
হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার ৭ অক্টোবর হামলার মূল স্থপতি। বর্তমানে তিনি ইসরাইলের প্রধান লক্ষ্য। হামলার পর চার মাস হতে চলেছে কিন্তু তিনি এখনো অধরা রয়ে গেছেন। তিনি সবসময় ইসরায়েলই সামরিক এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলি থেকে এক ধাপ এগিয়ে থাকেন।
গাজ্জার ভিতরে ঘনবসতিপূর্ণ একটি এলাকা খান ইউনুস। এখানেই ইয়াহিয়া সিনওয়ারের জন্ম এবং কর্মকাণ্ডের ঘাঁটি। ইসরায়েল বাহিনী সম্প্রতি খান ইউনুসে মাটির গভীর নিচে জিম্মিদের আটকে রাখার একটা খাঁচা খুঁজে পেয়েছে। ইসরাইলি বাহিনী ধারণা করছে এর কাছাকাছি কোথাও সিনওয়ার লুকিয়ে আছে। তিনটি স্তর দ্বারা সিনওয়ারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। টানেলের প্রথম স্তরে আছে হামাসের যোদ্ধা, দ্বিতীয় স্তরে জিম্মিদের খাঁচা তারপর সুরক্ষিত কমান্ড পোস্টে সিনওয়ার অবস্থান করছেন। তাকে ধরতে হলে প্রথমে টানেলে ঢুকতে হবে যা প্রায় অসম্ভব। যদি ঢুকতেও পারে তাহলে তারা হামাস যোদ্ধাদের মুখোমুখি হবে। যদি হামাস যোদ্ধাদের পরাজিত করতে যায় তাহলে খাঁচায় বন্দি নিরীহ জিম্মিরা মারা যাবে। তারপর সিনওয়ারের সুরক্ষিত স্থানে ঢুকা যাবে। কিন্তু ইতোমধ্যে সিনওয়ার পালানোর জন্য অনেক সময় পেয়ে যাবে। সে টানেলের অন্যদিক দিয়ে আরেক অজানা স্থানে চলে যাবে। ফলাফল হবে শূন্য কিন্তু ইসরাইলের ব্যাপক ক্ষতি হবে এবং খাঁচায় বন্দি সব নিরীহ জিম্মি মারা যাবে। ইতোমধ্যে ইসরাইল একটা প্রচেষ্টা চালিয়ে ছিল। এতে ২৪ জন ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছে, যা এযাবৎ কালের মধ্যে এক দিনে এক ঘটনায় ইসরাইলের সর্বোচ্চ ক্ষয় ক্ষতি।
জিম্মিদের কাছাকাছি থাকার কারণে হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার একাধিক বার রক্ষা পেয়েছেন। ইসরাইল বাহিনী তাকে নাগালে পেয়েও জিম্মিদের নিরাপত্তার কারণে কিছু করতে পারে নাই। তার এই কৌশল খুব ভাল ভাবে কাজ করছে। তাছাড়া হামাস এমন কিছু প্রযুক্তি ব্যবহার করছে যার ফলে সিনওয়ার দোহায় তার রাজনৈতিক নেতাদের সাথে যোগাযোগ করলে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা তা সনাক্ত করতে পারে না।
গাজ্জাতে হামাসের একটি বাড়তি সুবিধা হল এর ঘনবসতি। এই ঘনবসতির কারণে ইসরাইল প্রতিটা বাড়ি এবং মানুষ সঠিক ভাবে ট্রেক করতে পারে না। কিন্তু পশ্চিম তীরে খুব সহজেই প্রতিটা বাড়ি এবং মানুষ ট্রেক করতে পারে।
সিনওয়ারের সম্ভাব্য অবস্থান স্থল মনে করে ইসরাইল বাহিনী গত কয়েক দিন ধরে খান ইউনুসের যে সুড়ঙ্গটি ঘেরাও করে রেখেছে সম্ভবত সিনওয়ার সেখান থেকে সরে গেছে। অর্থাৎ সনাক্তকরণ এড়াতে অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। তবে তারা এই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিতে পারছে না যে তিনি একটি টানেল দিয়ে মিশর অতিক্রম করতে পারেন।
সিনওয়ারকে ধরতে পারার সম্ভাবনা কম, এই ধারণা থেকে ইসরাইল প্রস্তাব দিয়েছে যে বাকি সব জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে সিনওয়ার এবং অন্যান্য হামাস নেতাদের গাজা থেকে নিরাপদে অন্য দেশে চলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে।
কিন্তু এই আলোচনা ফলপ্রসূ হয় নাই। কারণ সিনওয়ার বর্তমানে তিনটি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, (১) তার নিজের বেঁচে থাকা, (২) হামাসের সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং (৩) ভবিষ্যতে গাজ্জার নেতৃত্বে দেয়া।
হামাস -ইসরাইল দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে আমেরিকা, কাতার এবং মিশর সহ একাধিক দেশ আলোচনা করছে ৷ হামাসে দাবি, যে কোনো জিম্মি মুক্তি পাওয়ার আগে ইসরায়েলকে তার আক্রমণ অনির্দিষ্টকালের জন্য থামাতে হবে। কিন্তু এই দাবি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সিনওয়ারের কৌশল হচ্ছে তিনি সবসময় কিছু নিরীহ মানুষকে জিম্মি হিসাবে আটকে রাখবেন। কারণ এই নিরীহ মানুষগুলিই হবে তার বীমা পলিসি। এই নিরীহ মানুষগুলির কারণে যে কেউ তাকে হত্যা করবে না।
হামাসকে ধ্বংস করতে হবে এই ব্যাপারে দলমত নির্বিশেষে সব ইসরাইলি একমত হলেও সেটা কি ভাবে সম্ভব এই ব্যাপারে ভিন্ন মত আছে। কারো করো মতে আগে জিম্মি উদ্ধার করতে হবে, তারপর হামাস ধ্বংস করতে হবে। আবার কারো কারো মতে জিম্মি উদ্ধার করতে গেলে হামাস ধ্বংস করা যাবে না। অর্থাৎ নিরীহ জিম্মি মুক্তি এখন প্রধান ইস্যু। এটা সিনওয়ার পরিষ্কার ভাবে বুঝতে পেরেছে। তাই নিরীহ জিম্মিদেরকেই তার লক্ষ্যে পৌঁছার কৌশল হিসাবে বেছে নিয়েছে।
হামাসের সাথে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছেন এমন একজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন যে গাজা ছেড়ে দোহা বা বৈরুতের মতো আঞ্চলিক নিরাপদ আশ্রয়ে বসবাস করতে বাধ্য করবে এমন চুক্তিতে সিনওয়ার সম্মত হবেন না। তার মানসিকতা ইয়াসিন আরাফাত বা মাহমুদ আব্বাস থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার বিশ্বাস যতটা সম্ভব ইহুদিদের হত্যা করার পরে মারা যাওয়া, এতে তিনি সরাসরি বেহেস্তে যাবেন। ইসলাম ধর্মকে তিনি এই ভাবেই ব্যাখ্যা করেন। সিনওয়ার বিশ্বাস করেন যে তিনি শহীদ হবেন এবং তিনি মৃত্যুকে ভয় পান না। পৃথিবীর সংক্ষিপ্ত জীবন শেষে তিনি চিরদিন বেহেস্তে বসবাস করবেন।
তথ্য যাচাই, গবেষণা এবং বিশ্লেষণের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেয়া হয়েছে।
সূত্র: ১. NBCNews.com, CNN, Daily News Egypt, Jordan Times, Palestine Chronicle, Al Jazeera
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জানুয়ারি, ২০২৪ রাত ১২:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


