শেষ বিকেলের একটু আগে ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। ব্যস্ত জীবনের ঘানি টানতে টানতে এতোটাই এক ঘেয়ে হয়ে গেছি যে, শেষ কবে ছাদে উঠেছিলাম মনে নেই। চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম, মানুষের ছাদে ওঠার হার আশঙ্কাজনক হারে কমে গিয়েছে। কিন্তু তার মাঝে নজর কাড়লো পাশের বাড়ির ছাদে শাড়ি পড়া একটা মেয়ের পায়চারি। প্রথম দেখায় ভালোই লাগলো। হঠাৎ করে মনে হলো ওটা না আনমনাদের ছাদ!! আনমনা, নামটা একটু বেখাপ্পা হলেও মেয়েটা যথেষ্ট ভালো ছিলো। মানে বেশ পরিপাটি একটা মেয়ে যাকে বলে। লেখাপড়ায় খুব একটা ভালো ছিলো না। তাই আকীকা করে রাখা নামটা সার্থক ছিলো বটে! একটা সময় ভালো বন্ধু ছিলো আমার। সেই যখন স্কুলে পড়তাম তখন থেকে কলেজ অবধি। প্রায়ই এক সাথে স্কুলে যেতাম, স্কুল থেকে ফিরতাম। খুব সুন্দর গান গাইতো ও। স্কুল কলেজে এমন কোন অনুষ্ঠান ছিলো যেখানে ও গান গায়নি। কলেজের শেষদিনে ওর গাওয়া “আমারো পরানো যাহা চায়” গানটা এখনো কানে বাজে। নানা প্রোগ্রামে ওর আরো অনেক সুন্দর সুন্দর গান থাকা সত্ত্বেও কেন যে খালি গলায় গাওয়া গানটা এতো ভালো লেগেছিলো কে জানে। কলেজের শেষদিনে আর সবার মতো আমি অতোটা ইমোশনাল ছিলাম না। আমার কথা ছিলো, একসাথে এতোগুলো বছর ছিলাম ভালো কথা, কিন্তু আমি আরো বড় হতে চাই। তাই এইসব ব্যাপারগুলো কখনো ভালো লাগতো না। সে যাই হোক, ওই দিনের পর থেকে আনমনার সাথে আর সেইভাবে দেখা হয় নি। ইন্টারের রেজাল্টের দিন এক ঝলক দেখা হলো। ভালো রেজাল্ট করার পরেও ওর মুখের মলিন থাকাটা বুঝতে পারলাম না। পরে আন্টির কাছে শুনলাম, ওরা ফ্যামিলি সহ জার্মানি চলে যাচ্ছিলো। মনে মনে ভাবলাম কপাল খুলে গেলো মেয়েটার। কম সে কম আন্ডার গ্র্যাডটা অনেক ভালোভাবে শেষ করতে পারবে। আবার খারাপ লাগলো এই ভেবে কথা না হোক দেখা না হোক এতোদিন তো পাশেই ছিলো এখন তো অনেক দূরে চলে যাবে। কিন্তু এই খারাপ লাগার কারণ সেদিন বুঝিনি। ওখানে যাওয়ার পরে প্রায়ই ফেসবুকে কথা হতো। ধীরে ধীরে “আউট অফ সাইড, আউট আফ মাইন্ড” ফ্রেজটিকে সত্যি করে দিয়ে আমার কাছ থেকে হারিয়ে যায় এক সময়ের খুব কাছের সেই বন্ধুটি। আসলে রোজ বিকেলে ছাদে আড্ডা দেয়া হতো বলেই আজ হয়তো অনেক দিন পর ছাদে উঠে আর ওদের ছাদে কাউকে দেখে এতো কথা মনে পড়লো। কেমন যেনো একটা অস্থিরতা কাজ করছিলো মনে। বার বার মনে হচ্ছিলো মেয়েটাকে ডেকে একটু কথা বলি। কিন্তু জেঁচে পরে কথা বলতে একদম পারি না। তবুও ডাক দিলাম “এই মেয়ে”
“আমাকে বলছেন?”
“হ্যাঁ, তোমাকে”
“জি বলুন”
“তোমাকে আগে কখনো দেখিনি”
“আসলে আমরা এখানে থাকি না। আপুর বিয়ে ঠিক করতে এসেছি”
“আপুর বিয়ে! তোমার আপুর নাম কি?”
“হায়রে এমিল ভাই, আমার আপুর নাম জানেন না। আনমনা আপুকে ভুলে গেলেন!! হাহাহাহাহা”
আমার মাথা কাজ করা শুরু করলো। আস্তে আস্তে সব পরিষ্কার হতে শুরু করলো। মা কেন এই সপ্তাহে কোন কাজ রাখতে বারোন করেছিলো। বার বার জিজ্ঞেস করছিলো কাউকে পছন্দ করি কি না, রিলেশান আছে কি না, বিয়ে কবে করবো নাকি আদৌ করবো না। আর সবচেয়ে বড় কথা আজকে অনেক জোর করে ছাদে পাঠালোই বা কেন। এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে দেখি আনমনাদের ছাদে যে দোলনাটা আছে, যেটাতে ও প্রায়ই ঝুলতো সেটাতে কেউ একজন বসে আছে, মাঝে মাঝে আড় চোখে আমার দিকে দেখছে। আমার যা বোঝার আমি বুঝে গেলাম। কেন জানি মনে এক অনাবিল শান্তির ঝড় বয়ে গেলো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




