষার সাথে আরবি বিভিন্ন ফার্সি ভাষার মিশ্রণে উর্দু ভাষার জন্ম। এখন যাদের উর্দুকে নিয়ে অনেক চুলকানি এলার্জি তাদের উদ্দেশ্যে আরেকটা ইন্টারেস্টিং তথ্য আছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে। এটা ওই একবারই ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ বাংলাদেশ এসে বলেছিলেন। কিন্তু ১৯৫২ সাল পর্যন্ত এই কথাটা হাজার বার বলেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রধান নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সোহরাওয়ারদী। সোহরাওয়ারদী ছিল মজিবের লিডার এবং জিন্নাহর শীর্ষ। সোহরাওয়ারদী ছিল বাংলার শেষ মুখ্যমন্ত্রী। সোহরাওয়ারদী ছিল কলকাতা শহরের মেয়র। সোহরাওয়ারদী ছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু এটা কি জানেন সোহরাওয়ারদী মাতৃভাষা উর্দু ছিল? মনে হয় এটা তো কোনদিন শোনেন নাই মজিবর যাকে লিডার ডাকে সেই তো উর্দু ভাষী। সেই সোহরাওয়ারদী হাজার বার বলেছে যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হওয়া উচিত উর্দু তার মাতৃভাষা এই কারণে বলেনি উর্দু ভাষা সবাই জানতো সেই কারণে বলেছে আজকে আমরা বাংলাদেশে ইতিহাসের যে অংশটা জানি সেটা মেড ইন ইন্ডিয়া। জাতিতে আমরা বাংলাদেশী কিন্তু আমাদের ইতিহাস ভারতীয়দের কাছ থেকে লেখা। যে কারণে আমরা ভারতীয়দের চশমা দিয়ে জিন্নাহকে দেখি আর ভাবি ও জিন্নাহ মনে হয় ইতিহাসের একজন ভিলেন। জিন্নাহ মনে হয় বাঙালি মুসলমানের শত্রু। মজিবর তিনি ১৯৫২ সালে সোসোহরাওয়ারদীকে কনভিন্স করলেন যে দেখেন বাংলাদেশের মেজরিটি মানুষ বাঙালি। আপনি যদি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে বলেন তাহলে আওয়ামী লীগের আর রাজনীতি করার মত কোন জায়গা থাকে না। আওয়ামী লীগ মানুষের কাছে যেয়ে কি বলবে? মজার ব্যাপার আওয়ামী এই শব্দটাও উর্দু ভাষার শব্দ। শেষে সোহরাওয়ারদী সাহেব চুপ হয়ে গেলেন। তিনি আর উর্দু নিয়ে কথা বললেন না। বাংলা ভাষার আন্দোলন শুরু করলো শেখ মুজিবুর রহমান।


পাকিস্তানের পাসপোর্টে পাকিস্তানের টাকার মধ্যে তিনটি ভাষার নাম লেখা ছিল ইংরেজি, উর্দু এবং বাংলা। বিষয় হলো যেইভাবে আমাদেরকে জানানো হয়েছে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তান শাসনামলে আন্ডার এস্টিমেট করা হয়েছে এটা সত্য ইতিহাস নয়। পাকিস্তানে আরো অনেকগুলো ভাষা ছিল কিন্তু পাকিস্তানের মানুষের মেজরিটি মানুষের ভাষা ছিল বাংলা এবং বাংলাকে যথাযুক্ত সম্মানই দেওয়া হয়েছে। আরো ইন্টারেস্টিং বিষয় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীদের অর্ধেকই ছিল বাঙালি। বাঙালি প্রধানমন্ত্রী যারা বাংলাদেশ থেকে জন্ম নিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিল। সুতরাং পাকিস্তান শাসনামলে যে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্যের গল্প বলা হয় তার অনেকটাই অতিরঞ্জিত।

১৯৪০ এর দশকে জিন্নাহ ছিল ভারতীয় মুসলমানদের একজন মুক্তির অগ্রদূত। ব্যক্তি জীবনে জিন্নাহ খুব বেশি প্র্যাকটিসিং মুসলিম ছিলেন না। প্রথম জীবনে জিন্নাহ একজন সেকুলার লিবারেল লিডার ছিলেন। কখনো কংগ্রেস করেছেন, কখনো মুসলিম লীগ করেছেন। কিন্তু শেষ জীবনে জিন্নাহ তার জীবন তার সবকিছু সঁপে দিয়েছিলেন ভারতের মুসলমানদের জন্য একটা স্বাধীন ভূখণ্ড তৈরি করার জন্য। নেহেরু মাউন্ট ব্যাটেনের সাথে লড়াই করে যখন পাকিস্তানের মানচিত্র তৈরি করা হয় তখন বাংলাকে ভারত থেকে আলাদা করে পাকিস্তানের অংশ করার জন্য কাজ করেছেন জিন্নাহ। সেইদিন একই সাথে আরাকানকে পাকিস্তানের অংশ বানানোর জন্য রোহিঙ্গা মুসলমানদের একটি গ্রুপ জিন্নাহর কাছে এসেছিল নানা কারণে রোহিঙ্গাদেরকে বা আরাকানকে পাকিস্তানের অংশ বানানো যায়নি। আজকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের পরিণতি দেখুন তাহলে বুঝতে পারবেন সেইদিন বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানের অংশ না হতো কি হতো। আজকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের আসামের মুসলমানদের দিকে তাকান তাহলে বুঝবেন বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানে যোগ না দিত কি হতো? এখন লাহোর প্রস্তাবে একটি কথা আছে যে, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ১৯৪০ সালে যে লাহোর প্রস্তাব দিয়েছিল সেখানে একাধিক রাষ্ট্রের কথা ছিল ছিল একাধিক স্টেটসের বা রাষ্ট্রের কথা ছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে একটি পাকিস্তান হবে।

বাংলাদেশ একটা অখন্ড বাংলা হিসেবে একটা আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে সৃষ্টি হওয়ার ব্যাপারে প্রস্তাব দিয়েছিল সোহরাওয়ারদী এবং তাতে সম্মত হয়েছিল শরদ বসু তাতে চেষ্টা করেছে কিংকর রায় আবুল হাশিমের মত নেতারা কিন্তু অখন্ড বাংলার বিরোধিতা করেছে কংগ্রেস। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছে আমি অখন্ড বাংলার পক্ষে বাংলা যদি পুরোটা একসাথে আলাদা হয় আমি তার পক্ষে কিন্তু বাংলাকে আলাদা দেশ হতে দেয়নি কংগ্রেস নেহরু এবং বল্লভ ভাই প্যাটেল এমনকি ইন্দিরা গান্ধী মহাত্মা গান্ধীও বাংলার আলাদা রাষ্ট্র হওয়ার পক্ষে ছিল সে কারণে মহাত্মা গান্ধীকে কঠিন সমালোচনা করা হয়।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন যে এই রাষ্ট্রটি সকল ধর্মের সকল বর্ণের সকল জাতির মানুষের সমান অধিকার দিবে শেখ মুজিবুর রহমানও মনে করতো যদি জিন্নাহ জীবিত থাকতো তাহলে পাকিস্তান এইভাবে মিলিটারি শাসন হতো না এই বৈষম্য হতো না হয়তো পূর্ব পাকিস্তানে। পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়ার প্রয়োজন পড়তো না।

বাংলাদেশ যদি প্রথম থেকে আলাদা হতো তাহলে সেই বাংলাদেশ কি টিকতো? ভারতের মানচিত্রের দিকে তাকান। যেই রাষ্ট্রগুলো পাকিস্তানে যোগ দেয়নি। একটা রাষ্ট্রকে কি ভারত আস্ত রেখেছে? সিককিমকে গিলে খেয়েছে। সবাইকে ৪৭ সালে গিলে খায়নি আস্তে আস্তে গিলে খেয়েছে। ভারতের গোয়াকে? গোয়া মেরে দিয়েছে ভারত। গোয়া নামে একটা রাষ্ট্র ছিল পর্তুগিজদের সেটাকে দখল করেছে হায়দ্রাবাদ নামে একটা রাষ্ট্র ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ধনী রাষ্ট্র সেনাবাহিনী মিলিটারি এভরিথিং ছিল সেই রাষ্ট্রটাকে দখল করেছে বল্লভ ভাই প্যাটেল কাশ্মীরের মুসলমানরা একটা মুসলিম মেজরিটি এলাকা কাশ্মীরকে কিভাবে দখল করেছে ভারত আজ বাংলাদেশের পরিণতি হতো আজকে কাশ্মীরের মতো এবং মণিপুর অরুণাচল যেগুলো কোনদিনও ভারতের অংশ ছিল না সেই জায়গা গুলো দখল করেছে।

বাংলাদেশ যদি সেইদিন পাকিস্তানের অংশ হয়ে ভারত থেকে আলাদাা না হতো বাংলাদেশ কোনদিন আলাদা ভূখন্ড হতো না। স্বাধীন বাংলাদেশ হতো না। সুতরাং স্বাধীন বাংলাদেশের যে যাত্রা এই যাত্রাটা সম্ভব হয়েছে জিন্নাহ পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের অংশ করাতে। এই ইতিহাসগুলো আমাদেরকে জানতে দেয়া হয় না। এই ইতিহাসের নাম নিলে জিন্নাহর নাম নিলেই উহাদের জ্বলে। জিন্নাহকে এমন একটা ট্যাবু বানিয়ে রাখা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো যে এতদিন পরে জিন্নাহর এই আলোচনা কেন? আলোচনা এ কারণে যখন ভারতের মুসলমানরা আবারো মুসলমান হওয়ার কারণে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। মুসলমান হওয়ার কারণে সব জায়গায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছে তখন ভারতের মুসলমানরা ভাবছে যে হ্যাঁ জিন্নাহই হয়তো সঠিক কাজটা করেছিল। যেই মুসলমানরা হিজরত করে ভারত থেকে বাংলাদেশে পাকিস্তানে চলে এসেছিল তারা প্রাণে বেঁচেছে।

আজকে ভারতীয় মুসলিমদেরকে নানাভাবে প্রমাণ করতে হচ্ছে যে,আমরা ভারতীয়। ভারতের স্বাধীনতার জন্য মুসলমানদের অনেক অবদান। কিন্তু বিজেপি কোন কিছু স্বীকার করতে চায় না। আপনাদের কি মনে হয় জিন্নাহ বাঙালি মুসলমানের শত্রু ছিল? বাঙালি মুসলমানের কি জিন্নাকে ঘৃণা করা উচিত ভারতীয়দের মত বিজেপির মত? নাকি জিন্নাহ ভারত থেকে পাকিস্তানকে আলাদা করে মুসলমানদের জন্য আজাদ স্বাধীন ভূখণ্ডের ব্যবস্থা করে বাঙালি মুসলমানদেরকেও স্বাধীন দেশের একটা ব্যবস্থা হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল সেই জন্য ভালোবাসা উচিত?

জিন্নাহর দ্বারা পাকিস্তান হওয়াতে পূর্ব বাংলায় হিন্দুদের যে জমিদারী ছিল সেই জমিদারী প্রথা বাতিল হয়ে গিয়েছে। বাংলার জমি জামার মালিক হয়েছে সাধারণ মানুষেরা। সে কারণে যাদের জমিদারি গিয়েছে তাদের যে জলাটা জ্বলে তা চরম ভাবে জ্বলে। তাদের অনেকেই পশ্চিমবঙ্গে চলে গিয়েছে। কলকাতায় চলে গিয়েছে। তারা জমিদারীর সেই মজা খুব একটা এখনো ভুলতে পারেনি। সেই জমিদারদের অনেক ছেলেপুলে নাতিপুতিরা আবার কমিউনিস্ট পার্টি। এজন্য দেখবেন যারা বাংলার বাম রাজনীতি করে তারা দুই চক্ষে জিন্নাহকে দেখতে পারে না। কারণ জিন্নাহ তো তাদের বাপের সম্পত্তিগুলো বাঙালি মুসলমানদেরকে বিতরণ করে দিয়েছে। সুতরাং তারা কিভাবে জিন্নাকে দেখতে পারবে?

বাংলাদেশে এমন অনেক মানুষ আছে যারা বাংলাদেশের নাগরিক বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছে কিন্তু তাদের চিন্তা চেতনা ব্রেইন চিন্তার কাঠামো তৈরি হয়েছে সারাজীবন ভারতের ন্যারেটিভ শুনে ভারতের লিটারেচার পরে সুতরাং তারা জিন্নাহকে ভারতের চোখে দেখে জিন্নাহ হলো সেই লোক যে অখন্ড ভারতকে টুকরা টুকরা করেছিল সেদিন যদি অখন্ড ভারত টুকরা টুকরা না হতো আমরা হয়তো অখন্ড ভারত তের কোনায় কোন এক জায়গায় থার্ড ক্লাস নাগরিক হিসেবে থাকতাম। তখন বাঙালি মুসলমানরা বিচারপতি হওয়ার মত সেনাপ্রধান হওয়ার মত এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গায় যাওয়ার মত কোন সুযোগই পেতোনা।

১৯৪৮ সালে যেই জিন্নাহ মারা গিয়েছে সেই জিন্নাহকে এখনো অনেকে ৭১ এর জন্য দোষ দিতে চায়। যে জিন্নাহকে সবসময় রেসপেক্ট করতো শেখ মজিবর তার চেলা চামুন্ডারা এখন জিন্নাহকে গালিগালাজ করে। যত গালিগালাজ করুক জিন্নাকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা সম্ভব না জিন্না ইতিহাসের একটি বাস্তবতা ঠিক যেমনিভাবে নরেন্দ্র মোদি চেষ্টা করছে সম্রাট আওরঙ্গজেবকে ভারতের ইতিহাস থেকে মুছে দিতে মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাস মুছে দিতে মহিশুরের বীর টিপু সুলতানের ইতিহাস মুছে দিতে ইতিহাস থেকে। মুছে যাবে নরেন্দ্র মোদী একজন চাওয়ালা একজন অশিক্ষিত প্রধানমন্ত্রী কিন্তু ইতিহাস সবসময় মনে রাখবে একজন আওরঙ্গজেবকে যিনি ভারতকে সারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতিতে পরিণত করেছিলেন। যিনি এমন সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেখানে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ সবার জন্য নিরাপত্তা ছিল সুযোগ ছিল। ইতিহাস সবসময় মনে রাখবে মুঘল শাসনকে। যেই মোগলরা ভারতকে লুট করেনি। ভারতকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশ তৈরি করেছিল যারা ভারতের বুকে লালকেল্লা বসিয়েছিল যারা ভারতের বুকে তাজমহল বসিয়েছিল যারা ভারতকে বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করেছিল।

আমরা কি মোদির লেন্স দিয়ে ভারতীয় লেন্স দিয়ে বল্লভ ভাই প্যাটেল নেহরুর লেন্স দিয়ে জিন্নাহকে দেখবো নাকি জিন্নাহকে আমরা বাঙালি মুসলমানের ত্রাতা হিসেবে দেখবো?

তথ্যসূত্র : অন্তর্জাল।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৫
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশে ইসলামপন্থা বনাম গণতন্ত্র: মানুষ যখন নাগরিক থেকে অনুসারী হয়ে উঠছে!

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৪৩


কিছুদিন আগেও আমরা বলতাম, "দয়া করে ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে মেশাবেন না"। সরল এই কথাটির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বোধ ছিল - ধর্মীয় বিশ্বাস আর রাজনীতি এক জিনিস নয়। গত দুই... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো প্রয়োজন নেই! আপনি কি মনে করেন?

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৪



বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে শিক্ষাগত যোগ্যতাবিহীন বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত কোনো ব্যক্তির পক্ষে এককভাবে স্থানীয় সরকারকে প্রযুক্তিনির্ভর এবং 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বা 'ডিজিটাল বাংলাদেশ'-এর লক্ষ্য অনুযায়ী আধুনিকায়নের দিকে এগিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

"টোকাই থেকে হিরো"

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৬



টোকাই থেকে হিরো! বাংলা ছবির  অশ্লীল যুগে মুক্তি পাওয়া এক ঢাকাইয়া চলচ্চিত্র। ছবিতে প্রেক্ষাপটে অনেকটা এইরকম - বস্তিতে বেড়ে উঠা; মানুষের লাথি- উষ্টা খেয়ে বড় হওয়া এক টোকাই (ছবির... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুখরিত জীবনের চলার পথে, ব্লগের মুখরিত দিন

লিখেছেন মেহবুবা, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:১৪


ব্লগ স্কুল, মজারু
ছোটন চলে স্কুলেতে বই শ্লেট হাতে ,
বদরুল ভাই কাঁদছে ভীষন যাবে সাথে সাথে,
চান্কু হল লক্ষ্মীছাড়া পান্কু হয়ে ঘোরে ,
চিটি যাবে সবার আগে উঠল... ...বাকিটুকু পড়ুন

Ripe Age দুই প্রান্তের দুই মানুষঃ সামু শব্দের সেতু প্রজন্মের বন্ধন

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:২৪


একজন দাঁড়িয়ে জীবনের শুরুতে
চোখে তার অগণিত স্বপ্ন
আগামীর পথে কত প্রশ্ন
কত না-জানা, কত বিস্ময়
কত দূরের নীল আকাশ
ডাকে তাকে প্রতিদিন।

অন্যজন বসে জীবনের শেষে নয়
বরং দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা এক প্রান্তে
প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×