somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

থার্টি ফার্স্ট

২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাত ৯:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মিজান ও তাহিয়ার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে দুবছর হল । এরপর থেকে মিজান আজকাল অনেক আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পরেছে । কথা কম বলে , পড়াশুনায় মন দিয়েছে । মিজান ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে বি বি এ পড়ছে । তাহিয়া ঢাকায় একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ২য় বর্ষের ছাত্রী । দুজনের দেখা অনেক বেশি নাটকীয় , অনেকটা গল্পের মত । মিজান এর বোন তাহিয়ার পরিচিত , সেখান থেকে কাহিনীর সূত্রপাত । পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলের এক অনুষ্ঠানে দেখা দুজনের । সেখান থেকে কথা হল , কথা থেকে ভালোলাগা হল , কালের আবর্তে পরে সে ভালোলাগা ভালবাসায় পরিণত হল । অথবা হয়তো সেটা ভালবাসা ছিলনা , কেবলই ভালোলাগা ছিল । লোকে বলে ভালোলাগা আর ভালবাসা এক নয় ।

৩১ তারিখ সকাল টা মিজানের ভালোমতোই শুরু হল । সকাল এ ক্লাস , বিকেল এ বন্ধুদের সাথে আড্ডা , সবাই মিলে প্ল্যান করল রাতে মাঠে বার-বি-কিউ করবে , আরও কত কি ! বার বি কিউ এর আইডিয়া ছিল রাশেদের । " দোস্তরা , রাতে কাজ কর্ম ছাড়া কাটাবি কিভাবে ? চল একটা পার্টি করি । " রাশেদ আড্ডায় প্রস্তাব দেয় । রাশেদের প্রস্তাব সর্ব সম্মতি ক্রমে গৃহীতও হয় । তখনি সুজন বলে উঠে - " পার্টির টাকা কি তুই দিবি ? " " নাহ , ওর আব্বা দিবে , বড়লোক মানুষ । " পাশ থেকে সনেট ফোঁড়ন কাটে । " আহ তোরা থামত! " মিজান বিরক্ত হয় । " আমরা সবাই ভাগাভাগি করে টাকা দিবো ,তাহলেই তো হল । " সবাই মোটামুটি মিজানের কথা মেনে নিল । ঠিক হল টাকা জোগাড় হলে রাশেদ আর সুজন যাবে মুরগি আনতে , মিজান ও সনেট কয়লা জোগাড় করবে । মিজান সনেট কে নিয়ে রিকশায় করে নিউ মার্কেট রওনা দেয় । " আচ্ছা তুই তাহিয়ার ব্যাপারটা কি করলি বলতো ? " সনেট যেতে যেতে হঠাৎ মিজান কে প্রশ্ন করে । " এ ব্যাপারে কোনও কথা না , ব্যাপারটা ভুলে যা । " মিজান উদাস কণ্ঠে বলে উঠে । তার স্মৃতিতে ভেসে উঠে কয়েকবছর আগের সুখ স্মৃতি । কয়েক বছর আগের কোন এক সময় ।


বছরের শেষ সন্ধ্যা - তাহিয়া আর মিজান ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে বসে আছে । সূর্য অস্ত গেলো কিছুক্ষন আগে । সেটা ছিল বছরের শেষ সূর্যাস্ত । একটা ঠাণ্ডা অথচ মিষ্টি হাওয়া বইছে বিকেল থেকেই । তাহিয়ার হাতে মিজানের হাত , দুজনের চোখে মুখেই নূতন বছর সুন্দর করে শুরু করার প্রত্যয় । " এর পরের বছর কি আমরা এতো আনন্দ করতে পারব ? " তাহিয়া বলে উঠল । সন্ধ্যার হিমেল বাতাসে ওকে বেশ লাগছিলো দেখতে । তাহিয়া নীল শাড়ী পরেছিল , কি করে যেন শাড়ির নীল রঙ আর ধানমণ্ডি লেকের পানির নীল রঙ মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছে । " না পারবোনা । " মিজান চাঁছাছোলা একটি জবাব দিল । তারপর দুজনে চুপচাপ । মিজানই নিরবতা ভাঙল - " এই প্রশ্ন টা আজকে তুমি কয়বার করেছ ? " তাহিয়া কিন্তু চুপ করে রইল , এটা ওর রাগ প্রকাশ এর ধরণ , রেগে গেলে তাহিয়া কারো সাথে কথা বলেনা । " অবশ্যই এর পরের বছর আমরা আনন্দ করবো , এর চাইতেও বেশি ঘুরোঘুরি করবো , যদি তুমি পাশে থাকার কথা দাও । " মিজান তাহিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় । " এবার বল , আমাকে কতটা ভালবাস ? " মিজান মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করে । " অনেক ভালবাসি । " বলেই তাহিয়া হেসে দেয় , দুজনে হাত ধরে রাতের ঢাকার পথে হারিয়ে যায় ।

বর্তমান সময় - ৩১ তারিখ সন্ধ্যা বেলা-

তাহিয়ার কাছে সবচাইতে বিরক্তিকর জিনিস হল রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম । কিছু কেনাকাটা করতে নিউ মার্কেট যাচ্ছিল তাহিয়া, আরও ভালো করে বললে কিছু মেডিক্যাল এর বই কিনতে । আধা ঘণ্টা ধরে জ্যামে বসে সিদ্ধ হচ্ছে এখন । তাই মেজাজ টা চরম খারাপ । সাথে বসে থাকা বান্ধবী নিকিতা নন - স্টপ মোবাইলে বক বক করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে । " এই তুই থামবি , তোর প্রেম পিরিতি বাসায় গিয়ে করিস , রাস্তায় না । " তাহিয়া নিকিতা কে ধমক দেয় । নিকিতা তাহিরা কে চোখ রাঙায় , ইশারায় চুপ করতে বলে , সে তার ছেলে বন্ধুর সাথে ফোনে প্রেম -আলাপ করছিল খুব আনন্দের সাথে , মাঝখান থেকে বেরসিক তাহিয়া বাঁধা দিল । " তোর মত খটমট মানুষ যে কিভাবে , বেঁচে থাকে , প্রেম মানে কি তা না বুঝলেও অন্তত দুজনের প্রেমে বাঁধা না দিয়ে থাকতে পারবিনা কেন ? " তাহিয়া রেগে যায় । " তুই ঠিকি বলেছিস রে , আমি আসলেই একটা বেরসিক , প্রেম বুঝিনা । " তাহিয়ার বিরক্তি হঠাৎ উদাসীনতায় পরিণত হয় , গলায় কেমন যেন এক হাহাকারের সুর । নিকিতা তাহিয়ার স্বরের পরিবর্তন বুঝতে পারল , সাথে সাথে বলে উঠল - " আমি ওভাবে বলতে চাইনি রে , সরি দোস্ত । " " বাদ দে , মার্কেট এসে পরেছে প্রায় , জ্যামও ছুটে গিয়েছে । " বলেই তাহিয়া আলোচনা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয় ।

বর্তমান সময় - ৩১ তারিখ রাতের বেলা

থার্টি ফার্স্ট নাইট ঢাকার রাস্তায় মানুষ যেন উপচে পরেছে । সবাই যেন আজকের রাত টাকে স্মরণীয় করে রাখার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ । নিউ মার্কেট এলাকা তো রীতিমত জন সমুদ্রে পরিণত হয়েছে । সেই জন সমুদ্র দিয়েই মিজান আর সনেট সাঁতরে যাচ্ছে । কয়লা কেনা শেষ , দুজনের গন্তব্য এখন নিউ মার্কেট গেট সংলগ্ন খাবারের দোকান । বহু কষ্টে দুজনে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর নাস্তার অর্ডার দিলো । মানুষের ভিড়ে আর নিঃশ্বাসে পরিবেশ কেমন যেন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে । " এই যে ভাই , দুপ্লেট ফুচকা দিনতো , ঝাল একটু কম দিবেন । " একটা অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে মিজান চমকে উঠল । পাশে ঘুরে দেখল তাহিয়া দাঁড়িয়ে আছে । মিজান বিস্ময়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল , হয়তো একেই নিয়তি বলে । এতক্ষণে তাহিয়া মিজান কে খেয়াল করল তারপর দুজনে নিশ্চুপ । সময় বয়ে চলছে সময়ের মতো । পুরানো সেই দিনগুলোর মতো মিজানই প্রথম নিরবতা ভাঙল- " কেমন আছো তাহিয়া ? " " ভালো , তুমি কেমন আছো ? " তাহিয়া যেন একটু অপ্রস্তুত । " ভালো নেই , তবে যদি একটু কথা বলার সুযোগ দাও তাহলে হয়তো ভালো থাকবো । " মিজান একটু হেসে উত্তর দেয় , তবে সে হাসির মাঝে কোন প্রাণ নেই যেন , অনেক মলিন সে হাসি । তাহিয়া নিরবে সম্মতি দেয় । দুজনে হাঁটতে হাঁটতে নিউ মার্কেটের কোলাহল ছেড়ে ঢাকা ভার্সিটির নিরবতায় প্রবেশ করল । তখনও খুব একটা রাত হয়নি , তবে ঝি ঝি পোকা ডাকতে আরম্ভ করে দিয়েছে । " আজকে রাতে কি করবে ? " মিজান কথা খুঁজে না পেয়ে প্রশ্ন করে । " পড়াশুনা , কালকে পরীক্ষা , তুমি কি করবে ?" " রাতে বন্ধুরা মিলে বার বি কিউ পার্টি করবো ভাবছিলাম । " " ভালোই তো , মজায় থাকবে । " তাহিয়া যেন অনেকটা সহজ হয়ে আসে । " আমাকে ক্ষমা কর তাহিয়া । " বলেই মিজান দাঁড়িয়ে পরে। " ক্ষমা প্রার্থনাটা একটু দেরিতে হয়ে গেলো না ? " তাহিয়া যেন একটু অবাক হয় । " দুবছর তো কম চেষ্টা করলাম না , তোমাকে ছাড়া বাঁচা আমার পক্ষে অসম্ভব । আর একটাবার সুযোগ দাও , কথা দিচ্ছি , নতুন বছরে নিজেকে নতুন করে গড়ব । " এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে মিজান বিরতি নেয় । দুজনের নীরবতায় রাতের নিস্তব্ধতা যেন আরও চেপে বসে ।অবশেষে তাহিয়া মুখ খুলে - " আর তুমি কি করে বুঝলে , তোমাকে ছাড়া আমি বেঁচে থাকবো ? " বলেই তাহিয়া মিজানের হাতে হাত রাখে । তাহিয়ার মুখে হাসি । মিজান তাহিয়ার হাত শক্ত করে ধরে । তারপর দুজনে পুরনো দিনের মত ঢাকার রাস্তায় হারিয়ে যায় । পুরনো দুটি আত্মার আবার নূতন করে মিলন হয়
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজ প্রিয়তমা স্ত্রীর প্রশংসা করার দিন

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



আজ প্রিয়তমা স্ত্রীর প্রশংসা করার দিন

আজ ২০ সেপ্টেম্বর, Wife Appreciation Day—প্রিয়তমা স্ত্রীকে ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও সম্মান জানানোর একটি সুন্দর উপলক্ষ।

সংসারের নানা দায়িত্ব, ভালো-মন্দ সময় এবং জীবনের কঠিন মুহূর্তে একজন স্ত্রী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ অপ্রত্যাশিত উপহার

লিখেছেন সামিয়া, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৪০




সৌদি আরবের রিয়াদের একটা পাঁচ তারকা হোটেলে আমার চাকরি। চাকরিটা খুব কঠিন কিছু না। প্রতিদিন একটা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার হাতে নিয়ে হোটেলের কার্পেট পরিষ্কার করি। লবি, করিডোর, হলরুম, অতিথিদের বসার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগার নিমো'র আসল নাম নিমচাঁদ না?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



সামুর আগের মডূ জাদীদ ভাই আমাকে একবার বলেছিলেন ব্লগার নিমো'র আসল নাম নিমচাঁদ, তাঁর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারা মাঝে মাঝে পদ্মার পাড়ে ইলিশ খেতে যান। আর, গরুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাসালসুল (অনন্ত পশ্চাদগমন), প্রথম সৃষ্টি ও ‘আকল’: কুরআন-সুন্নাহর আলোকে একটি সতর্ক অনুসন্ধান

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৩৭


ভূমিকা
সৃষ্টিজগতের অস্তিত্ব নিয়ে মানুষের অন্যতম প্রাচীন প্রশ্ন হলো,সবকিছুর শুরু কোথায়? যদি প্রতিটি সৃষ্ট বস্তুর অস্তিত্বের জন্য তার আগে আরেকটি সৃষ্ট বস্তুর প্রয়োজন হয়, এবং সেই নির্ভরতার ধারা কখনো শেষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মরিয়ম খাতুন জীবন থেকে ছুটি নিয়েছে

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১৮



মরিয়ম খাতুন। মাত্র ১৯ বছরের একটি মেয়ে। ৭৫ বছরের বুইড়া পাঁঠা গাজী নজরুলের লালসার শিকার হয়ে জীবন থেকে ছুটি নিয়েছে। শুধুমাত্র একটি ছোটখাটো চাকুরী সুপারিশের জন্য গিয়েছিল। তখনই ১৯... ...বাকিটুকু পড়ুন

×