somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তালেবান ও টিটিপি বিতর্ক: নূর আহমাদ নূরের ঢাকা সফর কি দিল্লির কোনো এজেন্ডা ?

০১ লা জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোলের মাঝে আফগান তালেবান সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা নূর আহমাদ নূরের ঢাকা সফর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ময়দানে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে যখন পশ্চিমা বিশ্ব ও জাতিসংঘ তালেবান সরকারকে স্বীকৃতির প্রশ্নে এখনো কঠোর অবস্থানে, তখন ঢাকার বিমানবন্দরে নূর আহমাদ নূরের অবতরণ এবং পরবর্তী এক সপ্তাহের কর্মকাণ্ড স্বাভাবিকভাবেই জনমনে কৌতূহল ও উদ্বেগের মিশ্র অনুভূতি তৈরি করেছে।

বিশেষ করে তিনি যখন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকসহ কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন, তখন প্রশ্ন ওঠে এই সফরের গূঢ় উদ্দেশ্য নিয়ে। সরকারিভাবে একে 'ব্যক্তিগত সফর' বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলেও, একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার এমন স্পর্শকাতর সময়ে আগমনকে সাধারণ কোনো সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এই সফরকে কেন্দ্র করে বর্তমানে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রাজনৈতিক বয়ান তৈরি হয়েছে। একটি পক্ষ মনে করছে, তালেবান এখন আর কেবল একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী নয়, বরং তারা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একটি কৌশলগত প্রক্সিতে পরিণত হয়েছে। এই যুক্তির সপক্ষে তারা সাম্প্রতিক সময়ে তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির অভাবনীয় ভারত সফরকে উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

তাদের দাবি, পাকিস্তান যখন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি-কে ভারতীয় মদদপুষ্ট 'ফিতনা আল-খাওয়ারিজ' হিসেবে অভিযুক্ত করছে, তখন তালেবানের সাথে ভারতের এই সখ্যতা নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দেয়। ফলে নূর আহমাদ নূরের এই সফর বাংলাদেশে ভারতীয় কোনো বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নের মাধ্যম কি না, এমন প্রশ্নও রাজনীতির অন্দরমহলে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশেষ করে পাকিস্তানপন্থী অংশটি মনে করছে, তালেবান এখন পাকিস্তানের পুরোনো বন্ধুত্বের বদলে ভারতের সাথে নতুন সম্পর্কের পথ বেছে নিয়েছে।

অন্যদিকে দ্বিতীয় পক্ষটি এই সফরকে দেখছে বাংলাদেশে উগ্রবাদের পুনরুত্থান বা অরাজকতা সৃষ্টির একটি সংকেত হিসেবে। নব্বইয়ের দশকের আফগান যুদ্ধ ফেরত যোদ্ধাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের যে বীজ রোপিত হয়েছিল, সেই স্মৃতি এখনো অনেকের মনে অম্লান। তাদের কাছে তালেবানের যেকোনো প্রতিনিধি মানেই অন্ধকারের বার্তা। সরকারের পক্ষ থেকে এই সফরের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান না থাকা বা গোয়েন্দা নজরদারির অভাবকে তারা রাষ্ট্রের একটি বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন।

তবে এখানে একটি মৌলিক বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। যখন চীন, রাশিয়া বা ভারতের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো তালেবানের সাথে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক লেনদেন করে, তখন তাকে 'বাস্তবসম্মত রাজনীতি' বলে মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে একই ধরনের যোগাযোগ ঘটলে কেন কেবল 'জঙ্গি' ট্যাগ দিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো হয়, সেই প্রশ্নটিও এখন বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে।

ক্রীড়া ও সংস্কৃতির ময়দানেও এই মেরুকরণ বেশ স্পষ্ট। আফগানিস্তানে নারী ক্রিকেট নিষিদ্ধ হওয়ার পর ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো তাদের সাথে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বর্জন করলেও ভারত এখনো তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আইসিসি-তে আফগানিস্তানের পূর্ণ সদস্যপদ টিকিয়ে রাখার পেছনে ভারতের শক্ত অবস্থান নির্দেশ করে যে, দিল্লি এখন কাবুলের অন্যতম বড় অভিভাবক।

অথচ সেই একই তালেবান যখন ঢাকায় এসে ইসলামপন্থী নেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা দেখায়, তখন তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি কি না, সেই বিতর্ক শেষ হয় না। শেষ পর্যন্ত নূর আহমাদ নূরের এই রহস্যময় সফর বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে কোনো বিশেষ দিকে প্রবাহিত করবে কি না, কিংবা এটি কোনো বড় আঞ্চলিক গোয়েন্দা খেলার অংশ কি না, তা সময়ের সাথে সাথে পরিষ্কার হবে। তবে আপাতত এই সফর যে সরকারের জন্য একটি অস্বস্তিকর কূটনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৩৭
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২০২৩ এ ওয়াকআউট করেছিলেন, ২০২৬ এ তিনিই ঢাবির ভিসি ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২২


২০২৩ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সভা চলছে। একজন শিক্ষক দাঁড়িয়ে বললেন, হলগুলোতে ছাত্রলীগের গেস্টরুম নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। কথাটা শেষ হতে না হতেই তৎকালীন ভিসি জবাব দিলেন, "গেস্টরুম কালচার... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ১৭ ই মার্চ, ২০২৬ ভোর ৪:২১

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
==========================
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি ও বাঙালির মুক্তির অগ্রদূত। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমান ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

এপস্টেইনের এলিট: ইসরায়েলের মিডিয়া নিয়ন্ত্রন এবং প্রপাগাণ্ডা

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৭ ই মার্চ, ২০২৬ ভোর ৬:৩৮


ইতিহাসবিদ ইলান পাপে বলেছেন, "ইসরায়েল অবৈধ বসতি স্থাপনকারী, ঔপনিবেশিক শক্তির একটি প্রজেক্ট। এটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠা স্বাভাবিক রাষ্ট্র নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যবস্থা"। এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পিতা তোমার জন্মদিনে জানাই শুভেচ্ছা

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৭ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ৮:৩৬


কার ডাকেতে টগবগিয়ে ফুটলো বাংলাদেশ
কার ডাকেতে বিজয় ছিনিয়ে  মুক্ত হলো স্বদেশ?

কার ডাকেতে সমবেত হয়েছিলো দীপ্ত তরুণেরা,
কার ডাকেতে দ্বিধা ভূলে একত্রিত  তারা?

কার ডাকেতে অসাম্প্রদায়িক হলো আমার প্রিয় দেশ
কার ডাকেতে স্বপ্ন... ...বাকিটুকু পড়ুন

তিনি বাংলাদেশী জাতির জনক

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৭ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ১১:৪১



বঙ্গবন্ধৃ শেখ মজিবুর রহমানকে জাতির পিতা মানে বাংলাদেশী নাগরিকগণের একাংশ। ১৯৭১ সালের পূর্বে বাংলাদেশী নামে কোন জাতি ছিল না। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকগণের একাংশ পশ্চিম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×