গাই ফকসের বিষয়ে কথা বলছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ‘বিবি’ নেতানিয়াহু। মহাসন্ত্রাসী গাই ফকস ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট ও রাজাকে বোমার ঘায়ে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ওই হামলায় পুরো দেশের ভিত্তিই উড়ে যাওয়ার কথা ছিল। গাই ফকস কিন্তু মুসলিম ছিলেন না, ছিলেন ক্যাথলিক খ্রিষ্টান। রেনেসাঁ যুগের ইউরোপে অবশ্য উভয়কেই গালমন্দ করা হয়েছে।
কিন্তু গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে কী চমৎকার কার্টুনই না উপস্থাপন করলেন নেতানিয়াহু! বোমার বাঁকা ফিউজটা আর শেষ মাথার জ্বলন্ত অংশটা দারুণ লেগেছে আমার। যেন কার্টুন ছবির ড্যান ডেয়ার বনাম দ্য মেকন। আর কালো রেখার ওপর আঁকা লাল রেখাটি; আহা! কতই না বিশ্বাসযোগ্য পুরো ব্যাপারটা। ৯০ শতাংশ বিশ্বাসযোগ্য।
জাতিসংঘে সর্বশেষ এমন ব্যঙ্গচিত্র তুলে ধরার পর থেকে আজ পর্যন্ত এ রকম হতভম্ব আর হয়নি বিশ্ব। সে ঘটনা ঘটেছিল ২০০৩ সালে। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি কার্টুন তুলে ধরে দেখান। এতে দেখা যায়, সাদা কোট পরা ইরাকি গবেষকেরা ভ্রাম্যমাণ গবেষণাগারে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি করছেন। ছবিতে দেখানো হয় একটা ট্রেনের কামরা। কিন্তু নেতানিয়াহুর বৃহস্পতিবারের মিথ্যা বোমার বিপরীতক্রমে সেটা সত্যিই ছিল একটা সাধারণ ট্রেন।
কার্টুনকে আক্ষরিক বা রূপক দুই অর্থেই নেওয়া যায়। অথবা সাধারণ মানুষের মেধার প্রতি মোটাদাগের অবমাননা হিসেবেও দেখা যায় একে। যেমন ‘বিবি’র কার্টুন। এগুলো শেষ পর্যন্ত নিষ্ফলই হয়।
ইসরায়েলের সমর্থকেরাও কেন ‘বিবি’র কার্টুনটিকে নাকচ করে দিয়েছেন, তা বুঝতে পারি আমি। কার্টুনটি যাচ্ছেতাই, সন্দেহ নেই। তবে এর বার্তাটি হচ্ছে আসল কথা। হালকা কার্টুনটি যেন আবার আসল সত্য থেকে আপনাদের দৃষ্টি সরিয়ে না নেয়। আর নেতানিয়াহুর মতে, সেই সত্যটি হচ্ছে, ইরান আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পারমাণবিক বোমা তৈরি করে ফেলতে পারে।
এখানে পাঠককে একটু পুরোনো কথা মনে করিয়ে দিই। ইরান সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ ও নাশকতাকারীদের কেন্দ্র...দেশটি নাৎসিদের চেয়ে বিপজ্জনক। কারণ, হিটলার পারমাণবিক বোমার অধিকারী ছিলেন না। ‘বিবি’ বৃহস্পতিবার এসব বলেছেন? না। কথাগুলো ১৯৯৬ সালে বলেছিলেন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিমন পেরেজ।
শিমন পেরেজ ১৯৯২ সালে নিজে বলেছিলেন, ইরান ১৯৯৯ সালের মধ্যে পারমাণবিক বোমা তৈরি করে ফেলবে। ১৯৯৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৩ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। নেতানিয়াহুর প্রতিরক্ষামন্ত্রী এহুদ বারাক ১৯৯৬ সালে বলেছিলেন, ইরান ২০০৪ সালের মধ্যে পারমাণবিক বোমার অধিকারী হতে যাচ্ছে। ২০০৪ সাল থেকেও পেরিয়ে যাচ্ছে প্রায় আট বছর। তাঁদের হাতে এখন হয়তো শুধু কার্টুনই আছে।
বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে হরেক বিশেষজ্ঞ কার্টুনটি দেখে বোকাটে হাসি হেসেছেন। তবে আবার জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব করে নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারিতে একমতও হয়েছেন তাঁরা। একবার ভেবে দেখেননি অতীতের ডাহা মিথ্যা হুঁশিয়ারিগুলোর কথা। ব্লুমবার্গের কলাম লেখক লিসা বেয়ার মন্তব্য করেছেন, নেতানিয়াহু ‘সঠিকভাবেই’ উল্লেখ করেছেন যে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাজ চমৎকার। কিন্তু আসলেই ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাজ চমৎকার নয়। দুই দশক ধরে লেবানন বিষয়ে ইসরায়েলি সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্য যা-তা মানের। এবং এই সংস্থাগুলোই কলিন পাওয়েলকে এই তথ্য দিয়েছিল যে ইরাকের কাছে সত্যিই গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে। এরপর আমরা যেকোনোভাবে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সেই মিথ্যা তথ্যের কথা ভুলে গেছি।
তবে এটা ঠিক, নেতানিয়াহুর উপস্থাপিত কার্টুন আমাদের মনোযোগ ঠিকই ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের মর্যাদাকর বক্তব্য থেকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যেতে পেরেছে। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলদারিত্বের যে নিন্দা আব্বাস করেছেন, তা নেতানিয়াহুর শিল্পকর্মের চেয়ে বহুগুণ বেশি সঠিক। কিন্তু আব্বাসের বক্তব্য ছিল আরবি ভাষায়, নেতানিয়াহু বক্তৃতা করেন আমেরিকান ইংরেজিতে। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বের টিভি পর্দাগুলোয় এদিন একজনকেই দেখানোর কথা। নেতানিয়াহু তাঁর বক্তৃতায় জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন নিয়ে অস্বাভাবিকভাবে উত্তেজিত হন। প্রায় ভুলে যাওয়া সেই প্রতিবেদনটি ২০০৮-০৯ সালে গাজায় ইসরায়েলি নিষ্ঠুরতাবিষয়ক। ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে সেবার এক হাজার ৩০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়, যার বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক। যে নেতানিয়াহু এত পরিসংখ্যান নিয়ে থাকেন, সেই মানুষটির স্মৃতি থেকে এটি হারিয়ে গেল!
কিন্তু কী আর করার! ইরান তো প্রতারণাপূর্ণ জায়গা। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ এক খ্যাপাটে লোক। যদিও নতুন ছাইরঙা চশমায় তাঁকে নেতানিয়াহুর চেয়ে কিছুটা বেশিই নিরুদ্বিগ্ন মনে হয়। ইরান অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইরাকের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনও তো একটি তৈরি করছিলেন। মনে নেই
[প্রথম আলো থেকে নেওয়া.....]
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০১২ বিকাল ৪:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




