somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফাস্ট ফ্যাশন ও আমাদের ভবিষ্যৎ

১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ রাত ১১:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার মনে আছে- ছোটবেলায় চট্টগ্রামের জহুর হকার মার্কেট বা ঢাকার বঙ্গবাজারে টাল কোম্পানির কাপড় পাওয়া যেতো; আরো ভদ্র ভাষায় বললে- বিদেশের সেকেন্ড হ্যান্ড কাপড়। যেগুলোর অনেকগুলো দেখে বুঝাই যেতো না- এগুলো ব্যবহৃত। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়াসহ ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রিগুলো নিজেদের প্লাস্টিক বর্জ্য, ই-বর্জ্য (পুরানো মডেলের iphone ও macbook) যেমন বহু বছর ধরে লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়াতে dump করে আসছিলো, তেমনি কাপড়ের ক্ষেত্রেও আরো আগে থেকে তা করা হতো। গার্মেন্টস শিল্পের উত্থানের পরে বাংলাদেশে অন্যদের ব্যবহৃত কাপড় আসা ধীরে ধীরে কমে আসে; যদিও ব্যবহৃত জাহাজ আসা থামেনি।


Repairing আর Reusing এর যে সুন্দর কালচার, সেটা বাংলাদেশে অনেক আগে থেকেই ছিলো। Consumerism বা ভোগবাদ এসে এইরকম ভালো অভ্যাসগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে। মানুষ আগে চিন্তা করতো, কিভাবে খরচ বাঁচানো যায়; আর এখন খরচ হাতের নাগালে চলে আসার কারণে তারা সময় ও শ্রম বাঁচাতে খরচের চিন্তাও করে না। কিন্তু মূল কোপটা গিয়ে পরেছে পরিবেশের উপরে; এবং ঘুরেফিরে মানুষের নিজের উপরেই।


কাপড় সেলাই করার চর্চা ও দক্ষতা ঘরে ঘরে প্রায় সবার ছিলো; নিজেদের তাগিদেই। বিনিয়োগকারী ও শিল্পউদ্যোক্তারা সেটাকে Monetize করলো। ফ্যাশন বিপ্লবের সূচনা হলো গোটা বিশ্বজুড়ে। উন্নত বিশ্ব টাকা, মেশিন, কাঁচামাল দেয়; উন্নয়নশীল আর অনুন্নতরা কাপড় বানিয়ে দেয় সস্তা শ্রম দিয়ে। সবার মধ্যে ঘন ঘন Product change এর প্রবণতা দেখা দিলো; প্রয়োজন হোক আর না হোক। আপডেট হওয়াকে সমাজে সাধুবাদ করা হতে লাগলো। ফ্রি, সস্তা বা বাধ্যতামূলক পেইড মার্চেন্ডাইজের ট্রেন্ড আসলো- সবাই স্পেশাল লোগো বা মোটো সম্বলিত ড্রেস পরতে লাগলো।


সবকিছুর একটা Threshold point আছে; সীমা আছে। কাপড় উৎপাদন হোক, বা সেই কাপড় রাখার জন্য বিশাল ফার্নিচার- সবকিছুর একটা ecological impact আছে। আমাদের ব্যবহৃত প্রতিটা বস্তুর কার্বন ফুটপ্রিন্ট ও ওয়াটার ফুটফ্রিন্ট আছে; অর্থাৎ দ্রব্যটা উৎপাদনে কতখানি কার্বন নিঃসরণ হয়, কতখানি পানি খরচ হয়। এখন গর্দভরা বলবে- এতকিছু ভাবার কি দরকার, এতকিছু ভেবে কি সবকিছু করা যায় নাকি, আমাদের পুর্বপ্রজন্মের ওরা কিভাবে করে গিয়েছে, ইত্যাদি। মূল কথা হচ্ছে- আমাদের আগের মানুষদের জনসংখ্যা এত বেশি ছিল না। আমাদের আগের মানুষদের জ্বালানি ব্যবহার এত বেশি ছিল না। আমরা ধীরে ধীরে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ পৃথিবী থেকে উত্তোলিত করে নিঃশেষ করে ফেলছি, সেটা প্রকৃতপক্ষে আমাদের একমাত্র বসবাসযোগ্য এই গ্রহটাকেই শেষ করে দিচ্ছে। অনেকে আবার বলবে- এটা তো হওয়ারই কথা; এভাবেই তো কেয়ামত হবে। দুনিয়াটাকে নিজেদের ভোগবাদিতা আর নির্বুদ্ধিতার কারণে নিজেদের হাতে ধ্বংস করে দিয়ে- আবার সেই দুনিয়াতেই একের পর এক বাচ্চা পয়দা করে যাওয়া একমাত্র নির্লজ্জ কামুক বিলাসিতারই বহিঃপ্রকাশ।


এসবের সহজ সমাধান আছে। সংযম ও বিচক্ষণতা। অনিয়ন্ত্রিত উৎপাদন, বিপণন, ভোগ এবং নিক্ষেপণ বন্ধ করার কোনই বিকল্প নাই। একটু সহজ করে উদাহরণ দিয়ে বুঝাই। একটা শার্ট বানানোর কাঁচামাল ও মেশিন বানানো, ঐ শার্টটা বানানো, শার্ট এর আনুষঙ্গিক জিনিসগুলো তৈরি, শার্টের ফ্যাক্টরির কার্যক্রম, শার্ট বিক্রি ও পরিবহন, এবং সর্বশেষ শার্টটা পুড়িয়ে ফেলা বা ল্যান্ডফিলে ডাম্প করা পর্যন্ত- বিদ্যুৎ/জ্বালানি খরচ হচ্ছে, কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে। অর্থাৎ বায়ুস্তরে এমন সব উপাদানের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে- যা মানুষের স্বাস্থ্য, কৃষি ও অর্থনীতির জন্য সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ। এই ভারসাম্যহীনতার কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিমাণ ও তীব্রতাও বাড়ছে; এবং অনিয়মিতভাবেও হচ্ছে। কার্বন নিঃসরণের মত একটা Product এর lifecycle এ পানির খরচও প্রচুর পরিমাণে হয়। আর পুরা বিশ্বে স্বাদু/মিঠা পানির যে এখন কি ভয়ানক দুরবস্থা- সেটা যারা জানে না, তারা তো বোকার স্বর্গেই আছে।


মহামারী আসার পরে, গোটা বিশ্ব মোটামুটি নড়েচড়ে বসেছে। কোন পণ্য দরকার ও কোন পেশাজীবি বেশি দরকার- সেটা নতুন করে বুঝার ও ভাবার সময় এসেছে। ভোগবাদ এত সহজে যাবে না। অধিকাংশ মানুষ ও পেশাজীবি নিজেদের স্বার্থেই চাইবে- মানুষ বেশি ভোগ করুক। মানুষের এই স্বার্থপর মনোভাব ও লোভের কারণেই Fast Fashion এত দ্রুত দুনিয়া থেকে বিদায় নিবে না। বিশেষত নারীসমাজকে অতিরিক্ত ভোগবাদী জীবনযাপনের ফাঁদে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলা হয়েছে। মেয়েজাতি হচ্ছে অনেকের জন্য Cash Cow; শপিংমল/মার্কেটের দোকানদারদের আকুতি শুনেই বুঝা যায়।


আপনি যদি আপনার আয়-ব্যায়-সঞ্চয়-দরকার বুঝে নিয়ে অদরকারি ভোগ্যপণ্যকে #Refuse করতে শুরু করেন, নিজের চাহিদাকে #Reduce করে আনেন, তাহলে সবার আগে মাথায় হাত পরবে সেই ব্যবসায়ীদের- যাদের জীবিকা নির্বাহ করে- আপনি কত দ্রুত ব্যবহৃত কাপড় বাতিলের খাতায় নাম লিখিয়ে নতুন কাপড় কিনেন- তার উপরে। তারা কখনোই চাইবে না- আপনি এভাবে জীবনযাপন করেন; ঠিক যেমন একজন খারাপ ডাক্তার চায় না তার রোগী ভালো হোক, খারাপ উকিল চায় না তার মক্কেলের ঝামেলা চুকে যাক, খারাপ মেকানিক চায় তার কাছে বারবারই একই জিনিস নিয়ে ফেরত আসুক।


বড় ভাইবোনের কাপড়- ছোট ভাইবোন পড়া; এইটা ছিল চিরায়ত বাঙালির #reuse কালচার। যেটা এখন খুব কমে এসেছে। কারণ অতিরিক্ত ফ্যাশন সচেতনতা; এবং Cheap ও Fast ফ্যাশন! মানুষ ভুলে যায়, সস্তা বা ফ্রি যেকোন কিছু দাম উসুল করে অন্যভাবে। আপনি যদি আপনার মৃত মায়ের ব্যবহারযোগ্য শাড়ি নিজের বউ, বোন বা মেয়েকে পরতে দেন, সেটাতে ধর্মীয় বাধা থাকার প্রশ্নই উঠে না; কারণ সব ধর্মই অপচয়কে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করে। আমাদের নিজেদের বানানো উলটাপালটা সামাজিক রীতির কারণেই আমরা এসব করি না।


বাংলাদেশের আরো একটা ভালো রীতি ছিল- পুরানো কাপড় দিয়ে বাচ্চাদের ডায়পার (কাপড়ের ডায়পার সবচেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব!), নতুন বাচ্চার ছোট কাপড়, ঘরের সবার ব্যবহারের জন্য নকশি কাঁথা, ইত্যাদি বানানো। এই ব্যাপারটাকে বলে #repurposing বা #upcycling। সবচেয়ে বেশি প্রচলিত রিপারপাজিং হয় পুরানো কাপড়কে ন্যাকড়া বানানোর ক্ষেত্রে।


যেই পণ্য আর আপসাইকেল করা সম্ভব হয় না, সেই পণ্যকে করতে হয়- #recycling! ফেসবুকের রিসাইক্লিং পেইজ/গ্রুপগুলোর কারণে হোক, কিংবা পরীক্ষার খাতায় লেখার কারণেও হোক, আমরা সবাই রিসাইকেল সম্পর্কেই বেশি শুনেছি। যদিও অনেকেই এটা সম্পর্কে ক্লিয়ার ধারণা রাখে না। উদাহরণস্বরূপ, আপনার পরনের জামাটা যখন আর পুনর্ব্যবহার ও আপসাইকেলের উপযোগী থাকে না, তখন সেটা যা করা হয়- সেটাই রিসাইকেল। আমরা এই রিসাইকেল ধাপটা কখনোই চোখে দেখি না। ডাস্টবিনে পুরানো কাপড় ফেলে দেওয়াটাই একজন সাধারণ ভোক্তার জন্য রিসাইকেল। সেই কাপড় কে নিলো, কি করলো, কোথায় ফেললো- এটা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। কিন্তু ঐ কাপড়টার কারণেই আমাদের নালা বদ্ধ হয়ে গিয়ে রাস্তায় পানি উঠে। ঐ কাপড়টা মাটিতে থাকার কারণেই ফল/সবজি/শস্য উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি হয়। ঐ কাপড়টা পাশের বস্তিতে পুড়ানোর কারণেই আপনার বাচ্চার নিউমোনিয়া হয়।


রিসাইক্লিং এর জন্য দরকার আলাদা রিসাইক্লিং স্টেশন ও ভেন্ডর; আলাদা কালেকশন সিস্টেম। বিশ্বের অনেক দেশে এরকম সম্পূর্ণ অযোগ্য কাপড়গুলো নিয়ে, সেগুলো মেশিনে কেটে- পুনরায় এসব থেকে নতুন পণ্যের কাঁচামাল বানানো হয়। সম্ভবত বাংলাদেশেও খুব কম পরিমাণে এরকম হচ্ছে।

সারমর্ম হচ্ছে- নিজের ভোগ আর লোভে লাগাম টেনে ধরেন।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ রাত ১১:৩৩
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

স্কুলের দ্বিতীয় দিন

লিখেছেন মোঃমোস্তাফিজুর রহমান তমাল, ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ বিকাল ৩:৩০



ছবিঃ সমকাল পত্রিকা।

শিরোনাম পড়ে মনে হতে পারে "দ্বিতীয় দিন কেন? প্রথম দিন কেন নয়? " আসলে স্কুলে আমার প্রথম দিন গতানুগতিকই ছিলো।প্রায় সবার সাথেই মিলে যাবে।বাবার আঙুল ধরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফুলের নাম : কালো পঙ্গপাল!!

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ বিকাল ৫:২৯



সময়টা ২০১৫ সালের মে মাসের শেষ দিকে। যাচ্ছিলাম ভারতের জম্মু থেকে পেহেলগামে। যারা ঐ পথে গিয়েছেন তারা জানেন মাঝে মাঝেই ঐ পথে বেশ যানজটের সৃষ্টি হয়। তেমনি এক যানজটের ফাঁদে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কলকাতায় কেন পদ্মার ইলিশ?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ রাত ৯:৩১



যারা পদ্মাকে হত্যা করছে, তাদেরকে কেন পদ্মার ইলিশ খেতে দেয়া হবে?
তাদের জন্য শক্ত শেলের কাঁকড়া পাঠানোর দরকার ছিলো; কলকাতায় ৭ হাজার টন ইলিশ রপ্তানী করাটা বেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের শাহেদ জামাল- (চৌত্রিশ)

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ রাত ১:০১


ছবিঃ আমার তোলা।

গতকাল রাতের কথা-
সুরভি আর ফারাজা গভীর ঘুমে। রাতের শেষ সিগারেট খাওয়ার জন্য চুপি চুপি ব্যলকনিতে গিয়েছি। দিয়াশলাই খুঁজে পাচ্ছি না। খুবই রাগ লাগছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ আগন্তুক - দ্য পানিশার

লিখেছেন অপু তানভীর, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ সকাল ১১:১৭


আমিনুল ইসলাম নিজেকে কোন ভাবেই শান্ত রাখতে পারছেন না । হাসপাতালের কেবিনের ভেতরে বারবার পায়চারি করছেন । কীভাবে নিজেকে শান্ত করবেন বুঝতে পারছেন না । একটু আগে থানাতে গিয়েছিলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×