
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোলের মাঝে আফগান তালেবান সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা নূর আহমাদ নূরের ঢাকা সফর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ময়দানে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে যখন পশ্চিমা বিশ্ব ও জাতিসংঘ তালেবান সরকারকে স্বীকৃতির প্রশ্নে এখনো কঠোর অবস্থানে, তখন ঢাকার বিমানবন্দরে নূর আহমাদ নূরের অবতরণ এবং পরবর্তী এক সপ্তাহের কর্মকাণ্ড স্বাভাবিকভাবেই জনমনে কৌতূহল ও উদ্বেগের মিশ্র অনুভূতি তৈরি করেছে।
বিশেষ করে তিনি যখন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকসহ কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন, তখন প্রশ্ন ওঠে এই সফরের গূঢ় উদ্দেশ্য নিয়ে। সরকারিভাবে একে 'ব্যক্তিগত সফর' বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলেও, একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার এমন স্পর্শকাতর সময়ে আগমনকে সাধারণ কোনো সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এই সফরকে কেন্দ্র করে বর্তমানে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রাজনৈতিক বয়ান তৈরি হয়েছে। একটি পক্ষ মনে করছে, তালেবান এখন আর কেবল একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী নয়, বরং তারা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একটি কৌশলগত প্রক্সিতে পরিণত হয়েছে। এই যুক্তির সপক্ষে তারা সাম্প্রতিক সময়ে তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির অভাবনীয় ভারত সফরকে উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
তাদের দাবি, পাকিস্তান যখন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি-কে ভারতীয় মদদপুষ্ট 'ফিতনা আল-খাওয়ারিজ' হিসেবে অভিযুক্ত করছে, তখন তালেবানের সাথে ভারতের এই সখ্যতা নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দেয়। ফলে নূর আহমাদ নূরের এই সফর বাংলাদেশে ভারতীয় কোনো বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নের মাধ্যম কি না, এমন প্রশ্নও রাজনীতির অন্দরমহলে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশেষ করে পাকিস্তানপন্থী অংশটি মনে করছে, তালেবান এখন পাকিস্তানের পুরোনো বন্ধুত্বের বদলে ভারতের সাথে নতুন সম্পর্কের পথ বেছে নিয়েছে।
অন্যদিকে দ্বিতীয় পক্ষটি এই সফরকে দেখছে বাংলাদেশে উগ্রবাদের পুনরুত্থান বা অরাজকতা সৃষ্টির একটি সংকেত হিসেবে। নব্বইয়ের দশকের আফগান যুদ্ধ ফেরত যোদ্ধাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের যে বীজ রোপিত হয়েছিল, সেই স্মৃতি এখনো অনেকের মনে অম্লান। তাদের কাছে তালেবানের যেকোনো প্রতিনিধি মানেই অন্ধকারের বার্তা। সরকারের পক্ষ থেকে এই সফরের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান না থাকা বা গোয়েন্দা নজরদারির অভাবকে তারা রাষ্ট্রের একটি বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন।
তবে এখানে একটি মৌলিক বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। যখন চীন, রাশিয়া বা ভারতের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো তালেবানের সাথে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক লেনদেন করে, তখন তাকে 'বাস্তবসম্মত রাজনীতি' বলে মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে একই ধরনের যোগাযোগ ঘটলে কেন কেবল 'জঙ্গি' ট্যাগ দিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো হয়, সেই প্রশ্নটিও এখন বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে।
ক্রীড়া ও সংস্কৃতির ময়দানেও এই মেরুকরণ বেশ স্পষ্ট। আফগানিস্তানে নারী ক্রিকেট নিষিদ্ধ হওয়ার পর ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো তাদের সাথে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বর্জন করলেও ভারত এখনো তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আইসিসি-তে আফগানিস্তানের পূর্ণ সদস্যপদ টিকিয়ে রাখার পেছনে ভারতের শক্ত অবস্থান নির্দেশ করে যে, দিল্লি এখন কাবুলের অন্যতম বড় অভিভাবক।
অথচ সেই একই তালেবান যখন ঢাকায় এসে ইসলামপন্থী নেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা দেখায়, তখন তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি কি না, সেই বিতর্ক শেষ হয় না। শেষ পর্যন্ত নূর আহমাদ নূরের এই রহস্যময় সফর বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে কোনো বিশেষ দিকে প্রবাহিত করবে কি না, কিংবা এটি কোনো বড় আঞ্চলিক গোয়েন্দা খেলার অংশ কি না, তা সময়ের সাথে সাথে পরিষ্কার হবে। তবে আপাতত এই সফর যে সরকারের জন্য একটি অস্বস্তিকর কূটনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


