ছোটবেলায় প্রথম প্রথম বড় ভাইদের মুখে যখন "হুজুগে বাঙ্গালি" কথাটা শুনতাম, তখন এর মানে বুঝতাম না। শুধু এতটুকু বুঝতাম ওনারা এমন সময় কথাটা ব্যবহার করতেন যখন অন্যের কোন কাজ তাদের পছন্দ না হতো। আর তাই তখন না বুঝেই অন্যের কাজ পছন্দ না হলেই নিজেও অনেকবার তাদের "হুজুগে বাঙ্গালি" বলে ডেকেছি। আর যখন এর আসল মানে বুঝতে পারলাম তখন বুঝলাম- না বুঝে ওদের যখন তখন তা ডেকে নিজের অজান্তে আমি নিজেও অনেকবার "হুজুগে বাঙ্গালি" হয়েছি।
ছোটবেলায় বেশিরভাগ ঈদ'ই নানুর বাড়িতেই করা হতো। গ্রামের ঈদে সমবয়সি ছেলমেয়েদের দেখতাম সালামির টাকা দিয়ে বাঁশের তৈরী একধরনের বাঁশি কিনতো। একটানা বাজাতে লম্বা সময় ধরে এয়ার সাপ্লাই দেয়ার জন্য বাঁশির সাথে যে প্যকেট'টা কেনা হতো তা ছিল আসলে 'কনডম'! আমরা তখন তাকে পোটকা বলতাম। সবাই কিনতো, কিন্তু বুঝতামনা কেন যেন আমার ঘরেই ওটা পছন্দ করতো না! বলতো এর শব্দ বিরক্তিকর! এটা ক্ষতিকর! সেই পোটকার ব্যাবহার আমার চোখে তো কেবল বাঁশি বাজানোই ছিল!
সেই সময়ই টিভি-রেডিওতে এইচআইভি এইডস'এর বিজ্ঞাপন ফলাও করে প্রচার হতো। কোনভাবে জানতে পারলাম ওটা একটা ভয়ানক রোগ। বিজ্ঞাপনে পরিষ্কার বলা হতো ওইটা ব্যাবহার করলে নাকি এইডস থেকে বাঁচা যায়। আমি ভাবলাম এত ভাল একটা জিনিসকে আমার ঘরে পছন্দ করে না! একবার তো মা'কে গিয়ে বলেই ফেললাম- মা, পোটকা ব্যাবহার করলে এইডস থেকে বাঁচা যায়। এত ভাল একটা কথার জবাবে মা পরিষ্কার শুনিয়ে দিল- এটা নিয়ে যেন আর কোন কথা না শুনি! ঠিক আছে? মন খারাপ করে তখন উত্তর দিয়েছিলাম- ওকে!
পাকিস্তান টিমে একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বি লেগ স্পিনার ছিল, "দানিশ ক্যানেরিয়া"। বিভিন্ন সময় প্রি-ম্যাচ প্রেস কনফারেন্সে বলতে শুনতাম- "... ইনশাআল্লাহ হাম লোগ জিতেঙ্গে"। সেখানে "ইনশাআল্লাহ" শব্দটা হয়তো তার ভেতর একজন সাধারন পাকিস্তানি হিসেবে কথার অভ্যাসের কারনেই বলতো।
আমার দেশে'র ৯০% মানুষ'ই প্রাকটিসিং না হলেও অন্তত নামে মুসলিম। যেমনই হোক ইসলামিক কিছু অভ্যাস, প্রাকটিস পুরো সমাজে বা আমাদের প্রায় সবার মাঝেই আছে। রং দিয়ে বিচার করলে ইসলাম একটা সাদাকালো ধর্ম। প্রত্যেকটা কাজের পেছনেই এর চাওয়া আল্লাহ'র সন্তুষ্টি অর্জন। এবং তা'র পথগুলোও খুবই সিম্পল। এখানে অতিরঞ্জিত কোন কিছুর স্থান নেই, খুশীতে গা ভাসানোর কোন উপলক্ষ নেই, কোন অজুহাতেই যা ইচ্ছে তা করার অনুমুতি নেই। এমনকি উৎসবেও এর চাওয়া হলো পবিত্র থাকা, আল্লাহ'র সন্তুষ্টির জন্য নামাজ পড়া। আর যে পথগুলি আনন্দের বলা হয়েছে, সেগুলো আমাদের চোখে- বলিউডি রংয়ের কাছে, পাশ্চাত্যের শিল্পের কাছে ফ্যাকাশে লাগে।
আমরা রং খুজি। নিজেকে ঝক ঝকে Ultra HD 4K টিভি'র Pixel এ রাঙ্গাই। আমরা ল্যান্টার্ন উড়াই, হোলি খেলি, প্রদীপ ভাসাই, কারো শোকে মোমের বাত্তি জ্বালাই, ভাই-ভাই ভুলে মামা ডাকি, ন্যায়-অন্যায় বুঝি না, ধর্মের দোহাই মানি না, কালচার'এর তোয়াক্কা করি না। যা কিছু রঙ্গিন, যা কিছু ভাল লাগে, সব আমাদের চাই। যখন যার হুজুগ উঠে, আনন্দের সাথে বুঝে না বুঝে নিজের গা খানি এলিয়ে দিয়ে কুল গাই হয়ে যাই!
আমরা এখন আরেকটা হুজুগের সামনে আছি। নিজের প্রোফাইল পিক'কে রঙধনুর রঙ্গে রাঙ্গানোর হুজুগ। ফেইসবুকও বিল্টইন সার্ভিস দিচ্ছে সহজে নিজের প্রোফাইল পিক'কে রংধনুর রঙ্গে রাঙ্গিয়ে তোলার। অনেকেই করেছে, আরও অনেকেই করবে। তবে এটা নিশ্চিত তাদের মধ্যে বেশীরভাগই না বুঝে জাস্ট হুজুগে করবে, কুল গাই হবে। আর তা দেখে যারা সেলিব্রেটিং এর আসল কারনটা জানে বা বুঝে, তারা আমার মা'য়ের মতোই বিব্রত হবে। আর কুল গাই'রা আমার মতোই আরেকবার "হুজুগে বাঙ্গালি" হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


