
ওয়াজী হুজুরদের একচ্ছত্র আয়-রোজগারের পথে বড় বাধা ছিল গ্রামীণ মেলা, যাত্রা, পুতুলনাচ, সার্কাস। কোনো এলাকায় এসব অনুষ্ঠিত হলে সেই এলাকার মানুষ ওয়াজ শুনতে যেত না। বিকেল থেকে মাইকে ডাকাডাকি করলেও ওয়াজের মাঠের বসার জায়গার তিন চতুর্থাংশ অংশ ফাঁকা পড়ে থাকত। ফলে ওয়াজীদের আয়-রোজগার ভালো ছিল না। আজ থেকে ২০-২৫ বছর আগের ওয়াজীদের অর্থনৈতিক অবস্থা আর আজকের ওয়াজীদের অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। তখন ওয়াজীরা ওয়াজ করার জন্য নিজে থেকে মসজিদ কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করত। বাসে ঝুলে, ভ্যানে চড়ে, হেঁটে ওয়াজ করতে যেত। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার ছাপ থাকত তাদের পরনের পোশাকে, সামগ্রিক জীবনযাপনে। আর এখন ওয়াজের শিডিউল নেবার জন্য মসজিদ কমিটি ওয়াজীদের পিছে ঘোরে। জনপ্রিয় ওয়াজীদের শিডিউল নিতে হয় এক বছর আগে থেকে। বাস-ভ্যানের দিন অতীত, এখন ওয়াজীরা ওয়াজ করতে যায় দামী গাড়ীতে, কেউ কেউ হেলিকাপ্টারেও যায়। অনেকে শিডিউল দিয়ে অগ্রীম টাকা নিয়েও ওয়াজ করতে যায় না। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আগে শিল্পীদের পৃষ্ঠপোকষতা করত, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে আর্থিক সহযোগিতা করত, এখন তারা আহমাদুল্লাহ-আমির হামজাদের মতো ওয়াজী পোষে! ওয়াজ মাহফিলে প্রচুর অর্থ দান করে। ওয়াজীদের এইরকম রমরমা বাজার তৈরি করা সম্ভব হয়েছে একের পর এক মেলা বন্ধ করে আর মাঠ থেকে যাত্রা, পুতুলনাচ, সার্কাস তাড়িয়ে। এখন তারা প্রায় ফাঁকা মাঠে গোল দিচ্ছে, কাড়িকাড়ি টাকা কামাচ্ছে, ক্ষুধার্ত নবীর খেঁজুর খাওয়ার গল্প শুনিয়ে মানুষকে কাঁদিয়ে নিজেরা বিলাসী জীবনযাপন করছে। এখন একেকজনের বিবির বহর। গণ্ডায় গণ্ডায় সন্তান। কেউ কেউ পরস্ত্রী নিয়ে রিসোর্টেও যাচ্ছে।
মেলা বন্ধ এবং মাঠ থেকে যাত্রা, পুতুলনাচ, সার্কাস তাড়াতে না পারলে ওয়াজী হুজুরদের আজকের অর্থনৈতিক সাফল্য আসত না। ফলে কেবল ধর্মীয় কারণে নয়, অর্থনৈতিক কারণেও তারা মরিয়া ছিল মাঠ থেকে লোকশিক্ষা ও বিনোদনের এই মাধ্যমগুলো তাড়াতে। তাদের সামনে সেই মোক্ষাম সুযোগ আসে ২০০১ সালে বিএনপি’র সঙ্গে জোট করে জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতার স্বাদ পাবার পর। তথাকথিত আপোসহীন নেত্রী ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে জামায়াতের সঙ্গে আপোস করতে হয়েছে, বাংলাদেশের মাটি থেকে বাঙালী সংস্কৃতির শিকড় উৎপাটনের মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। জামায়াতের প্রেসক্রিপশনে একের পর এক মেলা বন্ধ করে, যাত্রা নিষিদ্ধ করে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত করে ওয়াজী হুজুরদের মাঠ তৈরিতে সহায়তা খালেদা জিয়া।
তারপর থেকে ওয়াজী হুজুরদের আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি, সাফল্যের সেই শুরু। সরকার ও প্রশাসনের সহায়তা পেয়ে তারা আরও মরিয়া হয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে কোনো কোনো অঞ্চলে গড়ে তোলে আফগানতুল্য অপসংস্কৃতি ও ভয়ের জনপদ। জন্ম হয় কুখ্যাত জঙ্গি বাংলা ভাই-মুফতি হান্নানদের। বহু জায়গায় প্রকাশ্যে গান-বাজনা নিধিদ্ধ হয়। বহু এলাকায় মুসলিম বাড়ির বিয়ে থেকে বিদায় হয় বাদ্যযন্ত্র, অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাদ্যকাররা। তাদেরকে বিকল্প পেশা বেছে নিতে হয়। দিনকে দিন ওয়াজী হুজুররা যত ফুলেফেঁপে উঠেছে, তত বিপন্ন-নিরন্ন হয়েছে লোকশিল্পীরা। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মৌলবাদী হুজুররা বাংলাদেশের লোকশিল্প ও লোকশিল্পীদের বিপন্নতার পথে ঠেলে দিয়েছে!
বহু মেলা বন্ধ হবার পরও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন পূজা উপলক্ষে এখনও কোথায়ও কোথাও মেলা হয়। একসময় এই মেলাগুলোতে যাত্রা, পুতুলনাচ, সার্কাসের দল আনা হতো। এখন বেশিরভাগ মেলাতেই এসব বন্ধ হয়েছে। ধুঁকে ধুঁকে মেলা চললেও মোল্লারা তা বন্ধের পায়তারা করছে। মেলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল করছে। বেশিরভাগ জায়গাতেই প্রশাসনের চাপে সাতদিন-পনেরদিনের মেলা এসে ঠেকেছে দু-তিন দিনে। বন্ধ হতে হতে যে মেলাগুলো এখনও টিকে আছে, সে-গুলোর ভবিষ্যৎ বিপন্ন। এখনও বাঙালির সংস্কৃতি যতটুকু টিকে আছে, এটুকু বন্ধ করতে পারলেই ওয়াজী হুজুরদের আকাঙ্ক্ষার ষোলকলা পূর্ণ হবে, তাই ওরা সংস্কৃতির অবশিষ্ট শিকড়টুকু উৎপাটনে এতটা মরিয়া, এতটা আগ্রাসী, এতটা সহিংস, এতটা ভয়ংকর!
ঢাকা
১ জানুয়ারি, ২০২৬
*নাটকের ছবিটা আরণ্যকের প্রযোজনায় আমার লেখা ও হাশিম মাসুদ ভাইয়ের নির্দেশনায় ‘পুতুলকথন’ নাটকের দৃশ্য।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



