সাংবাদিকদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার কিছুই নেই। তবে সাংবাদিক কোন স্বাধীন সত্ত্বা নয়। তাকে একটা নির্দ্দিষ্ট ছক আর কাঠামো মেনেই কাজ করতে হয়। এটা অবশ্য ভিন্ন কথা যে আমাদের দেশে সাংবাদিকরা অধিকাংশক্ষেত্রেই পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে পারেন না। আর এটা কমবেশি পুরোটাই তাদের ব্যক্তি সমস্যা। তাছাড়া মিডিয়ার মালিক কারা তাদের দিকটাও দেখা উচিত। সবাই ব্যবসায়ী কিংবা রাজনৈতিক দলের সদস্য। তাই তাদের কাছে ভালো কিছু আশা করাই ভুল। কেবল মালিকানার জোরে অনেক আগাছাকেই মিডিয়ার জগতে বড় বড় পদে আসীন থাকতে দেখা যায়। একটি উদাহরণ দেই, এখনও আনুষ্ঠানিক সম্প্রচার শুরু হয়নি এমন একটি টিভি চ্যানেলে দেখলাম ফ্যাশন শো দেখাচ্ছে। ফ্যাশন শো দেখানো খারাপ কোন বিষয় নয়, তবে ফ্যাশন শোতে কিছু মেয়ে উদ্ভট সব পোশাক পরে ক্যাট ওয়াক করছিল। আর মঞ্চের সামনে একটি মেয়ে যত ভাবে সম্ভব শরীর নাচিয়ে হিন্দি গানের সাথে তাল মিলাচ্ছিল।
ইদানিংকালে হলুদ সাংবাদিকতার কথা কমবেশ সবাই জানে। এর জন্য অবশ্য বাংলাদেশের সাংবাদিককূলের দারুন কৃতিত্ব রয়েছে। কারণ আর যাইহোক, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ আর যথাযথ নির্দেশনা না দিয়ে, সাংবাদিকতা করতে দিলে তো, কম বেশ এমনটাই ঘটবে। তো, যা বলছিলাম, হলুদ সাংবাদিকতা, এটার ইতিহাস বহুত পুরোনো। খুব সহজ করে বললে, হলুদ সাংবাদিকতা হচ্ছে, অতিরঞ্জিত আর মিথ্যা সংবাদ। উইলিয়াম রেন্ডম হার্স্টের নিউ ইয়র্ক জার্নাল আর জোসেফ পুলিৎজারের নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ডের মধ্যকার প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করেই হলুদ সাংবাদিকতার জন্ম। তাদের কৃতকর্মের কারণে আমেরিকা ও স্পেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। তাহলে বুঝুন হলুদ সাংবাদিকতা কী করতে পারে। তবে সব কিছুকেই ঢালাওভাবে হলুদ সাংবাদিকতা বলার কোন মানে নেই।
একটি গণমাধ্যমের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সংবাদ পরিবেশন করা, আর সেটা অবশ্যই বিক্রির উদ্দেশ্যে। পাশাপাশি কিছু মতাদর্শ তৈরি করা এবং ভালো-মন্দটা বুঝতে সাহায্য করা। কিন্তু আসলে কী ঘটে? ধরুন আপনি কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, যাদের কাজ হচ্ছে আইডিয়া বিক্রি করা, তো, আপনার বস কী সবসময় আপনার মতকে প্রাধান্য দেয়? বোধ করি না। আবার যখন উত্তরটা ইতিবাচক হচ্ছে, তখনও কিন্তু আপনার আইডিয়াটা পুরোপুরি আপনার মনের মত যাবে না। যাইহোক, যেটা বলছিলাম, সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলো নিউজ লেখে, সাথে টিকে থাকার জন্য বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করে, পাশাপাশি আরও বিভিন্ন কাজ করে। তো, যে প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিয়ে সংবাদ প্রতিষ্ঠান তার কর্মচারীদের বেতন দেয়, তারা তো তাদের বিপক্ষে কখনই নেতিবাচক কিছু ছাপবে না, যেমন প্রথম আলো কখনই গ্রামীণ ফোনের বিরুদ্ধে নেতিবাচক কিছু ছাপে না। আর আগেই বলেছি যে এখন মিডিয়ার মালিকানায় রয়েছে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী একইসাথে রাজনৈতিক দলের নেতারা। তাই সবকিছুই সংবাদাকারে আসে না। আবার এটা ধরে নেবেন না, যে আপনি যা দেখছেন বা পড়ছেন সেটাই সত্য! কারণ ঐ যে বলেছিলাম মিডিয়া মতাদর্শ তৈরি করে। নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড হারম্যান তাদের সম্মতি উৎপাদন নামক একটি বইয়ে দেখিয়েছেন, মিডিয়া কীভাবে এলিট শ্রেণীর মতাদর্শ উৎপাদন করে। অর্থাৎ মিডিয়াতে আপনি যা পাচ্ছেন, তা আপনি কী চাইছেন সেটা নয় বরং এলিট শ্রেণী যা চাচ্ছে এবং যেভাবে দেখাতে চাচ্ছে আপনি ঠিক সেভাবেই দেখছেন। আদতে কিন্তু বিশ্বের কোথাও মিডিয়া স্বাধীন নয় আর তাই বিকল্প মিডিয়ার ধারণা থেকেই ইন্টারনেট খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
উপরে এত কথা লিখলাম শুধু এটা বিষয় বলার জন্য যে, রাজধানীতে একজন ডাক্তার সম্ভ্রমহানি হওয়ার হাত থেকে নিজেকে বাচাতে গিয়ে খুন হয়েছেন। আর আদতে এটা মিডিয়ার মালিকদের (ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক) তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। বরং এসব বিষয় মিডিয়াতে না আসাটাই অনেক ভালো। আর একটা বিষয় খেয়াল করুন, আশুলিয়া ট্রাজেডির পর কি হলো? সবাই দুদিন যেতে না যেতে সব ভুলে গেছে। বরং মিডিয়াগুলো অন্যান্য রাজনৈতিক খবরগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করছে। কারণ মানুষকে এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে দেয়া যাবে না। বরং তাদের চিন্তাভাবনা অন্য কিছুর দিকে সরিয়ে দিতে হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


