
২০২৩ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সভা চলছে। একজন শিক্ষক দাঁড়িয়ে বললেন, হলগুলোতে ছাত্রলীগের গেস্টরুম নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। কথাটা শেষ হতে না হতেই তৎকালীন ভিসি জবাব দিলেন, "গেস্টরুম কালচার নামে কোনো কিছু নেই।" শুধু তাই নয়, সেই শিক্ষকের বক্তব্য সিনেটের রেকর্ড থেকে মুছেও দেওয়া হলো। ওই শিক্ষক আর তাঁর সহকর্মী প্রতিবাদে উঠে চলে গেলেন, যাকে বলে ওয়াকআউট।
সেই মানুষটি ছিলেন অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, যিনি সেদিন মাথা নত না করে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। আজ ২০২৬ সালে এসে সময়ের কী অদ্ভুত খেলা—তিনিই এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। ঘটনা যদি এখানেই শেষ হতো, তবে বুক ভরে একটা তৃপ্তি নিয়ে বলা যেত, ন্যায়বিচারের জয় হয়েছে। মনে হতো একজন সাহসী মানুষ তাঁর সততার পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু ঘটনার আসল মোড়টা থেকেই শুরু হচ্ছে এক অন্যরকম অধ্যায়।
ড. ওবায়দুল ইসলাম পদার্থবিজ্ঞানের মানুষ। জাপানের টয়ামা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেছেন। জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডে পোস্টডক্টরাল গবেষণা করেছেন। আন্তর্জাতিক জার্নালে ৪০টির বেশি গবেষণাপত্র আছে তাঁর। কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংস্থা ACU তে বাংলাদেশ থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে কাউন্সিলে ছিলেন। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি হিসেবেও কাজ করেছেন। অর্থাৎ শিক্ষামন্ত্রী যেমনটা দাবি করলেন সাইটেশন, পিএইচডি, পোস্টডক দেখে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেটা এই ক্ষেত্রে একেবারে মিথ্যাও না। ওবায়দুল ইসলামের একাডেমিক ক্যারিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলা কঠিন।
ড. ওবায়দুল ইসলাম একই সাথে বিএনপির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক। বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের আহ্বায়ক ছিলেন। বাগেরহাট থেকে বিএনপির সংসদ সদস্য হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। দলীয় বিবেচনায় ভিসি নিয়োগ সাংবাদিকদের প্রশ্নে শিক্ষামন্ত্রী বললেন , "রাজনীতি করা কি অপরাধ?" না, অপরাধ নয়। কিন্তু প্রশ্নটা সেটা না। প্রশ্নটা হলো দেশের সবচেয়ে বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যখন একটি রাজনৈতিক দলের কার্ড ক্যারি করেন, তখন তিনি কি সত্যিই নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন ?
২০২৩ সালে যে ভিসি ওবায়দুল ইসলামের বক্তব্য মুছে দিয়েছিলেন, তিনিও কোনো না কোনো সরকারের আস্থাভাজন ছিলেন। আজকে ওবায়দুল ইসলাম নিজেই সেই চেয়ারে বসলেন, ভিন্ন দলের আস্থাভাজন হিসেবে। পুরো চক্রটা আবার ঘুরে এলো। এটাকে ট্র্যাজেডি বলব না। এটাকে বলব বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির সবচেয়ে পরিচিত ছাঁচ। বিরোধীরা প্রতিবাদ করে, ক্ষমতায় এলে সেই প্রতিষ্ঠানকেই নিজেদের মতো করে সাজায়। দলের নাম বদলায়, মুখ বদলায়, কিন্তু কাঠামোটা একই থাকে।
ওবায়দুল ইসলাম অন্তত একবার প্রমাণ করেছেন চাপের মুখে চুপ না থেকে সরে যাওয়ার সাহস তাঁর আছে। ২০২৩ সালের সেই ওয়াকআউট ছোট কাজ ছিল না। ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে বলা আমি এটা মানি না, এই দেশে এটা অনেক সময়ই অনেক কঠিন। এখন দেখার বিষয় হলো ক্ষমতার বাইরে থেকে যে সাহস দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতার ভেতরে থেকেও কি সেই মানুষটাকে ধরে রাখতে পারবেন। গেস্টরুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে যিনি কথা বলেছিলেন, তিনি কি নিজের আমলেও সেটা বন্ধ রাখতে পারবেন?
বাংলাদেশে ভিসি নিয়োগের ইতিহাসটা আসলে রিপিট টেলিকাস্ট হওয়া একটা পুরনো সিনেমা। সিন পাল্টায়, অভিনেতা পাল্টায়, কিন্তু সংলাপ একই থাকে। আজকের প্রতিবাদী কালকের প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে, কালকের প্রতিষ্ঠান পরশু আবার কারো প্রতিবাদের কারণ হয়। অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলামের সামনেও এখন সেই একই চেনা মঞ্চ। সুযোগ আছে স্ক্রিপ্টটা বদলে দেওয়ার, তবে ইতিহাস বলছে চেয়ার মানুষকেই বদলে দেয়। তিনি কি সত্যিই নতুন গল্প লিখবেন, নাকি এই রিপিট টেলিকাস্টের আরেকটা পর্ব হয়েই থেকে যাবেন। সময় বড় নিষ্ঠুর পরীক্ষক।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


