যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পরাশক্তি দেশগুলো নিয়ে গঠিত মিত্রবাহিনী যখন আফগানিস্তানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে তখন থেকে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার নিহত হয়েছে ওসামা বিন লাদেন। তার মৃত্যু হয়েছে জর্জ বুশ জুনিয়র এবং প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোও এ বার্তাটি দিয়েছিলেন। আল-কায়েদা যথারীতি তা অস্বীকার করে এসেছে। অনেক রহস্য ও প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া গেলেও লক্ষণীয় যে, এবারের মৃত্যু সংবাদে উভয় পক্ষ থেকে কোন পাল্টা বিবৃতি দেয়া হয়নি। মৃত্যু নিয়ে যতই ধূম্রজাল থাক একটি বিষয়ে বিশ্ববাসীর সন্দেহ যে অমূলক নয় তা হল জঙ্গিবাদের সাথে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। একটি মৃত্যু বিশ্বে শান্তি নিশ্চিত করেনি, কিন্তু এর মাঝে যে সতর্কবার্তা ছিল তা কারা কতটা উপলব্ধি করলো তার উপর নির্ভর করবে বিশ্বের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।
ওসামা-বধ: সাফল্য ওবামা'র?
ওসামা (লাদেন তার পিতার নাম) শুধু একটি নামে পরিণত হয়েছিল। জীবিত ওসামা'র প্রভাব কতটা বিস্তৃত ছিল তা প্রশ্ন সাপেক্ষ কিন্তু মৃত ওসামা ওবামার সাময়িক জনসমর্থন বাড়ালেও আরব বিশ্বে যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে সেক্ষেত্রে কি প্রভাব ফেলবে সেটাই বিবেচ্য। তাকে কি জীবিত গ্রেফতার করা যেত না? তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী আবু আহমেদের সহায়তায় সিআইএ ওসামার অবস্থান নিশ্চিত করে বলে জানা যায়। আবার অভিযান পরিচালনাকারী গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হয় প্রতিরোধের আশংকায় গুলি করা হয়েছে। আবু আহমেদ কি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত করেনি? তার স্ত্রীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে, ওসামাকে আত্মসমর্পণ করতেও বলা হয়েছে। সম্পূর্ণ অভিযান ওবামা, হিলারি লাইভ উপভোগ করেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের চৌকস সেনা দল তাকে জীবন্ত গ্রেফতার করতে পারলো না- এটা কি সাফল্য না ব্যর্থতা? নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং নি:সন্দেহে আস্থা-ভাজন অফিসারদের নিয়ে এ অভিযান পরিচালিত হয়েছে যা পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারা জড়িত ছিল তাও অজানা। তারপরও উইকিলিকস'এর কাছে কি করে ভিডিও গেল? পরবর্তীতে ভিডিওগুলো প্রত্যাহার করা হয়। তাহলে তারা এ সফল অভিযানের কোন ভিডিও/ফটো কেন প্রকাশ করলো না? কেউ যদি প্রশ্ন করে আল-কায়েদা আবু আহমেদের মাধ্যমে সিআইএ ও বিশ্ববাসীর চোখ ফাকি দিয়েছে! যদি প্রশ্ন তোলা হয় এটি আল-কায়েদা-সিআইএ'র যৌথ প্রযোজনার নাটক?
নৈতিকতা বিবর্জিত রাষ্ট্রের নাম পাকিস্তান:
বলার অপেক্ষা রাখে না জর্জ বুশ জুনিয়রের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কার্যক্রমে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান মোশারফের একাত্ম হবার ঘোষণা স্ট্যান্টবাজি ছিল মাত্র। বেনজির ভুট্টোর দাবী ছিল বিভ্রান্তিকর। উগ্রবাদ বা জঙ্গিবাদের সাথে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অনেক অভিযোগ করা হয়েছে, পাকিস্তান প্রতিবারই অস্বীকার করেছে। আফগানিস্তান নিয়ে সোভিয়েত বিরোধী যুদ্ধে পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ তৈরিতে সহায়তা করেছে - প্রয়োজন শেষে তারাই ফ্রাঙ্কেন্সটাইন হয়ে দাড়ায়। যাদেরকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যোদ্ধায় পরিণত করা হয় তারাই মাথা ব্যথার কারণ হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র মুখ ফিরিয়ে নিলেও পাকিস্তান পারেনি কারণ ততদিনে তারা শাসকগোষ্ঠী নির্ধারণের নিয়ামকে পরিণত হয়। ক্ষমতা-কেন্দ্রিক রাজনীতি, সামরিক প্রভাব ও স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের কারণে তাদের মানসিকতা এখনও আশির দশকের আচরণের প্রতিফলন ঘটায়। সামরিক ঘাটির একশ গজের মধ্যে ওসামার প্রাসাদ কি তাদের অজ্ঞাত ছিল? যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষ সেনারা তাদের দেশে অভিযান পরিচালনা করেছে; তাদের সামরিক বাহিনী, আইএসআই কি কিছুই জানতো না? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? এ অভিযানে তাদের সম্পৃক্ততার স্বীকৃতি দেয়ার নৈতিক শক্তিও পাকিস্তান সরকারের নেই।
বিশ্বশান্তি ও অপ্রত্যাশিত মানবাধিকার লঙ্ঘন
আগেও ওসামার মৃত্যু সংবাদ দেয়া হয়েছে। আল-কায়েদা অস্বীকার করেছে কিন্তু প্রমাণ দিতে পারেনি। কিছুদিন পর ভিডিও বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে ওসামা বিন লাদেন। যুক্তরাষ্ট্র সে ভিডিও সত্য নয় বলে বিবৃতি দিয়েছে। এবার উভয় পক্ষের সম্মতির প্রেক্ষিতে সত্য বলেই ধরে নিচ্ছি। সুনিপুণ পরিকল্পনা ও প্রাপ্য সকল সহযোগিতা নিশ্চিত করে এ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এটি এক-পাক্ষিক ছিল। জীবিত ওসামাকে উদ্ধার করা হলে তা হত সাফল্যের ও সাহসিকতার। উগ্রবাদ বা জঙ্গিবাদের অনেক অজানা অধ্যায় বিশ্ববাসী অবগত হত। এ বধ অভিযান মার্কিন সেনাদের সাফল্যের চেয়ে কাপুরুষতাই বেশী তুলে ধরেছে। একজন অপরাধী যত অপরাধই করুক মৃত্যুর পর সে মৃতদেহ অবশ্যই প্রচলিত সংস্কার প্রত্যাশী। তার মৃতদেহ হেলিকপ্টারে করে আফগানিস্তানে নেয়ার কি প্রয়োজন ছিল? মৃতদেহ সাগরে ভাসিয়ে দেয়ার প্রয়োজন ছিল? ওসামা'র স্ত্রীসহ নিহত চারজনের লাশ কোথায়? অন্তত তার স্ত্রী'তো সন্ত্রাসী ছিল না। ওসামা-হত্যাকে যদি বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করার প্রত্যাশিত ও নন্দিত কাজ হয়, মৃত্যু পরবর্তী লাশগুলো নিয়ে মার্কিনী লুকোচুরি ততটাই নিন্দনীয় ও অপ্রত্যাশিত।
মৃত্যুর আগে ওসামা
ওসামার স্ত্রী'কে যখন ঢাল হিসাবে ব্যবহার করা হল, গুলি করা হল, মৃত্যু যখন সময়ের ব্যাপার মাত্র তখন কি তার একবারও মনে হয়েছে যে জর্জ বুশ সিনিয়রের ইশারায় আইএসআই ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়েছিল? তার মতো হাজার মানুষ অস্ত্র তুলে নিয়েছিল শুধু একটি স্বপ্ন নিয়ে! একবারও কি মনে হয়েছে বুশ জুনিয়রের ইশারাতে সেই আইএসআই বুঝিয়ে দিয়েছে সবকিছু রাজনীতি ও ক্ষমতার জন্য! মনে পড়েছিল কি যে আমি বা আমার অনুসারীরাও এভাবে হত্যা করেছে! যদি এমন হত সে চাইলে সোভিয়েত যুদ্ধকালীন সময়ে ফিরে যেতে পারবে - আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি সে এই হত্যাযজ্ঞের খেলার গুটি হবার সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করতো।
সন্ত্রাসী পরবর্তীতে বিপ্লবী আখ্যায়িত চে'কে হত্যায় যেমন যুক্তরাষ্ট্র সম্পৃক্ত ছিল; তেমনি তাকে বিপ্লবী বানিয়ে বিলিয়ন ডলার বাণিজ্যও করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ধনতন্ত্র। কখনও যুক্তরাষ্ট্র যদি ওসামা'কে বিপ্লবী নায়ক রূপে প্রতিষ্ঠা করে অবাক হবার কিছু থাকবে না। আরব বিশ্বে যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে সে আন্দোলনে এ মৃত্যু প্রভাব ফেলবে কি-না তা সময়ই বলে দিবে। কিন্তু পাকিস্তানের আল-কায়েদা সংশ্লিষ্টতা এবং এর প্রক্ষিতে বিভিন্ন সময়ে দেয়া পরস্পর বিরোধী বক্তব্য বিশ্ববাসী কিভাবে বিবেচনা করবে তার উপর নির্ভর করবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির অনেক সমীকরণ। ওসামার মৃত্যু হয়তো ওবামাকে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে সাহায্য করবে কিন্তু এ রাজনৈতিক সুবিধা বিশ্ববাসীর জন্য কি বার্তা বয়ে আনবে তা অবশ্যই ভাবতে হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


