somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

১৯৩০ সালে আসাম প্রাদেশিক পুলিশ প্রধান ইন্সপেক্টর জেনারেল ফেলাগনের গাড়ী বহর থামিয়ে এক সিলেটী যুবকের দাবী আদায়

০৩ রা আগস্ট, ২০১৫ সকাল ১১:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

....ইংরেজ শাসনামল। সাল ১৯৩০। স্থান সিলেটের বিয়ানীবাজার। আসাম প্রাদেশিক পুলিশ প্রধান ইন্সপেক্টর জেনারেল ফেলাগন যাচ্ছিলেন হাইওয়ে দিয়ে। আবদুস সুবহান চৌধুরী নামে এক যুবক গাড়ীবহরের সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন। গাড়িবহর থেমে গেলে আবদুস সুবহান চৌধুরী নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বললেন তিনি ইন্সপেক্টর জেনারেলকে এলাকার একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে নিয়ে যেতে চান।নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সাথে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে মিস্টার ফেলাগন গাড়ী থেকে নেমে উৎসুক দৃষ্টি দিলে সোবহান চৌধুরী কাছে গিয়ে চোস্ত ইংরেজী দিয়ে সবিনয়ে অনুরোধ করেন ওল্ড স্কীম মাদ্রাসা পরিদর্শনের।অজ পাড়াগাঁয়ে ইংরেজি জানা এই যুবকের অনুরোধ ও কমিনিউটি ডেভেলপমেন্টে আগ্রহ দেখে মিস্টার ফেলাগন অফিসিয়াল ডেকরাম ভেঙ্গে রাজী হন মাদ্রাসায় যেতে।সোবহান চোধুরী উচ্চপদে অধীন পুলিশ কর্মকর্তাকে বোঝান এই মাদ্রাসাকে একটি যুগ উপযোগী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তোলার জন্য তিনি চেষ্টা করছেন কিন্তু ফল হচ্ছে না। বারংবার চিঠি লিখেছেন শিক্ষা বিভাগে কিন্তু সাড়া পাননি। সোবহান চোধুরী এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে তার পরিকল্পনা বিশদ ভাবে বুঝিয়ে বলেন ইন্সপেক্টর জেনারেলকে। তারপর অনুরোধ করেন সাহেব যেন এই ব্যাপারে পদক্ষেপ নেন। মিস্টার ফেলাগন সোবহান চোধুরীর পরিকল্পনা, উৎসাহ ও উদ্দাম দেখে রাজি হন এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চিঠি দিতে। সাথে সাথে ১০০ টাকা চাঁদা দেন প্রতিষ্ঠানটির তহবিলে। এবং অঙ্গীকার করেন প্রতিমাসে বিশ টাকা করে চাঁদা দিবেন।পরবর্তী তিন বছর, যতদিন তিনি আসামে কর্মরত ছিলেন ততদিন এই চাঁদা অব্যাহত রেখেছেন। ১৯৩১ সালে ওল্ড স্কীম মাদ্রাসাটাকে একটি মধ্য ইংরেজী স্কুলে রূপান্তরিত হয়।শুরু হয় বৃহৎ পরিসরে স্কুলের কার্যক্রম।

যেই সময়ের ঘটনা এটা, আবদুস সোবহান চোধুরী তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাত্র ইতিহাসে অনার্স শেষ করে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে। যখনি গ্রামের বাড়ীতে আসেন নিজেকে ব্যস্ত রাখেন এলাকার উন্নয়নে। সমাজের অনিয়ম আর কুসংস্কার তাড়ানোর জন্য গ্রামবাসীকে দেন উপদেশ; কখনো বাড়ি বাড়ি গিয়ে, কখনো সমবেত আকারে।



এরকম আরেকটা ঘটনা আবদুস সোবহান চোধুরী ঘটিয়েছিলেন ১৯৩৪ সালের শীতকালে। ততদিনে তিনি আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্স্ট ক্লাস নিয়ে এলএলবি ডিগ্রী অর্জন করেছেন এবং আলীগড় থেকে ফিরে এসে যোগ দিয়েছেন সিলেট বারে ওকালতিতে।তখন আসাম প্রদেশের গভর্নর ছিলেন স্যার মাইকেল কিং। আসাম প্রদেশের রাজধানী শিলং থেকে তার যাওয়ার কথা অন্য কোথাও। পথে পরবে বিয়ানীবাজার।সোবহান চৌধুরী আগে থেকেই এলাকাবাসীকে নিয়ে হাইওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকলেন।যখনই সাহেবের গাড়ীবহর আসল সোবহান চৌধুরী গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের অনুরোধ করলেন তিনি গভর্নরের সাথে কথা বলতে চান।গভর্নর গাড়ী থেকে নামলে গভর্নরকে এলাকার চিত্র দেখে যেতে অনুরোধ করলেন। গভর্নর জানতে চান তিনি কী করতে পারেন। সোবহান চোধুরী বলেন দক্ষিন দিকের আনাবাদি হাওরকে কুশিয়ারা নদী থেকে খাল কেটে শেওলা নামের এক স্থানের ভিতর দিয়ে নিয়ে এলাকার একটা হাওরে ফেললে আর বিশাল হাওরকে পলিমাটি দিয়ে ভরাট করলে সুজলা-সুফলা শষ্য শ্যামল হবে এলাকা।গভর্নর অঙ্গীকার করলেন তিনি ফিরে গিয়ে এ ব্যপারে পদক্ষেপ নেবেন। শিলংয়ে পৌঁছার পর গভর্নর জরিপ নঁকশা করার জন্য লোক পাঠিয়ে ছিলেন।

বলিষ্ঠ কণ্ঠে দাবী পেশ করা আবদুস সোবহান চোধুরীর স্বভাব একেবারে ছোটবেলা থেকে। তার জন্ম ১৯০৮ সালের জুলাই মাসে বিয়ানিবাজার থানার চারখাই ইউনিয়নে। প্রথম শিক্ষা পান গ্রাম্য পাঠশালায়। শিক্ষক ছিলেন নরেশ চন্দ্র কর। একটু বড় হলে বাবা মোতাফর আলী চৌধুরী তাকে পাঠিয়ে দেন মওলানা আব্দুল বারীর বাড়িতে। উদ্দেশ্য দীনিয়াত ও কোরআন শিক্ষা। মোতাফর আলীর ইচ্ছা ছেলেকে মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিবেন।কিন্তু ছেলে সোবহান এ সুতায় বাঁধা পরতে চায় না।ছেলে মওলানা আব্দুল বারির বাহু থেকে পালিয়ে এসে বাবার কাছে দাবী সে স্কুলে ভর্তি হতে চায়। ছেলের অনবরত পীড়াপিড়িতে বাবা মোতাফর আলী বাধ্য হলেন বাড়ি থেকে ১৫ মাইল দূরে করিমগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে ভর্তি করতে। করিমগঞ্জে এক বাড়ীতে জাইগীর থেকে পরাশুনা চালিয়ে গেলেন আবদুস সোবহান চোধুরী। যে বছর ভর্তি হলেন সে বছরই বাবা মোতাফর আলী চোধুরী মারা যান। স্বাভাবিক ভাবেই সংসারের আয় রোজগার স্তিমিত হলো।বড় ভাই আব্দুল মান্নান চৌধুরী ধরলেন পরিবারের হাল। সোবহান চৌধুরী বছর দুই থাকলেন করিমগঞ্জ।তারপর ফেরত আসলেন নিজের বাড়িতে। আশেপাশে কোন হাইস্কুল নেই। ভর্তি হলেন ভাদেশ্বর হাইস্কুলে। ক্লাস নাইনে।

১৯২৫ সালে মেট্রিক পাশ করেন আবদুস সোবহান চোধুরী। চলে যান সিলেট শহরে, ভর্তি হন সিলেট গভর্নমেন্ট কলেজে। পড়াশোনার সাথে সাথে সমাজ গঠনমুলক কাজ শুরু করলেন।এলাকায় প্রতিষ্ঠা করলেন দুইটি পাঠাগার, বয়স্কদের জন্য খুললেন নাইট স্কুল, আয়োজন করতে থাকলেন বিতর্ক অনুষ্ঠানের।১৯২৭ সালে আসাম প্রদেশে দ্বিতীয় স্থান নিয়ে ডিস্টিংশনে আই পাশ করলেন। ব্রিটিশ ইতিহাসে পেলেন রেকর্ড মার্কস।

কলেজে থাকতেই নিজ এলাকায় উন্নতি নিয়ে তার উৎসাহ। টেলিগ্রামের সুবিধা আদায়ের জন্য যোগাযোগ করলেন ডাক বিভাগের সাথে। ডাক বিভাগ জানালো একটা চুক্তি করতে হবে দশ বছরের জন্য আর দিতে হবে দশ হাজার টাকা। চুক্তিতে স্বাক্ষর লাগবে দশ জনের। সোবহান চোধুরী আহবান জানালেন এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিদের। সব শর্ত পূরণ করে টেলিগ্রাম বিয়ানিবাজারে আনলেন ১৯২৭ সালে।

সেই সময় এক বন্যায় বিয়ানিবাজার তছনছ হয়ে যায়। সোবহান চোধুরী ধরলেন কলম। লিখতে লাগলেন ডেপুটি কমিশনার, গভর্নর, রামকৃষ্ণ মিশন ও সংবাদপত্রে। ইংরেজ ডেপুটি কমিশনার মিস্টার ডোসেলকে আনলেন এলাকা পরিদর্শনে। কাজ হল। সাহায্য আসতে লাগলো। গরীবেরা ত্রান নিতে লাগলো কিন্তু সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলো আত্মসন্মানের বেড়াজাল ভাঙ্গতে না পেরে ক্ষুধার্ত থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সোবহান চৌধুরী ব্যাপারটা খেয়াল করে গোপনে খাদ্যদ্রব্য এবং বস্ত্র পৌছে দিলেন সেই সব পরিবারে।

আবদুস সুবহান চৌধুরী ১৯৩৫ সালে চাকরি নিয়েছিলেন ব্রিটিশ সরকারের মুনসেফ পদে। জেলা ও সেশন জজ হিসেবে চাকরি করেন বরিশাল, পাবনা, চিটাগং ও দিনাজপুরে। ১৯৬৪ সালে উন্নীত হন হাইকোর্টের বিচারপতি পদে।

১৯৬৮ সালের ১ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় লন্ডনের একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান।মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ৬১ বছর


**আবদুস সুবহান চৌধুরী আমার দাদা। ইতিহাস নিয়ে ঘাটাঘাটি করার তাড়নাটা মনেহয় তার কাছ থেকে পাওয়া। আমার জন্ম ১৯৭৮ সালে, তার মৃত্যুর ১০ বছর পর। তাকে পেলে হয়তো আমি ইতিহাস নিয়ে সতের হাজার চুরাশীটা প্রশ্ন করে জর্জরিত করে ফেলতাম।
- আগস্ট ২০১৫, ঢাকা

সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা আগস্ট, ২০১৫ সকাল ১১:৫৪
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জিউস vs মুসা (আ.)

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৫



গ্রিক পুরাণে (Greek Mythology) কোনো একজন ঈশ্বর ছিল না , বরং অসংখ্য দেবদেবী ছিল। তবে জিউস (Zeus) হলেন গ্রিক পুরাণের প্রধান দেবতা , সমস্ত দেবদেবীর রাজা আকাশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

নির্বাক স্পর্শ (এটাকে সুর করে গান করার ইচ্ছে আছে)

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৪০

কুয়াশার ভেতর ফিরে আসি চেনা সেই শহরের পথে,
বিবর্ণ আলো ঘুমিয়ে থাকে পুরোনো কোনো জানালাতে।
একটা নাম আজও কেন নিঃশব্দে ডাকে......
ধুলো জমা সেই পথটাতে পায়ের শব্দ থেমে যায়,
দেয়ালজুড়ে মুছে যাওয়া কত স্মৃতিরেখা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কি রাজধানী ঢাকাকে মেরে ফেলছি ?

লিখেছেন এ.টি.এম.মোস্তফা কামাল, ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৯

ঢাকাকে সব কিছুর কেন্দ্র বানিয়ে ঢাকার মাথায় আমরা যে দুর্বহ বোঝা তুলে দিচ্ছি তার ভার কি ঢাকা বইতে পারবে? আমরা যদি খুব চেনা কিছু দেশের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো রাজধানী... ...বাকিটুকু পড়ুন

হোয়াইট হাউজে বঙ্গবন্ধু - "I want to survive"

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:২৬




জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শেষ করে অক্টোবরের ১ তারিখে ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউজে এলেন বঙ্গবন্ধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণতন্ত্রের অধিকার : ২৫ কিমি: মধ্যে ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:২১

গণতন্ত্রের অধিকার : ২৫ কিমি: মধ্যে ?



জাতিসংঘে বিশ্বের সকল দেশের অংশগ্রহনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান হয়ে গেল ।
সেখানে শাসক, স্বৈর-শাসক ও গনতন্ত্রর বক্ততারা এক হয়েছিলেন । কিন্ত কোন ভালো সিদ্বান্ত
নিতে পেরেছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×