সাল ২০০৭। বিএনপির ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বলি দেশের সব মানুষ। আওয়ামী লীগের আন্দোলন এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে। উভয়পক্ষই অনড়, নিজেদের অবস্থানে। পরিনাম ওয়ান ইলেভেন। বিএনপির রাজত্ব শেষ হওয়ায়, নিজেদের আন্দোলন সফল হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই খুশি আওয়ামী লীগ। স্বাগত জানালেন তখনকার সেনাপ্রধান মঈনের নেতৃত্বাধীন ফখরুদ্দিনের সরকারকে। বিএনপি নাখোশ তাদের রাজত্ব হারানোর কারনে।
ধূর্ত মঈন, ফখরুদ্দিন ধরতে পারলেন দেশের বেশীরভাগ মানুষের পাল্স। দেশের মানুষ তখন বিরক্ত ছিলো চারদলের জোটের নেতাদের দূর্নীতিতে। তাছাড়া বেশ কয়েক বছর তাদের দূর্নীতির কারনে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ছিলো দেশ! ওয়ান ইলেভেন'র কুশীলবরা এর বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করলেন। জোরালো প্রচারণা। 'শক্তিশালী' করলেন দূর্ণীতি দমন কমিশনকে। সংঘবদ্ধ মিডিয়া সিণ্ডিকেট'র মাধ্যমে দূর্ণীতির 'বিরুদ্ধে' জোরালো প্রচারণা করে গ্রেফতার শুরু হলো রাজনীতিবিদদের। বাদ পড়ছে না ব্যবসায়ীরাও। দূর্ণীতিতে অতিষ্ট সাধারণ মানুষ হাততালি দিয়ে বরণ শুরু করলো তাদের। জনগন তখনো বুঝতে পারেনি তাদের আসল উদ্দেশ্য। তারা সফল। এবার তারা প্রবল উৎসাহে শুরু করলো দুই নেত্রীকে গ্রেফতারের 'মাইনাস টু ফর্মূলা'। মূলত: মাইনাস করার দরকার ছিলো বঙ্গবন্ধুর মেয়ে শেখ হাসিনাকে। তিনি কেনো গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করবেন! দূর্ণীতির কোনো অভিযোগ না পেয়ে তার বিরুদ্ধে ছড়ানো হচ্ছে 'চাঁদাবাজির' অভিযোগ! দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হলেন ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই সকাল সাড়ে সাতটায়। বাসভবন 'সুধা সদন' থেকে গ্রেফতার করা হলো তাকে। আদালতে সোপর্দ করলেও আদালত তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করেননি। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকারের বাসভবনকে সাব জেল ঘোষণা করে সেখানে তাকে অন্তরীণ রাখা হয়।
সাধারণ মানুষের আর বুঝতে বাকি রইলো না তাদের এ অপপ্রচারের মূল হেতু। কিন্তু তখন কিছু করার ছিলো না। তাদের অপপ্রচার এতোটাই শক্তিশালী ছিলো, তখন দূর্ণীতি বিরোধী এ 'সেন্টিমেন্ট'র বিরুদ্ধে কিছু বলা যায়নি, দেশের ভূতুরে পরিস্থিতির কারনে। অবশ্য সাধারন ছাত্র, জনতা তাদের বিরুদ্ধে জেগে ওঠলে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় সেনা সরকার।
অন্যদকে, ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের তিন তারিখে দূর্নীতির অভিযোগে পুত্রসহ গ্রেফতার হন খালেদা জিয়া। ২০০৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর তিনিও হাইকোর্টের নির্দেশে মুক্তিলাভ করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে গ্রেফতার করার পর দীর্ঘ এক বছর সাত দিন কারাগারে আটকে রাখে।
ওই সময় এখনকার অনেক মন্ত্রী, এম.পিদের সাজা হয়েছে ষাট, সত্তর, আশি বছর করে! তবে মজার বিষয় হলো, তাদের বিরুদ্ধে চলতে থাকা কোন মামলারই উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি হয়নি, চলতে থাকা তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগই প্রমাণিতো হয়নি।
এবার বলতে পারেন, এখনতো আর জানুয়ারি মাস না। জানুয়ারির এগারো তারিখও না। কেনো কষ্টের এ ঘটনা সামনে আনছেন? মনে করছেন, করাচ্ছেন? কারন একটা অবশ্যই আছে। ওয়ান ইলেভেন'র সময় দেশকে রাজনীতিশূন্য করতে রাজনীতিবিদদের চরিত্রের বিষয়ে অপপ্রচার করে যেমন তাদেরকে গ্রেফতারের বিষয়ে ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে, মিথ্যা প্রচারনার দ্বারা জনগনকে ভুল বোঝানো হয়েছে, ঠিক সেই একই গোয়েবলসীয় কায়দায় সংঘবদ্ধ সিণ্ডিকেট'র মাধ্যমে অপপ্রচার করা হচ্ছে গাজী টিভি'র বার্তা সম্পাদক রকিবুল ইসলাম মুকুলের বিরুদ্ধে।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি তার বিবাহিতো স্ত্রী, জনকণ্ঠের অন্যতম জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক নাজনীন আক্তার তন্বিকে রেখে আরেক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন। এর কারনে তিনি নিশ্চয়ই 'দোষী'! 'মারধর করতেন'। সবশেষে মামলা করলেন। গ্রেফতার হলেন মুকুল। মেয়ে সাংবাদিক হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তন্বির ফ্রেন্ডসার্কেল'র বেশির ভাগই নারী সাংবাদিক। তারা অনলাইন, অফলাইন মাতালেন। নিজেদের ক্রোধ, ক্ষোভ ঝাড়লেন মুকুলের ওপর। তাকে যতো নিচে নামানো যায়, সাংবাদিক কমিউনিটি, আর সাধারণ মানুষের কাছে তাকে যতোটা বাজেভাবে উপস্থাপন করা যায়, প্রতিযোগিতামূলক এ ক্যাম্পেইনে নামলো তারা! ঠিক যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিলো ওয়ান ইলেভেন'র সময় রাজনীতিবিদদেরকে।
কেউ আবার আরেকটু এগিয়ে আছেন। তাদের সঙ্গে কোনো পুরুষ সাংবাদিক কেনো এ ক্যাম্পেইনে অংশ নিচ্ছে না? আবদার মাখা কণ্ঠে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেল শুরু হলো ঠিক এভাবে, '...আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, গাজী টিভির নিউজ এডিটর রকিবুল ইসলাম মুকুলকে স্ত্রী নির্যাতনের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়ার নিউজগুলো আমরা মেয়েরাই কেবল শেয়ার দিচ্ছি। আমাদের পুরুষ সাংবাদিক, সহকর্মীরা এ নিয়ে সোচ্চার নয়। দিলে আঘাত পেয়েছেন আপনারা?' কেউ আবার কষ্টের বিষয়টা প্রকাশ করেছেন এভাবে, 'কাক কাকের মাংস খায়না। কোনো সাংবাদিক যখন কোনো অপরাধ করে, অন্যায় করে, সেই খবর প্রচার, প্রকাশের সময় বেশির ভাগ গণমাধ্যম এবং নীতি নির্ধারকেরা এমন এক ভয়ঙ্কর সেল্ফ সেন্সরশিপ করেন। ...গাজী টেলিভিশনের নিউজ এডিটর রকিবুল ইসলাম মুকুল দীর্ঘদিন ধরে তার স্ত্রী জনকন্ঠের সিনিয়র রিপোর্টার নাজনীন আখতার তন্বীর ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাচ্ছিলো। সাংবাদিক নেতা থেকে শুরু করে কমিউনিটির অনেকেই বিষয়টি অবহিত ছিলেন। কেউ মুকুলের টিকিটিও ধরতে পারেনি। কাক কাকের মাংস খায়না বলে যারা নিজেদেরকে কাক গোত্রের মনে করেন, তারা কাকের মতোই চোখ বন্ধ করে থেকেছে আর হয়তো ভেবেছে কেউ কিছু জানেনা, তারা এর সমাধানের তেমন জোড়ালো কোনো চেষ্টা করেছে বলে শুনিনি। ...সাংবাদিকের ভাবমূর্তি রক্ষা? এভাবে কি ভাবমূর্তি রক্ষা করা যায়? যায় না। খবরটি যথাযথ ভাবে স্থান না দিয়ে আসলে কাকের মতোই চোখ বন্ধ রেখে ভেবেছে কেউ দেখেনি! ভাবমূর্তি যদি সত্যিই রক্ষা করতে হয় তাহলে দরকার শুদ্ধি অভিযান, ন্যায় বিচার। মুকুলকে আড়াল না করে তন্বীকে ন্যায় বিচার পেতে সহযোগিতা করার মধ্য দিয়েই শুরু হোক শুদ্ধতার চর্চা।' অনেকের ক্ষোভ গাজী টিভির ওপর। অভিযোগ প্রমানের আগে কেনো তাকে 'অব্যাহতি' দেয়া হচ্ছে না? গাজী টিভি কি 'দেউলিয়া'...!
তাদের এমন কৌশলী প্রচারনায় কমিউনিটির অনেকেই নিজেদের অবস্থান ব্যখ্যা করার চেষ্টা করলেন। মুকুলের পাশে না 'ঘোষণা, অঙ্গীকার' করলেন। আসলে অনেক কিছু না জেনেই তারা 'শুদ্ধতার চর্চা' শুরু করে দিলেন। ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবদের মতো এবারের 'ক্যাম্পেইনওয়ালা'রাও সফল। কারন, কোনো মিডিয়া জানতে চায়নি অভিযুক্তের বক্তব্য। এদেশের সাংবাদিকতাকে 'সেল্ফ সেন্সরশিপ', 'নারী পটানো'র পেশায় ব্র্যাকেটবন্দি করার পরেও তারা অনুসন্ধান করলেন না। তারা একপক্ষের বক্তব্য শুনে, ইমোশনালি ব্ল্যাকমেল'র শিকার হয়ে নিজেদেরকে 'নারীবাদী' প্রচারে ব্যস্ত হলেন! ভালো কথা। কিন্তু তারা এমন একজন নারীর পক্ষ নিলেন, আর যা হোক, যার মুখে নারীবাদের কথা মানায় না। কারন, এটা হচ্ছে মানবিকতা।
তাদের অভিযোগ, নাজনীনকে অকথ্য ভাষায় 'নির্যাতন' করতেন মুকুল। যারা তাদের সম্পর্কে জানেন, তাদের সেসব বন্ধু, আর সহকর্মীদের বলছি, আপনারা একপেশে বক্তব্য না দিয়ে বুকে
হাত রেখে বলুন, মুকুল নির্যাতন করতেন তন্বিকে। আমার জানামতে, মুকুলকে মানসিক, শারীরিকভাবে নির্যাতন করতেন তন্বি। কারন একটাই। তার দৃষ্টিতে 'ভালো' কোনো ফ্যামিলি থেকে আসেননি মুকুল। শুধু 'নিচু বর্ণ'র হওয়ার কারনে তাদের ফ্যামিলির কাউকে তাদের বাসায় আসতে দিতেন না তন্বি! ৯ বছরের দাম্পত্যজীবনে মাত্র তিন, চারবারের মতো মুকুলদের গ্রামের গিয়েছেন তিনি। তার বোন, ভাগ্নে, ভাগ্নি, আত্নীয়, স্বজনদের কেউ বাসায় আসার ব্যপারে ছিলো তন্বির নিষেধাজ্ঞা।
পুলিশের কাছে তিনি স্বীকার করেছেন, তন্বী তাকে মারধর করতেন। তাদের বক্তব্য 'ভাঙ্গা হাত' নিয়ে কিভাবে মারতো বউটা? হাত ভেঙ্গেছে চন্দ্রমূখীর মৃত্যুর পর। তার আগেই মুকুলের গায়ে হাত তুলতেন তিনি। কারনে, অকারনে। কিন্তু তিনি বিষয়টা ওইভাবে কারো কাছে শেয়ার করতে পারতেন না লজ্জায়। আরেকটা কারন আছে। সেটা হলো এই তন্বিকে তিনি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। তন্বিকে পাওয়ার জন্য 'মাত্রাতিরিক্ত ঘুমের ট্যাবলেটও খেয়েছেন তিনি'। আর এটাকেই 'দূর্বলতা' হিসেবে পেয়েছেন তন্বি। এ দূর্বলতার প্রতিদান তিনি এভাবেই দিতেন! একদিন, দুই দিন, তিন দিন। মাস। বছরের পর বছর। নীরবে সহ্য করে অতিষ্ট হয়েছেন। চেয়েছেন শুধু চন্দ্রমূখীর মুখের দিকে। চন্দ্র'র মৃত্যুর পরে তিনি এর থেকে মুক্তি চেয়েছেন। আর এটা যেকোনো 'নারীবাদী পুরুষ, নারী'মাত্রই চাইতেন। এ বিষয়টা আঁচ করতে পেরেই এবার তারা জোট বাঁধলেন। যে করেই হোক, পূর্বাচলের জমিটা এবার তাদের চাই। 'গরীবের ছেলে' কোটিপতি হবে, এটাও তার মানতে হবে! তাই তারা স্ট্যাম্পে লিখে নিতে জোর চেষ্টা করলেন। ব্যর্থ হলেন, আত্নীয়, স্বজন নিয়ে তাকে মারধর করেও। সেখান থেকে দু'জনের আলাদা থাকা। জমি বিক্রি। সেই জেদে মামলা! প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে সংঘবদ্ধ মিথ্যা প্রচারনা। আর নারীবাদের জিগির তোলে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেল!
বিষয়টা এমন পর্যায়ে গেছে, একজন অভিযুক্ত কারাগারের কোন সেলে আছেন সেটা নিয়েও মাথাব্যাথা! সেল চেঞ্জ'র বিষয়ে সাংবাদিক পরিচয়ে সেখানেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা! তবে আজ ওনার সঙ্গে দেখা হওয়ার পরে জানলাম, তিনি এখনকার সেলে আগের চেয়ে ভালোই আছেন! কারন, আগের সেলে একা থাকায় মন খারাপ হতো, নিজের রান্না করে খেতে হতো। এ কারনে অনেক সময় খেতেন না। আর এখনকার সেলে তার নিজের রান্নাটা নিজের করা লাগছে না। 'গরুর মাংশ, ডিম ভূনা' তিনি এখন প্রতিদিনই খান। কারন, কারাগারে থাকা মানুষগুলো এখন তাকে রান্না করে খাওয়াচ্ছে। প্রথমে ভুল বুঝলেও পরে যেমন ভালোবাসা পেয়েছিলেন ওয়ান ইলেভেনের রাজবন্দীরা। আর তিনিও যেনো কোনো এক অদৃশ্য কারনে লাগাতার চারদিন করে তিন বেলায়ই গরুর মাংস, আর ডিম ভূনা খান! জিজ্ঞেস করলে বলেন, 'সব কথা জানতে নেই! ব্যক্তিগত কিছু কথা একান্ত গোপনই থাক!' আর জানতে চাইনি মাংস, আর ডিমের 'ইতিহাস'। তাদের ব্যক্তিগতো কথা তাদের মধ্যেই থাকতে দিয়েছি।
ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবরাও অনেককে তাদের দলে ভিড়িয়ে ছিলেন। অনেকে এসে ভিড়েছিলেন। প্রধান দু’দলের কেন্দ্রীয় অনেক নেতাকে জেনারেল মইন তার কিংস পার্টির সঙ্গে ভিড়াতে পারলেও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মঈনের অভিলাষের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। ফখরুদ্দীন, মঈনরা দায়িত্ব থেকে বিদায় নেয়ার পর এখন দেশের বাইরে জীবন কাটাচ্ছেন। তখনকার চাটুকাররা আজ তাদের পাশে নেই। এরা বিপদে পাশে থাকেও না। সময়মতো আপনিও এখনকার কাউকে পাশে পাবেন না। ২০০৭ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মানুষ প্রথমে একে স্বাগত জানালেও পরবর্তীতে তা যে আতঙ্ক ও চরিত্র হননের অভিশপ্ত সময় ছিলো, তা বর্তমানে সব মহলে স্বীকৃত। সত্য কখনো গোপন থাকে না। তা এক সময় বেরিয়ে আসবেই।

তাই বলবো, কালবৈশাখীর ঝড়ে কিছু মুকুল হয়তো ঝরে যায়, কিন্তু এটা দেখে মুকুল ঝরে গেলো বলে খুশি হওয়ার কিছু নেই। কেননা, কালবৈশাখীতে সব মুকুল ঝরে যায় না, ঝড়কে থোরাইকেয়ার করে কিছু মুকুল কিন্তু ঠিকই নিজের পূর্ণতায় পৌছে যায়। টিকে থাকে স্বমহিমায়...।
আহসান কামরুল
১০.০৭.২০১৫ খ্রি.
ঢাকা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


