পূর্বকথাঃ
সত্য হলেও গল্পের ছলেই বলবো। গল্প হিসেবেই নিবেন। আর, এটা আমার ভয় পাওয়ার গল্প, ভয় দেখানোর গল্প না!
২০১১ সাল। নোয়াখালী।
আমি তখন সবে ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি। নোয়াখালীতে আমার পরিচিত কেউ ছিল না। আব্বুর এক পুরানো কলিগ ছিলেন। প্রস্তাবটা উনিই করেন। উনার বাসায় থাকার। রাজি না হবার কোন কারণ নেই। একটা ফ্যামিলির সাথে থাকতে পারবো, এটা কম কি! প্রথম ক'দিন একটা মেসে ছিলাম। অনেক জ্বালা। তাই, প্রস্তাব পাওয়া মাত্র রাজি হয়ে গেলাম
সকাল সাড়ে সাতটায় যখন আমি বাসার সামনে নামলাম, আমি মুগ্ধ! এত সুন্দর একটা জায়গা! একটাবারও খেয়াল হলো না, এই বাসা সেটা নয়, যেটায় আমি উঠবো ভেবে ছিলাম। এটা আংকেলের আরেকটা বাসা। এটা মূল বাড়ি থেকে অনেকটাই দূরে। আমি ভেবেছিলাম, মূল বাড়ির বাইরের ঘরটা আমার হবে। যা হোক, উনি তো বলেন নাই কোন বাড়িতে উঠবো, আমার বুঝার ভুল।
স্যুটকেস আর ব্যাগ নিয়ে আংকেলের সাথে বাসায় ঢুকলাম। বিশাল বিশাল ফার্নিচার। সবগুলোই ঘরে বানানো বুঝা যায়। দরজা দিয়ে এসব ঢুকবে না। আংকেল বললেন, "অরিজিনাল সেগুন কিন্তু!"
"বলেন কি! সবগুলো?"
"হ্যাঁ। আর..." চাবিটা আমার হাতে তুলে দিলেন, "...এ সব কিছুই আগামী ৫ বছরের জন্য তোমার।"
"আপনারা উঠবেন না?"
"এখন না, আমার বাবাকে দেখছো না? উনি ওয়ার্নিং দিছেন, এ বাসায় উঠলে উনার লাশের উপর দিয়ে উঠতে হবে!"
"আচ্ছা!", হেসে ফেললাম। "আংকেল, আমার ৮ টায় ভার্সিটি যেতে হবে।"
"ওকে তাহলে, সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে কথা হবে।"
সারা ঘরে চোখ বুলিয়ে বের হয়ে গেলাম। সারাদিনের ব্যস্ততায় আর বাসার কথা মনে হয়নি। বিকেলে যখন ফিরছি তখন ব্যাপারটা খেয়াল করলাম। গ্রামে ঢুকার পর ১০ মিনিটের মত হাটতে হয় আমার বাসাটা দেখতে হলে। যখন দৃশ্যপটে আসে, তারও পর আরও ১০ মিনিট হাটতে হয় পৌছাতে।
চারপাশে ধানের মাঠ। মাঝে সর্পিলাকারে পাকা রাস্তা। আমার বাসাটার চারপাশে কোন বাসা নাই। সামনে-পেছনে ধানি জমি। বাসাটা জমির লেভেল থেকে অনেকটাই উঁচুতে। বাসার একটু পেছনে জঙ্গলের মত একটু জায়গা। একা একটা বাসা। ২ ফ্ল্যাটের। এক পাশে আমি থাকবো, আরেক পাশ বন্ধ।
হুম, চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলাম! একটা চায়ের দোকানে বসে দেখছিলাম বাসাটা।
বাসায় যখন ঢুকলাম তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে। ঘরে ঢুকে লাইট জ্বেলে দিলাম। প্রথমে ড্রয়িং রুম, পরে ডাইনিং, আর সবশেষে আমার বেডরুম। একটু মন খারাপ, সিলেট ছেড়ে এসেছি। সিলেটের সন্ধ্যাগুলো মনে পড়ছিল খুব।
ধপ করে আঁধারে ঢেকে গেল সব হঠাৎ করে। গ্রামের লোডশেডিং! উফ! কখন আসে কে জানে।
মোমবাতি একটা খুঁজে নিয়ে জ্বালালাম। সারা ঘরে কাঁপা কাঁপা আলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মন থেকে সিলেটকে সরিয়ে দিয়ে বিছানায় এসে বসলাম।
হঠাৎ অমানুষিক এক রক্ত হিম করা চিৎকার। রক্ত হিম হওয়াটা যে কি বুঝে গেলাম! শিয়ালের বিকৃত চিৎকার কোন বিশাল প্রাণীর গলায় যেমনটা হতে পারে, মনে হয় সেরকমই। ঠিক আমার এক হাত পেছনে জানালার একেবারে সাথে। কিন্তু, সেখানে একজন মানুষও জমিতে দাঁড়িয়ে জানালার নাগাল পাবে না। তাছাড়া পেছনে বারান্দাও আছে। নিস্তব্ধ সন্ধ্যা যেন ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আমার সারা শরীর বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। এই অনুভূতি এতদিন বইয়ে পড়েছি, সেদিন প্রথম টের পেলাম।
থামছে না চিৎকারটা... প্রতিটা শিরায় শিরায় অনুভব করছিলাম, যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। ১০ সেকেন্ডও হয় নাই, সারা বাসা পুরো একচক্কর দিল চিৎকারটা, বাসার সামনে গেল, ছাদের দিকে কিছু উঠে গিয়ে আবার নেমে আসলো। শেষে এসে থামলো ঠিক আমার বিছানার পাশের জানালায়, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল। চিৎকারটা শেষ হলো কুকুরের ভাঙ্গা গলায় কান্নার মত করে। ঠিক আমার কানের পাশে। হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেল। কান তখন ঝাঁ ঝাঁ করছে।
আবার, নিস্তব্ধ সন্ধ্যা। সুনশান নিরবতা। সারা ঘরে মোমবাতির আলো তখনো কাঁপছে। সব আছে, শুধু হঠাৎ শুরু হওয়া চিৎকারটা হঠাৎ'ই নাই হয়ে গেল।
এত ভয় পেয়েছিলাম যে, আমি অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছিলাম। যখন একটু ধাতস্থ হলাম , টের পেলাম আমার দু'চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে আছে।
হঠাৎ কলাপ্সিপল গেইটে জোর ঝাকানো আর আংকেলের ডাক শুনলাম। বিছানা থেকে উঠতে পারলাম না প্রথমবারে। পা'তে যেন কোন সেন্স নাই।
টলতে টলতে বের হলাম।
"শুনেছেন, আংকেল? শুনেছেন?" একটু মনে হয় অপ্রকৃতস্থের মত জিজ্ঞেস করলাম।
"কি শুনবো?" আংকেল অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন।
"চিৎকারটা। শুনেন নি?
"নাহ, আমি তো কখন থেকে গেইট ঝাকাইতেছি।"
"কতক্ষণ?" গলা কেঁপে যাচ্ছে।
"২৫-৩০ মিনিটের মত।"
"জ্বি?" অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ উনার দিকে।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মে, ২০১৪ রাত ১২:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




