নারীকে তাঁর উপযুক্ত মর্যাদা দিতেই হবে
আমরা আজ স্বাধীন দেশের নাগরিক। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী।নারীর সমঅধিকার সমমর্যাদা আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করতে না পারলে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়-এ সহজ সত্যটি অনেকে মানতে চাননা।পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে বিবিধ নিয়ম শৃঙ্খলার নামে চার দেয়ালে বন্দী করে রাখতে চায়।নারীরা এ বন্দীত্ব মানবে কেন? তাইতো তারা প্রতিবাদী হয়েছে যুগে যুগে।
আদিতে সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। পুরুষরা যুদ্ধবিগ্রহ আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ব্যস্ত থাকত, আর নারীরা কৃষিকাজ, পশুপালন, ঘরগেরস্থালী সহ ইত্যাকার কাজ করত।নারী পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠায় গড়ে উঠেছে সভ্যতা। কিন্তু নারীরা তার প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মান হতে বঞ্চিত। যদিও সকল ধর্মেই নারীর মর্যাদার বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। মনুসংহিতায় বলা হয়েছে-“যত্র নার্যস্তু পূজ্যন্তে নন্দন্তে তত্র দেবতাঃ। যত্রৈতাস্তু পূজান্তে সর্বাস্তত্রাফলাঃ ক্রিয়াঃ”। অর্থাৎ নারীরা পূজিত হলে দেবতারা সন্তুষ্ট হন। নারীরা অনাদৃত হলে সমস্ত কার্যই নিষ্ফল হয়। মহাভারত-রামায়নের যুগে নারীর অবস্থা কেমন ছিল তা নিমোক্ত দুটি ঘটনার আলোকে সম্মানিত পাঠক বোঝে নিতে পারেন। পঞ্চপান্ডব দ্রৌপদীকে নিয়ে প্রথমবার নিজ কুঠিরে ফেরেন। যুধিষ্ঠির তাঁর মাকে উদ্দ্যেশ্য করে বলেন, মা আজ এক আশ্চর্য জিনিস নিয়ে এসেছি। উত্তরে মা কুন্তি বললেন, পাঁচ ভাই ভাগ করে নে। লক্ষনীয় বিষয়, দ্রৌপদীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা মতামতের কোন স্থান সেখানে ছিল না। রামায়ণে দেখতে পাই দুঃখীনি সীতার ক্রন্দন। সীতাকে লঙ্কার রাজা রাবণ চুরি করে নিয়ে যায়। এতে সীতার কোন দোষ ছিল না। রাবণকে পরাস্ত করে রামচন্দ্র সীতাকে উদ্ধার করেন। সীতার চরিত্র নিয়ে নানা জন নানা কথা বলে।প্রজাবৎসল রামচন্দ্র সীতার সতীত্ব পরীক্ষার নানারকম ব্যবস্থা গ্রহন করেন। অবশেষে মা সীতার দুঃখে ধরণী দ্বিধা হলো,সীতাদেবী পাতালে প্রবেশ করলেন। সীতাদেবীর দুঃখগাঁথা মহাকাব্য রামায়ণে বর্ণিত হয়েছে। আজকের দুঃখীনি সীতাদের দুঃখের বয়ান প্রতিদিন পড়ি পত্রিকার পাতায়।
সমাজতাত্বিকদের মতে, ইতিহাসে দাসপ্রথা প্রচলনের পূবেই নারীর উপর দাসত্ব শুরু হয়েছে। প্রাচীণ রোম সাম্রাজ্যে যখন দাস প্রথার প্রচলন ছিল, তখন দাসেরা ছিল পশুপাখি স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মতই ক্রয়বিক্রয় যোগ্য; তখন নারীদাসদের অবস্থা যে পুরুষদাসদের চেযেও শোচনীয় ছিল তা সহজেই অনুমেয়। আরবে আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগে নারী শিশু ভূমিষ্ঠ হলে তাকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো। ভারতে সতীদাহ প্রথা ছিল ধর্মের বাতাবরনে নারীর প্রতি সহিংসতার এক নগ্ন প্রকাশ।
আধুনিক যুগে নারীরা তাদের ভাগ্যের উন্নয়নে নিজেরাই উদ্যোগী হয়েছে,পতিবাদে মুখর হয়েছে,গড়ে তোলেছে সংগ্রামের ইতিহাস।১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের নারী শ্রমিকেরা সমঅধিকারের দাবিতে প্রথম আন্দোলন শুরু করে।১৯১০ সালে এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব করেন জার্মান নারী নেত্রী ক্লারা জেটকিন।১৯৮৪ সালে জাতিসংঘ এদিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমানে দিনটি সারা বিশ্বে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে।নারীর ভোটাধিকারের দাবীতে ১৯১৩ সালের ১২ জুন নারীবাদী এমিলি ওয়াইল্ডিং ডেভিসন শহীদ হন।আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯২০ সালের ২৬ আগষ্ট মার্কিন কংগ্রেসে নারী ভোটাধিকার(১৯ তম) সংশোধনী বিল পাশ হয়।এদিকে ভারতবর্ষে নারীর দূর্দশা লাঘবে যিনি প্রথম এগিয়ে আসেন তিনি কোন নারী নন,তিনি একজন পুরুষ, তিনি রাজা রামমোহন রায়।১৮১৮ সালে তিনি সতিদাহ প্রথা বন্ধের উদ্যোগ নেন,যার ফলশ্রুতিতে ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিংক সতীদাহ নিষিদ্ধ করে আইন পাশ করেন।ফলে ভারতীয় নারীরা চিরতরে মুক্তি লাভ করে একটি ধর্মীয় নৃসংশ কুপ্রথা থেকে।বিবাহের
ক্ষেত্রেও নারী পুরুষে বৈষম্য ছিল।হিন্দু পুরুষেরা স্ত্রীর বর্তমানে একাধিক স্ত্রী গ্রহন কিংবা স্ত্রীর মৃত্যুতে পুনরায় বিবাহ করতে পারলেও মহিলাদের ক্ষেত্রে সে সুযোগ ছিল না।এমতাবস্থায়,বিধবা নারীদের অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট ও লাঞ্চনার শিকার হতে হতো।ধর্মীয় পীড়ন থেকে নারীদের মুক্তিদানের জন্য এগিয়ে এলেন আরেক সমাজসংস্কারক, তিনি ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর।তাঁরই প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালে হিন্দু বিবাহ আইন পাশ হয়,ফলে হিন্দু বিধবা নারীরা পুনরায় বিবাহের অধিকার লাভ করে।ধীরে ধীরে নারীদের মধ্যে নবজাগরনের সৃষ্টি হয়।তারই ধারাবাহিকতায় ১৯২১ সালে ভারতীয় নারীরা ভোটাধিকার লাভ করে।
বালাদেশের সংবিধানে নারীর অধিকারের বিষয়ে সবিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।সংবিধানের ১০ নং অনুচ্ছেদে জাতীয় জীবনে মহিলাদের অংশগ্রহন সম্পর্কে বলা হয়েছে,জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহন নিশ্চিত করিবার ব্যবস্থা গ্রহন করা হইবে। অনুচ্ছেদ ২৭ - সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। অনুচ্ছেদ ২৮(১) - কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী,বর্ণ,নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারনে কোন নাগরিকরে প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবে না। অনুচ্ছেদ ২৮(২) – রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন। অনুচ্ছেদ ২৮(৩) – কেবল ধর্ম,গোষ্ঠী,বর্ণ,নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারনে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা,বাধ্যবাধকতা,বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না।অনুচ্ছেদ ২৮(৪) – নারী বা শিশুদের অনুকুলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান-প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না। অনুচ্ছেদ-২৯(১)-প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে। অনুচ্ছেদ-২৯(২)-কেবল ধর্ম,গোষ্ঠী,বর্ণ,নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারনে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাঁহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না। অনুচ্ছেদ৬৫(৩)-এ জাতীয় সংসদে নারীর জন্য আসন সংরক্ষণ করা হয়েছে। অতএব দেখা যাচ্ছে,বাংলাদেশের সংবিধানে নারী পুরুষের মাঝে কোনরূপ বৈষম্য সৃষ্ঠি করা হয়নি।নারী-পুরুষের সমতা ও নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক সনদ ‘সিডও’(CEDAW – Convention on the Elimination of All Forms of Discrimination Against Women) । ১৯৮৪ সালের ৬ নভেম্বর কয়েকটি ধারা বাদ দিয়ে বাংলাদেশ সরকার সিডও সনদে স্বাক্ষর প্রদান করে। নারী উন্নয়নে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী নারী। এছাড়াও বাংলাদেশ সরকারের আরও বেশকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন নারী। বর্তমান সরকার নারীর ক্ষমতায়ন,নারী উন্নয়নে যথেষ্ঠ আন্তরিক এতে কারো কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়।সরকার নারী উন্নয়ণ নীতিমালা প্রণয়ন করেছে;উচ্চ আদালতে নারী বিচারক নিয়োগ সহ প্রসাসনের গুরুত্বপূর্ন বিভিন্ন পদে নারীদের পদায়ন করা হয়েছে।মোবাইল সহ প্রযুক্তির বিভিন্ন মাধ্যমে পর্ণোগ্রাফির অবাধ বিস্তার, আমাদের কিশোর,তরুণ,যুবকদের নৈতিক অধঃপতন ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কমর্কান্ডে জড়িয়ে পড়ার একটি অন্যতম কারন।সরকার সমস্যাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে পর্ণোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন – ২০১১ প্রণয়ন করেছে। আইনে পর্ণোগ্রাফি বহন,বিনিময়,মুঠোফোনের মাধ্যমে ব্যবহার,বিক্রি প্রভৃতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের সশ্রম কারাদন্ড অথবা পাচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করার বিধান করা হয়েছে।আইনের অপব্যহার রোধে মিথ্যা মামলার ক্ষেত্রে দুই বছরের শাস্তির বিধান রয়েছে।আইনটির যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি সমস্যার বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা তৈরী করা একান্ত জরুরী।
পুজিবাদের বর্তমান দুনিয়ায় মুনাফা অর্জনের হাতিয়ারে পরিনত হয়েছে নারী। বিঙ্গাপনে পণ্যের চাহিদা সৃষ্টিতে নারীর শরীরকে ব্যবহার করা হচ্ছে।নারী নিজেই আজ একটি পণ্য।ফলে সমাজ মানসে পড়ছে এর ক্ষতিকর প্রভাব। নারীকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের বিরুদ্ধে সকলকেই সোচ্চার হতে হবে আর এ ব্যাপারে নারী সমাজকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।একবিংশ শতাব্দিতে এসেও নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বরং নারী নির্যাতনের ধরন ও মাত্রা যেন বেড়েই চলেছে। নারীরা অনেক সময় নারীদের হাতেই নির্যাতিত হচ্ছে। গৃহপরিচারিকারা মূলত গৃহকর্ত্রীদের দ্বারাই চরম নিষ্ঠুরতার শিকার হচ্ছে- যিনি একজন নারী। র্কর্মজীবী নারীদের প্রতিনিয়ত নানা সমস্যার মুখোমুখী হতে হয়। যানবাহনে সিট খালি না থাকলে চালক পুরুষ যাত্রীদের উঠতে দিলেও নারীদের উঠতে দিতে চায় না ,এই যুক্তিতে যে – তারা দাড়িয়ে যেতে পারবে না। একান্ত প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে ভিড় ঠেলে কোন মহিলা যখন বাসে উঠে পুরুষের পাশে দাড়ায় তখন প্রায়শ তাকে কটু কথা শুনতে হয়।কিন্তু নিজের আসনটি ছেড়ে দিয়ে মহিলাটির সুবিধা করে দিতে কাউকে দেখা যায় না। রাস্তার পাশের যাত্রী ছাউনীতে কিংবা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন মোড়ে গণশৌচাগারের ব্যবস্থা না থাকায় সবচেয়ে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পরতে হয় মেয়েদের। বিভিন্ন বাস-টার্মিনালে শৌচাগারের ব্যবস্থা থাকলেও অব্যবস্থাপনা, যত্রতত্র যানবাহন পার্কিং,বখাটেদের উৎপাত,নিরাপত্তাহীন পরিবেশ বিবিধ কারনে এগুলি নারীদের ব্যবহার অনুপযোগী।এসকল সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে।
সবশেষে সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত পংক্তি দিয়ে লেখাটির ইতি টানতে চাই, “বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি,চির কল্যাণকর,অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন,’৬৯ এর গণঅভ্যূত্থান, স্বাধীনতা সংগ্রাম,যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে আন্দোলন সহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। নারী পুরুষের হাত ধরেই এগিয়ে চলেছে সভ্যতা,উৎকর্ষের দিকে। তাই নারীকে তাঁর উপযুক্ত মর্যাদা দিতেই হবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই এপ্রিল, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




