somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

২০২৩ এ ওয়াকআউট করেছিলেন, ২০২৬ এ তিনিই ঢাবির ভিসি ।

১৬ ই মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


২০২৩ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সভা চলছে। একজন শিক্ষক দাঁড়িয়ে বললেন, হলগুলোতে ছাত্রলীগের গেস্টরুম নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। কথাটা শেষ হতে না হতেই তৎকালীন ভিসি জবাব দিলেন, "গেস্টরুম কালচার নামে কোনো কিছু নেই।" শুধু তাই নয়, সেই শিক্ষকের বক্তব্য সিনেটের রেকর্ড থেকে মুছেও দেওয়া হলো। ওই শিক্ষক আর তাঁর সহকর্মী প্রতিবাদে উঠে চলে গেলেন, যাকে বলে ওয়াকআউট।

সেই মানুষটি ছিলেন অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, যিনি সেদিন মাথা নত না করে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। আজ ২০২৬ সালে এসে সময়ের কী অদ্ভুত খেলা—তিনিই এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। ঘটনা যদি এখানেই শেষ হতো, তবে বুক ভরে একটা তৃপ্তি নিয়ে বলা যেত, ন্যায়বিচারের জয় হয়েছে। মনে হতো একজন সাহসী মানুষ তাঁর সততার পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু ঘটনার আসল মোড়টা থেকেই শুরু হচ্ছে এক অন্যরকম অধ্যায়।

ড. ওবায়দুল ইসলাম পদার্থবিজ্ঞানের মানুষ। জাপানের টয়ামা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেছেন। জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডে পোস্টডক্টরাল গবেষণা করেছেন। আন্তর্জাতিক জার্নালে ৪০টির বেশি গবেষণাপত্র আছে তাঁর। কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংস্থা ACU তে বাংলাদেশ থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে কাউন্সিলে ছিলেন। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি হিসেবেও কাজ করেছেন। অর্থাৎ শিক্ষামন্ত্রী যেমনটা দাবি করলেন সাইটেশন, পিএইচডি, পোস্টডক দেখে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেটা এই ক্ষেত্রে একেবারে মিথ্যাও না। ওবায়দুল ইসলামের একাডেমিক ক্যারিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলা কঠিন।

ড. ওবায়দুল ইসলাম একই সাথে বিএনপির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক। বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের আহ্বায়ক ছিলেন। বাগেরহাট থেকে বিএনপির সংসদ সদস্য হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। দলীয় বিবেচনায় ভিসি নিয়োগ সাংবাদিকদের প্রশ্নে শিক্ষামন্ত্রী বললেন , "রাজনীতি করা কি অপরাধ?" না, অপরাধ নয়। কিন্তু প্রশ্নটা সেটা না। প্রশ্নটা হলো দেশের সবচেয়ে বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যখন একটি রাজনৈতিক দলের কার্ড ক্যারি করেন, তখন তিনি কি সত্যিই নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন ?

২০২৩ সালে যে ভিসি ওবায়দুল ইসলামের বক্তব্য মুছে দিয়েছিলেন, তিনিও কোনো না কোনো সরকারের আস্থাভাজন ছিলেন। আজকে ওবায়দুল ইসলাম নিজেই সেই চেয়ারে বসলেন, ভিন্ন দলের আস্থাভাজন হিসেবে। পুরো চক্রটা আবার ঘুরে এলো। এটাকে ট্র্যাজেডি বলব না। এটাকে বলব বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির সবচেয়ে পরিচিত ছাঁচ। বিরোধীরা প্রতিবাদ করে, ক্ষমতায় এলে সেই প্রতিষ্ঠানকেই নিজেদের মতো করে সাজায়। দলের নাম বদলায়, মুখ বদলায়, কিন্তু কাঠামোটা একই থাকে।

ওবায়দুল ইসলাম অন্তত একবার প্রমাণ করেছেন চাপের মুখে চুপ না থেকে সরে যাওয়ার সাহস তাঁর আছে। ২০২৩ সালের সেই ওয়াকআউট ছোট কাজ ছিল না। ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে বলা আমি এটা মানি না, এই দেশে এটা অনেক সময়ই অনেক কঠিন। এখন দেখার বিষয় হলো ক্ষমতার বাইরে থেকে যে সাহস দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতার ভেতরে থেকেও কি সেই মানুষটাকে ধরে রাখতে পারবেন। গেস্টরুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে যিনি কথা বলেছিলেন, তিনি কি নিজের আমলেও সেটা বন্ধ রাখতে পারবেন?

বাংলাদেশে ভিসি নিয়োগের ইতিহাসটা আসলে রিপিট টেলিকাস্ট হওয়া একটা পুরনো সিনেমা। সিন পাল্টায়, অভিনেতা পাল্টায়, কিন্তু সংলাপ একই থাকে। আজকের প্রতিবাদী কালকের প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে, কালকের প্রতিষ্ঠান পরশু আবার কারো প্রতিবাদের কারণ হয়। অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলামের সামনেও এখন সেই একই চেনা মঞ্চ। সুযোগ আছে স্ক্রিপ্টটা বদলে দেওয়ার, তবে ইতিহাস বলছে চেয়ার মানুষকেই বদলে দেয়। তিনি কি সত্যিই নতুন গল্প লিখবেন, নাকি এই রিপিট টেলিকাস্টের আরেকটা পর্ব হয়েই থেকে যাবেন। সময় বড় নিষ্ঠুর পরীক্ষক।

সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৭
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চরিত্রহীন

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ১৫ ই মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৬


নিপীড়িত ভেবে যাকে করে যাবে মায়া,
সর্বস্ব বিলিয়ে দেবে যার উপকারে;
কলির সন্ধ্যা কাটলে পাবে না তো তারে,
সে তখন হয়ে যাবে নিশ্চিন্ত প্রচ্ছায়া।
যাবে না ধরা হাঁটলেও সে কাছে-ধারে;
ভুজঙ্গের ন্যায় দেখাবে বিষাক্ত কায়া,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্ব রাজনীতি, শক্তির খেলা এবং ন্যায়ের প্রশ্ন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৫ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১০:৩৫

বিশ্ব রাজনীতি, শক্তির খেলা এবং ন্যায়ের প্রশ্ন

বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে বারবার এমন অভিযোগ উঠেছে যে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য দুর্বল বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নস্টালজিক

লিখেছেন সামিয়া, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৩:৩৩



আমার ঘরটা এখন আর আগের মতো লাগে না। দরজার লক নষ্ট, বন্ধ করলেও পুরোপুরি বন্ধ হয় না, আধখোলা হয়ে থাকে। বুকশেলফে ধুলো জমে আছে, ড্রেসিং টেবিলের পর্দাটা এলোমেলোভাবে ঝুলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বপ্ন যখন মাঝপথে থেমে যায়: ঢাকার জলপথ ও এক থমকে যাওয়া সম্ভাবনার গল্প

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ৮:২৫

ঢাকার যানজট নিয়ে আমরা অভিযোগ করি না এমন দিন বোধহয় ক্যালেন্ডারে খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ এই যানজট নিরসনের চাবিকাঠি আমাদের হাতের নাগালেই ছিল—আমাদের নদীগুলো। সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএ ঘোষণা করেছে যে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেন আমি ইরানের বিরুদ্ধে-২

লিখেছেন অর্ক, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১:১৪



ইরান বিশ্বসভ্যতার জন্য এক অভিশাপ, এক কলঙ্ক। কাঠমোল্লারা ক্ষমতা পেলে একটি রাষ্ট্রের যে কি পরিণতি হয়, তার জ্বাজ্জল্যমান উদাহরণ ইরান। সম্পূর্ণরূপে অসভ্য বর্বর অসুস্থ রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে সেখানে। যেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×