somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বপ্ন যখন মাঝপথে থেমে যায়: ঢাকার জলপথ ও এক থমকে যাওয়া সম্ভাবনার গল্প

১৬ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ৮:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঢাকার যানজট নিয়ে আমরা অভিযোগ করি না এমন দিন বোধহয় ক্যালেন্ডারে খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ এই যানজট নিরসনের চাবিকাঠি আমাদের হাতের নাগালেই ছিল—আমাদের নদীগুলো। সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএ ঘোষণা করেছে যে, ঈদের চাপ কমাতে এবার সদরঘাটের পাশাপাশি বসিলা ও কাঞ্চন ব্রিজ থেকেও লঞ্চ ছাড়বে। খবরটি আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তির মনে হলেও, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক ভুলে যাওয়া বড় স্বপ্নের কথা—'সার্কুলার ওয়াটার ওয়ে' বা বৃত্তাকার জলপথ।

স্মৃতি হাতড়ালে মনে পড়ে, বছর কয়েক আগে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছিল। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু আর শীতলক্ষ্যা নদীকে ঘিরে ঢাকার চারপাশ দিয়ে একটি জলপথ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল সহজ—রাস্তার ওপর চাপ কমিয়ে মানুষকে নৌপথে গন্তব্যে পৌঁছানো এবং কম খরচে পণ্য পরিবহন করা। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই গাবতলীর আমিনবাজার, টঙ্গী এবং আশুলিয়ায় চমৎকার সব ল্যান্ডিং স্টেশন তৈরি করা হয়েছিল। আশুলিয়ার সেই ল্যান্ডিং স্টেশন আর রেস্টুরেন্টটির কথা হয়তো অনেকেরই মনে আছে, যা এখন কেবল পরিত্যক্ত এক কংক্রিটের কাঠামো হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত চমৎকার একটি জনকল্যাণমুখী উদ্যোগ কেন আলোর মুখ দেখেও অন্ধকারে হারিয়ে গেল? টঙ্গী থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত চালু হওয়া সেই ওয়াটার বাসগুলো আজ কোথায়? কেন আমাদের দেশের বড় বড় প্রজেক্টগুলো শুরু হওয়ার কয়েক বছরের মাথায় ‘রহস্যময়’ কারণে বন্ধ হয়ে যায়?

বাস্তবতা হলো, যেকোনো পরিবহন ব্যবস্থা সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজন তার নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ বা কানেক্টিভিটি। আমরা ওয়াটার বাস নামিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু সেই ঘাটে নামার পর একজন যাত্রী কীভাবে তার গন্তব্যে পৌঁছাবেন, সেই 'লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি'র কথা ভাবিনি। এছাড়া নদীর নাব্যতার সংকট এবং দখলদারদের দৌরাত্ম্য তো ছিলই। কিন্তু সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত আমাদের দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ আর সদিচ্ছার অভাব। ফলে জনগণের করের টাকায় নির্মিত ল্যান্ডিং স্টেশনগুলো আজ কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের পরিকল্পনাহীনতাকেই উপহাস করছে।

অথচ 'সার্কুলার বাস রুট', 'সার্কুলার ওয়াটার ওয়ে' এবং 'সার্কুলার ট্রেন ট্রানজিট'—এই তিনটি আইডিয়া যদি সমন্বিতভাবে কাজ করত, তবে ঢাকা শহরটা বসবাসের জন্য পৃথিবীর অন্যতম সেরা শহর হতে পারত। চিন্তা করে দেখুন, আপনি উত্তরার জ্যাম এড়াতে টঙ্গী থেকে ওয়াটার বাসে উঠে নামলেন বসিলায়, আর সেখান থেকে একটি সার্কুলার বাসে করে দ্রুত পৌঁছে গেলেন ধানমন্ডি। এতে সময় যেমন বাঁচত, তেমনি রাজপথের অসহনীয় জটলা থেকেও মুক্তি পাওয়া যেত।

এবারের ঈদে বসিলা বা কাঞ্চন ব্রিজ থেকে লঞ্চ ছাড়ার এই সাময়িক উদ্যোগটি যেন কেবল উৎসবকেন্দ্রিক না হয়। এটি হোক স্থায়ী সমাধানের প্রথম ধাপ। আমাদের নদীগুলো এখনো মরে যায়নি; তাদের যদি সঠিকভাবে খনন করা হয় এবং ল্যান্ডিং স্টেশনগুলোকে পুনরায় সচল করে উন্নত সড়ক পথের সাথে যুক্ত করা হয়, তবে ঢাকার যানজট জাদুঘরে পাঠাতে আমাদের বেশি দিন লাগবে না।

জনকল্যাণমূলক পরিকল্পনাগুলো যেন কেবল খাতা-কলমে বা কয়েক দিনের শো-আপে সীমাবদ্ধ না থাকে। সরকারের কাছে অনুরোধ, সেই পরিত্যক্ত ল্যান্ডিং স্টেশনগুলোতে আবার প্রাণের স্পন্দন ফিরিয়ে আনুন। কারণ, একটি টেকসই শহর গড়তে হলে আমাদের মাটির রাস্তার পাশাপাশি জলপথকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। মাঝপথে স্বপ্ন থেমে যাওয়ার সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতেই হবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ৮:২৫
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একটা অপরাধ দশটা অপরাধের সুযোগ করে দিতে পারে ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


রাড্ডা হাসপাতালে লুটপাট
ঢাকার মিরপুর এক নম্বরে রাড্ডা ক্লিনিকের ওপর দিয়ে যেন টর্নেডো বয়ে গেছে! গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতের অন্ধকারে ১৫০-২০০ জন দুর্বৃত্ত রাড্ডা ক্লিনিকের ভেতরে প্রবেশ করে রীতিমতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিজন দাদা, হারালে কোথায় ?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


নিত্য নতুন পোস্টের ভিড়ে
সেই চেনা মুখটি আজ আর দেখি না
কোথায় হারালে বিজন দাদা
ব্লগের উঠোনে তোমার সেই ছায়াটি আর মেলে না।

কোনো লেখা যখন সদ্য প্রসবের ব্যথায়
শব্দেরা যখন খুঁজত একটু... ...বাকিটুকু পড়ুন

সক্রেটিস ঈশ্বরের বাণী প্রচার করতেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১৫



সক্রেটিস মানুষের সাথে কথা বলতে ভালোবাসতেন। তিনি যখনই সময়ে পেতেন, মানুষের সমাগম যেখানেই হতো, সেখানেই তিনি বক্তব্য দিতেন। সেই বক্তব্যগুলো ছিলো, সক্রেটিসের ভাষায়, 'দৈব বাণী' বাঁ 'ঈশ্বরের বাণী'। এজন্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

লাল বদর, কালা বদর এবং ছাপরি.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১১

লাল বদর, কালা বদর এবং ছাপরি.....

লাল বদরঃ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া একটি নতুন ও রাজনৈতিক কটূক্তিবাচক শব্দ বা স্লোগান। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও সরকার পতনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সর্ব্বহারা

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫০



দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়।
১৯৪৩ সালে জাপান ভারতে আচমকা বেশ কিছু বোমা হামলা করে। সম্ভবত হিটলারকে খুশি করতেই জাপান এই কাজ করে। একের পর এক বোমা ফেলে মাদ্রাজে (বতর্মান... ...বাকিটুকু পড়ুন

×