somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সমুদ্র অর্থনীতি - সমস্যা সম্ভাবনা ও করনীয়

২৯ শে অক্টোবর, ২০১৬ রাত ১:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



"পৃথিবীর কত প্রেম শেষ হল- তবু
এ সমুদ্রের আকাঙ্ক্ষার গানে
বাধা নাই, ভয় নাই, ক্লান্তি নাই,
কান্না নাই, মালাবার ঢেউয়ের ভিতরে
চারিদিকে নীল নারিকেল বন"


সমুদ্র নিয়ে এই আশাবাদী কথা গুলো আমার নয়। তিমির হননের কবি, ধূসরতার কবি জীবনানন্দ দাশ তার তন্দ্রালু কবিতার অবয়বে গেঁথে দিয়েছেন সমুদ্রের বিশালতা। সমুদ্র শব্দটির মনের গভীরে যেমন এক বিশাল কল্প ভাবের জন্ম দেয় ঠিক তেমনি বাস্তবেও তাই। সমুদ্রের হাতেই বন্দি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মুক্তির চাবিকাঠি। সিন্ধু সেচে ডুবুরীরা যেমন মনিমুক্তো আনে, ঠিক তেমনি সমুদ্র গবেষকরা জ্ঞানের সমুদ্র সেচে এনেছেন সমুদ্র অর্থনীতি।



সমুদ্র অর্থনীতি কি?

আমরা সবাই জানি যে বিশ্বের তিন ভাগ পানি একভাগ মাটি। সেই পানির বিশাল অংশটি হল সমুদ্র। সেই সমুদ্র নির্ভর অর্থনীতি হল সমুদ্র ভিত্তিক খাদ্য, জ্বালানি, ব্যবসা, বিনোদন সবকিছুই। ইংরেজিতে একেই আমরা বলি ব্লু ইকোনোমি। সমুদ্রকে ঘিরে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ রুপকার মূলত একজন বেলজিয়ান যাকে "স্টিভ জবস অব সাস্টেইনবিলিটি" নামে ডাকা হয়। সর্বপ্রথম তারই মহৎ চিন্তার মাধ্যমে আমাদের নজরে আসে এই ব্লু ইকোনোমি।



১৯৯৪ সালে গুন্টার পাওলি তার "ব্লু ইকোনমি-টেন ইয়ার-হান্ড্রেড ইনোভেশন, টেন মিলিয়ন জব" শীর্ষক বইয়ে ভবিষ্ণু সমুদ্র অর্থনীতির রূপরেখা, টেকসই ও পরিবেশ বান্ধব মডেল প্রদান করেন যা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রশংসিত ও অনুদিত হয়।

বাংলাদেশে ব্লু ইকোনোমি শুরু

২০১২ সালের জুনে রিও-ডি-জেনেরিওতে অনুষ্ঠিত রিও+২০ ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট (ইউএনসিএসডি) সম্মেলনে ব্লু ইকোনোমির সর্বপ্রথম কনসেপ্ট নোটটি উপস্থাপন করা হয়। অবশ্য সেখানে ‘ব্লু ইকোনোমি’ বলে আলাদা কোনো শব্দের প্রয়োগ করা হয়নি। বরং সেখানে গ্রিন ইকোনোমি ইন অ্যা ব্লু ওয়ার্ল্ড নামে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। তবে জাতিসংঘের উদ্যোগে ব্লু ইকোনোমি ধারণা নিয়ে প্রথম বৃহৎ কর্মশালাটি ২০১৪ সালে বাংলাদেশেই অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালা শেষে সরকারের ১৯টি মন্ত্রণালয় নিয়ে ব্লু ইকোনোমি বাস্তবায়নের মহাপরিকল্পনাও নেওয়া হয়।



সমুদ্রভিত্তিক এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বদলে দিতে পারে দেশের অর্থনৈতিক চিত্রপট। হতে পারে সমুদ্র উপকূলরেখায় বসবাসরত লাখ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান, ছুটতে পারে হাজার হাজার অর্থনীতি সমৃদ্ধকারী মাছধরা ট্রলার। আর এভাবেই সম্ভব দুই অংকের প্রবৃদ্ধি অর্জন করা। এমনি আশার কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জনাব কাউসার আহমেদ। তিনি আরো জানিয়েছেন সমুদ্র বক্ষ অনুসন্ধানে মালেশিয়া থেকে আসছে "মিন" নামের একটি এক হাজার পাঁচশ টনের জাহাজ। এটি আসলে আমাদের কি পরিমান মৎস্য সম্পদ আছে তা জানা যাবে।



কিন্তু আমাদের ব্লু ইকোনমিতে হাত দেওয়ার আগে নিম্নোক্ত বিষয়গুলি মনে রাখতে হবে-
# সঠিক ডাটাবেজ ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান
# সমুদ্র সম্পদের পরিমান ও মুল্যাদি
# সম্পদের প্রকৃত বাজার যাচাই
# প্রয়োজনীয় আধুনিক অবকাঠামো
# দক্ষ জনশক্তি
# সঠিক কর্মপরিকল্পনা
# সম্পদ অনুসন্ধান টিম গঠন
# সম্পদের সংরক্ষন
# পরিবেশ নিরাপত্তা
# সচল ইকোসিস্টেম মিথস্ক্রিয়ার নিশ্চয়তা
# মেরিন রিসোর্সভিত্তিক গবেষণা
#পরিবেশ বান্ধব ও টেকসই নীতিমালা।

ব্লু ইকোনমিতে বাংলাদেশের সম্ভবনা-

হংকং, সিংগাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশ সমুদ্র অর্থনীতিতে বহুদিন ধরে নির্ভরশীল। সিংগাপুরের জিডিপির ৪০ ভাগ সমুদ্র নির্ভর। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশর ২০১২ সালে মিয়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সাথে সমুদ্র বিষয়ক মামলায় জয় লাভ করে ১,১৮৮১৩ বর্গ কিমি লাভ করার পর সময় এসেছে এই সমুদ্র অর্থনীতিকে ভিত্তি করে এগিয়ে যাবার।



মৎস সম্পদ আহরনের সম্ভবনা-

সমুদ্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান " সেভ আওয়ার সী" এর মতে স্বাদু পানির ২৭০ প্রজাতির মাছের বিপরীতে আমাদের সমুদ্রে প্রায় ৪৭৫ প্রজাতির মাছ আছে। যার সাথে উপকূলীয় ত্রিশ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। প্রতি বছর বঙ্গোপসাগর হতে প্রায় ৮ মিলিয়ন মেট্রিকটন মাছ ধরা হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে আমরা মাত্র দশমিক সত্তর মিলিয়ন মেট্রিকটন মাছ ধরছি। উন্নত প্রযুক্তি ও টেকনোলজির ব্যবহার মাছ আহরণ বাড়াবে বলে বিশ্বাস সকল মাঝিমাল্লার।



সমুদ্র খনিজসম্পদে সম্ভাবনা-

আমাদের সমুদ্রের ২৮ টি ব্লকের মধ্যে দুটি ব্লকে বহুজাতিক কোম্পানি কনকোফোলিস প্রায় ৫ টিসিএফ গ্যাস পেয়েছে বলে জানিয়েছে। আমাদের অনুমানের তুলনায় তা অতি সামান্য হলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন ভিন্ন কথা।



ভারত মহাসাগরে সমুদ্র মহীসোপানে বিপুল পরিমান গ্যাস পাওয়া গেছে, সাথে মুল্যবান গ্যাস হাইড্রোজ। এদিকে মিয়ানমার সম্প্রতি বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী সমুদ্র বেসিনে খুঁজে পেয়েছে আরেক গ্যাস ভান্ডার। একই ভূতত্ত্ব গঠনের এই বাংলার সমুদ্র বক্ষে তেমনটি হবে না সেটা আশা করা নিতান্তপক্ষে বোকামি। এছাড়াও আমাদের সমুদ্রে প্রায় পনেরটি মুল্যবান খনিজ যেমন ইলামেনাইট, জিরকোনিয়াম, টাইটেনিয়াম অক্সাইড প্রভৃতি রয়েছে যার বৈদেশিক মূল্য কোটি কোটি ডলার।

জাহাজ নির্মান ও শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে সম্ভবনা-

বাংলাদেশ জাহাজ নির্মাণে বিশ্বে ১৩তম আর শিপ ব্রেকিং এ ৩য়। এ এক বিরল সম্মান। বিশ্বের ২৪.৮ ভাগ জাহাজের চাহিদা বর্তমানে পূরণ করছে হেনরী কিসিঞ্জারের তলা বিহীন ঝুড়ির দেশ। এই শিল্পে ব্লু ইকোনোমির ছোঁয়ায় বাংলাদেশ একদিন ডার্বি, ইয়র্কশায়ার, গ্লাসগোর জাহাজগুলোর মানকে ছড়িয়ে যাবে।



বিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্ভবনা-

সমুদ্র স্রোত, জোয়ার ভাটাকে কাজে লাগিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে পাওয়া যেতে পারে অকল্পনীয় বিদ্যুৎ শক্তি।এই শক্তির উৎপাদনে পরিবেশের কোন দূষন হবে না। ভারত দুই লক্ষ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে যার প্রায় দশ শতাংশ অর্থাৎ ২০ হাজার মেগাওয়াট আসে সমুদ্র থেকে।



এছাড়াও সমুদ্র থেকে পেতে পারি ১৫ হাজার রাসায়নিক পদার্থ যা দিয়ে বিভিন্ন ওষুধপত্র তৈরি সম্ভব। সমুদ্র শৈবাল চাষ হতে পারে কৃষি বিপ্লবের বিকল্পায়ন। নির্মান করতে পারি গভীর সমুদ্র বন্দর।



অবশেষে-
মহীসোপানের বিশাল সম্পদরাজি যে গুপ্তধনের ডালা মেলেছে তার ছোঁয়া লেগে বদলে যাক বাংলা। আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা সমুদ্র বিজয়ে বাংলার সমুদ্র জলে যে সোনালী ঢেউ তুলেছে একদিন তার জোয়ার বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে সুফল বয়ে আনবে- এই হোক সকলের অংগীকার।

সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে আগস্ট, ২০১৮ বিকাল ৫:৪০
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দুর্ভিক্ষের আওয়াজ কি আমরা বাংলাদেশিরা শুনতে পাচ্ছি?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৪৩

মুচলেকা দিয়ে, গোপন সমঝোতা করে মীর জাফর কিংবা মীর কাসিমের মতো “কথিত ক্ষমতার” সিংহাসনে বসা যায় ঠিকই কিন্তু বসে বসে জনগণের সর্বনাশ দেখা ছাড়া তাদের বিশেষ কিছু করার থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সম্ভাবনার বন্দি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:১৮



বান্দরবান জেলা কারাগারের চারপাশে পনেরো ফুট উঁচু পাথর ও কংক্রিটের নিরেট প্রাচীর। তারও ওপরে পেঁচানো ধারালো কাঁটাতারের জাল।

বর্ষার কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে ৩ নম্বর ব্লকের সংকীর্ণ সেলে শান্ত হয়ে বসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাজার থেকে নৌকাবাইচ- এরপর কোথায়?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০

মাজার থেকে নৌকাবাইচ- এরপর কোথায়?
মাজার বিদ্বেষ, বাউলগান বিদ্বেষ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আপত্তি- এরপর কিছুদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কলেমা লেখা পতাকা টানানো; আর এখন সিলেটের বিয়ানীবাজারে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে ঐতিহ্যবাহী... ...বাকিটুকু পড়ুন

খোঁজা সম্প্রদায়

লিখেছেন কিরকুট, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭

হিন্দু লোহানা জাতি থেকে ধর্মান্তরিত হয়েছিল খোঁজা সম্প্রদায়।মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই খোঁজা সম্প্রদায়ের মুসলিম ছিলেন এবং শিয়া গোষ্ঠীর আশারি সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। খোঁজাদের বিশ্বাস এবং ধ্রমীয় আচার-আচরণ সহজে কোন পরিচিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাবিতে "মব সায়েন্স" পড়তে হলে কী কী যোগ্যতা লাগে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:১৮



- রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তৌহিদী জনতার ব্যবহার করা জানতে হবে।

- রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও মবকে থামাতে না পারলে সেটাকে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা না বলে "জনতার শক্তি" বলতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×