somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইমাম সমাচার

১৯ শে জুলাই, ২০১৩ সন্ধ্যা ৭:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঈশ্বরদীর হুজুর হেকমত আলী মাস ছয়েক আগে হঠাৎ একটি চিঠি পেলেন। তার মাদ্রাসার এক ছাত্র ঢাকা থেকে চিঠিটা পাঠিয়েছে। চিঠি পড়ে জানতে পারলেন তার ছাত্রের এলাকার মসজিদের জন্য একজন ইমাম প্রয়োজন। ছাত্র মকসুদ সেখানকার মসজিদ কমিটির মেম্বার, তাই সে হেকমত সাহেবকে চিঠি পাঠিয়েছে তিনি যাতে দয়া করে ঢাকায় মসজিদে ইমামের দায়িত্বে যোগদান করেন। এই ছাত্রটি হেকমত সাহেবের খুব কাছের একজন, তার কথা ফেলে যায় না। তাই তল্পিতল্পা গুছিয়ে মোটামুটি তিনি যখন এসে পৌঁছান, তখন থেকেই এলাকার লোকজন তাকে মাথায় তুলে রেখেছে। দিনে তিনবেলা এলাকার নামী হোটেল থেকে খাবার আসে, কোনবেলায় পোলাও, গরুর মাংস, কোন বেলায় খিচূড়ি আবার কোন বেলায় খাসির বিরিয়ানী। তার পাশাপাশি বাসায় বাসায় মিলাদ পড়াতে গেলেও খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে, সাথে বাড়তি আয় তো আছেই।

ফজরের নামাজ পড়ে তসবিহ পড়তে পড়তে হেকমত সাহেব এসবই ভাবছিলেন। একে তো রমজান মাস, তার উপর আজ আবার শুক্রবার। জুমু'আর সময় প্রচুর মানুষ হবে। তসবিহ গোণা শেষ করে দোয়া করলেন। তারপর আতরের শিশি থেকে তুলায় একটু আতর নিয়ে হাতে ঘষলেন, বাকি দুই গালে ঘষে তুলাটা কানের ভাজে গুঁজে রাখলেন। এমন সময় তার সাথের মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। জহুরা বেগম ফোন করেছেন। হেকমত সাহেব একটু বিরক্তই হলেন। মেয়েমানুষের খেয়ে দেয়ে কাজ নাই, সকাল বেলা নামাজ পড়েই ফোন করতে হবে। কেন যে তাকে মোবাইল কিনে দিয়েছিলেন! হাতে মোবাইল ফোনটা নিয়ে কল রিসিভ করলেন,

"আসসালামু আলাইকুম জহুরা বেগম! কি সমাচার?"

"আসসালামু আলাইকুম, আপনি কেমন আছেন?"

"ওয়ালাইকুম সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ! আমি ভালো আছি! তোমারে না বলেছি আমাকে সকাল সকাল ফোন দেয়ার কোন দরকার নাই? আর সালামের উত্তর দাও নাই কেন? জাহান্নামবাসী হইতে চাও?"

"মাফ করে দেন! ভুল হয়ে গেছে।"

"মাফ করার মালিক আল্লাহ, আমি না! তা কি জন্যে ফোন করেছ?"

"ইয়ে ঘরের কাজ তো আল্লাহর রহমতে ভালো চলতেছে, আরো কিছু টাকা প্রয়োজন! আর ঘরেও খরচপাতি লাগবে!"

"তার জন্য ফোন দেয়ার কোন প্রয়োজন নাই, টাকা সময়মত পেয়ে যাবা ইনশাল্লাহ! আর শোন, সকাল সকাল আমাকে এইভাবে ফোন দিবা না। আমি যিকিরে মশগুল থাকি, আমার যিকিরে ব্যাঘাত ঘটে। এখন রাখ, খোদা হাফেজ!"

"জ্বি আচ্ছা, আসসালামু আলাইকুম!"

হেকমত সাহেব ফোন রেখে দিলেন।


রমজান মাসে মানুষ একটু বেশিই পরহেজগার হয়ে যায়! ধর্ম কর্মের প্রতি টান বাড়ে!

মসজিদে সমাগম হওয়া বিশাল মানুষের স্রোতের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলেন হেকমত আলী। উত্তর মহল্লার গাঁজাখোর কাসেমও দেখি টুপি পরে নামাজ পড়তে চলে এসেছে! অন্য সময় তো মামুনের চায়ের দোকানে হিন্দী গান শুনে আর গাঁজা টেনে দিন পার করে! আল্লাহ এদের হেদায়েত করুন!

নামাজের আগের ওয়াজ শুরু করলেন হেকমত আলী। এই রমজানের প্রতি শুক্রবারের মত আজকেও রমজান, যাকাত এর ফযীলাত নিয়ে আলোচনা করলেন। তারপর একটু দম নিয়ে হাতের ঘড়ির দিকে তাকালেন, এইবার শুরু করা যায়। একটু দম নিয়ে হেকমত আলী শুরু করলেন,

"ভাইয়েরা আমার! আগেই বলেছি এই রমজান ত্যাগের মাস! মহিমার মাস! কিভাবে ত্যাগ করতে হয় তা শেখার মাস! আপনার অনেক ধন সম্পদ, কিছুটা যদি আল্লাহর রাস্তায় ত্যাগ করবেন, আপনার সম্পদ হয়তো কমবে! কিন্তু মনে রাখবেন, রোজ কেয়ামতে আপনার এই সম্পদ! আপনার জন্য দোয়া করবে বলেন সুবহানআল্লাহ!

সমাগমের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন ওঠে। তৃপ্তির হাসি দিয়ে হেকমত আলী আবার শুরু করেন,

"আপনারা অনেকেই বলেন, পরকালের চিন্তা করেন। সেই চিন্তা করে নিজের কবরের জন্য জমি কিনে রাখেন। কিন্তু কে বলবে আপনার কপালে জমি আছে কি নাই? আপনি যদি হজ্বে গিয়ে মক্কা শরীফে মারা যান, তাহলে আপনার কবরতো সেখানেই হবে! তাহলে এই জমি কি করবেন? আমি বলতেছি না এই জমি কেনা গুনাহ, আমি বলতেছি যে কেন অনিশ্চিত বিষয়ে টাকা খরচ করবেন? আপনারা জানেন, আমাদের মসজিদের জন্য জমি কেনা আবশ্যক। আপনাদের টাকায় সেই জমি কেনা হইতেছে। আরো টাকা লাগবে। কবরের জমির দাম কত? বার স্কয়ার ফিট, প্রতি স্কয়ার ফিটের দাম ছয় হাজার হইলে বাহাত্তুর হাজার টাকা হয়! ভাইয়েরা আমার, কেন এত টাকা অনিশ্চিত কাজে খরচ করবেন? এই বাহাত্তুর হাজার টাকা আল্লাহর রাস্তায় দান করেন, আল্লাহর মসজিদের জন্য দান করেন। কে আছেন ভাই? নিজের কবরের জায়গা আল্লাহর রাস্তায় দান করবেন? ভয় নাই, আপনি দান করেন, আল্লাহ আপনার জন্য কবর নয়, জান্নাতের বাগিচা বানায়ে দেবেন! কেউ আছেন ভাই, হাত তোলেন!

আগ্রহী কাউকে দেখা যায় না!

"ভাবতেছেন, এত টাকা দিলে লস হয়? হায়রে ভাই! দুনিয়ার টাকায় কি হবে, কিছুই তো সাথে নিতে পারবেন না! আচ্ছা ঠিক আছে, কে আছেন এর অর্ধেক দেবেন? ছয় স্কয়ার ফিটের টাকা দান করবেন?"

একজন উঠে দাঁড়ালেন। এই লোককে হেকমত আলী চেনেন, সিমেন্টের দোকান আছে ভদ্রলোকের। নাম ইদ্রিস।

"আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের ইদ্রিস ভাই মসজিদের জন্য ছত্রিশ হাজার টাকা দান করেছেন। আর কেউ আছেন? যান আরো কমায়ে দিলাম! এক স্কয়ার ফিটের টাকা কেউ দান করবেন? ছয় হাজার? ছয় হাজার? কেউ দিলে তাড়াতাড়ি বলেন, নামাজের সময় পার হয়ে যাইতেছে!"

এইবার বেশ কিছু আগ্রহী দেখা যায়, পনের বিশ জন দাঁড়িয়ে যান। হেকমত আলীর চোখ চকচক করে ওঠে,

"আলহামদুলিল্লাহ! ভায়েরা আমার, এইরকম হৃদয়বান, আল্লাহপ্রেমিক ভাইদের জন্য আমি দোয়া করি! আল্লাহ তাদের জমীন জান্নাতের বাগিচা বানায়ে দেবেন, বলেন আলহামদুলিল্লাহ!"

নামাজ শেষ হয়। যারা টাকা দেবেন বলেছিলেন সবাই আছর ওয়াক্তে এসে টাকা দিয়ে যান।

ইফতারের পর হেকমত আলী মসজিদ কমিটির অফিসে যান। আজ যা যা দান উঠেছে, সব জমা দেবেন। হেকমত আলীকে দেখে মকসুদ উঠে দাঁড়ায়,

"আসসালামু আলাইকুম হুজুর, আসেন! বসেন এইখানে!"

"ওয়ালাইকুম সালাম, কি সমাচার মকসুদ? দিনকাল কেমন যায়?

"এই তো হুজুর! আল্লাহর রহমত আর আপনার দোয়া!"

"আমি আর কি? সব তারই উছিলা!"

একে একে কমিটির অন্য সদস্যরা এসে উপস্থিত হন। কাদের মিয়া, গোলাম রাব্বানী, আলিম আহমেদ, সবুর পাটোয়ারী সহ অন্যান্যরা।

হেকমত আলী শুরু করেন, "আল্লাহর অশেষ রহমতে আজ মসজিদে ভালই দান উঠেছে। ইদ্রিস আলী ভাইয়ের ছত্রিশ হাজার সহ আজকের অনুদান মোট পঞ্চাশ হাজার টাকা।"

আলিম আহমেদ অবাক হয়ে বলে উঠলেন, "সে কি হুজুর! মুয়াজ্জিন যে বলল দেড় লাখের মত টাকা উঠেছে?"

হেকমত আলী ঠান্ডা চোখে আলিম সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, "আমার বক্তব্য যদি বিশ্বাস না হয়, তাহলে আপনারা মুয়াজ্জিনরে গিয়ে ধরে হিসাব দিতে বলেন। আল্লাহর কসম! আমি যদি ভুল হই আল্লাহ আমার বিচার করবেন!"

মকসুদ তড়িঘড়ি করে বলে উঠল, "নাউযুবিল্লাহ হুজুর! আপনার কথায় অবিশ্বাস করি কিভাবে? আলিম ভাই, কি যে বলেন না! হুজুর কি মিথ্যা বলবে? মুয়াজ্জিনের বোধহয় ভুল হইছে কোথাও!"

আলিম সাহেব সমর্থন না পেয়ে চুপ করে রইলেন। বাকিরাও নীরব থাকলেন।

মিটিং শেষে নিজের বাসায় ফিরলেন হেকমত আলী। দরজা ভালো করে আটকিয়ে আলমারী খুললেন। পাঞ্জাবীর পকেট থেকে নব্বই হাজার টাকার বান্ডিলটা নিয়ে গোপন ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখলেন। কাল বাদে পরশু রবিবার সকালেই টাকাটা বাড়ি পাঠাতে হবে। এখানকার বাড়ির জানালা গুলো সুন্দর, এগুলোকে নাকি থাই গ্লাস বলে। ভাবছেন নিজের বাড়িতে নতুন করা চার তলা বিল্ডিঙয়ের জানালাগুলো তেও এই সিস্টেম করবেন। টাকাটা রেখে আলমারী ভালো করে বন্ধ করে হেকমত সাহেব মসজিদের উদ্দেশ্যে বের হলেন, একটু পর আবার তারাবীহ শুরু হবে!


এক সপ্তাহ পর!

হেকমত সাহেব জুমু'আর ইমামতি করবেন। ওয়াজ শুরু করলেন,

"ভাইয়েরা, আপনারা রাস্তায় অনেককেই দান করেন। কিন্তু সে কি আসলেই গরীব কি না তা জানার উপায় আছে কি? আপনার দান করা অর্থ সৎ কাজে যাচ্ছে কি? তাই বলি, আমাদের ফান্ডে জমা দিয়ে যান, আল্লাহর কসম! আমি নিজ হাতে তদারকি করে সেই টাকা মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিব। আর একটা কথা, আপনাদের টাকায় মসজিদের জমি কেনার চেষ্টা চলতেছে, আরো কিছু টাকা লাগবে। আসেন ভাই, আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সম্পদ বিলায়ে দিয়ে জান্নাতের পথ সুগম করি! আছেন কেউ ভাই............?"


(বিঃ দ্রঃ - এই গল্পটি লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব অভিজ্ঞতা অবলম্বনে লিখিত। কোন প্রকার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত প্রদান কিংবা হেয় করার উদ্দেশ্যে লেখা হয় নি। তবে কারো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলে গেলে লেখক দায়ী নয়!)
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×