somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হোয়াইট হাউজে বঙ্গবন্ধু - "I want to survive"

২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শেষ করে অক্টোবরের ১ তারিখে ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউজে এলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রোজ গার্ডেনের গাড়িবারান্দায় তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড। সেখান থেকে ওভাল অফিসে হেঁটে গেলেন দুজন।

সেদিনের বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেন, রাষ্ট্রদূত হোসেন আলী এবং প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্স ব্রেন্ট স্কওক্রফট। সরকারি নথি অনুযায়ী, বৈঠকটি শুরু হয় বিকেল ৩টায় এবং চলে ৪৫ মিনিট। শুরুতে সংবাদমাধ্যমকে অল্প সময়ের জন্য ছবি তোলার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

সেই দিনের কথোপকথনটি সহজ বাংলায় এমন—

শুরুতেই প্রেসিডেন্ট ফোর্ড তাঁর স্ত্রী বেটি ফোর্ডের অসুস্থতার কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
এরপর ফোর্ড বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটি প্রথম সাক্ষাৎ।

বঙ্গবন্ধু বলেন, তিনি মূলত তাঁর দেশের মানুষের কথা বলতে এসেছেন। যুদ্ধের পর বাংলাদেশের অবস্থা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের ক্ষতি, এরপর খরা ও বন্যা—সব মিলিয়ে মানুষের দুর্ভোগ চরমে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রসহ সহায়তাকারী দেশগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

বঙ্গবন্ধু বলেন, বাংলাদেশের সম্পদ আছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বনির্ভর হতে পারে। তিনি চাল, পাট, গম ও তামাক উৎপাদনের কথা বলেন। বাংলাদেশের বড় গ্যাসের মজুতের কথাও উল্লেখ করেন। যুদ্ধের কারণে সার কারখানাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও জানান।

এরপর আলোচনায় আসে তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য ও OPEC।

বঙ্গবন্ধু বলেন, উচ্চ তেলের দামের কারণে বাংলাদেশ মারাত্মক সমস্যায় পড়েছে। ফোর্ড OPEC দেশগুলোর উচ্চ মূল্যনীতির সমালোচনা করে বলেন, এ ধরনের উচ্চ মূল্য বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সমস্যার সৃষ্টি করছে।

এরপর আলোচনায় আসে সবচেয়ে জরুরি প্রসঙ্গ—খাদ্য।

বঙ্গবন্ধু বলেন, বাংলাদেশ ভয়াবহ খাদ্যসংকটের মধ্যে রয়েছে। তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের জন্য খাদ্যকেন্দ্র খোলার কথাও জানান। তাঁর তাৎক্ষণিক সংকট—শস্য ও খাদ্য সহায়তা।

ফোর্ড জানান, বাংলাদেশের জন্য খাদ্যশস্যের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সরকারি হোয়াইট হাউজের প্রেস রিলিজে বলা হয়েছিল, ওই সময় PL-480-এর আওতায় প্রাথমিকভাবে ১,৫০,০০০ টন খাদ্যশস্য বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য চুক্তি চূড়ান্ত করার আলোচনা চলছিল এবং আরও খাদ্যশস্য দেওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনায় ছিল।

বঙ্গবন্ধু এরপর ভোজ্যতেল ও তুলনা দেওয়ার বিষয়টিও তোলেন। ফোর্ডের উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত—
“We will do what we can.”
অর্থাৎ, “আমরা যতটা সম্ভব করার চেষ্টা করব।”

বৈঠকে বঙ্গবন্ধু মূলত তুলে ধরছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, খাদ্যসংকট, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, অর্থনীতি, গ্যাস, সার, পাট এবং দেশের ভবিষ্যৎ। আর ফোর্ডের কাছে তাঁর প্রধান তাৎক্ষণিক আবেদন ছিল খাদ্য সহায়তা ও বৃহত্তর অর্থনৈতিক সহযোগিতা।

“I want to survive.”

বৈঠকের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহূর্তগুলোর একটি আসে যখন বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জনসংখ্যা ও সংকটের কথা বলতে গিয়ে বলেন—
“I want to survive.”
বাংলায় যার অর্থ—
“আমি বেঁচে থাকতে চাই।”

এখানে কথাটি ব্যক্তিগত অর্থে নয়; বাংলাদেশের ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও খাদ্যসংকটের প্রেক্ষাপটে দেশের টিকে থাকার আকুতিই তিনি প্রকাশ করেছিলেন। সরকারি নথিতেই বাক্যটি রয়েছে।

কিউবা ও PL-480 প্রসঙ্গ

১৯৭৪ সালের খাদ্যসংকটের সময়ে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের আলোচনায় PL-480 খাদ্যসহায়তা এবং কিউবায় বাংলাদেশের পাটের বস্তা রপ্তানির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

৩০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে বঙ্গবন্ধু ও হেনরি কিসিঞ্জারের বৈঠকের নথিতে দেখা যায়, সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নে কিউবায় পাটের বস্তা বিক্রি ও PL-480 চুক্তির সম্পর্কের বিষয়টি উঠেছিল। বঙ্গবন্ধু বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং কিসিঞ্জার বলেন, তাঁদের আলোচনায় বিষয়টি আসেনি।

পরদিন ১ অক্টোবর ফোর্ডের সঙ্গে বৈঠকের সরকারি নথিতে খাদ্য সহায়তার বিষয়টিই সরাসরি আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। আর ৪ অক্টোবরের মার্কিন কংগ্রেসনাল রেকর্ডে বলা হয়, বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কিউবায় পাটের বস্তা পাঠানো বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে এবং এরপর ১ লাখ টন গম ও ৫০ হাজার টন চাল পাঠানোর চুক্তির পথ তৈরি হচ্ছিল। একই নথিতে অবশ্য মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, খাদ্য সহায়তা আটকে থাকার কারণ শুধু কিউবা-বাণিজ্য নয়; যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব খাদ্যশস্যের ঘাটতিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
একেবারে শেষে—

বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট ফোর্ডকে বাংলাদেশ সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান।

ফোর্ড ধন্যবাদ জানিয়ে হেনরি কিসিঞ্জারের বাংলাদেশ সফরের কথা উল্লেখ করেন। বঙ্গবন্ধু তখন পরিষ্কার করে বলেন—কিসিঞ্জার যাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর আমন্ত্রণ প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের জন্য।

ছবিটির কোনো ক্রেডিট দেখতে না পাওয়ায় কে তুলেছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে জানা গেল না। তবে হোয়াইট হাউজের এই একই ওভাল অফিসে ছবি তোলার সুযোগ আমারও হয়েছিল—প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাতের সময়।

আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তোমাকে সালাম শ্রদ্ধা।


পাভেল রহমান
নিউ ইয়র্ক
২৪ সেপ্টেম্বর ২৬।


লেখাটি সম্পূর্ণ কপি-পেস্ট করা - পাভেল রহমানের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া।

ক্যাপশনঃ ১ অক্টোবর ১৯৭৪। ওয়াশিংটন ডিসি।
জাতিসংঘ অধিবেশন শেষে হোয়াইট হাউজে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হোয়াইট হাউজে বঙ্গবন্ধু - "I want to survive"

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:২৬




জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শেষ করে অক্টোবরের ১ তারিখে ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউজে এলেন বঙ্গবন্ধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশে তরুন সমাজের মাঝে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার : অশনী সংকেত

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৫:৫১


২০২৬ সালের ২৫ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ অবৈধ মাদক গ্রহণে আসক্ত/জড়িত, এবং এই সংখ্যা একটি গবেষণার
ভিত্তিতে উল্লেখ করেন। তিনি নতুন synthetic ও semi-synthetic... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির মূল্যায়নে বঙ্গবন্ধু কিংবা আওয়ামিলীগের অবদান শূণ্য। মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অবদান জামাতের॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:০৬



বিএনপি করার পূর্ব শর্ত কি? ইতিহাস বিচারে দেখা যায়, পার্ক মার্কিন প্রেসক্রিপশনে সর্বোচ্চ পর্যায়ের মিথ্যুক হতে হবে। আর সাথে রাজাকার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড হলে তো কথাই নাই,... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণতন্ত্রের অধিকার : ২৫ কিমি: মধ্যে ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:২১

গণতন্ত্রের অধিকার : ২৫ কিমি: মধ্যে ?



জাতিসংঘে বিশ্বের সকল দেশের অংশগ্রহনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান হয়ে গেল ।
সেখানে শাসক, স্বৈর-শাসক ও গনতন্ত্রর বক্ততারা এক হয়েছিলেন । কিন্ত কোন ভালো সিদ্বান্ত
নিতে পেরেছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৮ বছর ১ সপ্তাহ পার !

লিখেছেন মেহবুবা, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৯


এমনি করে দিন চলে যায়। ১৮ বছর কখন পেরিয়ে গেল এখানে বুঝতে পারিনি। কত জনের কথা, কত ঘটনা মনে আসছে ! এমনি করে সূর্যাস্তের দিকে যেতে যেতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×