তোলপাড় করা বিশের দশক -৩
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মদ নিষিদ্ধ
বিশের দশকে অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীনতা বাড়লেও, এই দশককে নিষেধাজ্ঞার যুগও বলা হয়। ১৯১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র সংবিধানের ১৮ তম সংশোধনীর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মদ (alcoholic beverage) উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন এবং বিক্রি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। সংবিধান সংশোধনীর আলোকে প্রণীত ন্যাশনাল প্রহিবিশন এক্ট (National Prohibition Act) বলে ১৯২০ সালের ১৬ জানুয়ারী মধ্যরাত থেকে সারা যুক্তরাষ্ট্রে সব ধরণের শুঁড়িখানা, মদের দোকান এবং মদের সেলুনগুলি বন্ধ করে দেয়া হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে মদ্যাশক্তি, পারিবারিক সহিংসতা ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দুর্নীতি ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলে পেটিস্টিক প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টানরা মদ্যপানকে এর প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত করে মদ নিষিদ্ধ করার জন্য আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনের ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান আইন পাস হওয়ার আগেই নিজ থেকেই তাদের নিজেদের প্রতিষ্ঠানে মদ খাওয়া বন্ধ করে দেয়। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে মদ নিষিদ্ধ করার পক্ষে বিপক্ষে জোরালো বিতর্ক শুরু হয়। মদ নিষিদ্ধ করার পক্ষের লোকেরা জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতার স্বার্থে মদ নিষিদ্ধ করার দাবি জানায়।
মদ নিষিদ্ধ করার পর জনগণ নিজেরাই অবৈধ ভাবে মদ তৈরী করতো এবং চোরাকারবারিদের দ্বারা পরিচালিত অবৈধ মদের দোকানে যেয়ে মদ খেতে শুরু করে। মদ নিষিদ্ধ করার পর পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যায়। সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলি চোরাই পথে মদের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। এরমধ্যে সবচাইতে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ছিল এল ক্যাপনে; তার অধীনে এক হাজার স্বশস্ত্র সন্ত্রাসী ছিল। সে শিকাগোর অধিকাংশ পুলিশকে তার পক্ষে কাজ করার জন্য মাসে মাসে বেতন ভাতা দিতো। এতে আইন শৃঙ্খলার আরো অবনতি হয়। ১৯৩৩ সালে ৫ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সংবিধানের ২১ তম সংশোধনীর মাধ্যমে মদের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।
সাংস্কৃতিক গৃহযুদ্ধ
বিশের দশকে শুধুমাত্র মদ নিষিদ্ধের কারণেই না, আরো কিছুকিছু কারণে সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এই সময়ে হাজার হাজার কালো আমেরিকান দক্ষিণের রাজ্যগুলি থেকে উত্তরের রাজ্যগুলিতে এবং বড়বড় শহরগুলিতে চলে আসতে থাকে, যাকে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন বলে। তাছাড়া কালোদের নিজস্ব সংস্কৃতি প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠে, যেমন-জ্যাজ সংগীত, ব্লুজ সংগীত ইত্যাদি। এছাড়াও কালোদের মাঝে শিক্ষা আন্দোলন যাকে হারলেম রেনেসাঁস বলে, ইত্যাদি কারণে সাদা আমেরিকানরা অস্বস্তি বোধ করতে থাকে। তাই বিশের দশকে ইন্ডিয়ানা এবং ইলিনয়েস রাজ্যের হাজার হাজার সাদা আমেরিকান কু ক্লাক্স ক্লান (Ku Klux Klan) নামের বর্ণবাদী সংঘটনে যোগ দেয়। তারা এক দিকে যেমন কালোদেরকে দমন করার চেষ্টা করে, অপরদিকে পুরানো মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে।
অনুরূপভাবে কমিউনিস্ট বিরোধী "রেড স্ক্যার " সংঘটন অভিবাসন বিরুধী জোরদার আন্দোলন শুরু করে। যার ফলশ্রুতিতে ১৯২৪ সালে ন্যাশনাল অরিজিনস এক্ট (National Origins Act) নাম অভিবাসন সংক্রান্ত একটা কঠোর আইন পাস হয়। ঐতিহাসিকরা সামাজিক এই সংঘাতগুলিকে সাংস্কৃতিক গৃহযুদ্ধ বা Cultural Civil War হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। এই সাংস্কৃতিক গৃহযুদ্ধ ছিল মফস্বলের অধিবাসী বনাম বড়ো শহরবাসী, প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টান বনাম ক্যাথলিক খ্রিষ্টান, কালো আমেরিকান বনাম সাদা আমেরিকান; বিশেষ করে নতুন মহিলা সমাজ বনাম পরানো মূল্যবোধ সম্পন্ন সমাজ।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে এপ্রিল, ২০১৭ রাত ১:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



