এইচএম আকতার/ কামাল উদ্দিন সুমন : ভারত থেকে লবণ আমদানি করার সুযোগ করে দেয়ায় দেশীয় লবণ শিল্পে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এতে কয়েক লাখ টন দেশীয় লবণ অবিক্রীত পড়ে রয়েছে। লবণ শিল্পের সাথে জড়িত কয়েক লাখ শ্রমিক ও লবণ চাষী কর্মহীন এবং ছোট ছোট শতাধিক লবণ উৎপাদনকারী মিল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা অবিলম্বে লবণ আমদানির এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৪০টি ছোট ছোট লবণ মিল বন্ধ হয়ে গেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় লবণ আমদানির জন্য এ ধরনের অনুমতি প্রদান করেছে।
লবণ ব্যবসায়ীদের একটি সূত্র জানিয়েছে, দেশে প্রতিবছর লবণের চাহিদা হচ্ছে ১৩/১৪ লাখ টন। আর উৎপাদন হচ্ছে ১৬ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে শুধুমাত্র কক্সবাজার জেলায় যে পরিমাণ জমিতে লবণ উৎপাদিত হয় তা দিয়েই দেশের সকল চাহিদা মিটিয়ে নেয়া যায়। কয়েক বছর আগে বিসিক দেশীয় লবণের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য পলিথিনের উপর লবণ চাষের প্রযুক্তি আবিষ্কার করে। দেশে চাহিদার ৭০ ভাগ লবণ এখন পলিথিন থেকে উৎপাদিত হয়। এ লবণ সাধারণ লবণের চেয়ে বেশি পরিষ্কার ও উন্নত এবং ওয়েস্টেজ কম হয়। আগে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে দেশীয় উৎপাদিত লবণে চাহিদা পূরণ না হলে চাহিদা মেটাতে কি পরিমাণ লবণের প্রয়োজন তা বিসিকের মাধ্যমে নিরূপণ করে দেশের ২০৪টি লবণ মিলের মাধ্যমে কোটা পদ্ধতিতে তা আমদানি করা হতো। কিন্তু এবার মুক্ত বাজার অর্থনিতির নামে দেশের বৃহৎ কয়েকটি লবণ শিল্প মালিককে লাখ লাখ টন লবণ আমদানি করার অনুমোদন দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এসব শিল্প প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ৬/৭ লাখ টন লবণ ভারত থেকে আমদানি করতে শুরু করেছে।
নারায়ণগঞ্জের ক্ষুদ্র লবণ ব্যবসায়ীরা জানান লবণ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভারত থেকে আমদানিকৃত প্রায় ২ লাখ টন লবণ বর্তমানে খালাসের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থান করছে। এদিকে আমদানিকৃত ভারতীয় লবণে বাজার সায়লাব হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে দেশীয় লবণ ব্যবসায়ীরা। দেশীয় লবণের চেয়ে ভারতীয় লবণের মান কিছুটা উন্নত হওয়ায় এবং তুলনামূলকভাবে দেশীয় লবণের চেয়ে ওয়েস্টেজ কম হওয়ায় বিক্রেতারা ঐ লবণের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে এবং দেশীয় লবণের চেয়ে আমদানিকৃত লবণের দাম কম হওয়ায় মুনাফা বেশি করছে আমদানিকারকরা। ক্রেতা সাধারণ ওই লবণের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ছোট ছোট লবণ মিলগুলো বাধ্য হয়ে বড় বড় লবণ আমদানি কারকদের কাছ থেকে লবণ কিনে নিয়ে শুধু মাত্র আয়োডিন যুক্ত করে দিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে।
সূত্র জানায়, এরই মধ্যে ওরিয়েন্টাল এন্টারপ্রাইজের নামে প্রায় ২ লাখ টন, পূবালী সল্টের নামে প্রায় ১ লাখ টন, মোল্লা সল্টের নামে প্রায় ১ লাখ টন লবণ, তানভির সল্টের নামে এক লাখ টন আমদানি করার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি দিয়েছে। এছাড়া লবণ আমদানির জন্য অনুমতি পেয়েছে বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, সিকদার গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান। কক্সবাজারের মহেশখালী ধলঘাট এলাকার একজন লবণ চাষী জানান, কক্সবাজারে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় এ জেলার অন্যকোন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। তাই এ এলাকার মানুষ চিংড়ি ও লবণ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে এ এলাকার প্রায় ৪/৫ লাখ লোক লবণ চাষের সাথে জড়িত।
দেশের উন্নতমানের লবণ উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের বিজনেস ডিরেক্টর কামরুল ইসলাম জানান, বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করা সরকারের একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম এভাবে লবণ আমদানি করার জন্য অনুমোদন দিচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতে দেশীয় লবণের বাজারে ধস নামবে।
কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া-মহেশখালী এলাকার সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান আজাদ দৈনিক সংগ্রামকে জানান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের ১০টি উপজেলায় দেশের শতভাগ লবণ উৎপাদন হয়। দেশের চাহিদা পূরণ করে ইতোমধ্যে বিদেশে রফতানি করছে। দেশের ২ লাখ মেট্রিক টন লবণ উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও সরকার কার স্বার্থে লবণ আমদানি করছে তা রহস্যজনক। লবণ শিল্পকে ধ্বংস করেই একটি চোরা চালানীচক্র এ লবণ আমদানি করছে। বিগত সরকারের আমলে লবণ আমদানি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এ সরকার ক্ষমতায় আসার ৬ মাসের মধ্যে তা প্রত্যাহার করে নেয়। এতে করে এ চিহ্নিত চক্র আবারো লবণ আমদানি শুরু করে। প্রতিবছর লবণ উৎপাদনে দেড় হাজার কোটি টাকা আমদানি সাশ্রয় হয়। এ লবণ চাষের সাথে দেশের ১২ লাখ কৃষক প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। চোরাই পথে লবণ আমদানি হওয়াতে এসব কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লবণ উৎপাদন খরচের চেয়ে বিক্রয় মূল্য কম হওয়াতে লবণ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষক। ফলে লবণ চাষিরা বেকার হয়ে পড়ছে। চাপ পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। এর ফলে হাজার হাজার একর ভূমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে। জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ইতোমধ্যে কৃষকরা সমুদ্রে লবণ ঢেলে প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংসদে লবণ আমদানি বন্ধে দাবি তোলা হলেও সরকার এ ব্যাপারে নীরব। তাই কৃষকরা লবণ উৎপাদন না করে রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছে। সরকার লবণ আমদানি বন্ধ না করলে জাতীয় স্বার্থে জনগণকে সাথে নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
নারায়ণগঞ্জ লবণ আড়ৎদার সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব নাজির আহাম্মদ জানান, চাহিদা ও উৎপাদনের হিসাব না করেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় হঠকারি একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশের বৃহৎ কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে ভারত থেকে লাখ লাখ টন লবণ আমদানি করার অনুমতি দেয়ায় দেশীয় লবণ বাজার হারাচ্ছে। সনাতন পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদনকারী দেশের ছোট ছোট লবণ মিলগুলো বেকায়দায় পড়েছে।
নারায়ণগঞ্জ লবণ মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সফিকুল ইসলাম বাবুল জানান, বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সিন্ডিকেট করে লবণের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা যে ভারত থেকে লবণ আমদানি করছে এতে করে ছোট ছোট মিল মালিকরা পথে বসে যাবে। মেনুয়াল মেশিনে লবণ উৎপাদনকারী মিলগুলো অটো মেশিনে লবণ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে টিকতে পারছে না।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ লবণ আমদারিনকারক পুবালি সল্টের মালিক পরিতোষ সাহা জানান, ভারত থেকে লবণ আমদানি করায় দেশীয় লবণ শিল্পে ধস নামার কোন কারণ নেই। লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হওয়ার প্রশ্নই আসে না। বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করা না হলে বাংলাদেশের জনগণকে প্রায় ৩০ টাকা কেজি দরে লবণ কিনতে হতো। দেশীয় লবণ রিফাইন করে প্যাকেটজাত করতে খরচ বেশি পড়ে। দেশীয় এক কেজি কাঁচা লবণ কিনতে হয় তিন থেকে সাড়ে তিন টাকা, অথচ বিদেশ থেকে আমদানি করা লবণে খরচ পড়ে মাত্র ১ থেকে দেড় টাকা। তাছাড়া দেশীয় লবণের মহাজন ও ফড়িয়ারা লবণ নিয়ে মনোপলি ব্যবসা করে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


