পানি চক্র বলতে সাদামাটা ভাষায় পৃথিবীর উপরিভাগ এবং অভ্যন্তরে পানির প্রতিনিয়ত চলাচলকে বুঝায়। আমি অতটা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষনে না গিয়ে বাহ্যিক পর্যবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা করব।
প্রাচীনকালে ধারনা করা হতো- পৃথিবীর উপরিভাগ পানির উপর ভাসমান, এবং আমাদের নদীর অধিকাংশ পানির উৎস মাটির নীচে। হোমার (৮০০ BCE) এই ধরনা পোষণ করতেন। খ্রীষ্টপূর্ব ৫০০ সালের সময়টাতে বৃষ্টিপাতকে পানির আরেকটি উৎস হিসাবে ধরা হয়, যদিও তখন বিশ্বাস করা হতো মাটির নীচর পানিই নদীর পানির প্রধান উৎস। প্লাটো এবং এরিস্টটল উভয়েই এই ধারনা পোষণ করতেন।
রেঁনাসা’র (14th to the 17th century) আগ পর্যন্ত এই ধারনা ছিল যে, শুধুমাত্র বৃষ্টিপাত নদীর পানির জন্য পর্যাপ্ত উৎস নয়। লিউনার্দো দ্য ভিঞ্চি এই মতের ছিলেন। ১৫৮০ সালে ফ্রেঞ্চ জল প্রকৌশলী বার্নাড প্যালিসে (যিনি আধুনিক পানি চক্রের জনক) সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন বৃষ্টিপাত একাই নদীর পানির উৎস হিসাবে যথেষ্ট। কিন্তু এই তত্ত্ব তখনো প্রমাণিত ছিল না। ১৬৭৪ সালে Pierre Perrault এই তত্ত্ব বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করেন। তা স্বত্ত্বেও আধুনিক বিজ্ঞান ১৯ শতকের পূর্ব পর্যন্ত এই তত্ত্বকে স্বীকার করেনি।
বার্নাড প্যালিসে’র পানি চক্রটি আসলে কেমন? তিনি বলেছিলেন- পানি সমুদ্র হতে বাষ্পে পরিণত হয় এবং তা ঠান্ডা হয়ে মেঘের আকার ধারন করে। এই মেঘ হতে পানি পরবর্তীতে বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে পৃথিবীতে পতিত হয়। এই পানি নদী, লেক, ঝর্ণায় জমা হয় এবং তা সমুদ্রে ফিরে আসে ও চক্রটি চলতে থাকে। এই তত্ত্বের আগে ধারনা করা হত সমুদ্রের পানি বাতাসের মাধ্যমে উপরে উঠে বৃষ্টিপাত ঘটাত।
কিন্ত ১৪০০ বছর আগে আল কোরআন কি বলে?

সূরা ওয়াকি’আহ তে আমরা দেখি আল্লাহ আমাদেরকে পানির উৎস নিয়ে চিন্তা করতে বলেছেন। আল্লাহ সুবিন্নস্তভাবে পানির চক্রটি পরিচালনা করেন যার বর্ণনা পাওয়া যায় কোরআনের বিভিন্ন সূরাতে। আমাদের খাবার পানি আসে বৃষ্টি হতে যা লবনাক্ত নয়। বাষ্পীভবনের ৯০ শতাংশই হয় লবনাক্ত সমুদ্রের পানি হতে। আর এই বাষ্পীভবনের ফলশ্রুতিতেই আমরা বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে সুপেয় পানি পেয়ে থাকি।

বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন পানি চক্র একটি সুশৃঙ্খল এবং অপরিবর্তনীয় প্রাকৃতিক আইন মেনে চলে। সূরা মু’মিনুনের ১৮ নং আয়াতে দেখতে পাই আল্লাহ বৃষ্টিপাত ঘটান “পরিমিতভাবে”। পরিমিত বৃষ্টিপাত না হলে পৃথিবীর কি অবস্থা হতো তা ব্যখ্যা করার প্রয়োজন নেই। এর পরেই বলা হচ্ছে পানি চক্রের ৩ টি ধাপের কথা- বর্ষণ, সংরক্ষণ, অপসারণ (water fall, storage of water in the soil and evaporation phenomenon )। আমরা বিষ্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। পানি চক্রের আধুনিক ধারনা এই সেদিনকার, অথচ আল কোরান কি স্পষ্টভাবেই না আমদেরকে ১৪০০ বছর পূর্বে জানিয়ে রেখেছিল। আমরা বুঝতে পারিনি!

সূরা রূমের ৪৮ নং আয়াতে আমরা একটি বিস্তারিত কার্যধারা (condensation, fragmentation and rain-cycle) দেখতে পাই। কিন্তু এর শুরুটা কিভাবে? আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন সূরায় তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।

পানি চক্রের প্রধানতম চালিকা শক্তি হচ্ছে সূর্য। সূর্যের আলোর তাপে সমূদ্রের পানি জলীয় বাষ্পে পরিণত হয়। সূরা নাবা’র ১৩ ও ১৪ নং আয়াতে আল্লাহ সেই সূর্যের কথা বলেছেন, এবং মেঘ হতে নেমে আসা বৃষ্টিপাতের বর্ণনা দিয়েছে। আবারো অবাক হতে হয়।


আশ্চার্যজনকভাবে আল কোরআন (১৩:১২ ও ৭:৫৭) বাষ্পীভবনের পরের সবচেয়ে উল্ল্যেখযোগ্য ধাপ ঘন/ভারী মেঘের কথা বর্ণনা করে। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন একটি বিশাল আকৃতির মেঘখন্ড ১ মিলিয়ন টন পর্যন্ত ভারী হতে পারে। বিস্তারিত এখানে।


পানি চক্রে বাতাস একটি বিশাল ভূমিকা পালন করে। বাষ্পীভবনের মাধ্যমে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘের আকার ধারন করে।বাতাস সেই মেঘগুলোকে একত্রিত করে বৃষ্টিপাতের জন্য প্রস্তুত করে।আমাদের এই জ্ঞান হবার অনেক আগেই কোরআন সেই ঘোষণা দেচ্ছে উপরের দুটি আয়াতে।

এবং কোরাআন আরো বলে কিভাবে বিক্ষিপ্ত মেঘমালাকে একত্রিত করা হয়, মেঘ ঘন আকার ধারন করে। যার পরিনতিতে বৃষ্টিপাত ও শিলা বৃষ্টি হয়।

আমি বিস্তৃত করেছি ভূমিকে এবং তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা ও তাতে উদগত করেছি নয়ন প্রীতিকর সর্বপ্রকার উদ্ভিদ।
আল্লাহর অনুরাগী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য জ্ঞান ও উপদেশস্বরূপ! আমি বর্ষণ করি আকাশ হতে উপকারী বৃষ্টি এবং তা দিয়ে আমি উদ্যান, শস্যরাজি সৃষ্টি করি। সূরা ক্বা’ফ (৫০:৭-৯)
শুধু কি বাতাস থাকলেই বৃষ্টিপাত হবে? সু-উচ্চ পর্বত মালার কি কোন ভূমিকাই নেই? আমরা জানি বাতাস মেঘমালাকে পর্বতশ্রেনীর দিকে প্রবাহিত করে, সেখানে ঘন মেঘ উচু পাহাড়ে বাঁধা পেয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়।
আল কোরআন কত নিশ্চিন্তভাবে বিজ্ঞানের বর্তমান অগ্রযাত্রার আগেই সে কথা বলে রেখেছে।
আল কোরআনে আরো বলা হয়েছে -
তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন, অতঃপর সে পানি যমীনের ঝর্ণাসমূহে প্রবাহিত করেছেন, এরপর তদ্দ্বারা বিভিন্ন রঙের ফসল উৎপন্ন করেন, অতঃপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তোমরা তা পীতবর্ণ দেখতে পাও। এরপর আল্লাহ তাকে খড়-কুটায় পরিণত করে দেন। নিশ্চয় এতে বুদ্ধিমানদের জন্যে উপদেশ রয়েছে। সূরা যুমার (৩৯:২১)
তাঁর আরও নিদর্শনঃ তিনি তোমাদেরকে দেখান বিদ্যুৎ, ভয় ও ভরসার জন্যে এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর তদ্দ্বারা ভূমির মৃত্যুর পর তাকে পুনরুজ্জীবিত করেন। নিশ্চয় এতে বুদ্ধিমান লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে। সূরা রূম (৩০:২৪)
নেমে আসা বৃষ্টিপাত পৃথিবীতে বিভিন্নভাবে প্রবাহিত হয়-নদী, ঝরণা অথবা মাটিতে সঞ্চিত থাকে। এই পানি মাটি ও গাছপালাকে সজীব করে। মৃত গাছপালা থেকে বহুদিনের পরিক্রমায় আমরা তেল, কয়লা অথাবা গ্যাস পেয়ে থাকি। আল কোরআনের এইসব উপদেশ বুঝার জন্য কি আমরা যথেষ্ট বোধশক্তি সম্পন্ন? প্রশ্নটা আমাদের নিজেদের কাছেই।
এবং -
তিনিই সমান্তরালে দুই সমুদ্র প্রবাহিত করেছেন, এটি মিষ্ট, তৃষ্ণা নিবারক ও এটি লোনা, বিস্বাদ; উভয়ের মাঝখানে রেখেছেন একটি অন্তরায়, একটি দুর্ভেদ্য আড়াল। সূরা ফুরকান (২৫:৫৩)
সবশেষে সুপেয় পানি সমুদ্রে পতিত হয়। কিন্তু মিষ্টি পানি ও লবনাক্ত পানির মাঝে একটি দৃশ্যমান সীমারেখা থাকে। বর্তমানে আমরা জানি-দুই ধরনের পানির রং, ঘনত্ব আলাদা।
আর এভাবেই পানি চক্রটি চলতে থাকে।
সেই সাথে আমরা কি কখনো কি ভেবে দেখেছি পৃথিবীতে এই পানি সৃষ্টির আদিতে কিভাবে এল? বিজ্ঞানীরা বলেন আদিতে পৃথিবীতে হাইড্রোজেন ছিল না। ফলে পানি পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। পানি পৃথিবীর বাহির থেকে উল্কা বা পাথরে করে এসেছিল।
আল কোরআন এ ব্যাপারেও আমাদেরকে সূরা বাকারা’র ৭৪ নং আয়াতে নির্দেশনা দেয়ঃ
......প্রস্তর হতেও প্রস্রবণ নির্গত হয় এবং নিশ্চয় সেগুলোর মধ্যে কোন কোনটি বিদীর্ণ হয়, তৎপরে তা হতে পানি নির্গত হয় এবং নিশ্চয় ঐগুলোর মধ্যে কোনটি আল্লাহর ভয়ে পতিত হয় ......... (সূরা বাকারা ২:৭৪)
উপরের প্রতিটি বর্ণনা বর্তমানে প্রমাণিত, এদের বর্ণনায় কোন অসামঞ্জস্য নেই। এই পানি চক্রের কথা এমন একটা সময়ে বলা হয়েছে- যখন মানুষের এ বিষয়ে নূন্যতম ধারনা ছিল না। এতদিন পরে এসে আমরা এখন পানি চক্রের সম্পূর্ণ চিত্রটি অনুধাবন করতে পারি।
পাশাপাশি-
সূরা রাদের ১৩ নং এবং সূরা রূমের ২৪ নং আয়াতে (উপরে আয়াত দুটি আছে) আরো বলা হয়েছে- “তিনিই তোমাদেরকে দেখান বিজলী যা ভয় ও ভরসা (আশা) সঞ্চার করে ...”। ভয়ের কথা আমরা বুঝি, কিন্তু “ভরসা” কি? বেশ কয়েকটি তাফসির দেখেও এর কনভিন্সিং উত্তর পাইনি।
আমাদের বায়ুমন্ডলের ৭৮% নাইট্রোজেন। কিন্তু বেশীরভাগ গাছই এই নাইট্রোজেন সরাসরি ব্যবহার করতে পারে না। বজ্রপাত এই নাইট্রোজেনকে গাছদের জন্য ব্যবহার উপযোগী (nitrogen fixation) করে তোলে। সুতরাং এটা একটা ব্যখ্যা হতে পারে।
পাশাপাশি যদি এমনটা হয়-বিজ্ঞান হয়তো একদিন বজ্রপাতকে ব্যবহার করতে শিখবে, নতুন এনার্জির আবিস্কার ঘটবে, আমাদের এনার্জি সংকট দূর হবে। সেদিন যদি কতিপয় মুসলিম আল কোরআন দেখিয়ে বলে- এটা কোরআনে আগেই বলা হয়েছে তাহলে কোরআনকে বিদ্রুপ করার কোন কারন দেখিনা।
কিন্তু কথা হচ্ছে অবিশ্বাসীরা কখনোই বিশ্বাস স্থাপন করেনা, তারা শুধু বলে- বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সাথে সাথে কোরআন নতুন নতুন ব্যখ্যা নিয়ে হাজির হয়, ব্লা ব্লা। তারা কখনো সত্যকে স্বীকার করতে চায় না। মন ভরা দ্বিধা নিয়ে, মিথ্যার বেড়াজালেই জীবনটা চলে যায়।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে নভেম্বর, ২০১৫ দুপুর ১:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




