
তখন প্রথম বর্ষের ছাত্র। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে আমাদের আরেক বন্ধুর জন্মদিনের উপহার কিনতে গেছি মৌচাক মার্কেটের পিছনে, আনারকলি মার্কেটের সামনের ক্রাফটের দোকানগুলোতে। একটা নারীর ভাস্কর্য দেখে আমার খুব পছন্দ হলো। বন্ধুদের বললাম, ‘এটা নিই।’
আমাদের এক গোঁয়ার ধরনের বন্ধু বলল, ‘ধুর মিয়া, এডা নেওন যাইব না।’
‘ক্যান?’
‘ঘরে এইসব জিনিস রাখতে অয় না, তুই বুঝবি না, এইডা আমাগো ধর্মীয় ব্যাপার। আমরা তগো মতো না।’
চাঁদপুরের বৈশাখী মেলায় বীভৎস গরমের দুপুরে এক পর্দানশীল ভদ্রমহিলাকে পুতুল কিনতে দেখে আমার সেই ঘটনাটি মনে পড়ল। ইসলামে প্রাণির ভাস্কর্য ও ছবি নিষিদ্ধ। এসব থাকলে ঘরে নাকি রহমতের ফেরেশতারা প্রবেশ করে না। ওয়াজ মাহফিলে-খুতবার বয়নে হুজুররা প্রাণির ভাস্কর্য আর ছবি ঘরে না রাখতে প্রতিনিয়ত ধর্মপ্রাণ মুসলমানদেরকে সতর্ক করে। ফলে প্রায় শতভাগ মুসলমানের বাড়িতে কোনো প্রাণির ভাস্কর্য আর ছবি থাকে না। এই যে আমাদের মৃৎশিল্প আজ ধ্বংসের পথে, তার অনেকগুলো কারণের মধ্যে এটি একটি। প্রায় বিশ কোটি মানুষ, কিন্তু মৃৎশিল্পের বাজার খুবই ছোট। ধর্মীয় বিধিনিষেধ না থাকলে বাজার আরও বড় হতো।
তবু ধর্মীয় ও পারিবারিক অনুশাসন অমান্য করে কোনো কোনো মুসলমান ঘরে প্রাণির ভাস্কর্য ও ছবি রাখে। যেমন বৈশাখী মেলার এই নারী। তিনি পর্দানশীল, কিন্তু ধর্মীয় অনুশাসন তার মনকে পুরোপুরি বিকলাঙ্গ করতে পারেনি। ধর্মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, ঘরে ফেরেশতাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে তিনি অনেকগুলো পুতুল কিনলেন, সবই মানুষসহ বিভিন্ন প্রাণির। পর্দানশীল কোনো নারী পুতুল কিনছেন, দৃশ্যটি আমার কাছে যেমনি বিরল, তেমনি মনোমুগ্ধকর। চারিদিকে এখন শুধু হুজুরদের সফলতার ছবি দেখি, তার মধ্যে এই ছবিটি হুজুরদের ব্যর্থতার ছবি। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে এই ভদ্রমহিলা হয়ত বোরকা পরেন, কিন্তু তার মনের সৌন্ধর্য মরে যায়নি, তিনি পুতুলের মতো সুন্দর একটি জিনিস দিয়ে ঘর সাজাতে চান।
হুজুরদের আরও একটি ব্যর্থতার দৃশ্য ফেরার পথে লঞ্চে চোখে পড়েছে। লঞ্চের কামড়ায় মাত্র জনদশেক যাত্রী ছিলাম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। আমার সিটের উল্টোদিকের তিন সিটে বসেছে এক তরুণ দম্পতি আর তাদের পাঁচ-ছয় বছর বয়সী ছেলে। যুবতী বোরকা পরিহিত। ছোট্ট ছেলেটি বার বার বাইরে গিয়ে অনেকটা সময় অতিবাহিত করছিল। আর সেই সুযোগে দম্পতি আলিঙ্গন ও চুম্বনসাধা পান করছিল। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে বসলাম যাতে ওরা বিব্রত না হয়। কিন্তু ব্যাপারটা আমাকে ভাবালো। আর কয়েক ঘণ্টা পর বাসায় গিয়েই তো যা খুশি করতে পারবে, তাহলে এখন লঞ্চের মধ্যে আলিঙ্গন-চুম্বনে মত্ত হচ্ছে কেন? উত্তরটাও নিজের ভেতর থেকেই পেলাম, ওদের চুম্বনের নেশা জেগেছে এখন, বাসায় যেতে যেতে এই আবেগ তো নাও থাকতে পারে। তাছাড়া বাসায় যে গরম, আর এখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামড়ায় একটু রোমাঞ্চ করলোই বা ক্ষতি। বোরকা পরা একটি মেয়ে লঞ্চের কামড়ায় বরের সঙ্গে চুম্বনযজ্ঞে লিপ্ত হয়েছে, এই ব্যাপারটি আমাকে যত আনন্দ দিয়েছে, মেয়েটি বোরকাবিহীন হলে দৃশ্যটি নিয়ে আমি দ্বিতীয়বারও ভাবতাম না।
কিছুদিন পূর্বে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের শৈবাল পয়েন্টে দেখেছিলাম স্কুল-কলেজের ছেলে-মেয়েরা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে প্রেম করছে। ঝাউগাছ, মরা শিকড় আর ছাতার আড়ালে কেদারাগুলোতে তারা রোমাঞ্চে মগ্ন। প্রায় সব মেয়েই বোরকা পরিহিত। হুজুর ছেলেও ছিল কয়েকজন। হুজুরদের এভাবে প্রেম করতে দেখলে আমার একটু বেশি-ই ভালো লাগে, মনে হয় সে কিছুটা মানবিক। কক্সবাজারে ভয়ংকর রকমের জামায়াতীকরণ হয়ে গেছে, তারই মধ্যে ছেলে-মেয়েদের প্রেম করতে দেখলে ভালো লাগে। এটাও ওয়াজী আর খুতবায় বয়ান দেওয়া হুজুরদের ব্যর্থতার চিত্র।
সবার নিশ্ছয় মনে আছে হেফাজতি নেতা মাওলানা মামুনুল হকের মানবিক বিয়ের কথা। মানবিক বিয়ে আবার কী জিনিস? ওটা আসলে প্রেম। মাওলানা মামুনুল জান্নাত আরা ঝর্ণার সঙ্গে প্রেম করতে গিয়েছিলেন। প্রশাসনের লোকজন অযাচিতভাবে সেখানে হানা দিয়ে তাদের গোপনীয়তা নষ্ট করেছে। প্রশাসন এটা করেছে এজন্য যে মামুনুল সরকারকে খুব বিপদে ফেলে দিচ্ছিলেন তার জ্বালাময়ী বক্তব্যে। মানুষকে বিভ্রান্ত করছিলেন, সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিচ্ছিলেন মামুনুল। ফলে তাকে বাগে আনতেই প্রশাসন তার গোপন জীবন প্রকাশ্যে এনে তার ভাবমূর্তি নষ্ট করে জনপ্রিয়তায় ভাঙন ধরাতে চেয়েছে। প্রশাসন তার গোপনজীবন প্রকাশ্যে এনেছে ঠিকই, কিন্তু জনপ্রিয়তায় ভাঙন ধরাতে পারেনি। মামুনুল সরকারবিরোধী জ্বালাময়ী বক্তব্য না দিলে, প্রশাসন তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে হয়ত মাথাও ঘামাত না।
যাইহোক, দিনশেষে এটাই সত্য যে মাওলানা মামুনুল প্রেম করতে গিয়েছিলেন। অথচ প্রেমের বিরুদ্ধে তারাই সবচেয়ে বেশি কথা বলেন, মানুষকে ধর্মীয় অনুশাসনে বাঁধতে চান। অথচ হুজুররাই মাদ্রাসায় ছেলে ও মেয়ে শিশুদের ধর্ষণ ও নির্যাতন করেন, নিজের স্ত্রীকে দাসীর মতো রাখেন আর প্রহার করেন। কিন্তু এসব না করে হুজুররা প্রেমিক হতে পারত। প্রেম করায় লজ্জার কিছু নেই, তাদের কেউ বাঁধাও দেবে না। হুজুররা ওয়াজ ব্যবসায় জনপ্রিয়তাবাড়ানোর কৌশল বাদ দিয়ে সত্যিকারের প্রেমিক হলে তারা এখনকার মতো এমন পাষণ্ড থাকত না, তারা মানবিক আর রোমান্টিক হতো। তাদের তখন ফুল ভালো লাগত, যে-হাতে চাপাতি-বোমা তুলে নেয়, সেই হাতে ফুল নিয়ে প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা করত, খোঁপায় ফুল গুঁজে দিত। হুজুররা প্রেমিক হলে আমাদেরই মতো তাদেরও প্রজাপতির রঙিন ডানা ভালো লাগত, বৃষ্টি ভালো লাগত, পাখির কূজন ভালো লাগত, সংগীত-নৃত্যু ভালো লাগত, ভাস্কর্য ভালো লাগত, নান্দনিক সবকিছুই ভালো লাগত। হুজুররা প্রেমিক হলে তারা আর ধর্ষণ-নির্যাতন করবে না, স্ত্রীকেও দাসীর মতো রাখবে না, হাতে চাপাতি-বোমা তুলে নেবে না, ভিন্নমত-ভিন্ন সংস্কৃতি দমন করতে চাইবে না, বাউলদের প্রহার করবে না, নাটক-সংগীত-সিনেমাকে নিষিদ্ধ করতে চাইবে না, যাত্রাপালা-পুতুলনাচ বন্ধ করতে চাইবে না, সারা পৃথিবীতে দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠা করে কলেমার পতাকা উড়াতে চাইবে না। নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসবে। শিল্প-সংস্কৃতিতে নিজেরাও অবদান রাখবে।
ওই যে বৈশাখী মেলায় বোরকা পরা নারী পুতুল কিনলেন, লঞ্চে বোরকা পরা যুবতী বরের সঙ্গে চুম্বনে লিপ্ত হলেন, মামুনুল ঝর্ণাকে নিয়ে রিসোর্টে গেলেন, শৈবাল পয়েন্টে বোরকা পরা মেয়েরা প্রেমিকের সঙ্গে রোমাঞ্চে মত্ত হলো, এ সবই মানব মনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, মনের ক্ষুধার ডাকে সাড়া দেওয়া। এতে অন্যায় কিছু নেই। বরং মানব মনের এই স্বাভাবিক স্রোতধারায় বাঁধ দিতে চাওয়াই অন্যায়। হুজুররা এই স্রোতে বাঁধ না দিয়ে প্রেম করুক, ভালোবাসুক, প্রকৃত প্রেমিক হোক। হুজুররা প্রেমিক হলে, বাংলাদেশ বদলে যাবে।
ঢাকা
৩০ এপ্রিল, ২০২৪
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মে, ২০২৪ রাত ৯:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




