খুব সম্ভবত তখন নবম-দশম শ্রেণীতে পড়তাম। তখন জয়সুরিয়া, গিলি, সাইদ আনোয়ার, গাঙ্গুলি, শচীনরা দুর্দান্ত ওপেনার বোলারদের দুঃস্বপ্ন। ক্রিকেট খেলাটা অনেক উপভোগ করতাম। সারাদিন বল আর ব্যাট হাতে বন্ধুদের সাথে চলত খেলা আর খেলা। ব্যাট করার সময় নিজেকে মনে করতাম ওয়াটসন। বল করার ও সময় ওয়াটসন। কোথাকার কোন ওয়াটসন তখন এক অপরিচিত নাম। তারপরও তার আর ব্যাট চালানোর অপূর্ব ভঙ্গি আর মনকাড়া বোলিং স্টাইল মনে দাগ কেটে ছিল। ফলাফলটা ছিল কমন, তার ছবি আমার পড়ার টেবিলের বা পাশের দেওয়ালে।
একসময়ের সেরা অসি অলরাউন্ডার বার বার লড়াই করেছেন স্ট্রেস ফ্রাকচার, সোলডার ডিসলোকেশন সহ নানা ইনজুরিতে কিছুটা আমাদের প্রিয় ম্যাসের মত। বিশ্বকাপের আগে অফফর্মের নানা গুঞ্জনের পরও এই বিশ্বকাপে ৬ নাম্বার পজিশনে লড়াকু মেজাজে বোলারদের তুলোধুনো করে শেষ চার ম্যাচে ৬৭, ২৪, ৬৪ ও ২৮ রান করেছেন।
২০০২ সালে ব্রাডম্যান "ইয়ং ক্রিকেটার অব দ্যা ইয়ার" অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তির পর সেই বছরের ২৪ মার্চ শেন ওয়াটসনের অভিষেক সাউথ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। অভিষেকের বছরে তেমন কিছু করতে পারলেন না এই হার্ডহিটার তবে নিজের জাত চিনাতে বেশি সময় নেন নি। পাকিস্তানের গতিদানব সোয়েব আখতারকে পরপর তিন বলে তিনটি চার মেরে খেলেছিলেন ৪৪ রানের একটি সংখিপ্ত কিন্তু মূল্যবান ইনিংস। সেদিন থেকেই ওকে ফলো করা শুরু।
পরবর্তী ৩-৪ টি বছরে নিজের প্রতিভা চেনালেন সারা বিশ্বকে কার্যকরী ফাস্ট বোলিং দিয়ে, খুনে মেজাজের ব্যাটিং দিয়ে। ওর বোলিং থেকে ব্যাটিং এ বেশি মজা পেতাম তখন (নিজে ওপেনার ছিলাম তো তাই )। প্রতিটি আক্রমণাত্মক শটে বোলারদের মনে ফাটল ধরিয়ে দিতেন, প্রতিপক্ষ শিবিরে ভয়ের শীতল স্রোত বইয়ে দিতেন। বাঘা বাঘা কত বোলার তার ব্যাটের ধারে কচুকাটা হয়েছে, ইনসুইং বাউন্সারে যে কত ব্যাটসম্যানের আত্মারাম খাঁচাছাড়া করেছেন তার হিসেব নেই।
২০০৯ সালে সেঞ্চুরিয়ানে নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তার পাওয়ার ব্যাটিং, নিখুত টাইমিং আর দুর্দান্ত সব ড্রাইভের জোড়া সেঞ্চুরি বিশ্ব ক্রিকেটে নতুন ব্যাটিং ধারার সৃষ্টি করে। ক্রিকেট বিধাতা থরে থরে তার দুহাত ভরে সবগুলি চাওয়া পূর্ণ করেছে, জিতেছেন অ্যাশেজ সিরিজ, ভিবি সিরিজ, বিশ্বকাপ।কি নেই তার ঝুলিতে। ২০০৭ সালের বিশ্ব কাপে অতিমানবীয় ব্যাটিং গড় ১৪৫, রানের বন্যা, ফলাফল বিশ্বকাপ ঘরে। এরপর ফর্মের তুঙ্গে থাকা ওয়াটসন ভি বি সিরিজ, নেটওয়েস্ট সিরিজ, চ্যাপেল- হেডলি সিরিজসহ টানা এগারটি সিরিজ জিতেন। পরিসংখ্যানের খাতাও ওয়াটসনের গুণমুগ্ধ। ১৮৭ টি ওয়ানডেতে ক্রিকেটে ৪০.৬০ গড়ে করেছে ৫৬৮৪ রান, উইকেট নিয়েছেন ১৬৬ টি।
নিপাট ভদ্র, সোনালি চুলের আকর্ষণীয় এই অলরাউন্ডারের টেস্ট রেকর্ড ও আকর্ষণীয়। ৫৬ টেস্টে ৩৫.৭৪ গড়ে করেছেন ৩৬৪৬ রান। নিয়েছেন ৭৪ টি উইকেট, সেরা বোলিং ৬/৩৩।
খুব সম্ভবত এই অসি ক্রিকেটারের এটাই শেষ বিশ্বকাপ। এই ২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচে বোলিং ফিগার ৪-০-২৩-০ আর ব্যাটিং এ করেছেন মাত্র দু রান (নট আউট)। ১৮৩ রানের লো স্কোরিং কিউই ইনিংসটা বেচারাকে ভালমত ব্যাটিং করতে দিল না। হয়ত আর বেশিদিন নেই যেদিন আমার কৈশোরবেলার প্রিয় ক্রিকেটারটি অবসর নিবে। তবে বন্ধু ক্রিকেট খেলার মাঠে যেদিনই যাব, অবসরের বল বা ব্যাটের টুকটুক আওয়াজে তোমাকেই খুজে পাব। কারন পুরনো সেই কিশোরের ক্রিকেট খেলার প্রতিটি পর্বে তোমাকেই অনুসরণ করেছি।তোমাকে কেমনে ভুলিব বল?
পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়।
ও সেই চোখে দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়।
আয় আর একটিবার আয় রে সখা প্রাণের মাঝে আয়।
মোরা সুখের দুখের কথা কব প্রাণ জুড়াবে তায়।
মোরা ভোরের বেলা ফুল তুলেছি, দুলেছি দোলায় বাজিয়ে বাঁশি গান গেয়েছি বকুলের তলায়।
হায় মাঝে হল ছাড়াছাড়ি, গেলেম কে কোথায়
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মে, ২০২০ বিকাল ৩:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






