ঘূর্ণিঝড় আইলা ও জলোচ্ছবাসে লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া খুলনার কয়রা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দুর্গত মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত খয়রাতি চাল কালো বাজারে বিক্রির খবর পাওয়া গেছে। আবার কোথাও কোথাও প্রভাবশালী ও জনপ্রতিনিধিরা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে বানভাসী মানুষের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষুব্ধ এসব মানুষ দুর্নীতিবাজদের বিচার দাবি করেছে। ইতোমধ্যে চাল আত্মসাতের অভিযোগে থানায় মামলাও হয়েছে।দুর্গতরা জানান, কয়রার দু'লাখ দুর্গত মানুষকে রক্ষা করতে যে পরিমাণ ত্রাণ বরাদ্দ করা হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই যৎসামান্য।
একেবারেই অপ্রতুল ত্রাণ নিয়ে উপজেলা প্রশাসন যে সময়ে হিমসিম খাচ্ছে ঠিক সেই সময়ে একশ্রেণীর অসাধু জনপ্রতিনিধি ত্রাণের চাল আত্মসাতের চেষ্টায় ব্যস্ত। তারা বিভিন্ন উপায়ে তা আত্মসাতের চেষ্টা চালাচ্ছে। জিআরের চাল, খয়রাতি সাহায্য হিসেবে দুঃস্থদের মধ্যে বিতরণের নির্দেশনা থাকলেও কয়রার বেশিরভাগ জায়গায় স্থানীয়ভাবে বাঁধ মেরামতের কাজে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। আর শুভঙ্করের ফাঁকি এখানেই। পরিবার প্রতি ২০ কেজি করে খয়রাতি সাহায্য দেয়ার কথা থাকলেও তা কোথাও দেয়া হয়নি। বাঁধ মেরামতের কাজে যারা গেছে তাদেরকে এ খয়রাতি চাল মজুরি হিসেবে দেয়া হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে। যারা স্থানীয়ভাবে বাঁধ মেরামতের কাজ করাচ্ছেন তারাই বরাদ্দকৃত চাল এদিক সেদিক করছেন। যেখানে এক হাজার লোক কাজ করছে সেখানে দেখানো হচ্ছে দেড় থেকে দুই হাজার। তাদের এ কাজের প্রশাসনিকভাবে জবাবদিহি করার মতো কেউ না থাকায় অনেকটা ঝামেলাহীনভাবে আত্মসাতের কাজটি সম্পন্ন করতে পারছেন তারা।
জিআরের চাল বন্টনের ব্যাপারে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এমএম আরিফ পাশার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, �এটি স্রেফ দান। এর বিকল্প কোন কিছু নেই।' এটিকে আমরা খয়রাতি সাহায্যে বলি।
জিআরের এ চাল দিয়ে অন্য কোন কিছু করা যাবে না। স্থানীয়ভাবে কি করা হচ্ছে না হচ্ছে সেটি আমার জানার বাইরে। তবে খয়রাতি সাহায্য অন্য কোন কাজে ব্যবহার করা একেবারেই বেআইনী। দুর্গত মানুষকে ত্রাণ হিসেবে দেয়ার জন্য উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নে ৬০ মেট্রিক টন ও জিআরের চাল বরাদ্দ করা হয়। গত সোমবার বিকেলে যুগরাকাটি খাদ্য গুদাম থেকে ওই চাল একটি ট্রলারযোগে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। পথিমেধ্যে আরেকটি ট্রলারে করে নয় বস্তা চাল কালোবাজারে বিক্রির চেষ্টা করা হচ্ছিল। বিষয়টি যুগরাকাটি এলাকায় মানুষের নজরে পড়ে। তারা হাতেনাতে সেগুলো আটক করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানায়। তিনি পুলিশকে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নয় বস্তা চালসহ তিন জনকে আটক করে। আটককৃতরা হচ্ছে, দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের ঘড়িলাল গ্রামের খালেক মোড়লের ছেলে অলিয়ার, আমজাদ খানের ছেলে গোলাম রববানী ও গোলখালী গ্রামের হাশেম মোড়লের ছেলে শরিফুল। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। পুলিশ আটক তিনজনকে চারদিনের রিমান্ডে নিয়েছে বলে কয়রা থানার ওসি দাউদ হোসেন জানিয়েছেন। গত মঙ্গলবার থেকে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। এদিকে তিনজন আটক হলেও ঘটনার মূল হোতা দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কবি শামসুর রহমান গাজীকে আসামী না করায় এবং তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নেয়ায় দুর্গত মানুষের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের বক্তব্য চেয়ারম্যানের নির্দেশ না থাকলে ত্রাণের চাল বাইরে বিক্রির সাহস কারো হতো না। এ ব্যাপারে ওসি দাউদ হোসেন বলেন, তদন্ত চলছে। এতে চেয়ারম্যান জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাছাড়া ঘটনাস্থল থেকে আটককৃতরা রিমান্ডে চেয়ারম্যানের সংশ্লিষ্টতার কথা বললে সে মোতাবেক পদক্ষেপ নেয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা এমএম আরিফ পাশা ত্রাণের চাল উদ্ধারের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ঘটনার সাথে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। অপরদিকে ত্রাণের চাল নিয়ে বাঁধ মেরামতের নামে কোন প্রকার নয়ছয় হয়েছে কিনা এ ব্যাপারে তদন্ত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী মানুষ। একই সাথে ত্রাণের জিনিসপত্র যাতে যথাযথ বন্টন হয় তা নিশ্চিত করার দাবিও তাদের।
এদিকে ত্রাণের চাল বিতরণ করা কালীন আত্মসাৎ করা চাল গত ১ জুন সেনাবাহিনীর সাঁড়াশী অভিযানে নওয়াবেকী ও মুন্সিগঞ্জে ২২ বস্তা চাল উদ্ধার করা হয়। বন্যাদুর্গত এলাকা শ্যামনগরে অবস্থানরত সেনা সদস্যদের কমান্ডিং অফিসার লেঃ কর্নেল জিল্লুর হক (পিএসপি) জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ১ জুন কদমতলা গ্রামের সিরাজুল ইসলামের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে সেনা সদস্যরা আত্মসাতকৃত ৪ বস্তা চাল আটক করে। একই দিনে নওয়াবেকীর আতিয়ার মেম্বারের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ২৮ বস্তা ত্রাণের আত্মসাৎকৃত চাল আটক করে। এ ঘটনার পর থেকে আতিয়ার মেম্বার পলাতক রয়েছে।
এদিকে উপজেলার মুন্সিগঞ্জ এলাকার মেম্বার আব্দুল জলিল কর্তৃক আত্মসাতকরা ৬ বস্তা চাল উদ্ধার করে জেলা প্রশাসন। গত ৩১ মে রাত ১০টায় মেম্বরের বিভিন্ন আত্মীয় স্বজনের বাড়ি থেকে এ চাল উদ্ধার করা হয়।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০০৯ রাত ৯:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




